তিনটি কবিতা

ফেরদৌস নাহার

কান্নাটা জরুরি হয়ে পড়ে
অনেকদিন পর পুরানো চেনা কোনো শহরে গেলে
সেই আগের মতো লাগে না বলে যেতে চাই না
তবুও যাওয়া হয়। স্টিমারের প্রোপেলার জল কেটে
নিয়ে যায় পুরানোতে। প্রথম প্রেম ও প্রত্যাখ্যান
স্বপ্নমঙ্গল দাহ ঘুরপাক থেকে থাকে অসহ্য অনুভবে
সেজন্যে কাঁদতে পারি না, পাছে কেউ দেখে ফেলে
কিন্তু কান্নাটা জরুরি হয়ে পড়ে

সেসব শহরে খুব কুয়াশা ঘনসর হয়ে ছায়া ফেলে
নদীও বয়ে যায়। কত দিন কিছু গানের আশায় থেকেছি
একটানা বৈঠা বয় নায়ের মাঝি। তার কণ্ঠস্বর শুনি না
দূর থেকে দেখি হাওয়ায় উড়ছে ধুধু গামছা ও লুঙ্গি
আমাদের পুরাতনী তাকে যেন চিনে ফেলে তখনই

এমন অভিজ্ঞতা জীবনে ফিরে আসে বহুবার
আদিম আখ্যান, আচানক চমকে ওঠা ফিরে আসে
গোলপাতা জীবনের ঘরে খুব চেনা, খুব অচেনা
অহেতুক ঘর্ঘর শব্দের চাকা টানা, মেরেও মারে না
যতদূরেই যাও, কোনো পুরাতনী আর পুরাতন থাকে না
তার মুখে লেপে থাকে কারুকাজ করা নতুন যন্ত্রণা


উত্তর আমেরিকায় এপিটাফ
একটি রোদঝিল্লি বাতাসে দুলছিল উত্তর আমেরিকা
অবাক হব কিনা ভাবতে ভাবতে
শিকড় উপড়ে ফেলার আনন্দ পৌঁছে দেয়-
এই নাও, তোমার গ্রিনকার্ড
যাও প্রাণ ভরে ভেসে বেড়াও

সেই কবে ঘরবাস হেঁচকি তুলে
কাঁদতে কাঁদতে বনে চলে গেল
সেই থেকে শুরু হল বনবাস
বৃষ্টি ও তুষারের ব্যবধান
ঘুচিয়ে দিয়েছে মৌলিক অন্তর্ধান
ঠোঁটকাটা জ্যোৎস্না বিষণ্ন কণ্ঠ ছেড়ে গান গায়
উত্তরের হাওয়া লেগে হাড়ের চোয়াল হয় কঠিন

দিন মাস বছরের গোনাগুনতি শেষ হলে
ঘরে ফেরার ডাক গোপনে আমেরিকা খোঁজে
এখন এপিটাফের রং পালটে দিলেও
ঝিল্লি রোদে তা ধুসরই দেখাবে


বৃষ্টি বাকল
বৃষ্টি দেখব বলে তেরো হাজার কিলোমিটার দূর থেকে
উড়তে উড়তে হাঁপাতে হাঁপাতে
কেউ পৌঁছাল তার হারানো ভূমিতে দারুণ তৃষ্ণায়
ভোর রাতে সে এলো
এই সেই বৃষ্টি, চারদিক কাঁপিয়ে ভীষণ জলজ যানে
এই সেই বৃষ্টি, যার কাছে মাথা নোয়ালো ধূলির আসর
এই সেই বৃষ্টি, যাকে দেখব বলে এই আগুন গ্রীষ্মে
বৃষ্টির গান আনন্দের আবহমান সুর বিছিয়ে দিলো

আমি যখন মরে যাই, গায়ের গন্ধে শুধু সেই গান লেগে থাক
পশ্চিমের খয়েরি পাখি দিনরাত একাকার ডেকে ডেকে যাক
জীবনের দুঃখসাঁতারক্ষণ বিমনা বিজন গোপনে দিয়েছি তুলে
সংগীত সংকেতে। সমূহ আলাপ শেষে মিহিন কুয়াশা সুর
দাঁড়টানা সকালের ভৈরবী মহাকাল নির্জন নির্বাণ আকুল
রেখে যাক সবটুকু ভেসে আসা কোলাহল, প্রাচীন বৃষ্টি বাকল