না হওয়া কথারা মেঘ ক’রে আসে

শুভ্র সরকার


না হওয়া বৃষ্টির পাশে বসে আছে মেয়েটি। তার পরে থাকা পুরনো স্যান্ডেলের প্রায় উঠে যাওয়া রঙের মতো আকাশ অংশত মেঘলা থাকবে আজ। আর মেঘের ঠিক থুতনির নিচে আশ্চর্য তিলের আশঙ্কায় মেয়েটি বসে আছে বিঁধে যাওয়া মাছের ভারে, অল্প বেঁকে যাওয়া বঁড়শির কায়দায়। লক্ষ্মীর তলে, চায়ের কাপে চিনি গুলে দেয়ার ব্যস্ততায়, হাত মুছে ফেলে রাখা গামছার, অপমানে লাল হয়ে আছে মুখ। নীলবেঞ্চে সবেমাত্র এসে বসা বোরন কাকুর, নাটকের স্ক্রিপ্ট থেকে মুখ তুলে, আবার মুখ নামিয়ে নেয়ার মধ্যবর্তী ফাঁকে, আড্ডায় আজ দেরী করে আসা জীবনানন্দকে আবারও নিঃসঙ্গ রেখে, সবাই পিঠ চাপড়ে দিচ্ছে লেনিনের। মেয়েটিকে ওরজজই আড্ডার না দেখার সবরকম প্রস্তুতি নিয়ে প্রথম দেখেছিলাম। ডেকচির ফুটতে থাকা দুধের দিকে তখন, করুণ চোখে তাকিয়ে থাকা অপরিচিতার আঁটোসাঁটো ব্লাউজের ভিতর, নীলডাউন দিয়ে থাকা স্তনের পাশে, কান পেতে থাকা উটকো লোকটার দাঁতের ফাঁকে পড়ে অসহায় আলু, কতটা সিঙারার আর কতটা দাঁতের, তাই নিয়ে হয়তো কথা বলছিলাম আমি আর রওশন। আবার এমন হতে পারে, কোন কথাই হচ্ছিল না আমাদের মধ্যে, হয়তো চায়ের কাপে ফুঁ দেয়ার মনোযোগে খেয়াল হয়নি, সামান্য পেছন আমাদের সমস্ত সামনেটা অন্য কারও পাশে বসে আছে। মেয়েটি বসে আছে খারই ভর্তি তিতপুঁটির মনে, বিলের জলে দৌঁড়ে আসা কোনও কিশোরীর চুলের লাল ফিতায়, মাঠ ফেরত কৃষকের গোসল শেষে বেড়ে দেয়া ভাতের গরমে, মায়ের খালি পা— জলে খেয়ে যাওয়া আঙুলের ফাঁকে মেয়েটি বসে থাকে।


শুকিয়ে যাওয়া ক্ষতোর চারপাশে, যেভাবে টান ধরে চামড়ায়, আমি চাই কেউ অমন প্রবলভাবে আমাকে টানুক, তার দিকে। রোদ পড়ে গেলে বিকেলও ভাঙা ফুলদানি। কেউ ঝাড়ু দিয়ে তাকে সন্ধ্যার দিকে ঠেলে দেয়। এমন সামান্য সন্ধ্যায় ডানদিকে কাঁত হয়ে ঘুমিয়ে থাকেন আশরাফ চাচা। গলির মুখে তার খাবার হোটেল। বিছানায় তার প্রায় গড়িয়ে যাওয়া ভুঁড়িটা নিঃশ্বাসের সাথে অল্প কেঁপে ওঠা দোকানের পর্দার মতো। এ সমস্ত সরিয়ে রোজ দুটো জিলেপি কিনে ফিরে আসি আমি। ফেরার পথে নিজেকে গলির খাদ্যনালী মনে হয়। দুটো জিলেপি নিয়ে পাকস্থলীর দিকে হেঁটে চলেছি। গলির মুখে দাঁড়িয়ে আমি প্রায়ই ভাবি— গলিরও কি মন আছে! এই যে গলির চিন্তাগুলো দেখতে পাই দেয়ালে দেয়ালে, লাল কালিতে, লাগানো পোস্টারে— কিন্তু মন পাই না। জানলা দিয়ে বাড়ির ভিতর যতদূর দেখা যায়, আমি অতটুকু চিনি। কাউকে চিনি না— এমন বললে বারন্দায় গ্রিলের উপর দিয়ে হেঁটে যাওয়া পিঁপড়েরা পরিচিতার মতো তাকিয়ে হাসে। অথচ বাবার মৃতদেহের পাশে বসে থাকা পুত্রের ভাত খেতে উঠে যাওয়ার অধিকার না মেনে, বইবাড়িতে সেদিন মেয়েটির পাশে আমিও বসেছিলাম। ওই বসা অব্দি— কোনও কথা হয়নি আমাদের মধ্যে, স্নান শেষে মায়ের চুল আঁচড়ানোর পাশে কাঁত হয়ে চুপচাপ তাকিয় থাকা হাঁসমার্কা নারিকেল তেলের কৌটোটির সাথে চিরুনির যেমন কোন কথা হয়নি, অমন। হয়তো তাকিয়েছি চোখে এড়িয়ে। এই চোখে এড়িয়ে যাওয়া, অনেকটা বৃষ্টির মধ্যে ভিজে যাওয়া নিয়ে দুশ্চিন্তায় মেঘেদের বিশম খাওয়া। আর ব্যস্ত হয়ে তার পিঠে অনবরত হাত বুলিয়ে দে’য়া শাঁ শাঁ বাতাসের অন্যহাতে এগিয়ে দেয়া জলের ভিতর ভিজে একশা আমি বাজারের ব্যাগ হাতে কোনদিন জিততে পারিনি। রাস্তায় পাশ দিয়ে অসাবধানে পেরিয়ে যাওয়া কোন না চেনা মেয়ের না দেখা মুখ চিন্তা করে, তার থেকেও বেশি অসাবধানে হেসে ফেলা আমি, নিজের পেছনে নিজেই ব্যোমকেশ বক্সী। আমাকে নিজে বললেও বিশ্বাস করব না— নামাজ পড়তে না পারা, ধর্মপ্রাণ বয়স্ক মানুষটার চোখে মুখে লেগে থাকা সমস্ত অনুশোচনা নিয়েও, একদিন মেয়েটির দিকে তাকাবো আমি।