কবিতাগুচ্ছ

সাবেরা তাবাসসুম

সকল পিঠার স্বাদ মূলত নোনা
স্বপ্নে আম্মাকে দেখলাম
আমাদের শৈশবের বাড়িটির
প্রশস্ত মাঠ দেখলাম
দুপুরের স্বপ্ন, শীতের দুপুরে
আম্মা দু হাতে পিঠা ভাজেন
পিঠা ভাপে বসান
সেটাও দুপুর গড়ানো সময় ছিল
প্রশস্ত মাঠে আম্মার
দুটো হাত সমান সচল
আমি খাবারের জন্যে তাড়া
অনুভব করি না তেমন
এত আয়োজন তবু আমার
পিঠার খিদেকে ঘিরেই মনে হলো
প্রশস্ত মাঠ, আমাদের পুরান বাড়িটি
যার মেঝেয় মাদুর পেতে আব্বাকে
ঘিরে ভাইবোন খেতে বসতাম
তিনটি কাঁসার ফুলকাটা থাল
মাছের মাথা ভেঙে আব্বা
আমাকে কাঁটা খাওয়ানো শেখান
সেই বাড়িটির প্রশস্ত মাঠ এই এক
শীতের দুপুরে স্বপ্নে দেখলাম
দেখলাম আর টপাটপ
সবকিছু মনে পড়ে গেল
আব্বাকে কোথাও দেখলাম না
আমার দুই ভাই, দাদু কাউকে না
বহু বছরের পুরান মেহেদি গাছ
যাকে আমরা মেন্দি গাছ বলতাম
ঈদ এলে সারা পাড়ার লোকের
হাত রাঙিয়ে দিত যার পাতা
শুধু তাকে দেখলাম
প্রশস্ত মাঠে দুটো বড় উনুন
আম্মা ছুটে ছুটে দু হাতে পিঠা
বানিয়ে চলেছেন, তা-ই দেখলাম
দেখলাম শুধুই স্বপ্নে
আর একটি পিঠাও না চেখে
আমি সকল পিঠার স্বাদ পেয়ে গেলাম
পৃথিবীর সকল সুস্বাদু পিঠার স্বাদ মূলত নোনা।


সূর্য নামায় সংসার
বৎসর শেষ হয়, সূর্য নামে
আমার ধান ক্ষেত, চায়ের দোকান
আমার স্কুল-উৎসব শেষে সূর্য নামে
সূর্য নামে আর মানুষ হয় বিপুল অন্ধকার
পথে পথে সমাবেশ, মধ্যিখানে পুকুরের পার
স্কুল-উৎসব শেষে আমি তো ফিরি না
আমি তো ফিরি না ঘরে, সূর্য নামায় সংসার
অপেক্ষায় পরিবার, উৎসুক মুখেরা পাড়ার
অন্ধকার মানুষের ছয়জোড়া কুৎসিত হাত
রাতভর ফালা ফালা, পিশাচের ইন্দুর দাঁত
মৃতপ্রায় আমার শরীর, শরীর ভরা ঘোর অনাচার
আমি তো ফিরি না ঘরে, সূর্য নামায় সংসার
খোঁজ শোরগোল শেষে তারা কি দেহটিরে পায়
আমার দেহটি ছিল নিক্ষিপ্ত নর্দমায়
মৃত ভেবে আমি তবে নিক্ষিপ্ত নর্দমায়
স্বচ্ছ মানুষ, স্বচ্ছ মাছেরা আমার শরীর পানে চায়
বিলাপে দেহখানি স্বরূপে ফিরিবে কি আর
ঊষা লগন, চোখ মুছে বাপে যায় মঙ্গলার বাজার
মঙ্গলার বাজার, পাশে ধানখেত-- আমার নিবাস
মৃতপ্রায় ঘরে ফিরি, ফেরে না ঘরের অভ্যাস
চিকিৎসা জারি থাকে, কানাঘুষা আর ফিসফাস
খবরের লোক, থানার দালাল, বহুদূর তোমার সুবাস
প্রহসন শেষ হলে বারো ভাজা কিনে আনে ভাই
পরান শক্ত তবু দুর্লভ শুশ্রুষা লুকাই
মৃতপ্রায় আমি, মৃত ভাবে মঙ্গলার বাজার
সকলের আসে, আসে না উৎসব আমার একলার
ধানখেত, চায়ের দোকান, সঙ্গে একরাত বলাৎকার
বৎসর শেষ হয়ে আসে, সূর্য তার নামায় সংসার।


নৈর্ব্যক্তিক
আমার ঘুমগুলো তোমার বিছানায়
ঘুমিয়ে নিচ্ছে কে
আমার রাতজাগা গান কার শার্শিতে
আটকে থাকে দিনভর
কেউ তো একজন আছে যে
কথার নড়চড় করে নিশ্চয়ই
এমনই হবে ভেবে নিলে
সকল দায়মুক্তি ঘটে যেতে পারে
আমাদের নিঃশ্বাস পরস্পরের প্রতি
হতে পারে মুক্ত, উদার
একা কোনো ঘরে ফিরতে হবে ভেবে
একা একা মরে তিনদিন পড়ে থাকতে হবে ভেবে
এখনই যে শঙ্কা বাঘের মত তাড়ায় আমাকে
তাকে একটা আঙুল হেলিয়েই চুপসে দেয়া যায়
সঙ্গমের পর তোমার শিশ্নের
নেতিয়ে পড়ার মতই সে চুপ মেরে যাবে
আমি তাকে বলতে পারি
কোনো অনুশোচনা রাখতে নেই
আমি তো রাখি নি কোনোদিন
জেনে গেছি, এ জীবন আমার আর
আমি এ জীবনের অধীন
কিছুই মুক্ত নয়, ওই আকাশ, এই পাখি
শুধু আমার আত্মার নীলচে লাল ডিম
তা দিয়ে যেতে পারি তাকে
ফুটে উঠতে বলতে পারি তাকে
শুনে যাও নৈঃসঙ্গ্য অসীম,
কিছু পারি বা না পারি
দিনশেষে আমি আমার একলা
মৃত্যুর ভার বয়ে নিতে পারি, ঠিক।