ধূমাবতী

শতাব্দী দাশ

চুল কাঁচাপাকা, ঘাড়ের কাছে ছাঁটা। শুধু শাদা পরতেন। মুখের প্রতি কুঞ্চন ছিল কঠিন ও মাপা। এমন বেরঙ মানুষকে ক্লাস ফাইভের প্রথম ক্লাস নিতে পাঠানোর মানে হয়? আরেকটু হলে নতুন মেয়েরা ভ্যাঁ-কান্না জুড়ে দিত 'বাড়ি যাব' বলে। অথচ বকেননি, ঝকেননি। আপনমনে ক্লাসে ঢুকে পড়েছিলেন। অনেক দূরের দৃষ্টি মেলে চেয়েছিলেন।

সহজ গল্প, দ্রুতপঠনে। মহামতি যীশু ভক্তদের মহৎ কিছু বোঝাচ্ছেন-টোঝাচ্ছেন। কিন্তু গল্প পড়লে চলবে কেন?

-জেরুজালেম কোথায় জানো ? জর্ডন নদী? প্যালেস্টেইন? সে কী? যাঃ! তাহলে তো আগে সেসব জানতে হবে৷

ফোঁস করে নিশ্বাস ফেলে তিনি বসলেন। ছত্তিরিশটি মেয়ের বুকে হুড়ুম দুড়ুম।

-ম্যাপ বই আছে?

সে তো ভূগোলে লাগে! সেদিন ভূগোল নেই৷ দু-এক জনের ব্যাগে তাও তা পাওয়া গেল৷ ঢাউস ম্যাপ খুলে এক মনে বোঝাচ্ছেন।

-হুই দেখা যায়, জর্ডন নদী। এই যে জেরুজালেম, আর এই দেখো প্যালেস্টেইন। এখন খুব বখেড়া তাদের দুজনের মধ্যে অবশ্য! এসব জায়গার মাহাত্ম্য অনেক। খ্রীশ্চানদের জন্য পবিত্র, আবার ইহুদীদের জন্যও, আবার মুসলমানদের জন্যও। বোঝো কাণ্ড!... এই জায়গায় আমাদের গল্প শুরু। কোথায় যে শুরু, সেটাই যদি ধরতে না পারো, তবে মধ্যিখানটা কী করে ধরবে ? কিংবা শেষটা?

কুড়ি মিনিট গেছে কেটে। হঠাৎ পেখম তুলে এক ময়ূরী কড়া নেড়েছে। নীলাম্বরী, হাস্যমুখী। কি তার ছটা! মনে হল, ছায়া ঘনিয়েছে।

-দিদিমণি, এসে গেছি।

তার গলাও ভারি মিঠে। আগেরজনের মতো খ্যানখ্যানে নয়।

কাঁচাপাকা ঈষৎ কেঁপে উঠলেন। টেবিলে পা ঝুলিয়ে ভারি নিমগ্ন ছিলেন তো!

-ওঃ, তুমি! ইনিই তোমাদের আসল বাংলা দিদিমণি। এঁর দেরি হবে বলেই আমি, প্রভিশনালে…যাগগে যাক।

ম্যাপবই মুড়ে টেবিলে রেখে তিনি নিষ্ক্রান্ত হলেন উদভ্রান্তের মতো, ঠিক যেভাবে এসেছিলেন । হাঁফ ছাড়ল ছত্তিরিশটি প্রাণ। অথচ, মাইরি! বকেননি, ঝকেননি, কটূ কথা বলেননি। কেন যে তবু...

