পাখি-পূর্ণিমা

শ্রীদত্তা কৌশিক

মে মাস আন্দাজে তেমন গরম পড়েনি। উপরন্তু সস্নেহে বাতাস দিচ্ছে সন্ধ্যা। এলোমেলো, তবে মূলত উত্তর দিক থেকে এবং বেশ ঠাণ্ডাই। গ্রীষ্মে সন্ধ্যা এসব খুচরো করুণা বিলোয়। আঁচল-টাচল। আদর আদর হাওয়া। মাঝেমধ্যে দু'ফোঁটা জল। এবার রোদ ততটা চোখ রাঙায়নি, কিন্তু সন্ধ্যার মেয়েলি অভ্যাস রয়ে গেছে। স্নেহ প্রয়োজনের অপেক্ষা করে না এবং নারীকে নারীধর্ম রক্ষা করতে হয় নিজেকে আজীবন প্রমাণ করার তাগিদে। অতএব বিকেলের ছাদটা আজ মনোরম। সাড়ে ছটা নাগাদ কান থেকে হেডফোন খুলে প্লাস্টিকের চেয়ারের উপর সেলফোনটা রেখে উঠে দাঁড়াল শ্রীময়ী। প্রায় দেড়ঘণ্টা একটানা বসে থাকার জড়তা কাটাতে দুহাত উপরে তুলে শরীর টানটান করে নেয় চটিজোড়া পায়ে গলানোর আগে। জিনসের পকেট থেকে গোল্ড ফ্লেকের প্যাকেট আর লাইটার বের করে ঠোঁটের ফাঁকে একটাকে রাখে। দশ টাকার সস্তা লাইটার নিজে জ্বলে উঠতে তিনবার হোঁচট খায়। তারপর ফুসফুসে ধোঁয়া নিয়ে হাল্কা পায়চারি। চিলেকোঠার চৌকো অবরোধটুকু পেরিয়ে ছাদের পুবদিকের অংশে এসে সহসা থমকে যায় শ্রী। গোলাপি রঙের তিনতলা বাড়িটার ছাদের ওপর দিয়ে তাকিয়ে থাকে স্থির দৃষ্টিতে। এত বড়! এমন অদ্ভুত তামার থালা!

বিকেল পাঁচটা থেকে একটা সেমিনার ছিল। জুম মিটিং। বিষয়ঃ লক ডাউনের সময় নারী-নির্যাতন। মূলত গৃহহিংসা নিয়ে কথাবার্তা হল। আয়োজন করেছিল 'দ্বিতীয় ফৌজ' নামে আহিরীটোলার এক নাট্যগোষ্ঠী। সম্পূর্ণ মেয়েদের দল। দলের নামকরণে সিমোন দ্য বোভোয়ার প্রভাব দেখতে না পাওয়া কঠিন, কাজের ধরণ-ধারণ জানলে ব্যাপারটা আরও স্পষ্ট হয়। নারীকেন্দ্রিক নাটক ছাড়াও মেয়েদের সমস্যা নিয়ে বিভিন্ন আলোচনাসভার আয়োজন করে তারা নিয়মিত, যেমন আজকেরটা। এদের সঙ্গে শ্রীময়ীর সম্পর্ক অনেকদিনের। নাটকের সূত্রে তেমন নয়, নারী আন্দোলনের মঞ্চেই বেশি। দিন পাঁচেক আগে ওদের তরফে অহনা ফোন করে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল।

দেখা হল আবার সবার সঙ্গে। সাড়ে ছয় ইঞ্চি স্ক্রিনের ভেতর একেকটা চৌখুপি আলো করে বসে ছিল একেকজন। জমায়েতহীন আলাপচারিতা। আজকাল যেমন হচ্ছে করোনার ভয়ে, দূরে দূরে থেকে ছবি আর কথা চালাচালি। হাত ধরাধরি, গা ঘেঁষাঘেঁষির যুগ ক্রমশ পেরিয়ে যাচ্ছে মানুষ। শারীরিক দূরত্ব বাড়লে কি শারীরিক নির্যাতনের ভয় কমে? আসলে কমে না। সামাজিক দূরত্ব বাড়লেও পারিবারিক দূরত্ব বাড়ে না, বরং কমে যায়। বাকি পৃথিবীর মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে ঘরে ঢুকে পড়ে একএকটি পরিবার। চার দেওয়াল ঘেরা সামান্য কয়েক স্কোয়ার ফুটের মধ্যে আটকে পড়ে নারী আর পুরুষ। সোনার দামে কেনা সেই খাঁচায় জীবনের মালিকের নাগালের মধ্যে দিনে চব্বিশ ঘণ্টা, সপ্তাহে সাতদিনের জন্য বন্দী হয় মেয়েরা। তারপর হুকুম… তারপর নিন্দা, ধমক, রাঙা চোখ। কাজের পাহাড় উঁচু হয়। রাতের বরাদ্দ মারধোর আর কামনার আগুন দিনেও শরীর ছোঁয় অনায়াসে। টেলিভিশন সেটে আবহ সঙ্গীতের মতো বেজে চলে ছায়াছবির প্রেম-সঙ্গীত। যেন সবকিছু ঠিক আছে, এভাবেই ঠিক থাকে সব, এই কথাই কানের কাছে ক্রমাগত লক্ষ্মী-পাঁচালির মতো সুর করে গেয়ে চলা এদের কর্তব্য। গেয়ে যেতে হয়, যাতে প্রেম আর স্বাভাবিকতার ধারণা টোল না খায়, যাতে ভেঙে না পড়ে পরিবার, যাতে আহত না হয় সমাজ। এইটেই বোধহয় সংবিধান জগতের। সিংহকে মেনে নিয়েই হরিণকে বজায় রাখতে হয় ঘাস খাওয়ার অভ্যাস, টিকে থাকতে হয় নিয়মমাফিক আর টিকে থেকে সুস্থির রাখতে হয় শ্বাপদের খাদ্যের জোগান। তেমনই নারীযাপন মানুষের জঙ্গলে... ঘা খেয়ে, ঘাস খেয়ে, স্নো-পমেটম মেখে কত প্রজন্ম পার করে বেঁচে রইল পারিবারিক নারী, শুধু খাদ্যশৃঙখলকে অটুট রাখার খেলায়, সে যেন সভ্যতার প্রথম বিস্ময়।

শ্রীময়ী এসব জানে। শুধু বই পড়ে নয়, নিজের জীবন থেকে জানে। ছয় মাসের মেয়েকে কোলে নিয়ে ঘর ছাড়তে হয়েছিল। পাশে দাঁড়ানোর কেউ ছিল না। প্রথমে বন্ধুর বাড়িতে দিন কয়েক, তারপর তড়িঘড়ি গড়িয়ার কাছে এক কামরার ফ্ল্যাট ভাড়া করে ছয় বছর। শেষে গত বছর ব্যাংক আর প্রভিডেন্ট ফান্ড থেকে লোন নিয়ে বাঘাযতীনের এই দুই ঘরের ফ্ল্যাট। পাখি বড় হচ্ছে টুকটুক করে। ক'দিন পর ওর নিজস্ব ঘর আর বন্ধ করার মতো একটা দরজা প্রয়োজন হবে। মায়ের ওড়না ছেড়ে সেই দরজার আড়ালে লুকোতে শিখবে, একা হতে শিখবে, নিজেকে আবিষ্কার করবে সকলের নজর এড়িয়ে। তাই এই দ্বিতীয় বেডরুমের ব্যবস্থা এখন থেকেই। সেই ঘর আপাতত টেডিবিয়ারের পরিবার, বিবিধ খেলনা, নানারকম কাগজ আর রঙের দখলে। পাখি ছবি আঁকে, কাগজ কেটে ব্যাগ, ক্যামেরা, ল্যাপটপ, দোতলা বাড়ি বা জরিদার দশভুজা বানায়। কোথাও আটকে গেলে বা টিকটিকি দেখলে "মাম্মাই মাম্মাই" বলে হুড়মুড়িয়ে ছুটে আসে। সেটা ঘটে প্রতি দুই থেকে পাঁচ মিনিটে অন্তত একবার। বস্তুত স্থির হয়ে বসে কম, ছোটে বেশি। টাইগার শ্রফকে বিয়ে করার ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে কিন্তু এখনো নিজে হাতে ভাত মেখে খেতে পারে না এবং রাতে কোলে নিয়ে ঘুম পাড়াতে হয় মাকেই, সেখানে টাইগারের নেমন্তন্ন নেই। চাকরি, লেখালেখি, সামাজিক কাজকর্ম, মিটিং, মেয়ে সব একসঙ্গে সামলাতে হিমসিম খায় শ্রীময়ী। লেখার কাজ সারতে হয় মেয়ে ঘুমোলে, পাড়া জুড়োলে। মেয়ের অতিরিক্ত দুরন্তপনায় মাঝেমাঝে রাগ হয়, কতটা মেয়ের ওপর আর কতটা নিজের ওপর, সেই হিসেব যায় গুলিয়ে। মেয়েকে আরও বেশি সময় দিতে না পারার জন্য অপরাধবোধ হয়। মেয়ের যাবতীয় ভুলভ্রান্তির জন্য দায়ী মনে হয় নিজেকে। এমন মনে হওয়া ঠিক নয়, এর জন্য দায়ী মায়েদের সামাজিক মগজধোলাই... এসব তত্ত্বকথা শ্রীময়ীর চেয়ে ভালো কেউ জানে না। তবু প্রতিদিনের এই রক্তারক্তির হাত থেকে বাঁচাতে পারে না নিজেকে। ঘুমন্ত মেয়ের মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে শ্রী টের পায়, এই অশান্ত বালিকার চেয়ে বড় আশীর্বাদ তার জীবনে আসেনি কখনো। ছয় মাসের শিশুটা কোলে না থাকলে অত্যাচারের গুহা ছেড়ে বেরোনোর জেদটা আসত কিনা, বেরোলেও বেঁচে থাকার এতখানি প্রেরণা পেত কোথা থেকে, সেসব প্রশ্নের মুখোমুখি হতে ভয় লাগে।

