সুপ্রাণু হরণ

বাবলী হক

লক্ষ্মীবালা সারারাত ঘুমাতে পারল না। প্রায় একমাস লাগাতার রাতে সে ঘুমায় না। যেদিন ঘর থেকে সেনাবাহিনী সুপ্রাণুকে ধরে নিয়ে গেল, সেদিন থেকেই লক্ষ্মীবালার রাতের ঘুম গায়েব। গুনে গুনে দেখেছে তেত্রিশ রাত তার চোখে ঘুম নাই। রাত-প্রহরী হয়ে নিঃসঙ্গ ঘর আগলে বসে থাকে। আরও একজন যে তার সঙ্গে আছে, সে শুধু মাঝে মাঝে হঠাৎ নড়ে ওঠে, তার অস্তিত্বের জানান দেয়। পেটের ওপর হাত রেখে লক্ষ্মীবালা তার ওম পেতে চায়, তাকেও আশ্বস্ত করে।

লক্ষ্মীবালার ঘরটা দক্ষিণদিকে সেগুন গাছের বিশাল পাতায় ঢাকা। মাথার উপর দুয়েকটা জায়গা নড়বড়ে।ঝড়বৃষ্টিতে দুর্বল হয়েছে। বাঁশগুলি কিছুটা ফাঁকা হয়ে সরে গেছে। সুপ্রাণু বিয়ের সময় ঘরটা সারিয়ে বাসযোগ্য করেছিল। কিন্তু পুরোটা সামাল দিতে পারেনি। তবু্ও ঝড়-বৃষ্টি-রোদ, খানিকটা ভালোলাগা সবই ঢুকে পড়ে। আর এই ঘর জুড়েই চলে লক্ষ্মীবালার সংসার।
সুপ্রাণুর খাওয়া দেখে সে হাসত। এটা কী ধরনের খাওয়া হল! শাক-ভাত মেখে খাও। না, আগে শাক খেয়ে শুকনা ভাত পরে খাবে। সুপ্রাণু বলে, ‘ভাতের স্বাদ একরকম আর শাকের স্বাদ অন্যরকম। মেখে ফেললে কোনোটারই নিজের স্বাদ থাকে না। অন্য একটা স্বাদ হয়ে যায়।’ চোখ বড়ো বড়ো করে লক্ষ্মীবালা শুনত আর ভাবত, তাই তো! এটা তো এভাবে কোনোদিন সে ভেবে দেখে নাই!

সেদিন সকাল থেকেই আকাশের মেঘ পাহাড়ের ঢালু বেয়ে নেমে গেছে গাছগুলো ছুঁয়ে। সুপ্রাণু মাত্র খেতে বসেছে। ভাত বেড়ে লক্ষ্মীবালাও বসবে।
একটা আর্মি জিপ, পিছনে পিকআপ ভ্যান এসে ঘরের সামনে থামল। প্রথমে ভ্যান থেকে দশ-বারোজন সশস্ত্র সেনা গাড়ির পিছন থেকে লাফিয়ে নেমে বুটে সম্মিলিত শব্দ তুলে ঘরের সামনে পজিশন নিয়ে দাঁড়ায়। প্রত্যেকের হাতে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র উঁচানো। ঘরের খোলা দরজা দিয়ে লক্ষ্মীবালা দেখল রাইফেল, এসএমজি, নাইন এমএম কারবাইন এগিয়ে আসছে। বিয়ের পর এই সমস্ত অস্ত্রের সঙ্গে লক্ষ্মীবালার পরিচয় সুপ্রাণুই করিয়ে দিয়েছিল। সুপ্রাণু বলে–'সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার পর বাঘাইছড়ি স্কুল মাঠে যেদিন আমি থ্রি নট থ্রি রাইফেলটা জমা দিলাম, জানিস লক্ষ্মী, আমার মনে হল আমার ডান বাহুটা কেটে সেনাবাহিনীর কাছে গচ্ছিত রেখে যাচ্ছি। এরপর থেকে কাঁধটা কেমন যেন ফাঁকা ফাঁকা, হালকা লাগত!'