*****

ওই এক প্রভিশনাল ছাড়া, কাঁচাপাকার আর ক্লাস পাওয়া গেল না বড় হওয়ার আগে। তিনি নাকি সংস্কৃতও পড়ান। বাংলাও। দূরত্ব। সম্ভ্রম। অস্বস্তি। এইসব রয়ে গেল। ঢলো ঢলো লাবণ্য নেই৷ স্নেহ আছে। দয়া আছে প্রাণে। কিন্তু ওই যাকে বলে 'মা-মা ভাব', ওসব নেই। বকার ধরণ অদ্ভুত।

একবার নবরূপা করল কী, ক্যান্টিনে থেকে খাবার কিনে টাকা না দিয়ে স্রেফ সটকে পড়ল। অরবিন্দদা ঘোড়েল লোক৷ খুঁজে ঠিক বের করল । হনহন করে সে সময় হেঁটে যাচ্ছিলেন করিডোর দিয়ে কাঁচাপাকা। হাত-পা নেড়ে অরবিন্দদা তাঁকেই গেল নালিশ ঠুকতে। কাণ্ডটা মাথায় তাঁর ঢুকল বটে। কিন্তু রাগলেন কিনা, তা ঠাহর হল না। বরং যেন অবাক হলেন। যেন এমন অতিপ্রাকৃত অপরাধের কথা শোনেননি।

-তুমি সেদিন গান গাইলে না? 'পুষ্প যেমন আলোর লাগি, না জেনে রাত কাটায় জাগি/ তেমনি তোমার আশায় আমার হৃদয় আছে ছেয়ে…' গাইলে না? তুমিই তো?

নিজেও খানিক গুনগুন করলেন। পাগল নাকি!

নবরূপা ঘামছে।

তারপর আচমকা বললেন,

-গানের মানে কিছুই বোঝোনি দেখছি। ঘেঁচু বুঝেছ!

কাঁচাপাকা ঘেঁচু দেখালেন বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ হেলিয়ে। তারপর চলে গেলেন।

-যাচ্চলে!

হাঁ-মুখ অরবিন্দদা বলল। নবরূপা পকেট হাতড়ে সাড়ে আট টাকা দিয়েছিল অবশ্য।

যারা দূরে দাঁড়িয়ে মজা দেখছিল, তারা ফিকফিকিয়েছিল। শুধু নবরূপার কী যেন হল। টিফিন-ভর গুম মেরে থাকল৷ 'কারেন্ট নুন' খেল না আচারকাকুর থেকে।

*****
উঁচু ক্লাসে আবার দেখা-সাক্ষাত হল। সংস্কৃত ব্যাকরণ পড়াতেন নিখুঁত কম্পিউডার কোডিং-এর মতো। যদিও তাঁর স্থির বিশ্বাস ছিল, উপক্রমণিকা দিয়ে পরীক্ষার হলে পাঠালেও আমরা পাশ করব না৷ পাশ-ফেল চুলোয় যাক। উঠতি বয়সে দিদিমণিদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে মানুষের তার চেয়ে ঢের বেশি আগ্রহ গজায়।

অন্যদের ঘরসংসার আছে। কিংবা প্রেম। আসন্ন বিবাহ। এঁর বিষয়ে আলোচ্য কিছু নেই। সে অভাবের আল বেয়ে গাল-গল্প আসে। কেউ বলে, প্রেমিক মনে হয় পাইলট ছিল, বা সৈনিক। বিয়ের আগেই মরে গেছে, তাই স্বেচ্ছা-বৈধব্য ৷ সস্তায় স্বস্তিদায়ক ফিল্মি কাহানি। কিন্তু যৌন যাপন? একেবারেই নেই? পুরুষবন্ধু দেখা যায়নি কখনও। লেসবি? মেয়ে-স্কুলে 'লেসবি' চেনা কথা। ছাদে মেয়ে-মেয়ে ঘেঁষাঘেষি, অপরিণত চুমো...ওসবকে 'লেসবি' বলে। ওঁর কি বান্ধবীও নেই?

একদিন জগদীশচন্দ্রের 'অব্যক্ত' ধরলেন। 'নদী তুমি কোথা হতে আসিয়াছ?... মহাদেবের জটা হইতে।' তখন দশম । বাংলা থেকে সংস্কৃত হয়ে পুরাণ বেয়ে বিজ্ঞান বা ভূগোলে তাঁর লাফঝাঁপ... এসব তখন আস্তে আস্তে ভালোই লাগে৷ 'ইন্টারডিসিপ্লিনারি' ইত্যাদি গ্রাম্ভারি নাম না জেনেই ভালো লাগে।

-এই যে মহাদেবের জটা থেকে গঙ্গা এলেন, সত্যি কি এলেন? কিংবা কে এলেন?