এই ফ্ল্যাটবাড়িটা নতুন। সবকটা অ্যাপার্টমেন্ট বিক্রি হয়নি। অন্য যাঁরা কিনেছেন, তাঁরা এখনো আসেননি। গোটা বিল্ডিং ফাঁকা, শুধু চারতলার একটা দিকে একা এক মা আর তার মেয়ে। এই গ্রীষ্মে দুটো পরিবারের আসার কথা ছিল। ভাইরাসের ধাক্কায় দেশ তালাবন্ধ হওয়ায় তাঁরাও যে যার পুরনো ডেরায় দোরে খিল দিয়েছেন। প্রথমদিকে এই নির্জনতা ছমছমে লাগত। বিশেষত হত নভেম্বর-ডিসেম্বরে শহরের সব উৎসব একে একে নিভে আসার পর শ্যাওলা-সবুজ পুকুরের ধারে নামহীন এই একাকী চারতলা সফেদ বাড়িটাকে মনে হত শৈশবে অনাথ এক অসম্পূর্ণ ছোটগল্প। যেন শ্রীময়ীর শীত আর একাকিত্ব নিজের শরীরে নিয়ে সে দাঁড়িয়ে আছে নিজের গর্ভে তাকে ফিরিয়ে নেবে বলে। গর্ভ না কবর, ঠিক ঠাহর করতে পারত না শ্রীময়ী। দুয়েরই ওম আছে, আশ্রয় আছে, কিন্তু যে শুয়ে থাকে তার কোটরে, তার বোধ থাকে না, ভাষা থাকে না। মাঝেমাঝে সেই কোলাহলহীন নিবিড় ওমটুকু অসহ্য মনে হত। শীতের রাত চাঁদ পেরোলে ঘুমন্ত মেয়ের পাশ থেকে চুপিচুপি উঠে গৃহবাসী অন্ধকারকে ছেড়ে ফালি বারান্দায় এসে বাইরের অন্ধকারের মুখোমুখি দাঁড়াত সে। পুকুর ঘিরে পাহারায় জাগরুক নারকেল গাছগুলো সামান্য মাথা নেড়ে সায় দিলেই শৈবাল চাদর ফুঁড়ে জল মন্থনে নামিয়ে দিত ডুবুরি। গেঁড়ি গুগলি... গেঁড়ি গুগলি... জীবনের এটুকু আহরণ হাতড়াতে হাতড়াতে জলের পায়ের কাছে পৌঁছে সেই ডুবুরির দেখা হত প্রাচীন সাপের সঙ্গে, যার মুখটা কুমিরের মতো, কিন্তু জিভ চেরা। সাপ না কুমির, কোল না কবর বুঝতে বুঝতে... (কুমিরের জিভ কখনও দেখেছে কি সে?)... ভাবতে ভাবতে শ্রীময়ীর শীত করত। কাঁপতে কাঁপতে সে উঠে আসত সাগর থেকে পুকুরে, পুকুর থেকে চারতলার বারান্দায়। তখন কম্বলের কাছে ফিরে যাওয়া ছাড়া আর একটাই চয়েস দেওয়া হত তাকে... চারতলার খোলা বারান্দা থেকে বারোয়ারি অন্ধকারে ঝাঁপ দিয়ে পড়া। এখান থেকে লাফালে পুকুর অব্দি পৌঁছনো যাবে না, পড়তে হবে সামনের গলি রাস্তার ভাঙাচোরা পিচে, জল-সাপের সঙ্গে কথা হবে না, বিশ্রী পাথুরে উপসংহার মেনে নিতে হবে... (থ্যাঁতলানো মুখ নিয়ে মরে পড়ে থাকাকে সে ঘৃণা করে জিটি রোডে লরি চাপা পড়া কুকুরটাকে দেখার পর থেকেই)... ওদিকে ছেড়ে আসা বিছানায় পাখি ঘুমোচ্ছে মাকে বিশ্বাস করে... শুধু এই কারণে তাকে বারবার ফিরে আসতে হত। পরদিন আবার কাজে বেরোতে হত, অনুরোধমত লিখতে হত পত্রপত্রিকায়, সমাবেশে যেতে হত, কথা বলতে হত। ফাঁকা বাড়িটাতে ফিরে আসতে ভয় লাগত, বিশেষত পাখি যখন মামার বাড়ি যেত শনি-রবিবারে। সমস্ত দুর্নিবার শীতরাতে এই নিঃসঙ্গ ইমারত আর পরিত্যক্ত পুকুরের যৌথ আক্রমণ থেকে তাকে রক্ষা করেছে একমাত্র পাখি।

এখন মনে হয় ভালোই হয়েছে। ভয় বদলে গেছে ভরসায়। মানুষের ছোঁয়াচ এড়ানোর সময় এখন। পাম্প চালানোর সময় সিঁড়ি বা লিফটে নামা চলে মুখোশ ছাড়াই। তার চেয়েও বড় সুবিধে ছাদ জুড়ে একচ্ছত্র সাম্রাজ্য। ঘুরে বেড়ানো যায়। ঘরে সিগনাল আসে না ততটা জোরালো, তাই বক্তৃতা দিতে বা শুনতে ছাদে আসা যায়। সমস্যা পাখিকে নিয়ে। পাখিকে ছাদে নিয়ে এলে সারাক্ষণ নজর রাখতে হবে পাঁচিল বেয়ে উঠছে কিনা। ঘরে থাকলে যেমন, ছাদেও তেমনি, মায়ের মনোযোগ অন্যদিকে যেতে দেবে না, অন্তত এক-দেড় ঘণ্টার জন্য তো নয়ই। সুতরাং পাখি এবং সেমিনার এক খাঁচায় পোষা সম্ভব নয়। অথচ ওকে ঘরে তালাবন্ধ করে রেখে এতক্ষণ ছাদে কাটানো সম্ভব নয়। মেয়ে কাঁদবে, মাও।


