অন্তঃপুরের পথে-কালুক ভ্রমণ

পায়েল চ্যাটার্জী



“অন্ধকারের উৎস হতে উৎসারিত আলো"। এ সুন্দরের বর্ণনা হয়না কোন ভাষায়। পাহাড়ের ঘুম ভাঙ্গিয়ে তিনি জেগে উঠছেন। শ্বেতশুভ্র। আলোয় মাখা। কাঞ্চনজঙ্ঘা। পাহাড়ের রানী। মান্দারিন ভিলেজ রিসর্টের পাহাড়ী রাস্তায় রেলিং ঘেরা জায়গা থেকে দেখা সূর্যোদয়। লেন্সবন্দী ছবি। তবে এই ছবি লেন্সের থেকেও মনবন্দী অনেক বেশি। কালুক। পশ্চিম সিকিম। 'আনএক্সপ্লোরড'। ২০১৫ সাল। যাতায়াত বাদ দিয়ে দিন তিনেক পাহাড়, ঝরনা আর নিস্তব্ধতার সঙ্গে দিনযাপন। তিনটে রিসর্ট ছিল ওখানে সেই সময়। কালুকের রিসর্টগুলো পাহাড়ি ঢালে।এন.জে.পিতে নেমে যে কোন গাড়িতেই যাওয়া যায় কালুক। তবে রিসর্ট পর্যন্ত পৌঁছতে গেলে হোটেলের গাড়িতে যাওয়াই ভালো। সেভাবে রেস্তোরাঁ গড়ে ওঠেনি ওখানে। তাই হোটেলেই খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা থাকে। ঝুপ করে নেমে আসা অন্ধকার সন্ধ্যের নাকি রাতের তা বোঝার আগেই রাতের খাবার খেয়ে নিতে হয়। নিঝুম পাহাড়ের আকর্ষণ চুম্বকের মত। তারপর অনন্ত অপেক্ষা। সকালের সৌন্দর্যের।

"দে শাট দ্যা রোড থ্রু দ্য উডস্"। রুডিয়ার্ড কিপলিং। মান্দারিন ভিলেজ রিসর্ট। রিসর্টের পাশের জঙ্গলের রাস্তা ঠিক কোথায় শেষ হয়েছে কেউ জানে না। "ও রাস্তায় কেউ যায় না"। রিসেপশনের ছেলেটি শুরুতেই নিরুৎসাহ করে দিল। পাহাড়ের বুক চিরে উত্থিত কাঞ্চনজঙ্ঘার অবর্ণনীয় সৌন্দর্য দেখে আমার উৎসাহের পারদ তখন তুঙ্গে। রিসর্টের পিছনের রাস্তাটা কেন জানিনা কাল এখানে আসা থেকেই আকর্ষণ করে চলেছে। কিসের আকর্ষণ? অলক্ষ্যের! মন সে পথেই পাড়ি দিতে চাইছিল। সবশেষে হয়তো একটা শূন্য পড়ে থাকবে। তবু ওই পথটুকু চলাতেই আনন্দ। পথের শেষে নাই বা থাকল কোন পরশপাথরের খোঁজ। মান্দারিন ভিলেজ রিসর্টের পিছন দিকের রাস্তা ধরে হাঁটতে শুরু করলাম। বেশ কিছু নাম-না-জানা গাছের দেখা মিলল। রঙিন ফুলের সমাহার। কেউ তাদের যত্ন নেয় না। তবুও প্রকৃতির বুকে প্রত্যাশাহীন ভাবে সানন্দে বিরাজ করছে তারা। রাস্তা যেখানে শেষ হলো, একটা বিকল হয়ে থাকা পাহাড়ি ঝরনা। বর্ষাকালে হয়তো নিজের অস্তিত্ব জানান দেয় সে। এখন শুধুই জলের দাগ। আমি কালুকে গিয়েছিলাম মে মাসে। হালকা শীত ছিল ওখানে। পাহাড়ি জঙ্গল ঘেরা রাস্তায় পথ চলার শেষে দেখা মিলল প্রকৃতির। ‌ মানুষের সাহচর্য বিহীন নিশ্চিন্ত প্রকৃতি।

''দেখার মত কিছু পেলেন ওখানে?" রিসেপশনে ঢুকতেই সেই ছেলেটির কৌতুক মেশানো প্রশ্ন। সামান্য হেসে ওকে বোঝানোর বৃথা চেষ্টা করলাম, কোন সুনির্দিষ্ট দর্শনীয় বস্তুর লক্ষ্যে যাইনি আমি। নামহীন, পরিচিতিহীন পথে যারা অনাহুত, অনাগত সেখানেই মুক্ত খোঁজার চেষ্টা। হিমালয়ের পাদদেশে ৫৬০০ ফুট উচ্চতায় সিকিমের পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত কালুক জীবনের এমনই পথের খোঁজ। শারীরিক চোখ সেখানে প্রকৃতির সঙ্গে পরিচয় করায় আর মনের চোখ দিয়ে খুঁজে নিতে হয় অন্তরের সীমাহীন পথ। মান্দারিন ভিলেজ রিসর্ট থেকে ৩-৪ কিলোমিটার দূরে হাঁটা পথ পাড়ি দিলেই রিংচেংপং গ্রাম। রিংচেংপং নামটা ভারী মিষ্টি লেগেছিল। পাহাড়ি জল, প্রকৃতির অকৃত্রিম সৌন্দর্য মিলেমিশে খিদের অস্তিত্বটা অনেকক্ষণ ধরেই অনুভব করছিলাম। রিংচেংপং নামের মধ্যেই কেমন যেন চাইনিজ চাইনিজ গন্ধ। কোন চাইনিজ খাবার কি পাওয়া যায় ওখানে? না, কাউকে জিজ্ঞেস করিনি। কিছু কিছু জায়গায় পৌঁছলে শুধু নিজের অন্তঃপুরেই পাড়ি দিতে ইচ্ছে করে। অনেক কিছু জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করে, তবে শুধুই নিজেকে। কালুক তেমনি এক জায়গা। তাই মনের যাবতীয় কৌতুহল ও পেটের তীব্র খিদে নিয়ে হাঁটা শুরু করলাম রিংচেংপংএর দিকে।