সপত্নীশোভিত কোনো গেরস্তালি গল্প বলেননি। আসলে গল্প-টল্প বলছিলেন না, যথারীতি। কথা বলছিলেন নিজেরই সঙ্গে।

-স্বর্গের গঙ্গাকে মর্ত্য তার আদি উচ্ছ্বাসে ধারণ করতে পারবে না বলেই শিব বাফার হয়ে যান। তাঁর জটায় প্রাথমিক আঘাত করে যে নদী আসে, তার বেগ থাকে মানুষের সহনশীলতার মধ্যে। এই নদী কীসের প্রতীক? সে কি জ্ঞানস্বরূপা?

চক ঠুকছিলেন টেবিলে। ঠক ঠক। ঠক ঠক।

-সত্যকে একেবারে বিশুদ্ধ অবস্থায় ধারণ করার উপযুক্ত নই আমরা। বাফার লাগে। বাফার!

এই উদভ্রান্ত চোখমুখ...আরও কোথাও কি দেখেছি? তিনি বলে চলেছেন।

-যথাযোগ্য ‘অনুবাদক’ আমাদের ভাষা ও বোধ অনুসারে সত্যের কিয়দংশ হয়ত আমাদের উপযোগী করে হাজির করেন।

চোখমুখ শক্ত হয়ে আসছিল তাঁর। ধারালো। নীরস।

-জ্ঞানমার্গের পথ অতি কঠিন হে! নরমসরম ভক্তিমার্গ নয়, ভেবো না পুজো-আচ্চার কথা বলছি। প্রতিটি প্রশ্নের প্রাপ্ত উত্তরকে আবার প্রশ্ন করতে করতে এগোনো৷ সে পথে কোনও আবেগ নেই, ভাবালুতা নেই, আপন বিশ্বাসের প্রতি পক্ষপাত নেই। সেখান থেকে তুমি দুটি জায়গায় পৌঁছতে পারো। চরম সত্যে। বা চরম নাস্তিক্যে।

তখন আমাদের সদ্য হাতেখড়ি ধর্ম-অহিফেনের তত্ত্বে। বাড়িতে ঘনঘন তর্ক হচ্ছে। আমার, নব-র৷ পনের বছর বয়সে জগত-সংসারকে মূর্খ মনে হচ্ছে। অবাধ্য হচ্ছি। কিন্তু কাঁচাপাকার কথা ভাল লাগত। 'সত্য' কী? মার্ক্স সত্য? বিপ্লব সত্য? কিন্তু তাকেও যে প্রশ্ন করতে হবে বলছেন? প্রশ্ন না থামানোর নামই নাকি নাস্তিক্য?

বেল পড়ল। গোমুখে জগদীশবাবুর
তখনও পৌঁছনো বাকি। সেদিন স্বাধীনতা দিবসের রিহার্সালও। ঝুমুর দিদিমণি হারমোনিয়ামের বেলো টেনে চোখ বুজে ফেলেন। আমিও চোখ বুজে ফেললাম। 'কেন চেয়ে আছ গো মা, মুখপানে!' চোখ বন্ধ করতেই দৃশ্যরা ঝেঁপে আসে।

কাঁচাপাকা চুল।

উদভ্রান্ত চোখ।

ছাই উড়ছে।

নীলকণ্ঠ শিব।

নীলকণ্ঠের গলায় সত্যর দহন জ্বালা।

পাড়ার সিনে ক্লাবের শনিবার।

'কেন চেয়ে আছ গো মা।'