আগে মুমতাজদির জিম্মায় রেখে এটাসেটা কাজ সারা যেত। গড়িয়া থেকেই মুমতাজদি পাখির দেখাশোনা করেন। পাখির টানেই হয়ত এদিকেও আসতে রাজি হয়েছিলেন তিনি, যদিও দূরত্ব খানিক বেশি। অথবা নিজের মাসমাইনের প্রায় একতৃতীয়াংশের বিনিময়ে পাখির প্রতি মুমতাজদির এই টান কিনেছিল পাখির মা। বাকি দুই ভাগে লোন শোধ করা, মেয়ের স্কুলের মাইনে, পড়াশোনা খেলাধুলার সরঞ্জাম, সংসার চালানোর আবশ্যিক তেল-নুন-চাল সামলানো এক ট্র‍্যাপিজের খেলা, তলায় জাল বিছানো নেই। লক-ডাউনের সময় মুমতাজদি আসতে পারছেন না, এদিকে নিজের সংসার ফেলে এখানে থেকে যাওয়াও সম্ভব নয় তাঁর পক্ষে। শ্রীময়ীও ভয় পাচ্ছে নিত্যি রাস্তায় চলাফেরা করা কারো কাছে মেয়েকে ছাড়তে। অতএব লক-ডাউন আলগা হলেও পাখির দায়িত্বে মুমতাজদির পুনর্বহাল হবার আশু সম্ভাবনা কম করোনাকালে। ভাগ্যিস রাহুল আজ এসেছে ছুটি নিয়ে। সে খেলছে পাখির সঙ্গে, তাই মা পেয়েছে ছাদে গিয়ে "ক্লাস করার" ছুটি।

"তুমি যেমন ক্লাস করো স্কুলে, আন্টি পড়ায়, তেমনি মাকেও তো আজ পড়াতে হবে। নইলে হেড-আন্টি বকবে মাকে।" রাহুল বোঝালো পাখিকে। পাখি অনুমতি দিল। পক্ষ্মীমাতা সংক্ষিপ্ত উড়াল দিল ছাদ হয়ে অর্ধেক আকাশের দিকে। আকাশের সেই আধখানাও ডানাছাঁটা পক্ষিণীদের আর্তনাদে ঝনঝন। টুপটুপ খসে পড়ছে নানা বয়সের পাখিরা। ভালো করে ওড়াই হল না তাদের। সেই সব পাখির মুখে নিজের মেয়েটার আদল দেখতে পায় শ্রীময়ী। আরও এক পাখি ডানায় পালক সাজাচ্ছে। তাকে অনেকটা আকাশ দিতে হবে। তীর-তীরন্দাজ সরিয়ে তার আকাশ সাফ করতে যথাসম্ভব লড়ে যাবে তার মা। সেইজন্যই মেয়ে ফেলে দু'ঘণ্টা ছাদে উঠে আকাশ ঝাঁট দেওয়া। এসব সেমিনার শ্রীময়ীর কাছে স্রেফ বিষয়ভিত্তিক অ্যাকাডেমিক আলোচনা নয়। সে জানত যে এক-দেড় ঘণ্টার আলোচনার ধাক্কা সামলাতে তার সারারাত লাগবে। নিজের ক্ষতগুলো ব্যথায় টাটিয়ে উঠবে আরও একবার।

ওয়েবিনার শেষ। সব মেয়েকে ছেড়ে এবার একান্ত গর্ভজার কাছে ফিরতে হবে। তার আগে একটু ধাতস্থ হয়ে নেওয়া চাই। সুব্রত কাল রাতেও ফোনে গালাগালি দিচ্ছিল। ডিভোর্স হবার পর মেয়ের দায়িত্ব জননীর একার, কিন্তু জনকের আছে দায়িত্বহীন দর্শনাধিকার। সপ্তাহে একবার সে দেখা করতে পারে শুক্রাণুসূত্রে নিজস্ব কন্যার সঙ্গে। এক গ্রামের পাঁচ হাজার কোটি ভাগের একভাগ ওজনের ডিএনএ ধার দিয়ে এতখানি সুদ তার প্রাপ্য হয়েছে যে সাতাশ কেজি আট বছর ওজনের সম্পূর্ণ একটি বালিকাকে নিজের মেয়েকে নিজের বলে দাবি করতে পারে সে আইনের আদালতে। অথচ মেয়ের জন্মের আগে বা পরে কোনো দায়িত্বই পালন করেনি সুব্রত। দুই মাসের গর্ভাবস্থায় পেটে লাথি খাবার পর ডাক্তারের বাড়ি আর আল্ট্রাসাউন্ডের অন্ধকার ঘরে ছুটতে হয়েছিল বাচ্চাটা নষ্ট হয়ে গেল কিনা জানতে। তারপর শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে স্কুলের কাছে বাসা ভাড়া নিয়ে উঠে যেতে হয়েছিল একা। শেষ আড়াই মাস বাপের বাড়িতে। সেই সময়টুকু, জীবনে একমাত্র সেই সময়টুকু স্নেহ-যত্ন দিয়েছিল বাবা-মা।

ডেলিভারির সময় খরচ মেটাতে বাবার কাছে হাত পাততে আত্মসম্মানে লেগেছিল। বাবাও তেমন উৎসাহ দেখিয়ে জোরাজুরি করেনি। সুব্রতর বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে এলেও সুব্রতকে তখনো মন থেকে বের করে দিতে পারেনি শ্রী। তাকেই ফোন করেছিল। তারও তো সন্তান, তারও তো দায়িত্ব। সুব্রত জানিয়েছিল, নার্সিংহোমে আসবে। এসেছিল, বেশ দেরী করে, ভর্তি হবার অনেক পরে। সাধারণ কথাবার্তা বলে পার করেছিল ভিজিটিং আওয়ার। তার বাবার কোমরে ব্যথার চিকিৎসা আর বাড়ির মেরামতির কাজ চলছে। বড়ই আর্থিক চাপ। তাই তখনকার মতো দু'হাজার টাকা দিতে চেয়েছিল। নেয়নি শ্রীময়ী। দু'হাজার টাকার বাপ! এতদিনের যাবতীয় খরচ একা সামলে তরুণী স্কুল শিক্ষিকা দামি নার্সিংহোমে সিজার করাতে এসেছে সন্তানের জন্ম সুরক্ষিত রাখার মরিয়া চেষ্টায়। উপায় ছিল না এছাড়া। জরায়ুতে ফাইব্রয়েড আছে। আগের বাচ্চাটা চার মাসের মাথায় থেমে গিয়েছিল পেটের ভেতরেই। আরও বড় হতে বোধহয় আপত্তি ছিল তার। এই বাচ্চাটাকে বাঁচাতেই হবে। একাই নেমে পড়েছিল জলে, সাঁতরে পাড়ে উঠবে বলে। তবু হয়ত ভরসা ছিল, কেউ এসে হাত ধরে টেনে তুলবে। এখন শেষ মুহূর্তে সামনে দাঁড়িয়ে সেই লোক। সে হাত বাড়ালে হাত পেতে হাত নিতে সংকোচ হত না, কিন্তু আলগোছে ছুঁড়ে দেওয়া দু'হাজার টাকার ভিক্ষেটা ফুটপাথ থেকে কুড়িয়ে নিতে গেলে বড় বেশি নিচু হতে হয়। ফোলা পেট নিয়ে যখন পায়ের কাছটা দেখতেই পাওয়া যায় না, সেই অবস্থায় অতটা ঝুঁকতে নেই মায়েদের। স্বাস্থ্যবিধি মেনে সুব্রতকে "না" বলেছিল শ্রীময়ী।


পাখি আসার আগের রাতে নার্সিংহোমের বিছানায় শুয়ে শ্রীময়ী ঘূর্ণমান সিলিং ফ্যানের বলয় ঘিরে জমে ওঠা অমাবস্যা দেখছিল। অথবা ওটাকেই মহাকাশ বলে। পার্থিব বায়ুমণ্ডলের বৃত্তটুকু পেরোলেই চরাচার কৃষ্ণময়। শূন্যের নিজস্ব রঙ থাকে না রোদে বা চাঁদে। তার বর্ণহীনতার নামই অন্ধকার। শ্রীময়ীর প্রতিবেশ থেকে বায়ুমণ্ডল কেড়ে নিয়েছে সকলে মিলে। অন্ধকার দেখতে দেখতে শ্রীময়ীর মনে হল বাতাস পেরোতে গিয়ে সে যেন পেরিয়ে এসেছে পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণের এক্তিয়ার। যেন সে ভেসে রয়েছে সকলের পরিসরের বাইরে, হিসেবের বাইরে ধূমকেতু থেকে খসে পড়া একক ধূলিকণার মতো। কোনো গন্তব্য নেই, ফেরার ঠিকানাও না। আর যেন কিছু নেই যা টেনে রাখতে পারে কক্ষপথচ্যুত তাকে। চার বেডের নন-এসি কেবিনে দুটো বিছানা খালি। জানালার ধারের বিছানায় ত্রিশ বছরের ক্লান্ত মহিলা খুব মৃদু শব্দে নাক ডেকে ঘুমের মধ্যে নিজের জাগতিক উপস্থিতি জানান দিচ্ছেন। কাল তাঁরও সিজার হবে। শ্রীময়ীর জেগে থাকার কোনো সঙ্গী নেই। এইবেলা ঘরের বিশ্রামরত আলোটার মতো টুক করে নিজেকেও নিভিয়ে দিলে কেমন হয়?

