কবিতাগুচ্ছ

পার্থজিৎ চন্দ

অশ্রুকণা
এ পাথর কেন যে পাথর, এ স্তন কেন স্তন ভাবতে ভাবতে জলদস্যুর অশ্রুকণার কথা মনে পড়ে। সে লোনাজলে অশ্রু ঝরায় অথবা বাধ্য হয়। তার অশ্রুসন্ধানে প্রবেশ করতে হয় দুর্গম খাঁড়ির মধ্যে। মার্বেল-পাহাড়ের কোলে সে সব খাঁড়ির শরীর লুকানো থাকে, চাঁদের আঠালো আলো গড়িয়ে গড়িয়ে পড়ে গা বেয়ে। তারপর একদিন দুপুরবেলায়, চারদিক অদ্ভুত শান্ত হয়ে এলে, হয়তো ঘুঘুর মতো কোনও এক পাখি ডেকেই চলেছে, সে অশ্রুপাতের শব্দ শোনা যায়। যে কোনও আদিম গানে অশ্রুপাতের শব্দই শেষতম কথা। শুধু সে সময় পাথরের স্তন অথবা স্তনের মতো নরম-ধারালো পাথরের বুক থেকে এক পাথরের মুনি জেগে ওঠে, খাঁড়ির ভেতর সব ঝড়ঝঞ্ঝার প্রশমন তার হাতে।শান্ত চরাচরে জলদস্যুর মুখোমুখি এক পাথরের আলো। প্রশমিত চরাচরে অশ্রুপাতের আদিম শব্দ শুধু, আর কিছু নেই


রাত
সন্ধে নেমেছে, যেন পাহাড়ি কুকুরের ভেজা রোম, কাঁপতে কাঁপতে ঢুকে পড়েছিল বারান্দায় ভারী পর্দা-ঝোলানো ঘরে। সমতল থেকে চোদ্দহাজার ফিট উচ্চতায় ফুসফুস বাতাস খুঁজছে, দস্তানা ও মদের গন্ধে এক ক্লান্ত পশুর দিন শেষ হল। শেষ হয়ে এল আমাদের সফরও, গুম্ফায় কুয়াশা-মাখানো মৃদু আলো গিরিখাদে গড়িয়ে নামছে মন্দ্রিত গম্ভীর ধ্বনি…দূরে হোটেলের ঘরে একটি-দুটি করে আলো নিভে আসে। আমিও একে একে আলোগুলি নেভাতে নেভাতে চলি, পাহাড়ের মাথা থেকে বরফের আলো মুছে দিই…ফগলাইটের তীব্র ঝলকানি গুম্ফার গেটে-ভেজা ভেপারল্যাম্পের সার মৃদু মৃদু জোনাকির মতো জ্বলে থাকা বাল্ব…সমতল থেকে চোদ্দহাজার ফিট উচ্চতায় সব আলো গিলে ফেলবার পর এক আলোকশূন্যতার রাত জেগে ওঠে। কোনও আলো নেই, অন্ধকার নেই…আছে এক মন্ত্রের ধ্বনি ও পাহাড়ের গা-বেয়ে নেমে যাওয়া ঘন্টার শব্দ


হত্যামঞ্জুরি
আমার কথা ভেবে ঘোড়ার শক্তি পাবে তার দুটো পা, কালবিলম্ব না-করে সকাল সকাল চলে আসবেই। ঝকঝকে রোদ, তার কাটা গালে একখানা প্রজাপতি বসে থেকে থেকে উড়ে চলে যাবে। ঝরাপাতার ভেতর দুপুরবাতাস ঢুকে গেলে বহুদূরে এক ঘুঘু ডেকে ওঠে। ঝরনার জল বয়ে আনতে আনতে আমিও বুঝব কেন নদীতীরে মানুষের বসবাস শুরু হয়েছিল। যে কোনও হত্যার আগে এক হত্যাগন্ধ হাওয়া বয়ে যায়, যেমন সারারাত যাত্রাপালার আগে সখীদের নাচ, মড়কের আগে বাঁশফুল। এই সানকিভরা জল আর সরাভর্তি মধু নিয়ে গেলে তার দীর্ঘ পথশ্রমের ক্লান্তি দূর হবে। সারাদিন ঘুরেফিরে তার অস্ত্রটিতে হাত বোলাতে বোলতে বুঝে যাব এ ভার বহন করা কী ভীষণ কষ্টের। তার কথা মতো গলা পেতে দেব, চিৎকার করব না একফোঁটা রক্তও মুছবো না ক্ষত থেকে। শুধু তাকিয়ে দেখব তার ক্রোধ তার ব্যর্থ অস্ত্রের ঝকঝকে ফলা। একটি লিনেট হয়ে সন্ধেবেলায় ডালে ডালে উড়ি, বুঝি, হত্যার থেকেও বেশি…সে শুধু চেয়েছে হত্যাকবুল হত্যাকবুল…হত্যামঞ্জু রি