কণ্ঠ নীল নয় তবুও পাখির নাম নীলকণ্ঠ, কেন?

প্রসেনজিৎ দত্ত

‘কাশ্মীর রোলার’ নামে এক পাখি আছে। প্রকৃত অর্থে যা নীলকণ্ঠই, অর্থাৎ গলাটাই নীল। এখানে যে নীলকণ্ঠ পাখিকে দেখছেন, তার স্থানভেদে এমন রূপ। একে আপনি স্থানভেদে কাশ্মীর রোলারের জাতভাই বলতে পারেন। মহাদেবকে কেন নীলকণ্ঠ বলা হয়, তা প্রায় সবাই জানেন। দেবতা আর অসুরের সেই সমুদ্রমন্থনের কাহিনি আমাদের সকলেরই জানা। পুরাণ জানাচ্ছে, শিব বিষপান করার পর পার্বতী এসে শিবের গলা টিপে ধরেছিলেন, যাতে সারাশরীরে বিষ ছড়িয়ে না পড়তে পারে। গলা টিপে ধরার ফলে শিবের গলা নীল হয়ে গিয়েছিল, সেই থেকে শিব 'নীলকণ্ঠ'। পৌরাণিক মতানুসারে নীলকণ্ঠ শিবের বাস কৈলাসে। আর প্রকৃত নীলকণ্ঠের আবাসও হল কৈলাস। হিমালয়ের কাছে তার দেখা মেলে। দেখা পাওয়া যায় লাদাখ অঞ্চলে। অর্থাৎ কৈলাস বেশ কাছে এখান থেকে। কিন্তু দুর্ভাগ্য যে, এখন ভারতের মূল ভূখণ্ডে এরা লুপ্তপ্রায়। মাইগ্রেশনের অঞ্চলে এদের মেরে খুন করে প্রায় নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়েছে। শিব বিষপান করেছিল। আর এই সরল পাখিটিও মনুষ্যত্বের বিষ কোনও রকম দায় ছাড়াই আপন কণ্ঠে ধরণ করে নিশ্চিহ্ন হতে বসেছে। ঠিক এই কারণেই এরা নীলকণ্ঠ।

আর একটা তথ্য দিই। বইটার নাম 'Beast and Man in India'. লেখক John Lockwood Kipling. ১৯০৪ সালে লন্ডন থেকে বইটা প্রকাশিত হয়। বইটার ৩৩ পৃষ্ঠায় লেখা আছে, দশেরার দিনই হল প্রকৃত বিজয়া দশমীর দিন। শরৎকালের দুর্গাপুজো কিন্তু আসল দুর্গাপুজো নয়। রাজা কংসনারায়ণ চালু করার আগে দুর্গাপুজো হত বসন্তকালে। নীলকণ্ঠ ওড়াবার রীতি ছিল আসলে দশেরাতেই। দশেরার সঙ্গে নীলকণ্ঠ বা শিবের কী সম্পর্ক নেই। 'Beast and Man in India' অনুসারে, নীলকণ্ঠ আসলে বিষ্ণুর প্রতীক। ভাবছেন হয়তো আপনারা জানেন বিষ্ণু তো ‘নীলকান্ত’, তিনি নীলকণ্ঠ কীভাবে হলেন! আসলে এটি মহারাষ্ট্রের প্রথা। তাদের সঙ্গে দক্ষিণীদের খুব যোগাযোগ ছিল এককালে। দক্ষিণীরা তো ‘ত’ লেখেন টি+এইচ দিয়ে। জয়ললিতা বানান Jaylalitha। তো নীলকান্ত তো Neelkantha— এভাবেই লেখার কথা। এবার স্থানভেদে, বানানভেদে, রূপভেদে যে যে নামে ডাকে সেই নামেই মজে যাই আমরা প্রত্যেকে।

সুতরাং নীলকান্ত, যা শিবের অপর নাম। উত্তর ভারতের মানুষের মুখে একটা কথা শোনা যায়, 'নীলকণ্ঠ তুম নীল রাহিও, দুধ ভাত কা ভোজ করিয়ো, হামরি বাত রাম সে কহিও'। অর্থাৎ নীলকান্ত তুমি নীল থাকো, দুধভাত খাও এবং রামকে আমাদের সম্মান জানিও। বলা হয়, শ্রীরামচন্দ্র এবং তাঁর বাহিনীকে রাবণ বধের আগে পথ দেখিয়ে দিয়েছিল এই পাখি। তাই এ-পাখির দর্শন পাওয়াকে শুভ মনে করা হয়। বর্ষা শেষে এ-পাখির আগমন ঘটে। ধানক্ষেতে পোকা খায়। কিন্তু জমিতে প্রচুর পরিমাণে কীটনাশক ব্যবহার হয়। যার ফলে সংখ্যায় কমছে নীলকণ্ঠ। অথচ পাখিটি কীটপতঙ্গকে খাওয়ানোর সঙ্গে সঙ্গে কৃষকদের বন্ধু হিসাবে বিবেচিত হয়। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে, পুরনো গাছ কাটাও একটি কারণ হতে পারে। নীলকণ্ঠরা পুরনো লম্বা গাছে বাসা বেঁধে। ডিম দেওয়ার জন্য গাছের কাণ্ডে একটি গহ্বর চয়ন করে। গাছই যদি না থাকে, পাখিও বা থাকবে কোথায়?