এই কথা ভাবামাত্র দুরন্ত পাখি পেটের ভেতর থেকে লাথি মারল। খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে পরপর কয়েকবার। লাথির অভিঘাতে মহাকাশ থেকে দুম করে বিছানায় এসে পড়ল শ্রী। এই পেটটা এখন আরেকজনের বাসস্থান। সেই ভাড়াটের অনুমতি ছাড়া তার বাড়ি নিষ্প্রদীপ করার অধিকার শ্রীময়ীর নেই। হঠাৎ একটা উল্টো ভয় তাকে গ্রাস করল। এত লড়াইয়ের পর যদি বাচ্চাটার মুখ দেখার আগেই মরে যাই? পিঠে ইঞ্জেকশন দিয়েই কাজ হবে, নাকি অজ্ঞান করতে হবে শেষ পর্যন্ত? জ্ঞান যদি না ফেরে আর? ভাবতে ভাবতে এপ্রিলের রাতে শীত করে উঠল খুব। জ্বর আসছে না তো? রাতে হাল্কা ঘুমের ওষুধ দিয়েছিল। আরেকটা চাইবে? বেলটা বাজিয়ে নার্সকে ডাকা উচিত? কী করে বাজাবে বেল? হাত-পা অবশ লাগছে যে!

অপারেশনের সময় বাবা এসেছিল। কাগজে সই করা আর ওয়েটিংরুমে বসে থাকার কাজটুকু অন্তত কেউ করেছিল। সেই ঋণটাকেও মাঝেমাঝে বোঝা মনে হয়, যেন সেটুকুও স্বাভাবিক প্রাপ্য ছিল না। সুব্রত এসেছিল বিকেলে, মূলত বাচ্চা দেখতে। বেবি-কটের উপর ঝুঁকে পড়ে ড্যাবড্যাব করে দেখছিল। পাখি তার দিকে তাকায়নি একবারও। লাল লাল খুদে হাত-পা ব্যাঙের মতো কায়দায় রেখে, ছোট ছোট পাতা দিয়ে দৃষ্টি আড়াল করে পুরো সময়টা ঘুমলো। মায়ের পেটে থাকার সময় একবার লাথি খাওয়া ছাড়া এই লোকটার সঙ্গে পরিচয় হয়নি তার। অচেনা লোকের দিকে তাকিয়ে সময় নষ্ট করবে না সে। এখন তার অনেক কাজ। দিনে কুড়ি ঘণ্টা ঘুমোতে হবে, তারই ফাঁকেফাঁকে প্যাঁ-প্যাঁ সানাই বাজাবে হবে, চেষ্টা করে টেনেটুনে দুধ খেতে হবে, তারপর আবার ঘুমোতে হবে। জরুরি কাজ এগিয়ে রাখাই বরং ভালো। শ্রীময়ী খুশি হয়েছিল। সদ্যোজাত কন্যার এই নীরব প্রত্যাখ্যান তার ভালো লেগেছিল, যেন সে প্রতিবাদ করছে মায়ের তরফে। অথচ যে নির্লিপ্তি মেয়ে অর্জন করেছিল চার-পাঁচ ঘণ্টা বয়সে, পঁচিশ বছরের মা ততদূর পৌঁছতে পারেনি। সুব্রত ওই ঝুঁকে পড়া আগ্রহ দেখে তার মনে আশা জেগেছিল। হয়ত সে যা পারেনি, মেয়ে তা পারবে। পিতৃত্ব হয়ত পুরুষকে মানুষ করবে।

"সন্তানের জন্মমুহূর্তে জনক-জননীর কাজ শেষ হয়। পিতা-মাতার দায়িত্ব শুরু হয় ঠিক সেই মুহূর্ত থেকে। এরা আলাদা মানুষ হোক বা না হোক, আলাদা সত্তা তো বটেই। যে পালন করে না, সে পিতা হতে পারে না। আমি পাখির জনক নই, কিন্তু ওর পিতা হতে চাই।" রাহুল বলেছিল একদিন।

সুব্রতকে পিতা হয়ে ওঠার সুযোগ দিতে চেয়েছিল শ্রীময়ী। চার মাসের পাখিকে নিয়ে ওদের বাড়িতে ফেরত গিয়েছিল আরও একবার চেষ্টা করবে বলে। ভুল। পাখিকে পেটে নিয়ে যেমন, কোলে নিয়েও তেমনি, দুই মাসের বেশি টিকতে পারেনি সেখানে। এই প্রথম পাল্টা ফুঁসে উঠেছিল সে এবং সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, এমন অসুস্থ পরিবেশে তার মেয়ে বড় হবে না। এই প্রথম সে অনুভব করল যে তার সিদ্ধান্তের মধ্যে কোনো সংশয় নেই, মিটিয়ে নেওয়ার ইচ্ছে বা ফিরে পাওয়ার বাসনা নেই, ভবিষ্যতের গর্ভে লুকিয়ে রাখা কোনো গোপন প্রত্যাশা নেই। হয়ত পাখি ছিল বলেই। মা যা পারেনি, মেয়ে তা পেরেছিল। মাতৃত্ব কি নারীকে মেরুদণ্ডী মানুষ করে তোলে? না, শুধু পাখি একা নয়, স্কুলের চাকরিটার প্রতিও সে কৃতজ্ঞ। ওই আয়ুধটুকু না থাকলে হয়ত মাতৃত্বই তাকে আরও অপ্রতিরোধী সর্বংসহা হতে বাধ্য করত। মা-বাবাও চূড়ান্ত বিচ্ছেদের পক্ষে ছিল না। ঝামেলা মেটা অব্দি কদিন মেয়েকে আশ্রয় দিত অবশ্যই, কিন্তু "নিজের সংসারে" ফিরে যাবার জন্য মগজধোলাই করতই। ফোনেই ছিল তার স্পষ্ট ইঙ্গিত। আচমকা নিজের দেহে এক অনির্বচনীয় মেরুদণ্ড খুঁজে পাওয়া শ্রীময়ী স্থির করল, সিদ্ধান্তের স্থিরতা থেকে সরে আসার দিন শেষ। পাখির জন্য তাকে লড়তে হবে। মাকে মার খেতে দেখে পাখি এটাকেই স্বাভাবিক ভাবতে শিখবে না। বিকেল পাঁচটায় ট্যাক্সি ডেকে চারটে ব্যাগ আর একজোড়া প্রাণ নিয়ে আইনসিদ্ধ আশ্রয় ছেড়ে পথে বেরিয়ে পড়ল পাখির মা। শিক্ষা আর উপার্জনের প্রিভিলেজটুকু ছিল বলেই হয়ত পারল। প্রথমে ভেবেছিল কোনো ছোট হোটেলে উঠবে কদিনের জন্য মেয়েকে নিয়ে। তারপর ভয় করল একটু। ট্যাক্সি থেকেই ফোন করল বন্ধুদের। ব্যবস্থা হল স্বাতীদের বাড়িতে। ওর শ্বশুর-শাশুড়ি বেড়াতে গেছেন। অন্তত এক সপ্তাহ সমস্যা হবে না। বন্ধুরাই খুঁজে দিয়েছিল ভাড়া বাড়ি। সৌমেনের পরিচিত বাড়িওয়ালা আপত্তি করেননি শিশুসহ একা মাকে রাখতে।

