কবিতাগুচ্ছ

কুন্তল মুখোপাধ্যায়

বাইরে
বাইরে অন্ধকার । অন্ধকারের চোখ মুখ হাত পা কিছুই নেই । সেই অন্ধকারের ভিতরে দাঁড়িয়ে রয়েছে একটা গাছ । সে কি ভাষার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে ?

শেষ ভাদ্রের আকাশে পোড়ামুখ । অজস্র মৃতমুখ । অনাদিকালের । বৃষ্টি পড়বে , মনে হয় । কার কার কাছে কী কী ভাবে বৃষ্টি পড়বে ?

পৃথিবীর অসুখ আজ । সবাই সবকিছু জানে । যে বোঝায় সেও । যাকে বোঝানো হয় , সেও । তুমি তাই পায়চারী করতে করতে ভাষার বাইরে চলে আসো।

অপেক্ষা । কীসের জন্য জানো না , শুধু এক বেশ্যার মুখ মনে পড়ে ।


বন্ধু
এক একটি মানুষ আসলে এক একটি ঘরের মতো । ভিতরে সুড়ঙ্গ আছে । প্রকাশ্যে যাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা যায় না , তাদের সঙ্গে সেই পথে অন্ধকারে যোগাযোগ রাখে । মশাল জ্বালায় । এইসব গোপন শুঁড়িপথ এ ওকে জড়িয়ে ধরে তৈরি করে একটা জটিল পথের নকশা । সেই নকশা বদলায় বারবার । ক্যালিডোস্কোপের মতো ।

ভিতর পথে বন্ধুর শত্রুর সঙ্গে নিখুঁত যোগাযোগ রাখে তারা । খোঁজ নেয় জামাকাপড়ের । সেই পথের মধ্যে বড় হয় জুঁইফুলের গাছ । সুগন্ধী অন্ধকারে হাঁটতে হাঁটতে একদিন গোপন প্রেমের সন্ধান পায় , গোপন রাত্রির । এ ওর কাছে সেই সম্পর্ক চেপে রাখে সে তাকে কিছুই বলে না । অন্তরের সেই পথ যা হিরে আর মুক্তোর সন্ধানে নিয়ে যায় , তা দুঃখী হয়ে বেঁকে যায় অজানার ভিতরে ।

শুধু খেয়াল রাখে না এত পথ খুঁড়তে খুঁড়তে কখন ফোঁপরা হয়ে গেছে মাটি । তার ঘর যেকোনো সময় ধ্বসে পড়ে যেতে পারে ।



মৃত্যু/তিন
প্রসঙ্গত বলি , মৃত্যু ছাড়া আর কোনও কিছুতেই তুমি এতখানি প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠোনি । এভাবে ভাবলে, নিজেকে অর্থমন্ত্রীর চেয়েও দুর্বল মনে হয় । পুরোনো বইয়ের দোকানে তোমাকে পাওয়া যাবে , যে তুমি প্রিয় কাউকে সামনের সাদা পাতায় কিছু লিখে নিজের বইখানা দিয়েছিলে । বাজে কাগজের আবর্জনায় , ড্রেনে একটি পাতা উড়বে । সেখানে তোমাকে পাওয়া যাবে । লিখতে লিখতে একদিন উড়েছিলে তুমি । এখন নোংরা পাতা হয়ে উড়ছ । সঙ্গে উড়ছেন নিশিকান্ত , সঙ্গে উড়ছেন বিহারীলাল...

আমি তাই পূর্ণিমার রাত্রিবেলা ছাদে সারি সারি চেয়ার সাজাই । শাদা শাদা চেয়ার ।কথিত আছে যে , তাঁরা বসেন আসনে । প্রসঙ্গত বলি , এই ইনসমনিয়ার রাতে ফিসফিস শব্দ শুনতে পাচ্ছি , জ্যোৎস্নার আলোয় আমার শাদা চেয়ারে বসে কবিতা পড়ছেন চল্লিশের কবি , পঞ্চাশের কবি , সত্তরের ...

ছাদের তলায় শুয়ে উপরের সিলিংয়ে দেখছি জমছে জ্যোৎস্নার ঘাম । একমাত্র বিমের দিকে তাকিয়ে ছাদের তলা থেকে দেখছি ছাদের উপর কয়েক দশকের কবি গোল হয়ে ছাদের মেঝেতে ঝুঁকে আমাকে দেখছেন ! এই ইনসমনিয়ার রাতে এত জ্যোৎস্না !!