জিপের পিছন থেকে অস্ত্র হাতে চারজন সৈনিক নামল। সবশেষে ধীরে সুস্হে গাড়ির বামদিক থেকে নামল একজন অফিসার। লম্বা, ফর্সা, চোখে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, কঠোরতার আবরণে ঢাকা।
দুজন সৈনিক দ্রুত ঘরে ঢুকে পড়ে। তখনো সুপ্রাণু ভাতের থালায় হাত রেখে হতভম্ব বসে আছে। একজন সৈনিক সুপ্রাণুর কাছে এগিয়ে এসে ধমকের সুরে বলে,
–এই ওঠ। চল। তোকে এক্ষুনি আমাদের সঙ্গে যেতে হবে।
লক্ষ্মীবালার হাত থেকে ভাতের থালা পড়ে যায়।
দরজার বাইরে গাছের ডালপাতা জড়ো করে প্রতি রাতে আগুন জ্বালানো হয়। পোড়া গন্ধের উপর দিয়ে সুপ্রাণু টলতে টলতে পিকআপ ভ্যানের পিছনে উঠে চলে গেল। যাবার আগে একবার, শুধু একবার বিপন্ন অসহায় দৃষ্টিতে লক্ষ্মীবালার দিকে তাকিয়েছিল।
কী ঘটে গেল, বুঝতে না পেরে লক্ষ্মীবালা চলৎশক্তিহীন গাছের মতো দাঁড়িয়ে থাকল কিছুক্ষণ। তারপর পাহাড়ি পথ বেয়ে নদীর পাড় ছুঁয়ে সরকারি স্কুলের পাশ ঘেঁষে ছুটল মাস্টারমশাই-এর কাছে। মাঠের বুক চিরে ছোটো ছোটো পাতার ফাঁকে গোলাপি লজ্জাবতী। লক্ষ্মীবালার দ্রুত পায়ের ছোঁয়ায় লজ্জায় মাটির সঙ্গে মিশে যাচ্ছে লজ্জাবতীর চিড়ল চিড়ল পাতা। হাঁটু পর্যন্ত পিননের গায়ে কাঁটার নকশা হয়ে যাচ্ছে। রাঙাখাদি লুটিয়ে পড়েছে গা থেকে। কাঁটা, ঝোপ ছাড়িয়ে শরীরে আঁচড় নিয়ে লক্ষ্মীবালা ছুটছে। এই বিপদে জনসংহতি সমিতির মাস্টারমশাই-এর মুখটাই মনে পড়ল প্রথমে। ছোটোবেলা থেকেই দেখেছে লেখাপড়া শেখানোর দায়িত্বের সাথে নির্যাতিত পাহাড়িদের বিপদে-আপদে এই মানুষটি সব সময় পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন।
মাস্টারমশাই সব শুনে বললেন, 'কোন ক্যাম্প, কেন নিয়ে গেল কিছুই তো বলতে পারিস না। আচ্ছা তুই এখন ঘরে যা। আর কোনো খবর পেলেই সঙ্গেসঙ্গে আমাকে জানাবি। আমিও খোঁজে থাকি৷'
ফেরার পথে, লক্ষ্মীবালার মনে হয় পাহাড়ি পথ যেন দীর্ঘ হয়ে গেছে। চারপাশ দেখে। ভুল করে অন্য পথে চলে আসেনি তো! হাত-পা-আঙুলের ভিতর গুটিয়ে আসে। পেটের ভিতর আদুরে বায়না বেড়ে যায়। ফ্যাকাশে আকাশ বাতাসহীন। ক্রমশ পায়ের সরল ছাপগুলো ক্লান্তিতে এলোমেলো ছোটো হয়ে পড়ে। থেমে যায়। মনে হল কেউ যেন অনুসরণ করছে তাকে। পিছনে তাকিয়ে দেখে, কেউ নেই। লতাপাতার সামান্য নড়াচড়াও মনে ভয় ধরায়। কোনোরকম ঘর পর্যন্ত পৌঁছে, দাওয়ায় আছড়ে পড়ে।

