অপরাহ্ণ সুসমিতো’র দুটো গল্প

অপরাহ্ণ সুসমিতো

১.

মাছের পেটে ডিম থাকে


মাছের পেটে ডিম থাকে। এই ডিমটুকুর জন্য আমার বাবা ও আমি ইলিশ মাছের ভক্ত হয়েছিলাম। বাজারে যাওয়া সবচেয়ে অপছন্দের কাজ হবার পরেও আমি বাবার কনে আঙ্গুল ধরে ছোটবেলায় বাজারে যেতাম। মাছের বাজার সবচেয়ে নোংরা, সকাশে মাছি আর চারপাশে মাছময় গন্ধ। আমাকে বলতেন কি মাছ খাবি?
পেট মোটা ইলিশ মাছ দেখিয়ে বলতাম ডিম খাব। বাবা বলতেন সবসময় ডিম খেতে হয় না। তাহলে মাছের বাচ্চা হবে কি করে?
কথাটায় ব্যাপক দর্শন আছে ভেবে ভেবে দুপুরে ভাত ঘুমের সময় ভাবতাম ইলিশ মাছ চাষ করছি। সারি সারি মাছ আর ডিম। ডিম আর মাছ।
বেলাল নামে আমাদের যে কাজের লোকটি ছিল সে লুকিয়ে বিড়ি খেতো। আমাকে বলত; আসেন ভাইজান বিড়ি খাই দুই ভাই। বেলাল নামে আমার আরেকজন ভাইয়ের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে দেখে মনের আনন্দে বিড়ি খেয়েছিলাম দুই একদিন।
বৃষ্টির দিনে বেলাল আমার সামনেই লুঙ্গিটা তুলে হিসু করতো আর বলত; ভাইজান বেশি বেশি খাবেন আর বেশি বেশি বড় করবেন। বড় না হইলে ব্যাটা মাইনষের দাম নাই। ইলিশের যেমন ডিম ছাড়া জেবন বৃথা..

আমাদের পাশের বাসায় দীপালী নামে একটা মেয়ে ছিল। পড়াশুনায় খারাপ। অংকে আরো খারাপ। মাঝে মাঝে অংক করিয়ে দিতাম। বেলাল আবার মন্ত্র দেয়; ও ভাই সুযোগ মতো একদিন জাপটে ধইরবেন। না ধইরলে ইলিশ মাছের পেটে ডিম হবি কেমনে?

আমার একটা মোরগ ছিল ছোটবেলায়। নাম রেখেছিলাম মন্টু। আমি মন্টুকে কোলে করে নিয়ে এ পাড়া ও পাড়া করতাম, মোরগ লড়াই করতাম। ক্ষত বিক্ষত মন্টুকে দেখে আমি কেঁদে ফেলতাম। রাতে ঘুমাতে যাবার আগে স্বপ্ন দেখি মন্টু আর আমি দুজন তুরস্ক চলে যাচ্ছি। কোথায় যেন পড়েছিলাম তুরস্কের লোকজন মোরগ লড়াই খুব পছন্দ করে। মন্টু সব জায়গায় চ্যাম্পিয়ন হচ্ছে, আমার গলায় সোনার মেডেল।

একদিন ভোরে ওস্তাদ বেলাল সাহেব মন্টু আর বাসার কিছু টাকা পয়সা নিয়ে নিখোঁজ।
ক্লাস সেভেনে উঠে মাথায় চাপল বিপ্লব করব। সিরাজ সিকদার হবো। ছদ্মনাম রাখলাম: আসাবিক অর্ফিয়াস অর্থাৎ আমি সারকারখানা স্কুলে বিপ্লব করব (আসাবিক)। লেলিহান করে মানুষের কথা লিখি। চুল বড় করতে শুরু করি, এক আধটা সিগারেট। ডাল রান্নার ঘুটনি দিয়ে মা একদিন আমাকে আচ্ছা মতো পেটাল, বিপ্লব আর লাল মলাটের লেলিহান পালাল পশ্চিমে।

ক্লাস এইটে ট্যালেন্টপুল বৃত্তি পেয়ে গেলাম কী করে যেন। বাসায় আমার দাম বেড়ে গেল হু হু করে। ইলিশ মাছের ডিম চাইলেই পাই। দীপালী আমার দিকে মিটিমিটি গদগদ হাসি নিয়ে তাকালেও দীপালীকে পাত্তা দেই না।

