গুচ্ছ কবিতা : ভাঙা আয়নার পরি

দীপকরঞ্জন ভট্টাচার্য

বাগান
মুমলের কোনো খোঁজ মেলেনি। কবন্ধ পুতুলের দেহ মর্নিং ইশকুলের গেটে রেখে গেছে কেউ। নৈঃশব্দ্য এলোমেলো করা ঝড় বাগানে টহল দেয়! শহরের হাড়ের পাহাড় সাদাটে ঘুণপাউডার বাতাসে ছড়াচ্ছে। রামপুরিয়া চাকু তৈরির কারখানা থেকে হঠাৎ দু'কলি পান্নালাল। মঙ্গলাহাটের অস্থায়ী গুমটিতে রঙচঙে ভাঁড়ের মুখোশ। গুচ্ছবেলুন স্বপ্নের ভূমি পার হয়ে বৃষ্টিরেণু মাখে। প্রতিটি ফুলের আত্মায় মৃন্ময়ী নীরবতা

পথনাটক
ভালোবাসায় জড়িত যারা তৃতীয়বারের জন্য গর্ভবতী হল। জামরঙের মণি নিয়ে তাদের ছেলেপুলেরা খুঁড়ে তুলছে রাঙাআলুর কন্দ। দ্বীপ পার হতেই হাত পা ছড়িয়ে খেতে-পরতে পাওয়া মানুষের বসতি। কবেকার চিঠিপত্রে আতর ছড়িয়ে যায় ডাকবাক্সপ্রিয় অজানা যুবতী। ডেনড্রাইটের নেশাধরানো গন্ধে ঢাউস পাইপগুলো থেকে কৌশলী বিড়ালের মতো গা ফুলিয়ে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ল খড়খড়ে পথশিশুরা। ডানা দুটি মেলে চায়ের দোকানের চালে একনিষ্ঠ বসে আছেন শ্রীমান পথনাটক

মেয়েটি
মেয়েটি অন্ধকার থেকে উঠে আসার কথাই ভাবে। হাতে তার বিষাদের নীল রিবন। বালিঘড়ি থেকে ঝিরিঝিরি বালি তার হারানো মা-কে এবার ছুঁয়ে দেবে। বীজতলা আর গাভী-বিয়োনো গোহালের গন্ধে এক মুহূর্তে মাতাল চরাচর। চাকভাঙা মৌমাছির মতো গাড়িগুলো আজ রাস্তা থেকে উধাও! রাতবিরেতের ফুটপাথ ছেড়ে ঝুপড়িতে ফিরতে কেবলি সে অবশ হয়ে যায়। হাঙরের ধারালো দাঁতের চাপে আঁচল থেকে তার কয়েকটা পাঁজর খসে পড়ল

অতিথি
একেবারে সেই লোকটার মতো! পিছন থেকে সে আজ জড়িয়ে ধরেছে। তার নিশ্বাসে আমার কণ্ঠার ত্বকে জমাট বরফ। যেন সে-ই লোকটাই! স্কুবা ড্রাইভারের পোশাকে কালো ঝরনায় সাঁতার কাটছে সে। দুধের বোতলের টুংটাং রাস্তায় ফেলে মাদার ডেয়ারির গাড়ি গ্রিলের রেলিং ঝাঁকিয়ে পালায়। আলোর সুইচগুলোও আজ নেভানো। জলবসন্তের দিনের মশারির মতো রাত। মূক বাতাস সহস্র চিরে দিয়ে এফএম-এর তরল শব্দ হঠাৎ ককিয়ে ওঠে

ঘটনাটা
ভোমরার একঘেয়ে গুনগুন নিয়ে লোকগুলো এগিয়ে আসছে। তাদের সেইসব গলিত শব্দের বোঁটায় কোথাও এক কণা মনুষ্যস্মৃতি। ধুলোঝড়ে বেহুঁশ ধোপদুরস্ত বাড়িগুলো। রোদের ছড়ানো কাচে লোকগুলোর বেতাল চলন। পয়গম্বরের মতো তাকিয়ে ঘটনাটা দেখে এলাকার সবাই। গোলাপ জলে কেউ পা ধুইয়ে দাও ওদের -- একটি মেয়ে চিৎকার করে উঠল ভিড় থেকে। দ্বীপের বাতাস মৃত পায়রার মতো নিস্পৃহ