সেখানে ঋত্বিকের নামও নীলকণ্ঠ।

একদম ওই চোখ।
******
বড় বেদনার মতো কী একটা যেন নব আর আমি সংগোপনে সঞ্চয় করছিলুম তাঁর জন্য। জানতামও না, ঠিক কোথায় থাকেন। অন্যরা থাকেন কোথাও না কোথাও, কেয়াতলা বা কসবা। থিতু। বর আছে। বাচ্চা আছে। হয়ত একটা কুকুর, ছোট বা বড়। গাড়ি অবশ্য সবার নেই। কারও কারও আছে। ছুটির পর সেদিন আমরা মানু দিদিমনির গাড়ির কাঁচে মুখ দেখে নিচ্ছিলাম। ফাঁপিয়ে নিচ্ছিলাম চুল-টুল৷ হনহন করে যেই হেঁটে আসতে দেখা গেল কাঁচাপাকা-কে, অমনি সবাই গাড়ির আড়ালেই লুকিয়ে পড়ল। এমনিতেও লক্ষ্য করেন না কাউকে। এগিয়ে গেছেন অনেকটা। হঠাৎ হাতে হ্যাঁচকা টান। নব বলে, 'চল্!'

বড় রাস্তা দিয়ে শাদা শাড়ি হেঁটে যাচ্ছিল। বিড়বিড় করতে করতে৷ মাথাটা হালকা নড়ছিল এদিক ওদিক স্ব-তর্কপ্রতিতর্কের দোলায়৷ রেল লাইন টপকালেন৷ ধরলেন আরও সরু এক রাস্তা। ডান দিকে আরও একটি৷ পাশে মাঠে ছেলেদের ফুটবল। রিক্সাওয়ালা ডাকল একবার, ভ্রুক্ষেপ নেই। বাঁয়ে ঘুরলেন এবার। ডান-বাম-ডান-বাম। পিছনে দুজন হেঁটে চলেছি দূরত্ব রেখে৷ আধঘণ্টাটাক হাঁটার পর একটা ভীষণ সরু অন্ধগলির মুখে দাঁড়ালেন৷ সন্ধ্যার মুখে বাড়ি-ফেরা কাক ডাকল একটা। কেউ উনুনে আঁচ দিয়েছে৷ ঢুকলেন৷ ঠিক চারটি বাড়ি এদিকে। পাঁচটি ওদিকে। যেন এবড়ো-খেবড়ো দাঁতের দুটো সারির মধ্য এক চিলতে অন্ধকার ধোঁয়া ধোঁয়া গলি। একা মানুষের চলাচলের জন্যই। একটি বাড়ির সামনে দাঁড়ালেন। কাকটি আবার ডাকল। একটি শাড়ি, একটি গামছা তুললেন দড়ি থেকে। খুট শব্দে আলো জ্বলল। তালার গর্তে ঢুকল চাবি। ভাড়াঘর দু-কামরার, মনে হল৷ সে দু-ঘরে বাতি জ্বলল একে একে। বাড়ির আর কোনো ঘর সাড়া দিল না। সেগুলোতে সিরিয়াল বা হিন্দি গান চলতে লাগল যৎপূর্বৎ। কাকটা তৃতীয়বার ডাকল। আমরা ফিরলাম। সান্ধ্যপ্রেম না টিউশন, কিসে যেন দেরি হচ্ছিল।

তারপর সে পাড়ায় আমরা অবরে সবরে প্রায় গিয়ে পড়তাম। রোয়াকে আড্ডা দিত খালি-গা কটা লোক, উনুন ধরিয়ে গজল্লা দিত ম্যাক্সির-উপর-ওড়নারা। তার মাঝে জেগে থাকত প্রায়শ বন্ধ একটা দু-কামরা বাসা। জানালা লাগাতে ভুলে যেতেন,তাই সারে সারে বই-এর তাক চোখে পড়ত। পাড়ার লোক বলত মাস্টারনির বইঘর। সন্দেহভরে তাকাত।

-উনি তো টিউশন পড়ান না। ঘুরঘুর করো কেন?

