অতীত ও সত্যজিৎ

প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়

Avant-gardism is a luxury we cannot yet afford in our country. —



SATYAJIT RAY , ‘Our Films, Their Films’





বহুকাল আগেই মৃত, বস্তুত, জীবিত ছিল মাত্র দু-চার দশক: সমান্তরাল ‘নিউ ওয়েভ’ সিনেমা—তবে কবরিত নয়; বিবর্তনের নেক্রোপলিসে শায়িত, হিমায়িত।আত্মজিজ্ঞাসা র আভাগার্ডিস্ট সফরও, লুনি নদীর মতো, ধনবাদী মরুসাগরে্ মুখ লুকোয়। লুকোতে বাধ্য হয়—যেহেতু ভাবাদর্শের টেক্টোনিক শিফট ঘটে গেছে, হঠাৎই, কম্যুনিজমের আগেও ‘পোস্ট’ শব্দটি জুড়ে দেওয়া গেছে, ইতিমধ্যেই-- শেয়ারমার্কেটের কব্জায় চলে এসেছে মুভিবাজার। সন ১৯৮৯—আ-বিশ্ব বাজার জাঁকিয়ে বসেছে ডি-ভি-ডি’র অপ্রতিরোধ্য রমরমা, টেকনোলজিক্যাল বিবর্তনের “ডিজিটাইজড’ উত্তরাধুনিকতায় সরগরম জ্ঞান-বিশ্বের’ নব্য–আন্তর্জাতিকতা। স্টিফেন প্রিন্সের বক্তব্য উল্লেখ করে ডি.এন.রোডোউইক জানিয়েছেন যে ১৯৮৫-র পরেপরেই মার্কিন মুলুকে ভিডিও সুত্রে আয়ের নিরিখে স্টুডিওগুলোর শেয়ারের মূল্যমান ধার্য হতে শুরু করে এবং খোদ হলিউডেই সিনেমা-ব্যবসা বিনোদন ব্যবসায়ী কনগ্লোমারেটদের কুক্ষিগত হয়ে পড়ে। সাদা পর্দা, সাদা আলো, ঘনান্ধকার রঙ্গমঞ্চের রুদ্ধশ্বাস নিভৃতি, অতঃপর, কব্জা করে নিয়েছে উচ্চ-মধ্য-নিম্নবিত্ত বসার ঘরের বৈদ্যুতিন ক্যাথড রে। অথচ—
গ্লোবাল ক্যাপিটালের হাত ধরে, অন্য অনেক কিছুর মতোই—ফটোগ্রাফিও ঢুকে পড়েছিল ভারতীয় মনন-মানচিত্রে; সাহিত্যের কাঠামোকে ভেঙ্গেচুরে পরিপুষ্টি লাভ করেছিল ষাট-সত্তরের আর্ট ফিল্ম। বিদেশি ধারারই অনুসরণে, হয়তো। বলাই বাহুল্য যে বাজার নির্দেশিত একুশের বিনোদন সেই আর্থ-সামাজিক বিশ্লেষণের খোলনলচেটি তাচ্ছিল্যের সাথে পরিত্যাগ করেছে। দুনিয়ার কোনো স্টুডিওতেই কি আর ‘Un Chien Andalou’,‘ফোর হানড্রেড ব্লোজ’, ‘বাইসাইকেল থিফস্‌’,‘দি স্কাই হ্যাজ নো বারস’, ‘রশোমন’,‘আক্রোশ’, ‘পদাতিক’, ‘পথের পাঁচালি"-রা তৈরি হয়, শোরগোল সৃষ্টি করে? উনিশশো সত্তরের ৭০ এম.এম.সাদাপর্দার সুবিশাল পশ্চাতভূমি কব্জা করেছে ‘ডিজিটাইজড’ অভিনবত্বের ইউনিপোলার ‘Jaws’। টেকনোলজির হাতেই নিহত এখন টেকনোলজির অগ্রজ ‘অপর’ সন্তানঃ ‘রূপবাণী’...‘আলোছায়া’... মুভিম্যানিয়া... সিনেমা-পর্যটন।


