রুহের সেলাই (দীর্ঘ কবিতা)

কাজী নাসির মামুন

আমি কতদিন জীবন নামক পরিধির
প্রান্ত খুঁজে খুঁজে
শালিক বনের বাঁশপাতা
বিকল্প ভেবেছি।
বাঁশপাতা একটা সবুজ চাকু, সেই রঙে
আচ্ছন্ন বাতাস ঝির ঝির
কম্পনে জেগেছে।
বলেছে, জীবন্ত রেখা, তুমি
বৃত্তের ঘূর্ণনে বেঁচে থাকো। পরিধির সব বিন্দু
কেন্দ্রের নিজস্ব পাখি; ডানায় লালিত
কত মেঘ, ঝঞ্ঝা, বজ্রনিনাদ সফল
শ্রমের বিদ্যুতে জীবন রাঙায়।
রঙ খুঁজো, রঙে রঙে সয়লাব
আত্মার সকল ফুলে
ভ্রমর বসবে মধু নিতে।
ওটা মৃত্যু। ওকে গন্ধ দাও!
শুধু গন্ধ দাও!

সুগন্ধ বাড়ির দিকে
পৃথিবী একটা দু:খ। পরাক্রান্ত বেদনার
নিজস্ব বাগান।
কত পরিচর্যাময় নিষ্ফল হাতেই
ফুল নিয়ে কাড়াকাড়ি তবু।
ফেতনা-ফ্যাসাদ নিজে একটা আগুন।
কেউ খাঁটি হয়।
পুড়ে পুড়ে হয়ে যায় স্বর্ণসুমহান।
ছাই হয়ে ভেসে যায় কেউ।
আলোর বৈরীতে
একটা মানুষ দলা পাকিয়ে বসেছে।
যেন সে নিজেই অন্ধকার।
তার সেই গহন বিদ্যুতে
নিজেকে রোদের পাখি ভাবতে ভাবতে
সূর্যকে পেছনে ফেলে উড়ে যেতে থাকি।
কোনো কোনো দিন
পলায়ন মানে জীবনের দিকে দৌড়ের স্পন্দন।
হারানো মানেই সূর্যসারথিকে বুকে নিয়ে
নিজেকে অঙ্গার করে ফেলা।
একটা সুপোরি গাছ বহুদূর আকাশের পানে
ঊর্ধ্বমুখী ইচ্ছের বাতাস
বইয়ে দিয়েছে। ছুঁয়ে দেখবে নীলের প্রলোভন।
শুধু ডালপালাগুলো মাটির দিকেই প্রবঞ্চিত।
বৃহৎ পাখির ডানা নুয়ে পড়লে হঠাৎ
পড়ন্ত বিষাদ স্থির চিত্রে ধরে রাখলে যেমন হয়
সেরকম দেখছি পাতার উন্মুখতা।
জানালা ঘরের চোখ।
সেই চোখে পৃথিবীর দৃশ্যের নির্মাণে
লিপ্ত হতে ভালো লাগে।

জগতের সকল প্রলেপ মধুময়।
তাকে ঘিরে শৃগাল-চতুর সব ক্ষমতার নাম।
বৃক্ষের আদৃত লোকালয় মুছে দিয়ে
কেবল গড়তে চায় পরান্ন-প্রাসাদ।
বুকে যার পাতার লানত
নদীর বিপক্ষে তার উদ্ধত সংঘাত।
পাখির লাশের পাশে শুয়ে আছে পরাহত গান।
ব্যর্থ সুরারোপে
আমাদের মদের গেলাস
বিরূপ হাসির এক লাঞ্ছিত বিদ্রূপে
যত্রতত্র ফেলে গেছে অভিন্ন উদ্বেগ।
ইতিহাস বিবর্ণ পাতার দেশে নতুন অতীত।
পত্রস্থ সংগ্রামে চিরকাল বুকে নিয়ে
মৃত্যুর ধকল, শেষ হয় বিভেদের চারুপাঠ।
দেশ থেকে দেশান্তরে সুড়ঙ্গের বিরূপতা নিয়ে
মানুষ ছড়িয়ে দেয় নিজের বিকার।