ঠিক জানতাম না, কেন। অন্যরকম একটা ঘর, অন্যরকম যাপন। উনুনের ধোঁয়ায় যা আবছা দেখা যায়, আর বাকিটা ভেবে নিতে হয়।

-একা থাকলে বেশ স্বাধীন না রে? একচ্ছত্র! কাউকে জবাবদিহি করার নেই।

-জবাবদিহি করতে হয় না, এমন মেয়ে তুই দেখেছিস? মাকে করতে হয়। ঠাম্মাকে করতে হয়। আচ্ছা, বড়দিদিমণিকেও বাড়িতে জবাবদিহি করতে হয়?

-তাহলে তো একা থাকাই তোফা!

যেতুম সেই 'অন্যরকমের' টানে, মনে হয়। কিন্তু সবাইকে কি এত বোঝানো যায়? তারা বলে দিল ঠিক, কাঁচাপাকাকে।

পরদিন মহালয়া। মন ফুরফুরে। প্রতিবর্ত চলনেই অন্য-বাড়িটায় ঘুরে আসতে গেছি। সেই অক্সিমোরোনিক বাড়ি। এঁদো গলিতে স্বাধীনতার দ্বীপ। পিছনে রাগী গলা-'এদিকে কী মনে করে?'


বুক খাঁ খাঁ। খানিক তোতলানোর পর ঘর খুলে বসতে দিলেন অবশ্য। আতিশয্যহীন, পরিপাটি ঘর। দেওয়াল জুড়ে জ্ঞানের আকর।

-এবার বলো।

-কোথায় থাকেন,খোঁজ করতে করতে চলে এসেছিলাম।

-কৌতুহলের হেতু?

মুখ চাওয়াচাওয়ি করি৷

-আমাকে কী মনে হয় তোমাদের? কিম্ভূত? বিভীষিকা?

লাল হয়ে উঠি।

-না। মোটেও তা নয়। কিন্তু অন্যরকম।

-কেন বলো তো?

-এই যে আপনি একা থাকেন, কথা বলতে গেলে হারিয়ে যান, অন্য কোনো জগতে থাকেন, এই যে আপনি, ইয়ে,বিয়ে করেননি…


পরম দুঃসাহস দেখে, বিস্ময়ে তিনি কেশেই ফেললেন। কিন্তু আমাদের তো বোঝাতেই হবে ব্যাপারটা... শব্দ ফুরিয়ে আসছে…

-সব মিলে আপনি খুব আলাদা। এরকম আমরা দেখিনি তা নয়। এরকম পুরুষ হন। কিন্তু এরকম মহিলা, মানে...

আমাকে একটা পূর্ণেন্দু পত্রী দিয়েছিলেন। নবকে বুদ্ধদেব বসুর অনুবাদ। দুজনেই কবিতা পেলাম। কী আশ্চর্য! কবিতাও পড়েন! বই ফেরত দিতে বলেছিলেন বাড়ি এসেই।
******
পুজোর ঠিক মুখে জগদীশচন্দ্র সেই অমিত শব্দশূন্যতায় পৌঁছলেন। নদীর সব তারল্য যেখানে থির হয়েছে। দুই দিকে পর্বত৷ তার পাদদেশ থেকে ভৃগুদেশ পর্যন্ত উন্নত পর্ণমোচী। আমি কি কখনও, অমন একা, অমন ধবল অমল নিস্তব্ধতায় পৌঁছব? মেয়েরা পৌঁছয়? কাঁচাপাকা পারে হয়ত। আমি? নবরূপা?

আমরা বই ফেরত দিতে গেছিলাম।

-দিদিমণি, একটা কথা বলব?

-আপনি অনেকটা শিবের মতো। রুক্ষ্ম, উস্কোখুস্কো। আপনি কি সত্য খোঁজেন?

-হা হা হা হা হা!

-মেয়ে শিব হয় না, না? হয়?

