পিশাচদিন

আহমেদ খান হীরক

অফিসে গিয়া শুনি আর চাকরি নাই।

শুধু আমার নাই এইটা জানলে বেশি দুঃখ হইত; কিন্তু যখন শুনি আমার সাথে আরো একুশ জনেরও নাই তখন কষ্ট কম হয়। এই কষ্টের মধ্যে একটা সুখও হয় এই খবর পাইয়া যে মনতাজেরও চাকরি গেছে গা! আমার হাসি চইলা আসে—হালায় এবার ঠেলা বুঝব!

কিন্তু রাস্তার চিপায় সিগারেট খাইতে খাইতে মনে হয় ঠেলা তো শালা আমিও কম বুঝব না! তিন মাস থেইকা এরা কোনো বেতন দেয় না। এই দিবো ওই দিবো কইয়া এখন তো মাথায় গুলি কইরাই দিলো… আর কি বেতন দিবো এরা?

মনতাজ খুব গরম এইগুলা নিয়া অবশ্য। বলে, বেতন যদি না দেয় তো আন্দোলন করব!
এই কথায় একুশ জন একুশ রকম মুখ করে। আমার মুখ এর মধ্যে কেমন হয় বুঝতে পারি না। অথচ মনতাজ আমারই হাত ধইরা বলে, ভাই, পারুম না করতে আন্দোলন?

আন্দোলন নামে একটা সিনেমা ছিল মান্নার। ওই সময় মান্না খুব চিল্লাইত সিনেমায়। ওই সিনেমার কথা আমার মনে পইড়া যায়। আন্দোলন আমার জীবনে ওইটুকুই। মান্নার চিল্লানি। আমি মাথা নাড়ায়া বলি, অবশ্যই পারবা… তুমার তো বেশি কইরা আন্দোলন করা লাগব। ঢাকা শহরে এত বড় ফ্যামিলি তুমার!

মনতাজ সবার দিকে তাকায়। অন্যরাও মনতাজের দিকেই তাকায়ে আছে। তারপর ওদের ভিতর ভিতর কী জানি কথার মতো হয় কোনো আওয়াজ না কইরাই! আর একটু পর দেখি ওরা মিছিলের মতন খাড়া! মনতাজ বড় চিল্লাইতেছে… বেতন দেও বেতন দেও… বেতন নাইলে জান নেও…

ওরে আমার মান্নার মতন মনে হয়। আমি আরেকটা সিগারেট ধরাই। ধরানোর পর অপরাধের মতন লাগে। আর তো চাকরি নাই। সিগারেট খাওয়া বোধহয় আর যাইত না!

পুরা সকালটা মনতাজেরা খুব জোরপাড় করে। দুপুরের দিকে মিঠু ভাই ফোন দেয় আমারে—কী করতেছ তোমরা এইগুলা?

’আমি তো কিছু করতাছি না ভাই!’

’তুমি করতেছ না মানে? মনতাজ এত সাহস পায় কোত্থেইকা?’

’মনতাজের বাপ বোধহয় মুক্তিযোদ্ধা ছিল। রুটি সিনেমায় মান্নার বাপও মুক্তিযোদ্ধা ছিল… কিন্তু তা সত্বেও তারা ক্যান ভাত পায় না… এই রকম প্রশ্ন করছিল মান্না!’

’কোন মান্না?’

’মান্না ভাই। চিত্রনায়ক। অর ম্যালা হিট সিনেমা আছে। অর আম্মাজান গানটা মনে নাই ভাই?... আম্মাজান আম্মাজান আপনি বড়ই মেহেরবান… আম্মাজান…’

’তুমি এক্ষুনি আমার ঘরে আসো…’

’জি ভাই।’

জি ভাই বললেও আমি আর যাই না মিঠু ভাইয়ের ঘরে। ইচ্ছা কইরাই যাই না। চাকরিই নাই, তার আবার যাওয়া! আরো একটা সিগারেট খাই। খাইতে খাইতে ভাবি যে এইগুলা আর খাওয়া যাইব না। এইসব আলগা খরচ শেষ কইরা ফেলতে হবে। এইগুলা ভাবতে ভালো লাগে না, কিন্তু না ভাইবাও থাকা যায় না। বাথরুমে গিয়া অনেকক্ষণ বইসা থাকি। নিজের ডেস্ককে আর নিজের ডেস্ক মনে হয় না। এর মধ্যেই ইমেইলে নোটিশ আসে—কাল থেইকা আর আসোন লাগব না! সাথে আমাদের সবাইরে অনেক থ্যাংকস জানাইছে ওরা যে আমরা অনেক হেল্পফুল ছিলাম আর আরো সব কী কী যে ছিলাম ইংরেজিতে বলছে… আমার পড়তে ভালোই লাগে যে আমাদের তাও ইংরেজি বলার মতো অনেকগুলা কথা অদের আছে।

বিকালে ক্যান্টিনে যাই। এক কাপ চা খাই। পয়সা দিই না। বলি যে কাইল দিবো! এইটা বইলা হাসিও। ক্যান্টিনঅলা হাসে না। বেটায় বোধহয় জানে আমার আর চাকরি নাই। তাও কিছু বলে না। হয়তো ভাবতেছে আপদ বিদায় হইলেই ভালো। এর মধ্যে আবার আম্মা ফোন দেয়। কেমন কী আছি জানতে চায়। আমিও গৎবাঁধা উত্তর দিই। সব কিছু ভালো আছে কই। আম্মা বলে যে অনেক দিন তো গ্রামে যাই না, এইবার যেন যাই! আমি বাড়ির পিছনের মৌচাকটার খোঁজ নিই। আম্মা জানায় ওই মৌচাকে এখন শুকনা মোম আছে কিছু… বাকি আর কিছুই নাই!