সাপ্তাহিক কিশোর বাংলায় একদিন একটা লেখা ছাপা হয়ে গেল আচানক আমার। আর পায় কে? সুপার স্টার আমি। বগলে কিশোর বাংলা নিয়ে ঘুরে বেড়াই। সুযোগ পেলেই সবাইকে নিজের নামটা দেখাই। আসাবিক অর্ফিয়াস থেকে তখন আমি রানা অর্ফিয়াস।

ঈদের এক সকালে আমার মোরগ লড়াইয়ের শত্রু, মার্বেল খেলার সাথী ও বন্ধু শেরশাহ খান মারা গেল। এই প্রথম চোখের সামনে এক মৃত্যু দেখি। হাহাকার করে ওঠে সমস্ত শ্রীহট্ট। শোকের তীব্রতা আমাকে মুড়ে দিল বিষণ্ণ দেরাজে।

আয়নায় নিজের ঈষৎ গোঁফ দেখে ভালো লাগে। বাইরের ব্যালকনিতে রৌদ্র ছায়ায় ঝুলে থাকা ব্রা লুকিয়ে দেখতে ভালো লাগে। কলাবেণী করে মেয়েরা স্কুলে যায় স্কুলের ইউনিফর্ম পরে, ভালো লাগে।

জানালা খুলে দেই। পাহাড় থেকে নেমে আসা বাতাসের ঘ্রাণে চারপাশ লাবণ্য ভালো লাগে। লুকিয়ে সিনে ম্যাগাজিন দেখি। এলায়িত রঙ্গীন নায়িকারা আমার চারপাশে দোল খেতে খেতে ঝরণার হাসির মতো ভেঙ্গে ভেঙ্গে পড়ে..

আমি বড় হতে শুরু করি। কবিতার রূপনারাণের কূলে আমি জেগে উঠি ...

*

২.

আমার হাতে হোক রাত্রি রচনা


দুপুর গনগন করে বিদায় দিয়ে দিতে হয়, রাখা যায় না... রাখার কিছু নাইও... ছবির মত জীবন না জীবন শুধু বিদায় দিয়ে দেয়ার। ভালোবাসি না এমন ভাণ করার। জড়িয়ে না ধরার। গায়ের গন্ধ না নেয়ার। বৈশাখের দুপুর খুব গনগন করতে জানে।

আর ওর তো মনে কোন প্রেম নাই! সত্যি কথা প্রেম নাই। অনেকটা সাধু সন্ন্যাসী টাইপ, ওর কোন শারীরিক অস্থিরতাও নাই, প্রায় ভগবানের মতো! এইজন্যে আমাদের সম্পর্ক খুব ভালো হয়ে যাচ্ছে দিন দিন। আমার অস্থিরতা কমছে কিন্তু মায়া বাড়ছে। আমার মনে হয় ও একটা রাজহাঁস, ওর লম্বা গলা, নরম পেট...

ওর পেটে চুমু করতে ইচ্ছা করে, কিন্তু পারি না। কিন্তু ওর এসব ইচ্ছা করে না। দিন দিন আমরা বন্ধু বন্ধু গোলাপ ফুল হচ্ছি। আমার মনে হয় ওরে ছাড়া আমি কী করে বাঁচব বাংলা সিনেমার মতো! আর ওর মনে হয়: আচ্ছা, ও থাকলে ভালো হতো, কিন্তু নাই তাতে আমার চলবে না তা না।

ওকে আমি বাবাই ডাকি। আমার স্বামী এবং আমার বাবাকেও ডাকি বাবাই।

সুবর্ণ (এতক্ষণ যার কথা বলিনি ) আমাকে চড়ুইপাখি ডাকে... তারপর বলে আল্লাদি। ডাকে ঘুড্ডি, সোনাও ডাকে...আরো যা মুখে আসে তাই। ডাকাডাকির কোনো গুগল নেই।

এইসব ডেকে ডেকে আমরা শৈশব ফেরাই। এই যে আপনাকে এতো সব লিখছি, বলছি..কেন কে জানে!