তিনদিন পর সুপ্রাণুর কাপড় নিতে আসে একজন সৈনিক। লক্ষ্মীবালা বুঝতে পারে, কাপড় নিতে আসা একটা অজুহাত! আসলে তার খোঁজ নিতে এসেছে। লক্ষ্মীবালার কোনো প্রশ্নেরই উত্তর দিল না সৈনিকটি। সব কথার একটাই জবাব, ‘সব ঠিক আছে, জিজ্ঞাসাবাদ চলছে।’
তারপর ঘরের চারপাশ ঘুরে-ফিরে, খুঁজে, দেখে ফিরে গেল। যাবার সময় লক্ষ্মীবালার শরীরে চোখ বুলিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘সুপ্রাণু চাকমার খোঁজে কেউ এসেছিল এখানে?’
মুখ ঘুরিয়ে, ঠোঁট চেপে লক্ষ্মীবালা উত্তর দিল, ‘না।’

মাস্টারমশাই প্রতিদিন লোক পাঠিয়ে খোঁজ-খবর নিচ্ছেন। এরই মাঝে কিছু চাল-ডাল-সবজি পাঠিয়ে দিলেন। লক্ষ্মীবালা কিছুটা চাল-ডাল মিশিয়ে কোনোরকমে ফুটিয়ে খেয়ে নেয়। নিজের জন্য না-হোক, আরেকজনের জন্য তো তাকে খেতে হবে! সারারাত চোখে ঘুম থাকে না। চোখ বন্ধ করলেই বাঁশের দেয়ালগুলো মিলিয়ে গিয়ে বড়ো বড়ো গর্ত হয়ে যায়। ভয়ে আঁতকে ওঠে! বসে থাকে সারারাত স্মৃতির ভাঁড়ার খুলে। আর সারাদিন দুই হাঁটুর উপর কনুই ভর করে হাতের তালুতে গাল পেতে ঘরের দাওয়ায় বসে থাকে পথের দিকে তাকিয়ে। পেটের ওপর হাত বুলিয়ে বুলিয়ে বিড়বিড় করে কত কথা যে বলে! কখনো ঝিমাতে ঝিমাতে দুই চোখ লেগে যায়। ঘুমের ভিতর সে খায়, হাঁটে, সুপ্রাণুর অপেক্ষায় থাকে।
কার কাছে যাবে! বাবা একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে শহিদ হয়েছিলেন। লক্ষ্মীবালার ভাই, তার চেয়ে চার বছরের বড়ো শুক্রমণি চাকমা এইচএসসি পরীক্ষা দিয়ে রেজাল্টের অপেক্ষা না করেই চলে গিয়েছিল শান্তিবাহিনীতে৷ এগারো বছর সে গৃহহীন। সুপ্রাণু বলেছে, ভাই এখন শান্তিবাহিনীর একটি কম্পানির কমান্ডার হয়েছে। দুর্গম জঙ্গলে ঘুরে বেড়ায়। ঘন জঙ্গলে ভ্রাম্যমাণ প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে গেরিলাদের ট্রেনিং দেয়। জুমল্যান্ড প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখে। শুক্রমণি শান্তিবাহিনীতে যাবার পর তাকে খুঁজতে এসে সেনাবাহিনী তাদের বাড়িঘর আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছিল। আগুন দেবার আগে বাঁশের দেয়াল, মাচা সব ভাঙচুর করে অস্ত্র খোঁজে। বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে লেপ তোশকে তল্লাশি চালায়। চোদ্দো বছরের লক্ষ্মীবালা তখন ক্লাশ নাইনে পড়ে। দূরে দাঁড়িয়ে নিষ্ফল আক্রোশে ইচ্ছে করছিল বন্দুকের নলের মুখ ওদের দিকে ঘুরিয়ে দিয়ে ওদেরকে আগুনে ছুড়ে ফেলে। ইচ্ছেগুলি শান্ত হয় মায়ের শীতল শরীর জড়িয়ে। সেই আগুনের দিকে তাকিয়ে থেকে তার নিজের ঘর বোনার স্বপ্ন শুরু হয়।
ভাই চলে গেল, ঘর পুড়িয়ে দেবার পর আর পড়া হল না। মায়ের সঙ্গে লক্ষ্মীবালা মাসির ঘরে থাকত। বিয়ের পর সুপ্রাণুর সঙ্গে চলে আসে বাঘাইছড়ি। শুক্রমণি ওদের বিয়েতে আসেনি। আশীর্বাদ করে পাঁচ হাজার টাকার সঙ্গে ছোট্ট একটা চিরকুট পাঠিয়েছিল– 'এবার আসা হল না। খুব শীঘ্রই আসব।' বিয়ের পর বোনের কাছে এসেছিল মায়ের মৃত্যুর কথা শুনে। একটা রাত ওদের সঙ্গে ছিল। এরপর আবার এল মাস তিনেক পর এক গভীর রাতে। লুট করা অস্ত্র লুকিয়ে রেখে গিয়েছিল সুপ্রাণুর ঘরের মাচায়। লক্ষ্মীবালা ভয়ে ভয়ে ভাইয়ের কাছে জানতে চেয়েছে,
–দাদা আর কতদিন এই যুদ্ধ চলবে?
শুক্রমণি চোয়াল শক্ত করে উত্তর দিয়েছে,
–আমাদের অধিকার না পাওয়া পর্যন্ত আমরা থামব না। যতদিন আমাদের উপর নির্যাতন চলবে, ততদিন আমাদের যুদ্ধও চলবে।
লক্ষ্মীবালার মনে হচ্ছে এখন যদি একবার শুক্রমণির দেখা পায়! ভাইয়ের পা জড়িয়ে ধরে বলত, 'দাদা আমার সুপ্রাণুকে এনে দাও, যেমন করে পারো, যেখান থেকে পারো!'