তবু সুব্রত পাখির বাপ। ভিজিটিং রাইটে বলীয়ান হয়ে দেখা করতে আসে পাখির সঙ্গে। প্রতি সপ্তাহে আসে না, যেদিন হঠাৎ ঝোঁক চাপে, সেদিন আসে, প্রায়শ টলতে টলতে। নিঃশ্বাসে সস্তা স্বদেশী হুইস্কির গন্ধ বিকেল না হতেই। সম্ভবত নেশার ঘোরেই তার মনে পিতৃত্ব জাহির করার বেগ আসে। পাশাপাশি শ্রীময়ীকেও বার্তা দেওয়া হয়, "আমি এখনো আছি, তুমি মুক্ত নও।" এতটা ভদ্র ভাষায় সুব্রত ভাবতে পারে না। "যাবি কোথায় শালী? ভাগবি কোথায়? রাঙের মাংস কেটে মটনের দোকানে ঝুলিয়ে দেব রে মাগী।" এইটে সে বলত চুলের মুঠি ধরে। এখনও সেরকমই বলে ফোনের ওপার থেকে রাতবিরেতে। পাখির বিষয়ে কথা বলতে চেয়ে নানা কুৎসিত গালি দিয়ে নেশায় নিশিযাপন করে। শ্রীময়ীকে আশ্রয় নিতে হয় বারান্দার অন্ধকারে। সাহসী শ্রীময়ী, প্রতিবাদী শ্রীময়ী, অভিজ্ঞ আন্দোলনকারী শ্রীময়ী নিজেকে আজও এই আক্রমণ থেকে পুরোপুরি বাঁচাতে পারেনি। সেই কারণেই আজ অসীমার কথাগুলো সে বুঝতে পারছিল, শুধু বুদ্ধি দিয়ে নয়, হৃদয় দিয়ে।

আজকের সেমিনারে একতরফা বক্তৃতার বদলে কথোপকথনের ব্যবস্থা ছিল। অসীমা সহ গৃহহিংসার শিকার চারজন মহিলাকে নিজেদের কথা বলার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। তাঁদের কথার প্রেক্ষিতে তত্ত্ব আর সম্ভাব্য পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা। অসীমার পরিস্থিতি শ্রীময়ীর থেকেও খারাপ, তবু সে বিয়ে ভেঙে বেরিয়ে আসার কথা ভাবতে পারছে না। তার ধারণা, তার স্বামী লোকটি আসলে ভালো এবং তাকে ভালোবাসে। তাকে নরম করার একটা সঠিক পথ নিশ্চয় আছে, যেটা সে খুঁজে পাচ্ছে না। প্রচেতাদি, সুমনাদিদের বোঝানোর চেষ্টা করলেন, এই মনোভাবটাই সবচেয়ে বড় ভুল। অত্যাচারী স্বামীরা সাধারণত শোধরায় না এবং তাদের সংশোধনের দায় অত্যাচারিতা স্ত্রীর হতে পারে না, সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসাই একমাত্র পথ, আশায় বাসা বাঁধা মূর্খামি... এসব তত্ত্বকথা নানা ভঙ্গিমায় ঢিলের মতো উড়ে আসছিল অসীমার দিকে। শ্রীময়ীর মনে হল একজন আহত মেয়ে খোলা মাঠে বসে আছে দু'হাতে মাথা ঢেকে অনেকে মিলে তার দিকে পাথর ছুঁড়ছে জ্ঞানের অহমিকায়। অসীমাকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। বেরিয়ে আসার কাজটা সহজ নয়। মনে পড়ল নিজের হোঁচট খাওয়ার কথা। কতগুলো বছর লেগেছিল সিদ্ধান্তে পৌঁছতে! প্রতিবার অত্যাচারের পর ক্ষমা চাওয়াগুলো সত্যি বলে মনে হত। দশের পর একাদশতম বারেও মনে হত, এবার ও আন্তরিক, এবার বদলে যাবে সব। পেটে লাথি খেয়ে পালিয়েছিল নিজেকে নয়, ভ্রূণকে বাঁচাতে। পাখি না থাকলে পারত কি শুধু নিজের জন্য প্রেমকে পেরোতে? রূঢ় সত্যটা জানতে যতটা, হজম করতে প্রয়োজন হয়েছে তার চেয়ে অনেক বেশি সময়। অসীমাকে বোঝাতে হবে অবশ্যই, কিন্তু তার চেয়েও বেশি প্রয়োজন নিঃশর্তে তার প্রতি সমানুভূতি জানানো। শেষ অব্দি তার যন্ত্রণার বোঝা তো সেই বইছে, তাই তার জীবনের রাশও ছাড়তে হবে তার হাতেই। অরাজনৈতিক আবেগের জন্য তাকে দোষী সাব্যস্ত করা যায় না।

এইসব আলোচনা করতে করতে বিপর্যস্ত বোধ করছিল শ্রীময়ী। প্রতিটি যুদ্ধই যোদ্ধাকে ক্ষতবিক্ষত করে। যে আহত হয়নি, সে আসলে গ্যালারিতে ছিল। শ্রীময়ী গ্যালারি থেকে বক্তৃতা দিতে পারেনি কখনও, তাই প্রতিবার ঘরে ফেরার আগে তাকে ক্ষতস্থানে পুলটিস লাগাতে হয়। আজও মিনিট পনেরো সময় চুরি করে নিজেকে সামলে নিতে হবে পাখির কাছে ফেরার আগে। ততক্ষণ রাহুল ঠিক সামলে নেবে পাখিকে। এই মানুষটার ওপর ভরসা বেড়ে যাচ্ছে ক্রমশ। এটা ভালো না মন্দ, তা বলতে পারে না শ্রী। এটা স্রেফ বাস্তব, যা সে দেখতে পাচ্ছে। আপাতত আরও কয়েক মিনিট রাহুলের ওপর ভরসা রেখে ছাদে পায়চারি করতে হবে। ছাদটা বেশ বড়, কিন্তু দুই ভাগে বিভক্ত। মাঝে চিলেকোঠা। সেখানে সিঁড়ির পিছনের ঘরে লিফটের যন্ত্রপাতির ঘর। তার মাথায় জলের ট্যাংক। এই ঘরটা ছাদটাকে আড়াআড়ি দু'ভাগ করেছে। ফুট চারেক চওড়া একটা প্যাসেজ রয়েছে এদিক থেকে ওদিক যাওয়ার। শ্রীময়ী এতক্ষণ পশ্চিম দিকে বসে কাজ করছিল। বিকেলের পড়ন্ত আলোটাকে কাজে লাগিয়ে ক্যামেরায় বজায় রাখছিল নিজের উজ্জ্বলতা। গোল্ড ফ্লেকে দুটো টান দিয়ে পায়ে পায়ে চিলেকোঠার পাশ দিয়ে পূর্ব দিকটায় এল শ্রীময়ী। এসেই স্তম্ভিত হয়ে গেল।

হাইল্যান্ড পার্কের পাশে বুদ্ধপূর্ণিমার চাঁদ উঠছে। বিশাল, সুগোল তামাটে চাঁদ। এতবড় চাঁদ কি কখনো দেখেছে শ্রীময়ী? হাইল্যান্ড পার্কের উঁচু বাড়িগুলো অবরোধের মতো দাঁড়িয়ে আছে শ্রীময়ী আর পূর্ব দিগন্তের মাঝখানে, যেমন থাকে রোজ। অনেকগুলো ফ্ল্যাটে আলো জ্বলে উঠেছে। সেসব ম্লান করে বাড়িগুলোর দক্ষিণ ঘেঁষে বাইপাসের পিছন থেকে সামনের সুপুরি গাছটার মাথা ছাড়িয়ে উঠে আসছে আজব এক চাঁদ। আকাশটাকে ভরে ফেলবার প্রতিশ্রুতি যেন তার শরীরে। এমনিতে চাঁদ জিনিসটাকে বিশেষ মন দিয়ে দেখে না শ্রীময়ী, তার জীবনে খর সূর্যের প্রভাব বড় বেশি। চাঁদ-ফুল-তারা কাব্যের পেলব রোম্যান্টিকতাকে এক অকারণ মিথ্যার আচ্ছাদন মনে হয় তার, যে চাদরে অপরিচ্ছন্ন বাস্তব ঢেকে মানুষকে বোকা বানানো হয়, বিশেষত মেয়েদের। অথচ আজ চাঁদটাকেই বিশেষভাবে দেখতে সে বাধ্য হল, এমনকি দেড় ঘণ্টার একটা পীড়াদায়ক সেমিনারের পরেও। বাকি সব দৃশ্যকে প্রেক্ষাপটে পরিণত করে অনায়াসে কেন্দ্রীয় বিষয় হয়ে উঠেছে চাঁদটা। প্রতি মুহূর্তে একটু করে বড় হচ্ছে কি? হয়ত চোখের ভুল। ধীরেধীরে একএকটা তলা বেয়ে ওপরে উঠছে। যেন সভ্যতার শেষ গ্যাসবেলুন মানুষের যাবতীয় পরাজিত বাস্তবের নাগাল এড়িয়ে স্বপ্নের দর্পে আকাশ ছুঁয়ে ফেলছে। কঠোর বাস্তববাদী শ্রীময়ীও তার সম্মোহন এড়াতে পারে না।

