অসাড়লিপি ১৯

শুভ্র বন্দ্যোপাধ্যায়

কলকাতা ও তৎসংলগ্ন সমস্ত মফস্বল
যখন শেষ হয়ে আসে বিকেল, একটা আবছায়া গিলে নিতে শুরু করে আমাদের সমস্ত পরিকল্পনা, আঙুলের সামান্য চাপেই খুলে আসে সমস্ত বইয়ের আলমারির দরজা – আর কিছু বাকি নেই >> অব্যবহারের ছাপ প্রতিটা অক্ষরে, গুঁড়ো হয়ে আসছে তার খয়েরি – ভঙুরতা হাতে তুলে নেবার সময় টের পাই আমার ভাষা ও তার পুরনো গরদ-স্পন্দন – আগামী দেড়শো বছরে সে শুধু কথ্য হয়ে বেঁচে থাকবে
আচমকা পানকৌড়ির আধো-ডুব >> একটা মুণ্ডছিন্ন ম্লানোজ্জ্বল পাখি

স্পষ্ট আকাশ ও এই জন্মশহর
চাপা কথার মত নিঃশ্বাস ও পুরনো বন্ধু
বিরাট একটা সেতু বিকেলের মধ্যে আমরা
হাওয়া ও ধুলোর জমাট বিনুনির মধ্যে লক্ষ্য করছি
কীভাবে স্মৃতি খুবলে নিয়ে যায় আপাত পরিচিতির মাংস
যেভাবে আদ্যিকাল থেকে আমরা অলীকের
থেঁতলানো মাথার মধ্যে
পাক খেয়েছি ছটফটে বাংলার মানচিত্র

সিঁড়ি ভাঙার কথা লিখি
ওঠানামার পাঁজরে যতটা রক্ত আসে
ততটাই বেঁচে থাকা
হালকা আঁচড়ে ফুটিয়ে তুলতে চাই এই জন্মশহরের রক্ত-দাগ
তার কুটিল বিষয়ী লোকের জমি জিরেতের হিসেব

আমি বলেছি আঘাত (বিশেষত আচমকা শহর ও ভাষার পরিবর্তন)
আমাদের সঙ্গীত থেকে দূরে পাঠিয়ে দেয়
শ্রবণ বস্তুত ধুলো বধির একধরণের অক্ষরবিন্যাস
চোখ শুধু দেখে চলে স্বর ও লিপি
পাঠোদ্ধার একধরণের চেষ্টা
যা আমাদের এই বসবাসে সম্ভব কিনা ভাবি

এরপর চোখ বুজে থাকব আমি
নিজেরই হাতের মধ্যে সেঁধিয়ে যাব
কেউ এলে পাঠিয়ে দেবে খাদ্য সন্ধানে
স্পষ্ট বোঝা যাবে বন্ধুরা হারিয়ে যাচ্ছে
সাদা অক্ষরের দাপটে
কেউ বা অলৌকিকে বিশ্বাস রাখছে
যে বারান্দায় কুড়ি বছর আগে
বিকেল মানে ছিল চিঠির অপেক্ষা
সেখানে একধরণের ফাঁকা আবেগের বাসা
আমার বমি পাওয়া ও ফিরে আসতে চাওয়া বারবার

আর ঠিক এইখানে যখন চারপাশ দেখে
মাথার চুল ছিঁড়তে ইচ্ছে করে
কিস্যু ঠিক চলছে না
বাড়ি বলেও কিছু নেই
এমনকি রাস্তা বলেও কিছু নেই
এক দীর্ঘ মানচিত্র
বিমান-উচ্চতা থেকে দেখা যাচ্ছে
গোটা এলাকা শূন্য, মাটি ধুলো – সাদা একটা বিরাট
অক্ষরশূন্য বই

যেমন আমি জানতে পারব না কেন আদি গঙ্গার নাম
কেন নদী বেঁকে যায়? কবেই বা যায়?
পুরনো বসতি, গ্রাম, শ্মশান ও বন্দর থেকে যায়
পুরনো ডায়রি মৃত মানুষ ও তার অক্ষর
তারিখগুলো বিঁধে আছে পুরনো জং ধরা পিন

আর এখানেই আমি ফেলে দিই সামাজিক ভূমিকা
আসলে নির্ভরতা বলে কিছু হয় না
একটা কুয়াশার ডিসেম্বর এই দক্ষিণ-বাংলা
আমি পুরনো চিঠি খোলার মত গাড়ল ধারণায়
ছুটে গেছি নোনতা গন্ধ বরাবর

