ধ্বংসশহরঃ একটি অনুবাদ কবিতা

অর্ণব রায়


তাকে ছেড়ে তার বাসীন্দারা চলে যাওয়ায়, আমাদের এই প্রিয় ছোট্ট শহরটা, আমাদের নিয়ে, নিজেকে দুমড়ে মুচড়ে কাগজের দলার মত গুটিয়ে পৃথিবীর বুক থেকে প্রথমে একটি বিন্দু, তারপর নেই হয়ে গেল।
লুসি, আমরা এই কোঁচকানো কাগজের উল্টোপিঠে ফুটে ওঠা অক্ষরের চূর্ণ প্রতিবিম্ব। আমাদের বুকের ওপর আজকের স্থানীয় সংবাদ লেখাঃ
শহরের কেন্দ্রে, যেখানে বৃদ্ধাদের দাঁত পোঁতা থাকে, সেখানে একখানি মুখভঙ্গীর গাছ জন্মেছে। তার পাতাগুলি এক একটি ভাঙা সংসারের আয়না। কান্ডটি কুমারী মেয়ের নৃত্য। শহরে আর কেউ নেই বলে আয়নাগুলির ভেতর লম্বা এক শূণ্যতা চকচক করছে।
আমাদের শহরটা গুটিয়ে নেই হয়ে গেলে সেখানে কী আছে? লুসি, এই পৃথিবীটাতো সত্যি সত্যি নীল হলুদ বাদামী মানচিত্র নয়। বা নয় নিটোল একখানা খেলনা গ্লোব। এই পৃথিবীর প্রতিটি কোথাও-য়ে কিছু না কিছু আছে। মানচিত্র গুটিয়ে নিলে খালি টেবিল থাকে। গ্লোব থেকে দেশ খুঁটে তুলে নিলে বোবা ধাতব গোলক। আসল পৃথিবী থেকে আমাদের এই শহর ঘরবাড়ি পেট্রোল পাম্প পার্ক অফিস বার — সব নিয়ে কুঁচকে গেলে, সত্যি সত্যি সেখানে কী থাকে? আয় লুসি, তুই আর আমি ভাবি।


আমরা কি আদৌ কোথাও যেতে পারতাম? বুড়ো হলে মুমূর্ষু শহরের সাথে বাঁধা পড়াটাই কি নিয়তি নয়? আমাদের ছেলেমেয়ে বা অন্য কারোর ছেলেমেয়ে যদি, সেই গাড়ি ট্রাক ট্রলারের দীর্ঘ মিছিলের লেজের দিকে, কোনও এক আবছা গাড়িতে তুলে আমাদের বসিয়ে দিত? তাহলে? থেকে যাওয়া মানে একাকীত্ব, আমরা জানি। মানুষের দলে ভিড়ে মানুষের শহর ছেড়ে চলে যাওয়ার মানে তবে কী?
লুসি, তুই আর আমি এই শহর ছেড়ে চলে গেলে বেমানান হত। আর কেন যেন, আমরা ছাড়া এই শহরে চলমান একটি গাধারই থাকার কথা ছিল। বাবায়ারামের শঙ্কু আকারের মাথাটা কীভাবে ফেটে উড়ে গেল, কীভাবে তরল আগুন শহরের এতদিনের সব আকার আয়তন গিলে একটি কালো অনুচ্চ ঢিবি হয়ে রইল— আমরা না থাকলে এসব সকলকে শুধু কল্পনাই করতে হত। আমরা থেকে যাওয়াতে, এখনও তাদের কল্পনাই করতে হবে।


কী ভালো সকাল, যখন কিছুই আর মনে পড়ছে না। এমন সকাল হাসি দিয়ে শুরু করা যায়। একখানা বোকা হাসি টেনে রাত পর্যন্ত কাটিয়ে দেওয়া যায়। যেন বাতিল শহর নেই। পাহাড় তার গলা দিয়ে আগুন বমি করছে না। বাতাস তপ্ত লোহা হয়ে ত্বকে চুম্বন করছে না। ভাই লুসি, চল একখানা সিনেমা দেখে আসি।
শহরের হলে শেষ একখানা ওয়েস্টার্নার লেগেছিল। তার কাউবয় ল্যাসো ঘোরাতে ঘোরাতে এখনও ছুটছে। প্রোজেক্টার ঘরঘর শব্দ করে একাই ঘুরছে। পপকর্ন আর ভাজা সসেজ নিয়ে আমরা একেবারে দু-ডলারের সিটে গিয়ে বসব। সামনের চেয়ারে পা তুলে দেব। আর চেঁচাবো, ব্রাভো! ব্রাভো!
কাউবয় তার টুপি ছুঁয়ে আমাদের দিকে একবার নড করবে। তার ঘোড়াটি ছুটতে ছুটতে মাথা ঝোঁকাবে দুবার। আমাদের জন্য এই সিনেমা, লুসি। আমাদের জন্য এই পপকর্ন, সসেজ। আমাদের জন্য অপেক্ষায় সিনেমাহলের সিট, লবি, বারান্দা। আমাদের জন্য এই শহরের রাস্তা, গলি, ল্যাম্পপোষ্ট, পার্ক।
আমরা এই জনহীন ঐশ্বর্য্য নিয়ে কী করব?