আমার স্বামী অস্ট্রেলিয়া যাবে এই জুনের ৬ তারিখ।

সুবর্ণের একটা বিয়ে দিতে পারলে খুব ভালো হতো। কিন্তু ও বিয়ে করবে না। কেন তা আমি জানি না। ওর মা বাবা অস্ট্রেলিয়া থাকে, বোন ও। ওর মা ফোন করে কাঁদে। বিয়ে করতে বলে সুবর্ণকে।

একা থাকতে চায় সুবর্ণ, তার প্রেম প্রত্যাশী কতো মেয়ে আছে, তাদের কাউকে বিয়ে করে ফেললেই পারে, করে না। এই মে মাসের ১২ তারিখ ওর ৩৩ শেষ হলো। আর ২ বছর। এর মধ্যে না করলে ধরে নিতে হবে বিয়ে নাই কপালে।

আজকে একটা মজার ব্যাপার শুনলাম, সুবর্ণের এ পর্যন্ত যত মেয়ের সাথে সম্পর্ক হয়েছে সবাই ওর চেয়ে বয়সে বড় এবং সবাই হয় বিবাহিত নয়তো অন্য কারো সাথে এনগেজড!

এইটা একটা গুরুত্বপূর্ণ পুরানো তথ্য। আমি বয়সে ছোট এবং কঞ্জুগাল লাইফ নিয়ে সুখী আর আমার সাথেই তার দ্রুততম সময়ে সম্পর্ক। এখন এমন আন্তরিক হইছে যে ও খুব কমফোর্ট ফিল করে আমার সাথে আর বলে যে আমি ওকে বুঝি। বলে ও আর আমি প্রায় এক‌ই রকম, অক্ষম বুদ্ধিমান... কিন্তু আমি একটু অস্থির এইটাই তফাত....

এই যে দেখেন আমার মোহন ভাই এবং তার বৌ...এক ফ্রেমে আটতেছে না তারা, দুজনের কী রকম সাইজ। হিহিহিহি.. মানুষরে সুখী দেখতে কী ভালো লাগে...!
এরকম সংসারী, প্রেমময় বৌ...

আপনারও একটা বৌ থাকুক...সংসারী প্রেমময়... থাকবে জানি...। কবে বিয়া করবেন বলেন তো? মানুষের সুখী হওয়াই দরকার। দরকার হইলে সুখ ডাউনলোড কইরা সুখী হওনের দরকার।
আপনার বিয়া হইলে অনেকেই খুশী হবে...আমি হব সবার থেকে বেশী... সত্যি কথা... আচ্ছা ২ বছর সময় দেয়া হলো। মনে থাকে যেনো!
আপনার জন্য তো গামলা বউ দরকার। গামলা বউরা ভালো হয়। নরম। হুমায়ূন আহমেদ মার্কা।
আপনিও তো নরম...। নাহ, ওইটা মায়ায় ভাবলাম আপনাকে নরম।

কিন্তু আপনি আসলেই নরম! যা অদ্ভুত! ওহ...মনে পড়ে যাচ্ছে আদর আমার সোনা টা...নরম সবকিছু লুকায়া রাখে...কেউ জানে না! আমি জানি শুধু...আমার গায়ে লেগে আছে নরম টা...আমার রাজহাঁস টা! চুমু সব নরমে...কষ্ট দিয়েন না, না খাওয়াইয়া রাইখেন না নিজেরে আর কাজ শেষ হলে কোলে আসবেন...চুপচাপ ঘাড় গুঁজে কোলে আসবেন...কোন বিষাদের কথা না...আঙুল বুলায়া বিষাদে বিষাদে কাটাকাটি খেলব অনেক আদর জমা করে রাখছি...।

এই শহরে সব আছে। ঘুষ আছে, চাপাতির কোপ আছে, বজ্রপাতে মানুষের মরণ আছে। বুয়েটে সহপাঠী সহপাঠীকে ফেসবুকে লেখার কারণে পিটিয়ে মারা আছে। শুধু আদর নাই। আমার রাজহাঁসটা না খায়া রোদে রোদে একা ছোটে, আমার ভালো লাগে নাকি?

এই যে আল্লাদি কনভারশেসন আমিই সব বলি, ও বলে না, তাতে ওর নিষ্কাম কর্মের থিয়োরিতে ভাটা পড়বে বোধয়! বেশি আল্লাদ করে ফেলছি আজ।

****
ধুস শালার নিস্কাম ভালোমানুষের জীবন। মনে হচ্ছে ভালো মানুষ হইলে পুণ্য। কেউ যেন তার পুরস্কার নিয়া খাড়াইয়া আছে..

আজ যাই?