জুমল্যান্ডের স্বপ্ন সুপ্রাণুও দেখত।
পাকিস্তানের সামরিক শাসকদের তৈরি কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্প চালু হলে রাঙামাটিতে বাপ-দাদার ঘর-বাড়ি, আবাদি জমি সব জলের নীচে তলিয়ে গিয়েছিল। বাবা উদবাস্তু হয়ে খাগড়াছড়িতে এসে ঘর বাঁধল। স্ত্রী, সন্তান, বৃদ্ধ মা বাবাকে নিয়ে কোনোরকমে সংসার চলত। সুপ্রাণুর বড়ো বোন জ্বরে ভুগে ভুগে খাগড়াছড়িতে এসে ম্যালেরিয়ায় মারা গেল। বোনের কথা বলতে বলতে সুপ্রাণুর চোখ ছলছল করে। বলে, 'মা নয়, দিদিই আমাকে বড়ো করেছে। দিদি চলে যাবার পর আমারও মরে যেতে ইচ্ছা করত।'

সুপ্রাণু এসএসসি পাশ করে চলে গেল শান্তিবাহিনীতে। সেই সময়ে হাজার হাজার ছেলেরা চলে যাচ্ছিল জঙ্গলের জীবনে। না গিয়েই বা কী করবে? বিচ্ছিন্নতাবাদী বলে যেভাবে ছেলেদের ধরে নিয়ে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালাত সেনাবাহিনী! জঙ্গলের জীবন কঠিন হলেও সেনাবাহিনীর হাতে নির্যাতিত হয়ে মরার চেয়ে যুদ্ধ করে গুলি খেয়ে মরা ভালো–মনে করল সুপ্রাণু।
শান্তিবাহিনীর ট্রেনিং শেষে ছুটিতে আসে সুপ্রাণু ‘সার্জেন্ট পাণ্ডব’ হয়ে। বিজু উৎসবে লক্ষ্মীবালাকে মনে ধরল। লক্ষ্মীবালার কুমড়োফুলরঙা পিরান আর খোঁপায় গোঁজা পাহাড়ি বুনোফুল কুরুক, নেশা ধরিয়ে দিয়েছিল। তিন দিনের উৎসবের পুরোটা সময় চৈত্র সংক্রান্তির দিন থেকে শুরু করে ফুলবিজু, মূলবিজু পর্যন্ত সুপ্রাণু লক্ষ্মীবালার পিছনে পিছনে ঘুরেছে। মন্দির প্রদক্ষিণ শেষে নাচের অনুষ্ঠানে যাবার সময় লক্ষ্মীবালার হাতে রুপার চন্দ্রহার গুঁজে দিয়ে বলল, নদীর পাড়ে দেখা হবে।
এক সপ্তাহ বাকি ছিল ছুটি শেষ হতে। প্রতিদিন দেখা হত নদীর পাড়ে। সেই সুখের স্মৃতিতে লক্ষ্মীবালা কাটিয়েছে দুই বছর।
কয়েকবার ছুটিতে এসেছে সুপ্রাণু। মাঝে মাঝে শুক্রমণিও আসত। দেখা হত। একবেলা থেকেই চলে যেত। বিপন্ন সময়। ওদের মুখে শুনেছে বাঙালি সেটেলারদের কথা। সমতল থেকে এসে বাঙালিরা কেমন করে পাহাড়িদের ফেলে যাওয়া ঘরবাড়ি, জমি দখল করে নিচ্ছে। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় মারা যাচ্ছে পাহাড়ি বাঙালি !