ক্যান্টিন থেইকা বাইর হইয়া দেখি আন্দোলন তেমন আর নাই। মানে অরা সবাই আছে, কিন্তু কোনো জোর আর নাই। অবশ্য সবাই নাই। মনতাজ নাই। মনতাজরে দেখা যায় মিঠু ভাইয়ের সাথে সিঁড়ি বাইয়া নামে… সে নামে, কিন্তু আমার মনে হয় যে সে আসলে উইঠা যাইতেছে… সিঁড়ি কী আশ্চর্য জিনিস একটা… এইটা দিয়া নামাও যেমন যায়, তেমনি তো ওঠাও যায়!

মিঠু ভাইয়ের গাড়ি বাইর হইয়া গেছে। গাড়ির ভিতর ঢুকতে ঢুকতে মিঠু ভাই হাত ইশারায় একবার ডাকে। আমি অলস পায়ে আগায়া যাই। এর মধ্যেই গাড়ি স্টার্ট নিলে মিঠু ভাই আর কিছু না বইলাই চইলা যায়। গাড়ি যেখানে খাড়ায়া ছিল ওইখানে আমি অনেকক্ষণ থাকি। কেন থাকি কে জানে… অবশ্য আমার যাওয়ার তেমন কোনো জায়গাও তো নাই!

তখন পিছন থেইকা মনতাজ আইসা দাঁড়ায়। মৃদু তার আসা। কিন্তু আসার ভিতর কেমন একটা ক্ষমতাও যেন আছে। বলে, আগে যাইতে হইত ভাই। গেলে চাকরিটা থাকত!

আমি বলি, তোমার থাকছে?

মনতাজ হাসে। আমি অন্য মুখগুলার দিকে তাকাই। মুখগুলা মনতাজের দিকে তাকায়া আছে; কিন্তু মনতাজ আর সেই দিকে তাকাইতে পারতেছে না!

আমারে বিড়বিড় করে মনতাজ বলে, চিন্তা কইরেন না। আপনার যা হিসাব নিকাশ আছে ওইটা আমি দেখব। কয়েকটা দিন যাক, সব ঠাণ্ডা হউক। আপনার বিল আপনি পায়া যাবেন!

ফিক কইরা হাসি চইলা আসে আমার। শালার কণ্ঠ মিঠু ভাইয়ের মতন হইয়া গেছে গা!

রাইতের দিকে বুঝতে পারি যে খিদা লাগছে। খিদা আসলে ম্যালা দিন থেইকাই লাগছে এই রকম মনে হয়। আমি খুঁইজা পাইতা একটা লাইনে খাড়াই। কিছু দিন থেইকা এইখানে নিয়ম কইরা লাইন হয়। ৪০টা খানা আসলে ৪০০ লোক খাড়ায়। লাইনে তাই আগে আগে না দাঁড়াইলে কপালে খাওন থাকে না! আমরা ঠেলাঠেলি করি খানিকক্ষণ। এরই মধ্যে খানার লরি ঢোকে। লরির ভেতরে প্যাকেট। প্যাকেটগুলা কুমিরের দাঁতের মতন সাদা।

ঠেলাঠেলি আরো বাড়ে। আমারে একজন ধাক্কা দেয়। বদলায় আমি দুইজনরে ধাক্কা দিয়া ফালায় দিই। একটা সময় খুব ভয় হয় যে প্যাকেট বোধহয় পামুই না। খিদার চাইতেও ব্যাপারটা জয়-পরাজয়ের ইস্যু হইয়া দাঁড়ায়। আমার সামনের জনকে মুচড়ায়ে ফেলি। আর ওই ফেলার মধ্যেই একটা প্যাকেট আমার হাতে ঠেকে। মিঠু ভাই মনতাজ সবার কথাই তখন ভুইলা যাই। প্যাকেটটা নিয়া ছুইটা যাই দূরে… কুকুর যেমন মাংস নিয়া ছোটে…

ফুটপাতে বইসা খাওয়ার অভ্যাস আমার তো নাই। তাই একটা ভাঙা বেঞ্চে গিয়া বসি গলির চিপায়। প্যাকেট খুইলা দেখি আলু ডিমের ঝোল আর ভাত। রাস্তার বেকায়দার আলোর জন্য ঝোলগুলারে কেমন রক্তের মতন লাগে। মনে হয় রক্ত মাখায়া মাখায়া আমি ভাত খাইতেছি। রক্ত মাখায়া মাখায়া আমি আমারে খাইতেছি।

রক্তের যে এত টেস… সেইটা কে জানত!