রাস্তায় দূরত্বের পরিমাপ লেখা ফলকগুলোই মনে আশার আলো জ্বালিয়ে রেখেছে। অবশেষে দেখা মিলল। রিংচেংপং ০ কিমি। পাহাড়ি রাস্তায় তিন চার কিলোমিটার হাঁটা মানে নিজের শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে রীতিমতো যুদ্ধ করা। রিংচেংপং গ্রামে ঢোকার আগে একটা প্রবেশদ্বার আছে। সেটা পেরিয়েই ছোট্টো গ্রাম। কালুকের অন্যান্য জায়গার মতো প্রধানত কৃষি নির্ভর। বসতি খুবই সামান্য। চারিদিকে শুধুই নিঝুম প্রকৃতি। একটা ছোট্ট প্রাইমারি স্কুল রয়েছে গ্রামে। কয়েকটা দোকান তার চারপাশে। কথায় আছে খালি পেটে ধর্ম হয় না। খালি পেট যে প্রকৃতির সৌন্দর্য অনুভব করতেও বেশ বাধার সৃষ্টি করে তা সেদিন বুঝেছিলাম। ওয়াই ওয়াই। বেশিরভাগ দোকানগুলোয় এই খাবারটি বিক্রি হচ্ছে। নুডুলস। কোথাও প্যাকেটজাত। কোথাও আবার পাহাড়ি কোন মহিলার রান্নাঘর থেকে পৌঁছে যাচ্ছে গুটিকতক টুরিস্টের হাতে। ধোঁয়া ওঠা 'ওয়াই ওয়াই' নুডুলসের বাটি। মুংলি এক বাটি নুডুলস দিয়ে গেল। বাঁশ দিয়ে ঘেরা ছোট্ট দোকান। মুংলি সম্ভবত দোকানটির মালিকের মেয়ে। বেশ সপ্রতিভ। নাম জিজ্ঞেস করতে দ্বিধাহীনভাবে উত্তর দিয়েছিল। মুংলি কি স্কুলে যায়? জানতে চেয়েছিলাম! উত্তর দেয়নি। ওই ওয়াই ওয়াইএর স্বাদ আজও ভুলতে পারিনি। কলকাতায় নামী রেস্তোঁরায় কতবার ওয়াই ওয়াই খেয়েছি। তবুও ওই পাহাড়ী স্বাদ ভুলতে পারিনি। আর ভুলিনি মুংলির চোখ দুটো।


রিংচেংপং মনেস্ট্রিতে ছোট্ট লামাদের দেখে ফেরার হাঁটাপথএর কষ্ট ভুলে গেলাম নিমেষেই। কালুকে তাড়াতাড়ি সূর্যাস্ত হয়। বিকেলের আকাশটা বড় আদুরে। মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে। 'অনলি পোয়েটস্ ক্যান ওয়ান্ডার লাইক ক্লাউড'। আলগা রোদ ছড়িয়ে আছে চারিদিকে। নিস্তব্ধ পাহাড় তার সৌন্দর্য উজাড় করে দিচ্ছে। সারাবছর আকাশ, গাছ নিস্তব্ধতা একই রকম থাকে। তাও পুরনো হয় না। একঘেয়ে লাগে না।

এশিয়ার দ্বিতীয় উচ্চতম সেতু 'সিংশোর ব্রিজ'। দুটো পাহাড়কে যুক্ত করা ব্রিজের লেন্থ ১৯৮ মিটার। কালুক থেকে ৩৫ কিলোমিটার দূরে এই সেতু। কয়েকটি পাহাড়ি ঝরনা পেরিয়ে এই ব্রিজে পৌঁছলাম। চারিদিকে তখন কুয়াশার হাতছানি। ব্রিজে ট্যুরিস্টদের ভিড়। প্রকৃতি লেন্সবন্দি হচ্ছে। কালুকের নিস্তব্ধতার কাছে এ যেন বড়ই বেমানান। প্রকৃতির নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করে ট্যুরিস্টরা নিজেদের আনন্দে মেতে রয়েছে ওখানে। প্রকৃতি নির্বাক না হলে কি প্রতিবাদ জানাত? পেলিং, কালুক থেকে ৪২ কিলোমিটার দূরে। কয়েক ঘণ্টার পথ। মানুষ সাধারণত প্রকৃতিপ্রেমী। কিন্তু যত্ন নেয় কি? কালুক সেভাবে পর্যটনকেন্দ্র হয়ে ওঠেনি। তাই সেখানে পরিবেশ এখনও পর্যন্ত সুরক্ষিত। পাহাড়ি ফুলেরা গাছেরই শোভা বৃদ্ধি করে। ভাগ্যিস মানুষের হাতের ছোঁয়া পায়নি। পাহাড় তার সুন্দর আবেশ ছড়িয়ে দেয় চারিদিকে। আকাশে মেঘেরা নিশ্চিন্তে ভেসে বেড়ায়। ব্যস্ততা, লোভ, হিংসে, স্বার্থপরতার ছোঁয়াচ বাঁচিয়ে প্রকৃতির মন সেখানে বিষন্নতাহীন।