তিনটি কবিতা

রীনা ভৌমিক

স্পিরিচুয়াল-১
অ-সুখ ঘাপটি মেরে চিলেকোঠায়

ছেলেবেলা মেয়েবেলা এবং আসন্ন সন্ধ্যাপথে
থৈ থৈ বিছানো জট

একটা জীবন ধীরে হেঁটে চলেছে

আয়না গুছিয়ে নিচ্ছে টুকরোয় লেগে থাকা
গুঁড়ো স্বপ্ন ও জলীয় বোধ

একটা না পড়া চিঠির বুকে
ঘন হয়ে বসে আছি...
...আজ ও...


একটা অচিন আলো তিরছা ঢুকে পড়েছে ঘুলঘুলি ছাপিয়ে । আমার অন্ধ কুঠুরি কেমন মায়ায় ছয়ালাপ । যে সব শব্দেরা কান্না কুড়াচ্ছিল বিষন্ন নিঃশ্বাস বিছাচ্ছিল তারা ঘুরে দাঁড়িয়েছে নিজের দিকে । নিজস্ব মনে করে ছুট দিচ্ছিল যে দৃশ্য ও দৃশ্যাতীতে , স্পষ্ট হচ্ছে সেসব ধোঁয়াশা । বহির্মুখ যখন ফিরছে ভেতরে নিজের জন্য কষ্ট হচ্ছে । এই যে কিছু সময়ের জন্য পাওয়া জীবন , নিজেকেই দেখা হয়নি আদৌ । কতো স্বপ্ন আকাঙ্খা পাথর চাপা পড়ে র‌ইলো । জমে থাকা দিকহারা উচ্ছ্বাস গুমরে গুমনামি হলো । ছোট ছোট জাফরানি ভালোলাগারা আকাশ পেলো না । সমস্ত ক্ষয়ক্ষতি ভুলে তবু একবার ফিরতে চাইছি... একবার... নিজের কাছে... নিজের মতো করে....


স্পিরিচুয়াল -২

ঘুমের ভেতর থেকে উঠে আসছেন জীবনানন্দ

জনান্তিকে বলে রাখি
আমি কিন্তু ব্যতিক্রম হতে চাইনি কখনো

বড় ঘুমে যাবার আগে
এতো অজস্র ছোটো ছোটো ঘুমে ক্লান্ত হতে চাইনি

ঘাসফুল ফড়িং আর কোকিলকে এক মাদুরে বসিয়ে
দৃষ্টিসুখের অনিন্দ্য অবসর
খুব একটা দেয়নি সময়

আঙুলের ফাঁক গলে ঝরে পড়ছে অনন্ত

আমি এর তার ঘরে হ্যাংলা উঁকি মারছি
আর
নিজেকে জিজ্ঞাসা
করছি ...ঘোর বিস্ময়ে...

তবে কি বাঁচা মানে শুধুই চাতক-জল ....


মাতৃজঠরের পরিক্রমা সেরে ভুমিষ্ঠ আমি খিদে ও কান্নাকে সরবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারিনি । ভীরু পক্ষীশাবকের চিঁ চিঁ সম্বল হাজিরা দিয়েছি সময়ের আঙিনায় । তারপর যেভাবে সময় গড়ায় , গায়ে পায়ে লাগে ধুলো মাটি আঁচড় টাচর । ঘাম ঝরে রক্ত‌ ও । কিছু লবণভাষ্যে সরগরম পারিপার্শ্বিক । যদিও সাদৃশ্য থাকলেও সমস্ত গল্প‌ই কিন্তু ভিন্নধর্মী , জানে সসাগরা । জানে পথ । প্রচন্ড একলা চলার ক্রমবদ্ধতা জীবনানন্দকে ডেকে নেয় সঙ্গসুখের অছিলায় । জীবনানন্দ জ্বেলে দেন ভীষণ বিষন্ন আগুন , দেবার মতো তার‌ও ছিলো ওটুকুই । ভীড়ের মাঝে আমি আরো নির্জন হয়ে যাই । কোনো প্রিয় ডাক ছোঁয় না আমায় । কোন প্রিয় চোখ তরঙ্গ তোলে না বুকে । কিছু জলছবি দেখে যদি আনমনে তৃষ্ণা জাগে , বিষন্ন বাতাস ঝুপঝাপ দরজা কপাট বন্ধ করে দেয়....


স্পিরিচুয়াল -৩
সারাজীবন কারণে অকারণে
নিজেকে উইথড্র করে নিই

এ এক অভ্যস্থ খেলা ...একা একাই খেলি...
সাপ-লুডো

সিঁড়ি বেয়ে মগে চড়ে যেই দেখি
চেনা হাত আর চোখ খুব ডাকছে
ঝুপ করে ঢুকে পড়ি
সাপের মুখে

সাপতো তাই কেউ ঘাঁটায় না

এইভাবে দীর্ঘ সুড়ঙ্গপথ অন্ধকার ময়
আমায় অন্ধ করে রাখে

গানহীন ভ্যাপসা বাতাসে
একটা টানটান কান্না ওড়ে

রবিশঙ্কর আর্ট অফ লিভিং খুলে বসেন...
" আজ্ঞাচক্রে যাবার আগে তোমার শরীরের
প্রতিটি কণাকে সম্মান জানাও
তোমার ক্ষণকালের শরীর, প্রকৃতির অপার বিস্ময়..."


সমস্ত খেলার সেরা খেলা ছেলেবেলা । দিদিমার ঠাকুরঘরে জপের মালা থেকে উঠে আসা ধ্যান ও ধারণা । শ্যাম কীর্তনিয়ার রাধে রাধে বিরহ বাখান থেকে চুঁয়ানো ব্যাথা ছেলেমানুষী দুই ভ্রুর মাঝে হলচল মন্থন । কে জানতো ডি.এন.এ সমস্ত সামটে বসেছিল সময়ের আশায় । এখন তুমি আমি ,কাদা ক্লেশ, বিষয় আশয় , ক্ষীর‌ ও খিদে ভেসে যাচ্ছে জলপ্লাবনে । ধ্রুব বলে আঁকড়ে ধরা অচলায়তন হুড়মুড় ধ্বসে পড়ছে অনিবার্য ইশারায় । আমার জন্য যেন এই ভ্রমণ সুনির্দিষ্ট ছিল , এভাবেই ধরা দিচ্ছে অনুসঙ্গ । নিভে যাবার আগে প্রদীপ নিজের কাছে রেখে যেতে চাইছে কিছু গান' । হঠাৎ কুড়িয়ে পাওয়া এক আদুরে অনুভবে অর্বুদ শরীরকোষে জন্ম নিচ্ছে আহা আনন্দ...আমি ভেসে যাচ্ছি ঈশ্বরে...