বাবার ডায়রি খুলে আবিষ্কার করে নিচ্ছি অনাসক্তি
বড় কোনও আদর্শ নয় ছোট সাংসারিকতা
খেয়ে নেয় বিত্তের যাবতীয় মধ্য-পথ
টের পাচ্ছি মাংস ও আদার ঝাঁঝে পল্লবিত রবিবারে
কোথাও অন্য একটা চোখ জ্বালা ছিল
জানলা বন্ধ অথচ তেরছা একটা আলো এসে পড়ছে
রেকর্ড প্লেয়ার পুরনো বাংলা গান
অথচ আমি কাঙ্ক্ষিত সুর শুনতে পাচ্ছি না

পাতা খুলেছো আর তোমার সামনে বড় হয়ে উঠেছে মুখ
বিরাট হয়ে উঠেছে
জল খাল নদী বিল দীঘি পুকুর
নানা শব্দের জলাশয়
একটা ভেঙে জীর্ণ হয়ে থাকা মুখ আসলে
একটা দীর্ঘদিন সাঁতার না পাওয়া দীঘি

একটা দীঘি ভেঙে আসা শুনি
একটা অনিচ্ছুক ভেঙে আসা মুখ আসলে
দীঘির পাড় ভাঙার শব্দ

দীঘি আসলে একটা না বোঝা রক্তক্ষরণের মাথাকে
শান্তি দেওয়া জ্যৈষ্ঠ বিকেল

এই রইল দীঘি তার ভাঙা পাড়ের শালতি
একটা হাত কিছু ভাঙা মুখ সাজিয়ে রাখছে
চিৎকার করে উঠছে বাতাস
সহস্রাব্দের ধুলো সমেত জ্যৈষ্ঠ বিকেল
কেউ এমন চিৎকার করতে পারে না
কেবল ভাঙা মুখ জোর করে লেখা অবদমন

জ্যৈষ্ঠ-দীঘি আসলে সমস্ত না ঢুকতে পারা জীবনের ভাঙা মুখ
সমস্ত ভাঙা মুখ আসলে সেইসব পুরনো ডায়রির মালিকের
যার জীবনে গোষ্ঠী বা ব্যক্তি কোনওটাই ঠিকমত হয় নি
জানা যায় নি কোথায় গিয়ে আঘাত পরিণত হয়
একঘেয়ে আবহাওয়ার খবরে
অথবা স্বপ্নবিচারের কাটাকুটি খেলায় মেতে
বারবার বিষিয়ে দিয়েছে অন্য নিকটজনের স্বপ্নোচ্ছ্বাস

আসলে জ্যৈষ্ঠ-দীঘি একটা দেশ
মাটির মূর্তি বা খেলনায় ঢাকা একটা চলাচল
পা পড়লে ভেঙে যাচ্ছে
মূর্তি-ভাঙা চলনের টুকরো বিঁধে যাচ্ছে পায়ের পাতায়
কেউ বলতো না অঙ্ক শেখা জরুরি
হিসেব না মিললে গরদ কাপড়ে পোকার মত
হয়ে ওঠে বাকি বেঁচে থাকা

আর এখানেই রাস্তা বেঁকে যায় মা লক্ষী অর্কেস্ট্রার দিকে
কোনও দীপাবলি নিভে আসে না যে মঞ্চে
(আপনাদের প্রসেনিয়াম যেখানে একটু বেশি রোজাগারের লোভ মাত্র)
পরপর মহড়া চলতে থাকে রাস্তা জুড়ে
সমস্ত রাস্তাই ভরে আছে যাত্রা-পালা-কীর্তন ও খোলের মহড়ায়
যে জীবন গণিত জানে না তার শুধু খোলের আওয়াজ
আবারও পোড়া মাটি বিভাজন রেখা
আবার গলিটা মুসলমান পাড়ার মুখে
জলের কল আলাদা করে রাখে

শুধু দূর থেকে শোনা যায় গণিতহীন জীবনের
জ্যৈষ্ঠ-দীঘি ভেঙে আসার শব্দ
পোড়া মাটির মূর্তি ভেঙে চলার শব্দ
মাগরিব ও শেষ বিকেলের ফিনফিনে
গরদ-আকাশ ছেঁড়ার শব্দ

ধুলো নামক অস্তিত্বের হাতে ভাষা সমর্পণ করে
তুমি নিজের মুখ ভেঙে যেতে দেখলে
জলফড়িঙের ত্রস্ত লম্ফনে