এ-পাখির নামকরণ নিয়ে সুধীন্দ্রলাল রায়ও লিখেছেন, 'বাঙ্গলার পরিচিত পাখী' বইয়ে সুন্দর এক ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, ''দেবাসুরের সম্মিলিত চেষ্টায় সমুদ্রগর্ভ হইতে যে হলাহল উঠিয়াছিল তাহা সন্ন্যাসী ভোলানাথ কণ্ঠে ধারণ করিয়া নাম পাইয়াছিলেন নীলকণ্ঠ। কিন্তু আমাদের দেশে শহরে ও গ্রামে, কাননপ্রান্তে ও মাঠের মধ্যে, রেললাইনের ধারে টেলিগ্রাফের তারে যে খেচরটিকে দেখা যায়, তার নাম কেন নীলকণ্ঠ হইল? যখন সে চুপ করিয়া বসিয়া থাকে তখন তার দেহবর্ণে কোনও বিশিষ্টতা লক্ষিত হয় না। চোখের পাশ ও স্কন্ধদেশ নীলাভ হইলেও তাহা দৃষ্টি আকর্ষণ করে না। বাকী দেহটি সামান্য গোলাপী আভাযুক্ত বাদামী রঙের। শরীরের গড়ন মোটাসোটা ঢ্যাপসা গোছের, দোয়েল, শালিক ফিঙ্গে প্রভৃতির মত সুঠাম নহে। কিন্তু যখন সে পক্ষ-বিস্তার করিয়া শূন্যপথে আপনাকে নিক্ষেপ করে, তখন তার পক্ষপতত্রের নিম্নভাগের ঘন নীল বর্ণচ্ছটা ডানার উত্থান পতনের সঙ্গে বিচিত্র দৃশ্যের সৃষ্টি করে— তাহার দেহের রূপ প্রজাপতির মত বর্ণচ্ছটাসমম্বিত হইয়া আমাদের অবাক করিয়া দেয়। মার্কিন দেশের লোক সেইজন্য ইহার নাম দিয়াছে—সারপ্রাইজ বার্ড। ইংরেজ ইহাকে 'দি ব্লু জে' এবং 'দি ইণ্ডিয়ান রোলার' বলে।''

আরও জানা যায় যে, ইউরোপীয় সুন্দরীদের শিরোশোভা বাড়াতে বিভিন্ন পাখির পালক ব্যবহার করত। সেই হতভাগ্য পাখিদের মধ্যে নীলকণ্ঠ একটি। সুধীন্দ্রলাল লিখছেন, ''বিলাতী সভ্যতার বিলাসের সামগ্রী যোগাইবার জন্য মানুষ অজ্ঞাতে নিজের অনেক ক্ষতি করে। ইউরোপীয় অঙ্গনাদের শিরোভূষণের জন্য সুন্দর পালকবিশিষ্ট কৃষির উপকারী এরূপ কত পাখীকে যে হত্যা করা হয় তাহার ইয়ত্তা নাই। এইরূপ পাখীদের মধ্যে নীলকণ্ঠ একটি। ইহার পক্ষের উজ্জ্বল নীল পালক শ্বেতাঙ্গিণীদের পোষাকের জন্য বহুল ব্যবহৃত হয়। এই পাখী কৃষির উপকারী বলিয়া আমাদের দেশে আইন অনুসারে ইহা অবধ্য। এমন কি, ইহাকে বন্দী করিলেও জরিমানা হয়। এদেশে বন্দুকের লাইসেন্সের সঙ্গে অবধ্য পাখীর ফিরিস্তি দেওয়া হয়। তাহাতে নীলকণ্ঠের নাম আছে। ভারতের বন্দরে বন্দরে কাষ্টম বিভাগ হইতে কড়া পাহারার বন্দোবস্ত আছে, যাহাতে উপকারী পাখীর পালক রপ্তানী না হয়। কিন্তু উৎকোচের লীলাভূমি ভারতবর্ষে নিষেধ ও পাহারা বজ্রআঁটুনীর ফস্কা গেরোমাত্র। কৃষির পক্ষে হলাহলসম কীটাদি উদরে ধারণ করে বলিয়া হিন্দুরা বোধ হয় একে নীলকণ্ঠ নাম দিয়াছেন। হিন্দুর শাস্ত্রেও এ পাখী অবধ্য।" এই ব্যাখ্যা থেকে বোঝা যাচ্ছে যে, শস্যের যম পোকাদের খেয়ে উদরপূর্তি ঘটায় এ পাখি। এই কারণে উঠে আসে তার নাম 'নীলকণ্ঠ' কেন, এর উত্তরও।