নিঃসঙ্গ কাফেলা থেকে

গৌতম চৌধুরী

১.
এলোমেলোভাবে হাঁটতে হাঁটতে একদিন একটা ছবির ভেতর ঢুকে পড়ে মানুষ। মুগ্ধ হয়ে চারদিক দেখতে থাকে। দ্যাখে, আর মনের মতো ক’রে এটাসেটা বদলায়। ছবির ভেতরেই তৈরি হতে থাকে পথ। সে চলতে থাকে। চলাটাও তখন ছবির একটা অংশ। হয়তো এইরকমই সে চেয়েছিল মনে মনে। ছবির মতো একটি চলা! ভালোই সময় কাটতে থাকে তার। কিন্তু যতই সুন্দর হোক, ছবি তো পটের ওপর আঁকা। যতই মায়া রচনা করুক, পথ কিছুতেই সেই পট ভেদ ক’রে বেরিয়ে যেতে পারে না। তাছাড়া ছবির চারদিকেই একটা ক’রে সীমানা। তাহলে কি এটাও একটা হাজতখানা? ভাবতেই নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে মানুষের। ছবির ভেতর থেকে সে সোজা লাফ দেয় শূন্যে। তাহলে শূন্যের ভেতরেই চলা যাক আবার। ভাবে সে। ভাবে, আর একটু একটু ক’রে ফুটিয়ে তুলতে থাকে পথ। শূন্যও হাসতে হাসতে কেবলই ছড়িয়ে পড়ে।

২.
জিভের ওপর সাপের বিষ তুলে নিয়েও মানুষ বাঁচতে চেয়েছে। একটা না একটা আগুন তো তার চাইই। ভিজে খড়ের গাদার মতো আঙিনায় স্তূপ হয়ে পড়ে থাকলে অবশ্য কোনও জ্বালা-যন্ত্রণা নেই। চারিদিকে পৃথিবী নামে একটা গ্রহ যে পড়ে আছে, তারও কোনও হদিশই নেই। শুধু কিছু নধর সুস্বাদু ছত্রাক নিঃশব্দে গজিয়ে উঠবে খড়ের ফাঁক ফোকরে। ব্যাস, চমৎকার একটা শান্ত নিরুত্তেজিত জীবন। এইটুকু পাওয়ার জন্যই কতজনের কত সাধ্যসাধনা। কিন্তু ওই যে কামড়, সাধ ক’রে যে একবার তা খেয়েছে, তার তো নিস্তার নেই। ব্রহ্মরন্ধ্র অবধি তৃষ্ণায় তাকে কেবলই ছুটে বেড়াতে হয় অখাদ্য কুখাদ্যের খোঁজে। আর আগুন ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। যেন আগুনের পটভূমিকায় জীবনের অন্তিম নাচের একটা দৃশ্য অভিনীত হবে বলে, এত আয়োজন। অবশ্য,মঞ্চ জুড়ে যদি এক ঝাঁক শিশুর কলরব হঠাৎ ক’রে রংবেরঙের প্রজাপতির মতো ঢুকে পড়ে,আর তার পিছুপিছু অন্ধ সারিন্দাবাদক লম্বা চুল দুলিয়ে দুলিয়ে বাজাতে থাকে চিনতে না-পারা এক সুর, পরিস্থিতি যে কী দাঁড়াবে,বলা যায় না।

৩.
ভাঙা একটা বাক্সের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে গোঙানি, আর তাকেই সংগীত বলে উপস্থাপিত করতে চাইছে কেউ কেউ। তারাগুলো ধোঁয়ার মতো পাকিয়ে পাকিয়ে উঠছে। সমস্ত আকাশটাকেই যেন মাথার ওপর থেকে নিংড়ে বার ক’রে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আকাশ না রইলে, কী থাকবে ওই শূন্যতায়! জায়গাটা কি পাথরের মতো জমাট বেঁধে উঠল? সেই বিপুল পাথরখণ্ডের নিচে মাথা হেঁট ক’রে মানুষেরা শুধু নিঃশব্দে হেঁটে যায়। অথচ যে-কেউ একটা সুর ঠিক মতো লাগাতে পারলেই, পাথর চুরমার। ভাঙা বাক্সের গোঙানিও বন্ধ। আজ হোক কাল হোক, যেকোনও একটা মানুষ কি আর সেটা পেরে উঠবে না? তবে, বিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ হচ্ছে এই যে, আশাবাদ কুহেলিকার পক্ষে ক্ষতিকারক।