অস্থির সময়ের কথা শুনে শুনে লক্ষ্মীবালার ভিতরটা ঘুণপোকার মতো কুঁড়ে কুঁড়ে খায়। একা পেলেই সুপ্রাণুকে ঘরগন্ধী প্রজাপতির কথা শোনায়। উর্বর ঘামের ফসলের গল্প বলে। অন্যের ঘরে বড়ো হওয়া লক্ষ্মীবালার জীবনে একটাই যে স্বপ্ন, তার নিজের একটা ঘর হবে। তার একান্ত নিজের ঘর। ঘর পোড়ার পর থেকে এই অভাবটা বড়ো কষ্ট দেয়। এক চিলতে আগুন বুকের ভিতর সব সময়েই জ্বলতে থাকে।
এদিকে শান্তিবাহিনীতে শুরু হয় নেতৃত্বের কোন্দল। সবার হাতেই অস্ত্র। নিজেদের মধ্যে, যুদ্ধে দুই গ্রুপের অনেক গেরিলারা মারা যায় পাহাড়ে, জঙ্গলে। সেনাবাহিনীর সঙ্গে সংঘাত তো নিত্যদিন লেগেই ছিল। দুই বছরের গৃহযুদ্ধে এমনিতেই উদ্যম হারিয়ে ফেলেছিল অনেকে। এক পর্যায়ে নেতার মৃত্যু, গৃহযুদ্ধের অবসন্নতায় শান্তিচুক্তিতে বিশ্বাসী কিছু গেরিলা অস্ত্র সমর্পণ করে।
ফিরে আসে সুপ্রাণু।
ফেরে না শুক্রমণি।
ঘর বাঁধে সুপ্রাণু। স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসে অনেক পরিকল্পনাও করে। অনেক স্বপ্ন, অনেক আশা। কিন্তু কিছুদিন যেতেই বুঝতে পারে চুক্তি কোনোদিনও বাস্তবায়িত হবে না। সামান্য কিছু টাকা হাতে পেয়েছিল অস্ত্র জমা দেবার পর, সে টাকায় ভাঙা ঘরটাকে সারিয়ে তোলে। কিন্তু আয়ের উৎস নেই। পুনর্বাসনের ব্যবস্হা নেই। সহজ শর্তে ঋণের আশা দিয়েছিল সরকার। প্রায় প্রতিদিনই সেখানে একবার ঘুরাঘুরি করে। কিন্তু কোনো কাজ হয় না। ঋণের আশায় ফিশারিজ প্রজেক্ট বানিয়ে জমা দিয়েছে। দুই বছর হয়ে গেল প্রজেক্ট পাস হচ্ছে না। হতাশায় সুপ্রাণু পায়চারি করে আর বিড়বিড় করে বলে, 'এই পাহাড় একদিন আমাদের গিলে খাবে। সবাইকে গিলে খাবে।'
সুপ্রাণু এখন আর জুমল্যান্ডের স্বপ্ন দেখে না। বলে, 'ভুল করেছি অস্ত্র জমা দিয়ে, মিথ্যা আশায় নিজেকে শক্তিহীন করেছি। সময় নষ্ট করেছি।' ভিতরের ছটফটানি আর্তনাদ হয়ে ফেটে পড়ত এমনি করে। এ সব শুনে লক্ষ্মীবালার তখন সুপ্রাণুকে বড়ো অচেনা, অজানা লাগত।
সুপ্রাণু বলে, 'আমরা দরিদ্র জনগোষ্ঠী নই। আমাদের দরিদ্র বানিয়ে রাখা হয়েছে। সমতল ভূমি থেকে শাসকরা এসে আমাদের সম্পদ লুট করে নিয়ে যায়। আমরা কিছুই বলতে পারি না। কিছুই করতে পারি না। অস্ত্র হাতে তুলে নেয়া ছাড়া আমাদের বাঁচার আর কোনো পথ নেই। শুধু ব্রিটিশ কেন তার আগে থেকে আজ পর্যন্ত যে যখন ক্ষমতায় এসেছে আমাদের ওপর এমনই অত্যাচার করেছে।'