আড়াই হাজার বছর আগে যেদিন মায়ার গর্ভচ্যুত হয়েছিলেন সিদ্ধার্থ গৌতম, লুম্বিনির আকাশ দখল করে কি এমনই মায়াবী চাঁদ উঠেছিল সেই সন্ধ্যায়? সদ্যপ্রসূতি মায়া কি দেখেছিলেন সেই চাঁদ? সম্মোহিত হয়েছিলেন? সেই সময়ে শুদ্ধোদন কি তাঁর পাশে বসেছিলেন ক্লান্ত স্ত্রীর মাথা নিজের বুকের আশ্রয়ে টেনে নিয়ে? নাকি সেই মায়াবী মুহূর্তে চাঁদের সমীপে একা ছিলেন মায়া? শিশু সিদ্ধার্থ দোলনায় শুয়ে ধাত্রীর তত্ত্বাবধানে, তার বাপ রাজকাজে ব্যস্ত। সেই বিরল অবসরে শাক্য প্রাসাদের জানালা খুলে প্রহরীর নজর এড়িয়ে জ্যোৎস্না চুরি করছেন এক নারী, যিনি রাণী থেকে রাণী-মা হয়ে আরও বেশি ক্লান্ত আর একা। শ্রীময়ী অনুভব করে, এটাই ঘটেছিল। এমনটাই। মায়ার সঙ্গে নিভৃতে দেখা না হলে ব্যর্থ হয়ে যেত চাঁদের অভিসার।

সেই থেকে বড় মুখ করে চাঁদ ওঠে এসব রাতে। খুঁজে নেয় এমন একটি মেয়েকে, যে আগে কোনোদিন প্রাণ ভরে চাঁদ দেখেনি। হয়ত শুধু তারই চোখে সে ধরা দেয় এমন আকাশজোড়া বিশ্বরূপে। সিদ্ধার্থ গৌতম যেরাতে ঘুমন্ত যশোধরাকে ফেলে বুদ্ধ হতে বেরোলেন, সেদিন কী তিথি ছিল? সেই রাতে কি চাঁদ উঠেছিল? চাঁদই কি ঘুম পাড়িয়ে রেখেছিল যশোধরাকে? জ্ঞানের অন্বেষণ, নির্বাণের গুপ্তধন সন্ধান... সবই ছিল সিদ্ধার্থর নিজস্ব বাণিজ্য। সেই বাণিজ্যে এমনকি "তোমাদের জন্যই তো করছি" বলে মধ্যবিত্ত গৃহকর্তার মতো স্ত্রী-সন্তানের দোহাই দিতে পারতেন না তিনি। বুদ্ধত্ব তাঁর একার কেরিয়ার, নির্বাণে তাঁর ব্যক্তিগত মুক্তি, যশোধরাকে ঠকানোর ওপরেই প্রতিষ্ঠিত যার ভিত্তি। গৃহত্যাগের আগে গৌতম স্ত্রীর অনুমতি নেননি, নিমাই পণ্ডিতও তার প্রয়োজন বোধ করেননি। স্ত্রী এমন এক বস্তু, যাতে গমন করা চলে পুত্রার্থে যেকোনোদিন একক ইচ্ছায়, যাকে পরিত্যাগ করা যায় তেমনই সহজে লোভনীয় বিকল্প প্রেরণায়। নিদ্রিত স্ত্রীর দেহে অনুপ্রবেশের চেষ্টাকে এখন ধর্ষণ মনে করা হয়। নিদ্রিত স্ত্রীকে বোধহীন ভাষাহীন দেহবৎ জ্ঞান করে গোপনে পরিত্যাগ করাকে কী বলে? ধর্ম? সন্তানকে ত্যাগ করে ধর্মের কাছে যাওয়াকে কী বলে? পিতৃত্ব? সিদ্ধার্থ যখন সসীম যশোধরার বেড়া ডিঙিয়ে অসীমের পথে চলে গিয়েছিলেন, তখন তাঁদের একটি সন্তান ছিল। তার নাম রাহুল।

রাহুলের বাবার নাম ছিল কুণাল। স্বল্পবিত্ত কিন্তু উদ্যোগী এবং পরিশ্রমী পুরুষ হিসেবে চান্দ্রেয়ীকে তিনি মুগ্ধ করেন। চান্দ্রেয়ীর গর্ভে রাহুলকে রেখে তিনি মুম্বাই পারি দেন ভাগ্যান্বেষণে। আর ফেরেননি। সেখানেই মারা গিয়েছিলেন, নাকি অন্যত্র চলে গিয়েছিলেন, তা স্পষ্ট নয়। রাহুলের জন্ম পর্যন্ত তিনি বেঁচে ছিলেন এবং খুব তাড়াতাড়ি ছেলেকে দেখতে আসবেন বলে জানিয়েছিলেন টেলিগ্রামের উত্তরে। দেখা হয়নি ছেলের সঙ্গে। চান্দ্রেয়ী প্রাইমারি স্কুলে চাকরি জুটিয়ে একা হাতে সংসার সামলে সন্তানকে মানুষ করেছেন। দুঃখ আর বিরক্তি তাৎক্ষণিক অভিব্যক্তি এড়িয়ে তাঁর বুকের তলদেশে চাপে তাপে কয়লা হয়েছে প্রাচীন অরণ্যের মতো। যৌবন ফিরে গেছে প্রসাধনের স্পর্শ না পেয়ে। দুর্ভাগ্যের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিবাদ আকৃতি পায়নি চান্দ্রেয়ীকে অবলম্বন করে, বদলে জন্মেছে প্রগাঢ় অধিকারবোধ। চাকরি থেকে অবসর নেবার পর তিনি শুধুমাত্র রাহুলের মা, এমনকি চান্দ্রেয়ী গুহরায় নামটি মুছে ফেলে। রাহুল তাঁর সন্তান এবং রাহুল শুধুমাত্র তাই। এই সন্তান তাঁর জীবনের একমাত্র অবলম্বন, প্রাণের ধন, শিক্ষায় দীক্ষায় সুপুত্র। এই শেষ অবলম্বনটিকে প্রাণপণে এবং প্রতিমুহূর্তে রক্ষা করা প্রৌঢ়ার একমাত্র কর্ম এবং নর্ম। এই নেশাটি ছাড়া তিনি অস্থির বোধ করবেন।


শ্রীময়ী বোঝে, এ এক দুর্ভেদ্য দুর্গ। সেখানে তৃতীয় ব্যক্তি বা দ্বিতীয়া নারী হিসেবে প্রবেশ করতে গেলে সংঘর্ষ অনিবার্য, যে যতই পানিপথের প্রান্তর ছেড়ে গুপ্তকক্ষে মুখোশের আড়ালে অনুষ্ঠিত হোক না কেন। রক্তপাত হবেই, অকস্মাৎ ছিন্নমস্তার শোণিত-ফোয়ারার মতো না ছুটলেও অন্দরে অন্তরে অলক্ষ্যে ঝরতে থাকবে প্রতিদিন ফোঁটাফোঁটা। কুপুত্র না হয়ে রাহুলও এর প্রতিকার করতে পারবে না। ভালো স্বামী হবার দায়ে কুপুত্র হতে রাজি হলেও কি পারবে? হয়ত প্রতিবাদ করবে, মায়ের ওপর চিৎকার করতে শিখবে, সংঘাত প্রকাশ্যে আসবে। অশান্তি হবে হুড়মুড়িয়ে পড়ে যাওয়া স্তুপীকৃত বাসনের মতো আওয়াজ করে, অস্থির হেঁশেলে যেমন হয়ে থাকে। অশান্তি আর ভালো লাগে না শ্রীময়ীর। রাহুলের প্রণয়-প্রস্তাব ফেরাতে না পারলেও পরিণয়-প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার এও এক গুরুত্বপূর্ণ কারণ। ভালোবাসা দামী জিনিস, কিন্তু শান্তি আরও মূল্যবান। কষ্টার্জিত স্থিতি, নিরিবিলি শান্তি আর নিজের উপার্জিত অর্থে কেনা ছ'শ বর্গফুটের স্বাধিকার ছেড়ে পরের বাড়িতে আবার অশান্তির মোকাবিলা করতে যাবার প্রেরণা আর শক্তি জোগাবে, তেমন মণিময় নয় আর প্রেম, তেত্রিশ বছরের শ্রীর চোখে।