৪.
অমোঘ একটা সত্য যদি হঠাৎ এসে হাজির হয়, কেমন দেখতে হতে পারে তার চেহারা! সে কি ধুধু মাঠের মাঝখানে বাজেপোড়া এক তালগাছ? না, কাঁপতে কাঁপতে অলিন্দে এসে-বসা সেই পাখি, যে ঝড়ে পথ হারিয়েছে? সে কি হৃৎপিণ্ড ভেদ ক’রে ছুটে যাওয়া আততায়ীর একটি মাত্র গুলি? না, শূন্য থেকে ভেসে-আসা কিছু পঙ্‌ক্তি, যা কাগজে লিখে ফেলতেই তুমুল স্রোতে ভেসে গেল অদৃশ্যের দিকে? সে কি জ্বরতপ্ত কপালের ওপর একটি শান্ত করতল? না, কুয়াসায় ঢেকে-যাওয়া সেই বাতিঘর, সারেং কিছুতেই যার হদিশ পেল না? হয়তো এই সব সম্ভাবনাই সত্যি। বা, রয়েছে আরও না-বলা সব সম্ভাবনা। কিংবা এসব কিছুই নয়, সে আসলে শুধুই এক পথের বিস্তার। কেবলই চলার হাতছানি।

৫.
বৃক্ষশীর্ষ থেকে শেষ আলোরশ্মিটুকুও মুছে গেছে। শুকনো মুখে শূন্য হাতে ফিরে এসেছে ভিক্ষু। তাহলে নিজেকেই উৎসর্গ ক’রে দিতে হবে আজ, ভাবে সে। গিয়ে দাঁড়াতে হবে খোলা চত্বরে। ক্ষুধার্তদের তো ফেরানো যাবে না। তারা এসে একটু একটু ক’রে কেটে নিয়ে যাবে শরীরের একেকটা অংশ। মাটি অল্প সময়েই লাল হয়ে উঠবে। রেকাবিতে ঠং ঠং ক’রে এসে পড়বে নানা মাত্রার মুদ্রা। কিন্তু আজ আত্মবিক্রয়ের কোনও ফুরসত নেই। এখন শুধু নীরবে দাঁড়িয়ে থাকা নিজের রক্তধারার ওপর। যতক্ষণ চেতনা থাকে। চোখের সামনে থেকে যতক্ষণ না-মিলিয়ে যায় বাকি কাফেলার আঁকাবাঁকা রেখা।

৬.
একটু সামান্য বৃষ্টিতেই কেমন রঙিন হয়ে ওঠে এই পথ। পায়ের নিচে রুক্ষ কাঁকরের আঘাতও আর স্পর্শ করে না তেমন। কতটা যে চলা হল, আর আরও কতটা যে যেতে হবে, তা নিয়ে চুলচেরা হিসেবে আর মন লাগে না। কিন্তু এমন মায়াবী বৃষ্টি তো রোজ হবে না। আকাশও এমন রঙিন হয়ে উঠবে না। তখন কি মানুষের মুখে ফিরে আসবে শাপশাপান্তের ভাষা? কে তাদের মনে করিয়ে দেবে, কেউ তাদের ডাকেনি এই পথে। সকলেই স্বয়মাগত। সবারই হয়তো একটা ক’রে আলাদা আলাদা কাহিনি ছিল। কিন্তু সেসব উপাখ্যান কাঠিমের পাকে গুটিয়ে অশথ ডালে ঝুলিয়ে দিয়েছে তারা। তারপর, নেমে এসেছে এখানে। সেদিন কি তারা জানত, কোথায় যাবে, কোথায় যেতে চায়? কিচ্ছু না, স্রেফ একটা না-জানা উলসানি আকুল ক’রে রেখেছিল সেদিন। মুক্তি, ভেবেছিল তারা। আজ বুঝি মনে হয়, বড় কঠিন এই শব্দের ভার। খেলা থেকে বিদায় নেবে কেউ কেউ। কেউ কেউ তাকিয়ে থাকবে আকাশের দিকে, কবে আবার রঙিন হয়ে উঠবে তা।

৭.
প্রতিটি দ্বিধাহীন পদক্ষেপের আড়ালে রয়ে গেছে শত শত অনিচ্ছা। পরাভবের গাঢ় দাগ আঁকা আছে প্রতিটি অনুপলে। শক্ত ক’রে আঁটা ওই মুঠি, যাকে মনে হচ্ছে একটা বিরাট আত্মপ্রত্যয়ের ইশারা, তা আসলে ধরে থাকতে চাইছে একটি অদৃশ্য করতল। সেই করতল যেন নক্ষত্রখচিত এক টুকরো রাত্রি-আকাশ। বা, বিশাল অশ্রুবিন্দুর মতো একটি স্বচ্ছ নীল হ্রদ। বা হয়তো জ্যোৎস্নায় নেয়ে-চলা এক মাতাল অরণ্য। ভিতর থেকে গর্জন ভেসে আসে দু-একটি পশুর। আসলে সবটাই একটা বিনির্মাণ। আকাশ, সরোবর, জঙ্গল – কারওই কোনও অস্তিত্ব নেই। শুধু এক অদৃশ্য করতল পথিকের মুঠির ভেতর ধকধক করে। ভেঙে পড়ার হাত থেকে বাঁচায়। একটা জলজ্যান্ত শিশুই তাহলে বলা যায় এই পথিক মহোদয়কে। শক্ত ক’রে ধরে আছে সেই করতল, পাছে হারিয়ে যায়। আসলেই যা নেই, তবু না-থেকেও যা উত্তাপ দিয়ে যায়, কল্পনায়।