ভাবনা-চিন্তার মানুষ লক্ষ্মীবালা নয়। তবু ইদানীং এসবই ভাবে। সুপ্রাণু তার জীবনে আসার পর থেকে সে আর কিছু ভাবতে চাইতও না। কিন্তু আজ তাকে ভাবতে হচ্ছে। সন্তানের ভাবনা ভাবতে হচ্ছে। মাসির ঘরে মাকে নিয়ে থাকার কষ্টটা মনে পড়ে। কোনো উপায় ছিল না৷ সারাদিন আনারসের খেতে কাজ করে মা একবেলা খেত। বলত–'খিদা নাই।' লক্ষ্মীবালাকে মাঠের কাজে পাঠাত না। সমিতির অফিসে রেশনের চাল আনতেও মেয়েকে পাঠাত না। এমনকী ঝরনা থেকে জল আনতেও নিজেই যেত মিনতি। বলত– 'তুই ঘরের কাজ কর লক্ষ্মী। তোর বাইরে যাওয়ার দরকার নাই।'
লক্ষ্মীবালা শুধু ঘর চেনে। পাহাড়ের যন্ত্রণা সে বোঝে না। বুঝতেও চায় না।
আজ শুক্লা দ্বাদশীর চাঁদের আলো উপচে পড়ছে। জঙ্গলের জমাট অন্ধকারের ভিতর সেই আলো এক আশ্চর্য মায়াবী রূপ ধারণ করেছে। সেদিকে তাকিয়ে চোখের মাঝে কেমন একটা আরাম বোধ করল লক্ষ্মীবালা। বাঁশের গায়ে হেলান দিয়ে এলিয়ে বসে আছে। শরীর কিছুতেই ভালো লাগে না। তলপেটের নীচে ব্যথা টনটন করে। সন্ধ্যা হতেই পাহাড় ঝিমিয়ে যায়। পরতে পরতে মগ্নতা ছড়িয়ে পড়ে। পাতার শিরশিরানি শব্দ অশরীরীর মতো চলে ফিরে বেড়ায়। উঁচু-নীচু পথে বুনোফুলের গন্ধ বাতাসে ভাসে। কিছুদিন আগেও তার জীবন অন্যরকম ছিল। মাঝে মাঝেই মনে হয়, ঘুমিয়ে কোনো দুঃস্বপ্ন দেখছে। জেগে উঠে দেখবে সুপ্রাণু ঘরেই রয়েছে। উঁচু গাছগুলির পাতার আড়ালে একটানা পাখি ডেকে যায়। বুকের ভিতরটা ফাঁকা হয়ে কান্না পায়। কাঁদতে থাকে লক্ষ্মীবালা। কাঁদতে কাঁদতে কুঁকড়ে যায় শরীর। রাতে প্রহরের পর প্রহর কেটে যায়। চেঙ্গি নদীর উপর থরে থরে মেঘ জমে। ঠান্ডা বাতাস। নদীর দুইপাশে দীর্ঘ ঘন গাছগুলির মাথা বেয়ে বৃষ্টির জল দুকূল ভরে উঠে। আজও বৃষ্টি হবে। হয়তো না। হয়তো বাতাসে মেঘ সরে যাবে। পাহাড়ের অনেক উপরে মেঘ উড়ে যাবে। তবুও সুপ্রাণু আসবে না।
সকালবেলা মাস্টারমশাই নিজে এলেন। সঙ্গে আনলেন চাল-ডাল, ওষুধ। যাবার সময় বলে গেলেন– 'সুপ্রাণু চাকমা এই বাঘাইছড়ির আর্মি ক্যাম্পেই আছে, খবর পেয়েছি৷ তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির কেস। নন-বেলেবল কেস।
ব্যাকুল হয়ে লক্ষ্মীবালা জানতে চায়– দাদাকে কোথায় পাব?
মাস্টারমশাই বলেন– ওরা তো সবসময় এক জায়গায় থাকে না। গভীর জঙ্গলে কোথায় কোথায় ঘুরে বেড়ায় সে খবর কেউ বলতে পারে না। তবে শুনেছি মাঝে মাঝে কাতালমনির এক প্রত্যন্ত গ্রামে তাকে দেখা যায়৷ তৈলাফাং ঝরনার কাছে।