তিনি থামেন। ভাবেন। মাথা নাড়েন।

-হয়৷ হয়। আমার মতো, কুৎসিত, বিশুষ্কা, কাকবাহিনী৷ দশমহাবিদ্যা জানো কি? সেই যে শিবকে সতী তাঁর দশ রূপ দেখালেন? সপ্তম রূপটি ধূমাবতীর। অকালবৃদ্ধা, বিধবাবেশী। কত মিল ভাবো? হা হা হা!

-উনি বুঝি সত্য সন্ধান করেন?

-বটেই তো! তান্ত্রিক মতে পুজো হয় ওঁর। কঠিন যোগাভ্যাসী দেবী।

-বিধবা কেন? শিব ওঁর স্বামী নন?

-খিদে পেয়েছিল৷ শিবকে খেয়ে ফেলেছিলেন শোনা যায়। হা হা হা!

আমরা চমকাই।

-কিছু তফাত থাকবে না হে? নতুন গল্প থাকবে না, লিঙ্গ ভেদে? জ্ঞানসন্ধানী মেয়ে স্বামীখাগী হবে না? এই যে আমি...খাই নি তো কাউকে, খেয়ে ফেলিনি… আমি জানি, কত গল্প তোমাদের আমাকে নিয়ে। নিশ্চয় কেউ ছিল, যে অকালে মরে গেছে...মানে তোমাদের কল্পনায় আমিও তো স্বামীখাগী...

-না না দিদিমণি, ওভাবে কেউ বলে না...আসলে জানে না তো কেউ, মানে হয়ত জানতে চায় কিন্তু জানতে পায় না বলে কল্পনা করে নেয়…

-হয়ত কেউ ছিল। বা কেউ কেউ ছিল। হয়ত তারা বেঁচেবর্তেই আছে। স্রেফ তাদের আর পছন্দ হয়নি। কিংবা নিজের সঙ্গে ঘর করা বেশি পছন্দ হয়েছে। এমনও তো হতে পারে। পারে না?

-পারে।

-মানুষ মানুষকে ভালোবাসে। মানুষের মানুষকে প্রয়োজন হয়। মনুষ্যস্নেহসিঞ্চন। নাহলে রুক্ষ্ম রাখ ওড়ে গা থেকে। কণ্ঠ নীল হয়ে যায় সত্যের বিষে। শিবেরও পার্বতীর স্তন্যদান লাগে। জানো তো? তাতে ক্ষতি নেই। কিন্তু যোগিনী ধূমাবতী স্নেহ, মায়া চাইলে, কে জানে সে ভাতারখাগী হয়ে যায় কিনা! সে শুধুই ভয়ঙ্কর। অসুরনাশে তার ধূমকে আহ্বান করা যায়। তবু সে পূজিত হয় শুধু তান্ত্রিকের দ্বারা, গৃহীর দ্বারা নয়। সে যে গেরস্তালি নয়। আমিও নই। তোমরা কি গেরস্তালি হবে? ভেবে দেখো। মনুষ্যস্নেহসিঞ্চন... সেও লাগে, দরকার পড়ে, মাঝে মাঝে।

আমাদের কান্না পায়। ধূমাবতীর ছোট ছাঁট ঘেঁটে দিতে ইচ্ছে করে।

*****
পঞ্চমীর দিন স্কুলে ছুটি পড়ে। সেদিন কুজ্ঝটিকা কেটে নন্দাদেবী ও ত্রিশূল গোচর হয়েছেন বলে জগদীশচন্দ্রের ভারি আনন্দ হয়েছে৷ কুয়াশা সরে যাওয়ার পর নন্দাদেবীর মাথায় তিনি জ্যোতি দেখতে পাচ্ছেন। সেই জ্যোতি থেকে নির্গত হচ্ছে ধূমরাশি। 'এই কি তবে মহাদেবের জটা?' বিজ্ঞানসাধক প্রশ্ন করছেন। আমি বিড়বিড়িয়ে নবকে বলি, 'না রে, ও ধূমাবতীর ধূম।'

আমরা একটা কাক-কালো ব্ল্যাকবোর্ডের সামনে দাঁড়ানো ধূমাবতীকে মনে মনে আদর করে দিই।