প্রেক্ষাগৃহ
জানা কথাই, এটি প্রেক্ষাগৃহ ছাড়া কিছু নয়। সাজঘরে সবার জন্যেই ছোট্ট একটি খুপরি। আয়োডিনে ভেজানো হরেকরকম পোশাক ঝোলানো খুঁটে। একটি অজানা লোক সারাদিন ডান হাত আকাশের দিকে তুলে নীলদর্পণ মকশো করে, মাঝেমধ্যে কখনো বা লাফিয়ে উঠে বনের কিনারে চলে যায়। নিরীশ্বর হত্যাদৃশ্যগুলো আড়ালেই রাখা দস্তুর। এখানে ড্রপসিন ফেলে সময়ে সময়ে তুমি ভেঙে দিতে পারো ড্রাগনের লাল-সোনালি মুখ

সৎকার
সাহসী কফিনগুলো এবার এগিয়ে আসে। ঘুমন্ত নগরী আরও কত দূর? একাকী একটি মানুষ লোকালয়ের বাড়িগুলির দিকে অনন্তকাল চেয়ে আছে। ভালোবাসা মৃত্তিকার মতো। বুড়িমার গল্পের তুলো জানালা দিয়ে আকাশে উড়ে যায়। ফুটপাতে শোয়ানো অতিনাটকীয় মৃতদেহটি সৎকারের অপেক্ষায় অসীম ধৈর্যবান। ধর্মযুদ্ধ শেষে সাহসী যুবকেরা আবার ঘরে ফিরে যাবে

কবর
অজ্ঞাত সময়ের দ্বার খুলেছে। কবরের ভিতরে পাশ ফিরে শুলেন আইজেনআওয়ার। গ্যাসচেম্বারের উৎকট গন্ধে হঠাৎ ঘুম ভেঙে যায় তার। পা দুটি কি বেঁধে রেখেছে কেউ! বুলেটের গভীর শব্দের অন্তঃপুরে জোয়াল মুখে ছুটছে বান্দারা। নারী ও শিশুদের কুঞ্চিত কেশদাম, অলঙ্কার ও সুদৃশ্য পোশাকের পাহাড়ে পা জড়িয়ে গেল তার। বোমায় সদ্যমৃত তিন বছরের শিশুটি দূরে ভগবানের কাছে রক্তসরোবরের গল্প শোনায়

তীর্থ
তীব্র আগুনে খাণ্ডববন অনাথের মতো পুড়ছে। দীর্ঘ পনেরো দিন অতিক্রান্ত। তুমি এবং আমি আমাদের ঝলসানো মৃতদেহসহ অবশেষে মুখোমুখি। বৃষ্টি নাই, সত্র নাই, দুঃখমাত্র নাই। চারটি ভিতু প্রাণী জীবনভিক্ষা চেয়ে বেঁচে গেছে এ'যাত্রা। বিবিধ অস্ত্রের দগ্ধাবশেষে লাশগুলির সারা শরীর অলংকৃত। অজীর্ণভাব দূর হতে অগ্নিদেবের কাঞ্চনবর্ণ মুখমণ্ডলে হত্যাপিপাশা মুছে আসে। মনের মতো দ্রুত মায়ারথে যমুনার তীর্থ অভিমুখে চলেছেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এবং সখা অর্জুন

ভাঙা আয়নার পরি
ভাঙা আয়নার পরিদের দিকে কখনো তাকাতে নেই। পরনে তাদের কালো অর্কিডের ঝালর দেওয়া পোশাক। রেবা নদীর তীরে হোগলা পাতার কুটিরে তাদের দুঃখের বনবাস। টুকরি মাথায় সারাটা দিন সর্ষেখেতে মজুর খাটে তারা, আর নীলফামারির হাট থেকে সপ্তাশেষে চাল ডাল তেল আর নুন কিনে আনে। কাঁচা কাঠের আঁচে তাদের সন্ধেগুলো ভিজে যায়। শুধু জোছনারাতে নদীতে নামে যখন, তাদের রুপোলি ডানাদুটো স্পষ্ট নেচে ওঠে