আজ এই ব্যহত বেলায়
অনেক অভ্যস্ত পাখি, তুচ্ছ মশা
নগণ্য মাকড় আর চঞ্চল ব্যাঙের
নম্র গান ধেয়ে এলে শত শত
যেন কেউ, আরশমন্দ্রিত নীরবতা
প্রতুল মানুষগুলো ঠেলে দিয়ে ঘরের ভিতর
বিমুক্ত প্রাণের মেলা এনেছে আবার।
পাতা জেগে ওঠে; শত শত বৃক্ষশাখা
ফুলের আগুন জ্বেলে জানায় সংগ্রাম।
উদ্বুদ্ধ হাঁসের দল বহুদিন পর
প্রমোদ বঞ্চনাগুলো সাঁতারে সাঁতারে ভেঙে দেয়।
জলের সঞ্চার ভালোবেসে
সমুদ্র মন্থনে জেগে ওঠে ডলফিন।

সম্পর্ক মানেই
সাহচর্য নয়।
ওইযে ক্লেদাক্ত পশু- নিরীহ শূকর।
অস্পৃশ্য দেহের মূলে সঞ্চারিত অভিশাপ
মানুষ দিয়েছে তাকে; তবু
স্তূপীকৃত আবর্জনা
নিষ্পন্ন খাদ্যের নামে সে তো শুষে নেয়।
পৃথিবীতে নেমে আসে পরিচ্ছন্ন আবহ-নন্দন।
বিষধর সাপ
যদিও আতঙ্ক-দূত, জঙ্গলে জঙ্গলে
শ্বাপদের নিভৃত সঙ্কেত
নিজের ফণায় নিয়ে বলেছে, এসো না
এখানে বিশিষ্ট আমি। যোগ্য, প্রতিরক্ষা সহচর।
বাদুড় আপন হলে
কুঞ্জবনে মুখরিত কলার বাগান
শুশ্রূষায় পেকে যেতে পারে।
ভেঙো না বিনিদ্র সুখ রাতের পাখির।

প্রতিটি মৃত্যুই জিজ্ঞাসার
তুমুল জবাব; মগ্ন জীবনের উন্মুক্ত প্রচ্ছদ।
ক্ষমার আগুনে পুড়ে খাঁটি হয়
আমাদের সোনামুখ; ক্ষমার জলের
মধ্যে উবু হয়ে
গনগনে অহমের শীতল বিয়োগ।
তবে কি যথেষ্ঠ নয়
আকাশের নীল পাতা? প্রমোদ-বৃষ্টির জলভোর?
ফলের আশ্বাস ঝুলে থাকে।
নিঝুম পুকুরে দেখি
সবুজ শ্যাওলাবনে মাছেদের গ্রাম।
ক্রিং ক্রিং সাইকেলে একটা মানুষ
অনেক সমর্থবান সূর্যের আলোয়
পথের অন্তিমে, দূরে, বিন্দু বিন্দু ডুবে যায়।
ধুলো ওড়ে; গোধুলির লাল প্রেমে
মায়ায় জড়িয়ে আছে নীরব কৃষক।
তার চোখ পুঞ্জীভূত দুইটি কলম।
সন্ধ্যার সংযমে লিখে রাখে
চন্দ্রপোড়া রাতের বয়ান।
সময় একটা বাতিঘর;
শিখায় জমিয়ে রাখে গতির আগুন।
কালো গাভীটির সাথে মাসুম রাখাল
নিজের বাড়ির দিকে হেঁটে হেঁটে
মোম হয়ে গলে যেতে দেখি।
এখন চেতনবিন্দু, হে নশ্বর, কোথাও একটু
নড়ে ওঠো? দেখো, ভাব-শরতের কাশফুল?
বিজ্ঞান-পুষ্পের এক সুগন্ধ-লড়াই?
মানুষ তাহলে তীর?
ছিলায় জীবন্ত কারো ঘোর, শক্তি, সহজতা,
টান টান প্রেমের প্রহার?
ছুড়ে দেয়, আমরা পরম বিঁধে যাই?
কখনো প্রেমিক হই, ফিরে পাই জড়িয়ে ধরার
কাল, চুমু; স্পর্শের সংযত অভিধানে
কেবল পড়তে পারি রুহের সেলাই?