রাহুল তবু ডাকলেই আসে... না ডাকতেই আসে। পাশে থাকে। ভালোবাসে। পাখির বাবা সাজে। ঘোড়া হয়। পাখির মাকে উড়তে দেয়, তার ভেজা ডানা মুছিয়ে দেয় আলতোভাবে যাতে একটিও পালক খসে না পড়ে। শ্রীময়ী বুঝতে পারে, এ এমন এক ভালোবাসা যা সে কখনো পায়নি। পেতে ইচ্ছে করে, হাত বাড়িয়ে হাত ধরতে ইচ্ছে করে, বুকে মাথা রেখে জুড়োতে ইচ্ছে করে, ভালোবাসার মূল্য দিতে ইচ্ছে করে, তবু ভালোবাসাকে অমূল্য মনে হয় না। রাহুলকে শ্রীময়ী ভালোবাসে এতদিনে, তবু নোঙর তুলে ভেসে পড়তে পারে না। নিজের দুর্গটুকু আগলায় প্রাণপণে। তার অধিকারবোধ ছোট হতে হতে ছ'শ বর্গফুটে সেঁধিয়েছে। অন্যের বাড়িকে সে নিজের ভাবতে পারবে না আর। সেখানে অপমানিত হলে তার পায়ের তলায় নিজের নাম লেখা এক বর্গফুট জমিও থাকবে না। তখন সে দাঁড়াবে কোথায়? তার চেয়ে এই ভালো। ভালোবাসাটুকু বেঁচে থাক বিবাহের ফাঁস এড়িয়ে। রাহুলকে কি ছাদে ডাকবে? তার সঙ্গে কি ভাগ করে নেওয়া যায় বুদ্ধ পূর্ণিমার চাঁদ?

বাতাস দিচ্ছে আগের চেয়ে জোরে। উত্তর-পূর্ব দিকে অনেকখানি বাদলা মেঘ জমেছে। দমদম এয়ারপোর্ট থেকে ভিআইপি রোড, বাইপাস ধরে উড়ে আসছে এদিকেই। মেঘের অগ্রদূত চিকন তরবারির মতো চাঁদ ভেদ করে চলে যাচ্ছে। ক্রমশ সমূহ বিপুলতায় ধূসর এসে চাঁদ খাবে। রাঁদেভু শেষ এবারের মতো। জিনিসপত্র গুছিয়ে সিঁড়ির দিকে এগোয় শ্রীময়ী।

কলিং বেল টিপতেই খেলা ছেড়ে মেয়ে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ে। গলা ধরে ঝুলে নিজের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে ফের খেলায় মেতে যায়। রাহুল ফাঁক খোঁজে কথা বলার।

"ঘোষালবাবুর সঙ্গে কথা বললাম। তোমার পাশের ফ্ল্যাটটা যাঁর, সেই তিমির ঘোষাল। উনারই তো ছিল জমিটা। উনি এখানে আসবেন না। লেক টাউনের দিকে বিরাট বাড়ি। ওটা ছেড়ে এখানে কেনই বা আসবেন। ফ্ল্যাটটা ধরে রেখেছেন পরে বিক্রি করবেন বলে। আমিই কিনে নেব ভাবছি। অন্তত পাশাপাশি থাকা হবে। তোমার আপত্তি নেই তো?"

"আমি নিশ্চিত নই রাহুল। পাশাপাশি থাকলে ভালো হবে কিনা, আমি সত্যি জানি না। তাড়াহুড়ো করার দরকার নেই। যেমন আছে, থাক না।"

"ভেবে দেখো। এই মহামারী কতদিন চলবে জানে না কেউ। হয়ত আরও দেড়-দু'বছর। শহরের দুটো বিন্দুর মধ্যে দূরত্ব বেড়ে গেছে অনেক। হঠাৎ প্রয়োজন হলে যদি আসতে না পারি? ধরো পাখির দরকার হল। পাশাপাশি থাকলে সবসময় নাগালের মধ্যে পেতে আমাকে।"

"সাহায্য করতে আসবে? সবচেয়ে খারাপ সময়টা একাই পার করলাম যে! এখন আর সাহায্যের অপেক্ষায় থাকি না।"

"সাহায্য করতে কেন? জীবন ভাগ করতে।"

"ভাগাভাগিতে চিরকাল বড্ড ঠকেছি। আজকাল তাই যৌথ মালিকানায় কিছু কিনি না আর।"

"আমাকে বিশ্বাস করো না এখনও?"


"চোখ বুজে বিশ্বাস করার কায়দাটাই ভুলে গেছি এতদিনে। অন্ধ বিশ্বাস হয়ত তোমার কাছে খুব রোম্যান্টিক, ওটাই হয়ত তোমার প্রেমের ধারণা, কিন্তু আমার কাছে ওটা একটা ফাঁদ, যা থেকে আমি কষ্ট করে বেরিয়ে এসেছি। তবে তোমাকে অবিশ্বাস করার কোনো কারণ ঘটেনি এখন পর্যন্ত। বিচারশীলতা থাকবে, তা সত্ত্বেও তোমাকে বিশ্বাস করতে চাই, কিন্তু বিয়ে ব্যাপারটাকে আর বিশ্বাস করি না।"

"বিয়ে তো করছ না। এমনিই পাশাপাশি থাকা যায় না, নিকটতম প্রতিবেশী হয়ে?"

"প্রতিবেশী সেজে বলো। আসলে তো প্রতিবেশীর মতো থাকতে পারবে না। দুটো ফ্ল্যাট মিলে একটা সংসার হয়ে যাবে। কদিন পর একসঙ্গে রান্না হবে।"

"তাতে অসুবিধে কী?"

"বুঝতে পারছ না, ওটা চাইলে তো বিয়েই করতে পারতাম। সহজ হত। ওরকম চাইছি না। আসলে আমি হয়ত দাম্পত্যকেই ভয় পাই এখন। দাম্পত্য ইন এনি ফর্ম। বন্ধুত্ব ভালো, ভালোবাসাকেও তো বারণ করিনি। ওগুলো থাক, কিন্তু স্থানিক দূরত্বটুকু আমার জন্য জরুরি। ওটুকুও ঘুচে যাবে ভাবলে অস্বস্তি হয়। ভুল বুঝো না। তোমাকে ভালোবাসি। এটা সত্যি। তোমাকেই ভালোবাসি, কিন্তু ভালোবাসা অবলম্বন করে ভেসে যাওয়ার জোর বা তাগিদ কোনোটাই এখনও জমে ওঠেনি। আমার সময় লাগবে। এই বেড়াটুকু ডিঙিয়ো না এখনই।"

রাহুল কথা বাড়ায় না আর। সে জানে, বন্ধ দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে বেল দিতে হয়। না খুললে দরজা ধরে ঝাঁকাতে নেই, ভেঙে ফেলতে নেই। অপেক্ষা করতে হয়। ভেতরের মানুষটি সুস্থ আছে কিনা, সেটুকু যাচাই করতে হয়। "নো অ্যাডমিশন" বোর্ড দেখলে ফিরে যেতে হয়।

"রাতে খেয়ে যাবে?"