লক্ষ্মীবালা কাঁদে। সারারাত কাঁদে। পেটের ওপর হাত রেখে কাঁদে। কাঁদতে কাঁদতে এক সময় তার খুব ঘুম পায়। আজ প্রায় মাসখানেক পর তার শরীর ঘুমাতে চায়।
সকাল হতেই ঘুমচোখে ভাত চড়িয়ে দেয়। ভাতের সঙ্গে দুটা আলু সেদ্ধ মাখিয়ে খায়। তারপর বেরিয়ে পড়ে আর্মি ক্যাম্পের উদ্দেশে।


অনেকটা উঁচু-নীচু পথ চলার পর সেনাবাহিনীর গাড়িটি থামল। লক্ষ্মীবালার কাছে এসব পথ একেবারেই অচেনা। আগে কখনো আসে নাই। মা তাকে খাগড়াছড়ির বাইরে কোনোদিন কোথাও যেতে দেয়নি। গাড়ি থেকে নেমে পড়ল সবাই। লক্ষ্মীবালাকে একজন সৈনিক হাতের ইশারায় গাড়িতে বসে থাকতে বলল। সেনাবাহিনীরা নিজেদের মধ্যে কথা বলছে। 'মাটিরাঙা এসে গেছি স্যার। গাড়ি এরপর আর যাবে না স্যার। হেঁটে যেতে হবে স্যার।’ আরেকজন বলল, ‘মেয়েটিকে কী করব স্যার?
‘নিয়ে চলো। যতক্ষণ না অপারেশন শেষ হয়, একে ছাড়া যাবে না।’
একজন সৈনিক এগিয়ে এসে বলল, ‘নেমে আসো।’ আস্তে আস্তে গাড়ি থেকে নেমে এল লক্ষ্মীবালা। আশেপাশের ঝোপঝাড়, পায়ের নীচে বড়ো বড়ো ঘাস বলে দিচ্ছে এই এলাকায় লোক চলাচল কম। দূর থেকে ধূসর পাহাড়কে বিশাল জন্তুর মতো দেখাচ্ছে। এতক্ষণ গাড়ির পিছনে আড়ষ্ট হয়ে বসে থেকে হাত-পা জমে যাচ্ছিল লক্ষ্মীবালার। খোলা বাতাসে একটু স্বস্তি পেল।
অন্ধকার পথে টর্চের আলো ফেলে জঙ্গলের সরু একটা পথে ওরা একজন একজন করে নেমে এল অস্থায়ী ক্যাম্পে। জঙ্গলের ভেতর থেকে প্রচুর পাখির ডাক শোনা যাচ্ছে। সারাদিন কাটার পর সন্ধ্যাও কেটে গেল। শীতের ভরসন্ধ্যায় উদ্বেগ, উৎকণ্ঠায় দরদর করে ঘামছে লক্ষ্মীবালা।
ওরা কথা দিয়েছে লক্ষ্মীবালা যদি অস্ত্রসহ শান্তিবাহিনীর খোঁজ ওদেরকে দিতে পারে, তবেই সুপ্রাণুকে ছেড়ে দেয়া হবে। তানা হলে এই শরীরে এত বড়ো ঝুঁকি কি লক্ষ্মীবালা নিত? নিজের জীবনও যে কোনো সময়ে বিপন্ন হতে পারে শান্তিবাহিনীর মতো ? আজ সে বে-পরোয়া হয়েছে, শুধুমাত্র সুপ্রাণুকে ফিরে পাবার আশায়।

রাত গাঢ় হচ্ছে। দূরে গুলির শব্দ শুনতে পেল। গুলির শব্দ তো পাহাড়ে প্রায় শোনে লক্ষ্মীবালা কিন্তু আজ শিহরে ওঠে। গুলির শব্দে পাহাড়, জঙ্গল কেঁপে উঠে।