আল্লাহ সুরক্ষাদুর্গ, তবু
অহংবোধের এক প্রকাণ্ড গম্বুজ
মাথার ওপর জারি রেখে
আমরা বলছি মসজিদ।
প্রোথিত ইমান শুধু মসজিদে নেই।
মাটিবর্তী কেঁচোর শহর।
ওই কিলবিলে সত্য প্রাণ
উদিত প্রথার গুণে আনে না দূষণ।
উদভ্রান্ত পঙ্গপাল নিষ্ক্রান্ত আত্মার দিকে
হাঁসের খাবার হয়ে সুখী।
ঝিঁঝিঁ আর গোবর পোকার
আনন্দ ঘিরেই মৌন সকাল গৌরবে লালায়িত।
জুঁইফুলে ডুব-দেওয়া সামান্য সন্ধ্যায়
একটা কুকুর দেখি ঘেউ ঘেউ করে;
ঘেউ ঘেউ হলো কড়াঘাত; স্পন্দনের
বিভোর বাতাস মোনাজাতময় হলে
কেউ কেউ শোনে সেই নিষ্পন্ন আঘাত।
তখন দরজা খোলে, নিসর্গের সরব মিলাদ
বজ্রের আয়না ধরে গহীন ভিতর।
অতীব নিজের মুখ দেখতে দেখতে
যখন ভাবতে শিখি আমিও কুকুর
জলঘন হেদায়াত নেমে আসে চোখের পাতায়।

আমি বহুদিন বহু অতিক্রান্ত পাপের পাথরে
স্মৃতি ঠুকে ঠুকে কান্না খোদাই করেছি।
পাখির উদরে জমা নিঝুম দ্বীপের মধ্যে বসে বসে
পৃথিবীকে দেখেছি নির্দয় রক্ত ঢেলে
আগ্নেয় সূর্যের নিচে নিজেকে শুকায়।
বিদ্রূপে বিদ্রূপে সমাগত
উপার্জিত যন্ত্রণায়
মানুষ মূলত এক ঘুমন্ত উল্লাস।
শ্রেষ্ঠত্বের জলে খলবলে অহমিকা
অন্ধের লাঠিতে ভর করে
দেখে
অথবা দেখে না।
এই প্রাত্যহিক গুপ্ত জিঘাংসার দিনে
পরিণত জমায়েত নিষিদ্ধ হলেও
জেনে গেছি আমি
নিভৃত শেজদা হৃদয়ের কোলাহল।
আত্মার উড়ন্ত ঘরে আলো নিভে গেলে
নিখিল রৌদ্রের খেরো খাতা
হঠাৎ বিকিয়ে দেয় নিজের ঝিলিক।
গুমগুম অন্ধকার মনে মনে সমবেত হয়।
মানুষ শুনতে পায়, অথবা পায় না।
মৃত্যুর নৈ:শব্দ্যঘেরা
অনেক গভীরতর জীবাণু সংস্রবে
বারবার হাত ধোয়, যেন ধুয়ে ফেলে
সাবানের জলীয় ফেনায়
লাল খুনোখুনি, হীন অন্তর্লোক, বিনষ্ট জবান।
মনের গোপনে থাকা চোরাবালি, মায়াবি সম্পদ।
সাবান পানিতে আজ বণ্টনের সংক্ষুব্ধ জাকাত
ধুয়ে যেতে চায়, আহা, ধুয়ে যেতে চায়।
আমরা কি ঘরে ঘরে
বিচ্ছেদ মাখিয়ে রাখি? মেখে রাখি
চুপচাপ নিজের বিপদ?