"না, বাড়ি ফিরে খাবো।"

"তাহলে ঝড় থামলে যেয়ো।"

"ঝড় কই? এ তো বাতাস। একটু ছুটোছুটি করছে আমাদের পাখির মতো। আমি বেরোই।"

"না, বসো। বাতাস কমলে বেরোবে।" শ্রীময়ী বোঝে, এই এলোমেলো ঝোড়ো বাতাসের মধ্যে ধূলো আর বৃষ্টির গুঁড়ো মেখে বেরিয়ে যাওয়াটাই মিতবাক রাহুলের অভিমানের প্রকাশ। ও জানে সীমান্ত লঙ্ঘন করতে নেই। ও জানে আপত্তি মেনে নিতে হয়, তাই মেনে নেয়, কিন্তু আসলে মেনে নিতে পারে না সবটা। রাগতে পারে না, গালি দিতে পারে না, পেটাতে পারে না সুব্রতর মতো। বদলে অভিমান করে। সেটাও চেপে রাখার চেষ্টা করে, কিন্তু লুকোতে পারে না পুরোপুরি। এই মেনেও মেনে নিতে না পারার পিছনে যে প্রত্যাশা আর সুপ্ত অধিকারবোধ, সেটুকুই ওর সীমাবদ্ধতা। হয়ত এটাকেই ভয় পায় শ্রীময়ী। বাড়তে দিলে এই সুপ্ত বীজটাই কোন মহীরুহের জন্ম দেবে, তা বলা কঠিন। এই ভয় শ্রীময়ীকে বাধ্য করে নিজের দরজায় তালা দিতে। আবার একথাও মনে হয় যে এই সীমাবদ্ধতাটুকুই ওকে রক্তমাংসের মানুষ করেছে। এই অভিমানটুকুর মধ্যে ওকে সহজে ছোঁয়া যায়। শ্রীময়ীর মনে একটুকরো প্রশ্রয় রাখা আছে রাহুলের এইসব ছোট ছোট বিচ্যুতির জন্য। বাড়তে দিলে, জলসেচ দিলে কেমন চেহারা নিতে পারে এই প্রশ্রয়ের বীজ? আরও একবার সবকিছু ভেসে গেলে ডাঙা খুঁজে পাবে কোনোদিন? শ্রীময়ী আসলে নিজেকেই ভয় পায় সবচেয়ে বেশি।

ঝড় হল না। তেমন বৃষ্টিও না। বাতাস শান্ত হল তাড়াতাড়ি। রাহুল বেরিয়ে পড়ল। এবার কয়েক কিলোমিটার হেঁটে বাড়ি ফিরবে। শ্রীময়ীর কষ্ট হল। আসলে তো ওরও কোনো বাড়ি নেই নিজের। বান্ধবীর বাড়ি থেকে মায়ের বাড়ি যাবে পূর্ণিমার শহর হেঁটে। এই লোকটাও কি বাসা খুঁজছে মরিয়া হয়ে শ্রীময়ীর মতোই? পাখির বাসা! নিজের বাসা! তার খড়কুটো কুড়োনোয় কি বাধা দিল শ্রী? নাকি বাসা নয়, সংসার খুঁজছে সে? তাই হবে। দুজনের খোঁজ আলাদা বলেই মিলছে না ঠিকমতো। গৌতম চলে গেলেন বুদ্ধত্বের দিকে। ভোরবেলা ঘুম ভেঙে উঠে রাহুল দেখল মা কাঁদছে। ঘর আছে, সংসার নেই। সেই থেকে প্রাসাদে, ফুটপাথে সর্বত্র পরিবার খুঁজতে খুঁজতে, সংসার খুঁজতে খুঁজতে ত্রিশ পেরিয়ে ছেলেটা ভবানীপুর থেকে বাঘাযতীন ছুটে এল, এখানে পাওয়া যেতে পারে শুনে। এই খোঁজটাকেও অসম্মান করতে পারে না শ্রীময়ী, কিন্তু তার কাছে তো দেবার মতো কিছু নেই আর পড়ে। নিজের আর পাখির জন্য কোনোক্রমে একটু বাসা বুনেছে সে। এবার আকাশ খুঁজছে পাখিকে দেবে বলে, হয়ত নিজেকেও।

রাহুল চলে যেতে শ্রীময়ী পাখিকে বলল, "ছাদে যাবি? একটা জিনিস দেখাব।"
ছাদে যাবার নামে প্রবল উৎসাহ মেয়ের। মায়ের আগেই দুদ্দাড়িয়ে সিঁড়ি বেয়ে ছাদের দরজার সামনে থামতে হল। ওপরের ছিটকিনি অব্দি নাগাল পায় না এখনও। দরজা খুলে মেয়েকে নিয়ে পুব দিকটায় গেল শ্রীময়ী। চাঁদটা এতক্ষণে বাড়িঘরের চুড়ো ছাড়িয়ে আরও খানিকটা উঠে পড়েছে আকাশ বেয়ে। আগের মতো অত বড় দেখাচ্ছে না, তবে প্রসাধন সেরে আরেকটু ফ্যাকাশে হলুদ আর ঝলমলে। সেদিকে আঙুল তোলে শ্রীময়ী, "ঐ দ্যাখ।"

"কী? চাঁদ? এটা দেখাতে আনলে?"

শ্রীময়ীর মনে পড়ে, সে কখনো মেয়েকে এভাবে চাঁদ দেখায়নি। পৃথিবী দেখিয়েছে, মানুষ দেখিয়েছে, মিছিল দেখিয়েছে, এমনকি পাহাড়ও, কিন্তু মেয়েকে কোলে নিয়ে ঘুম পাড়ানোর সময়েও কোনোদিন "খুকির কপালে টিপ দিয়ে যা" বলে চাঁদকে ডাকেনি। চাঁদ তার পছন্দের তালিকায় ছিল না, মেয়েকেও দিতে চায়নি কোনো চাঁদনি উত্তরাধিকার। তার হাতে দেবার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যাটনগুলো সাজিয়ে রাখছিল পাশাপাশি, একটু বড় হয়ে যাতে সে বেছে নিতে পারে নিজের পছন্দমতো মশাল। এই পরিকল্পনা আর ব্যস্ততার মধ্যে চাঁদের অবসর ছিল না। পাখি তাই অবাক হল মা চাঁদ দেখাতে ছাদে নিয়ে এসেছে দেখে।

"ওখানে যাওয়া যায়, জানিস?"

"কোথায়? চাঁদে? মানুষ যায়?"

"হ্যাঁ, মানুষ যেতে পারে রকেটে চড়ে। যাবি?"

"যাব। আমি তো বানাবো রকেট। তুমি যাবে তো আমার সঙ্গে?"

"আমি কী করে যাব মনা? তুই যাবি বড় হয়ে।"

"না, বড় হয়ে না। এখন তো স্কুল যাচ্ছি না। এখনই যাব। ওখান থেকেই অনলাইন ক্লাস করব।"

"আচ্ছা। ওখান থেকেই?"

"হ্যাঁ। তুমিও চলো। মা, চাঁদে সুব্বোতো যেতে পারবে না তো?"

"সুব্রত? কেন?"

"ও এলে আমার ভালো লাগে না মা। দেখা করতে চাই না ওর সঙ্গে।"

"না, সুব্রত ওখানে আসতে পারবে না। আমরা চাঁদের গেট বন্ধ করে দেব।"

"খুব ভালো হবে মা। তুমি আর আমি থাকব। দিদান আর দাদাভাইকেও নিয়ে যাব একবার এসে।"

"বেশ, নিয়ে যাব। আর কেউ?"

"অঙ্কিতা এলে ভালো হত। ওর মা কি আসতে দেবে? খালি তো পড়তে বসায় জোর করে। আর বুবাই, সৌমিক।"

"রাহুল আঙ্কেল?"

"আসবে মাঝেমাঝে। আমি রকেট পাঠিয়ে দেব।"

ছাদের রেলিঙ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে মা আর মেয়ে। প্রথমবার দুজনে মিলে চাঁদ দেখছে। বহু কষ্টে এই পূর্ণিমা তারা অর্জন করেছে। পূর্ণিমা আজ থেকে আর বুদ্ধের নয়, লক্ষ্মীর নয়, কোনো গুরুর নয়। শুধু পাখি আর তার মায়ের জন্য মুখ আলো করে চাঁদ সরে আসছে পৃথিবীর কাছাকাছি। নীলচে ডানাওয়ালা দুই মেয়ে... তেত্রিশ আর আট... টুপ করে নেমে পড়বে তার সূর্যমুখী পিঠে। তারপর গেট লাগিয়ে দেবে। আদালতের ডিক্রি নিয়ে কেউ আর সেখানে পাখির অধিকার দাবি করতে পারবে না। এমনকি হেঁটে সেখানে পৌঁছনো যাবে না ভবানীপুর থেকেও। পাখি আর তার মা রকেট পাঠালে, তবেই না যাওয়া! শ্রীময়ীর মনে হল, এই শূন্য বাড়িটাতে নিজের জায়গাটুকু পেয়ে গেছে সে... ছ'শ বর্গফুট জমি আর একটি নিজস্ব চাঁদ।