সিনেমা হলে জনশূন্য অন্ধকারে রঙ বেরঙের আলোয় যা চলছিলঃ
একবার আমাদের পুরোনো পিক আপ ভ্যান আর চার ক্রেট বিয়ার নিয়ে অসীমের প্রান্ত দেখব বলে বেরিয়ে পড়েছিলাম। সে প্রান্তটি, দেখা গেল, এক অচেনা মহিলার বাড়ির সামনে দুম করে থেমে গেল। ইতিমধ্যে ক্রেটের সব বরফ গলে জল হয়ে গেছে। অছিলা নয়, সত্যি সত্যি বরফ চাইতেই সেই বাড়ির সামনে থেমেছিলাম। আদিগন্ত গমের ক্ষেতের মধ্যে সেই একখানা একক কাঠের বাড়ি। ফিকে হলুদ আর কালচে রঙ করা।
আমি কোনওদিনও ভুলব না সেই সামনের কাঠের বারান্দা। ঝোলানো হ্যামক। আইসড টি। ভাই লুসি, অতদূর তুই কোনওদিন যাসনি। অতক্ষণ গাড়ি চালানোর পরে অমন একজোড়া চোখ, চোয়ালের ধার, নরম গ্রীবা আর কখনও কেউ দেখেনি। আর কেউ কখনও অমন ভাবে কারোর বলা কথার দিকে হৃদয় পেতে রাখেনি।
এইসব আগুনঝড় ভূমিকম্প পাতালের আগ্রাসন মিটে গেলে একদিন আমরা ওই বাড়িটার খোঁজে বেরিয়ে পড়ব। দড়জায় টোকা মেরে বলব, একটু বরফ পাওয়া যাবে আপনার কাছে? এক আধটা পিক আপ ভ্যান আর কয়েক ক্রেট বিয়ারও জোগাড় হয়ে যাবে নিশ্চই।


লুসি, এই ডেক, সাদা রঙ করা, এর সামনে একটা সমুদ্রের কোনা থাকা উচিৎ ছিল। বা নিদেনপক্ষে হাডসনের মত একটা চওড়া নদী। আমার আর মার্থার একসাথে দাঁড়াবার কিছু মিঠে স্মৃতি এই ডেকে লেগে থাকা উচিৎ।
সেসব কিছুই নাই। ডেকের সামনে দিয়ে একটা খালের শুকনো খাত বেঁকে চলে গেছে। শহর পরিত্যক্ত হওয়ার আগেই নদী শুকিয়ে উঠেছে।
ভাই লুসি, একদিন বিকেলের দিকে একবার ডেকের ওপর গিয়ে দাঁড়াই, আয়। রেলিঙের ওপর আনমনে হাত রাখি। ভাবি, মার্থাও দাঁড়িয়ে ছিল কোনওদিন এইভাবে। মিথ্যে মিথ্যে ভাবি।
আমরা ভাববো না কীভাবে শেষ হতে পারি
আমরা দেখবো না এই সাদা ডেক
মৃত নদীর চিহ্নকে সাক্ষী রেখে , দাউদাউ পুড়ছে,
আমরা একটি লুপে বারবার কল্পনা করে যাবো না, বাবায়ারামের মাথা
হঠাৎ দড়াম করে উড়ে আকাশে চলে গেল।
বাবায়ারাম আগুনের পাহাড়, কিন্তু আমাদের পাহাড়।
একদিন এই ডেকে আমরা স্যান্ডুইচ আর হোয়াইট ওয়াইন নিয়ে পিকনিকে আসবো। আমি, তুই, মার্থা। আর কিছু প্রতিবেশী।