অবশ্যই—সে এক সময় ছিল যখন সৃষ্টির মূলমন্ত্র ছিল ‘সন্ধিস্বর’। ‘শব্দ’ হয়ে উঠেছিল ‘চিত্র’র ঘরণী—অনতিবিলম্বে যা দুনিয়াদারির ‘সীমাবদ্ধ’ বাস্তুবধর্মীতা সত্ত্বে্‌ও, ‘কল্পজগত’-এর ‘আউটডেটেড’ ‘আওয়ারা’, ‘শ্রী ৪২০’-র মতো “পপ্যুলার” বিনোদনবিন্যাসী একরৈখিক ঝাড়বাতির ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ প্রতিবেশি হয়ে—‘দো বিঘা জমিন’, ‘গরম হাওয়া’-র মতো সেলুলয়েড আখ্যানে রূপান্তরিত হয় কিংবা জীবনজিজ্ঞাসার অন্যপূর্ব মনস্তাত্ত্বিক ভাব ও ভাবনার বহুমুখী ‘মন্তাজ-ঠিকানা’ হয়ে উঠে’ ‘দেবী’,’জলসাঘর’, ’গুগাবাবা’, ’শতরঞ্জ’, ‘আগন্তুক, শাখা-প্রশাখা’-য় পরিণত হয়।বস্তুত,

মাস্ক পরে আছি দুনিয়াসুদ্ধ সবাই! ভরপুর মহামারীকাল এখন। এমন এক মাস্ক, যা আমাদের দৃষ্টিশক্তি, বোধবুদ্ধিকেই ঢেকে ফেলেছে, ফেলছে। আর ভোরের খবরের কাগজে (১/১০/২০২০) সেই আকালেরই অবিসংবাদী প্রতিচ্ছবি। টাইমস গ্রুপের আজকের নিউজ আইটেম— 'উওমেন নট ক্যাপাবল অফ বিয়িং লেফট ফ্রি অর ইন্ডিপেন্ডেট ’।
দুজন মানুষের স্বাভাবিক আদান-প্রদান, যোগাযোগ, দেওয়া-নেওয়ার মাঝখানে পাকাপাকিভাবেই হয়তো গাঁথা হয়ে গেছে (অ)-“সামাজিক” দেওয়াল- আড়াল- নিষেধাজ্ঞা। চার দেওয়ালের মধ্যে বন্দি মানুষের মনে ঝমঝমিয়ে ফিরে আসছে পারস্পরিক দ্বেষ-সন্দেহ-অনাচার-ধর ্মীয় কুসংস্কার। বিদ্ধ-বিধ্বস্ত হচ্ছে মানবিক সৌকুমার্য, আ-বিশ্ব মানবতাবাদ। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যব াদের জায়গা নিচ্ছে ‘মধ্যযুগীয়’ গোষ্ঠীতন্ত্রবাদ। আমরা গ্রস্ত, গ্রহণ-গ্রন্থিত, নিশ্চিত। "একুশশতকীয় ‘না-আধুনিকতার’ এমন রমরমা, হুড়হুজ্জতের আবহে মন নিজের থেকেই তৈরি করে নেয় এক তুলনামূলক পরিসর—আজ বনাম ৫৫ বছর পুরোনো সদ্যস্বাধীন ভারতের নারীমুক্তির বিষয়-ভাবনাঃ ‘ঘরে-বাইরে’, ‘মহানগর’, ’চারুলতা’র চারু- বিমলা- আরতি’র স্বাধীনা ‘তিনকন্যা’ আর সেই সুবাদেই অনুধ্যায়ী অন্তর্দৃষ্টি, অণু-বীক্ষণীয় অত্যাধুনিক অনুসন্ধান ও অনুভবী সাহিত্যগুণসমৃদ্ধ চিত্রনাট্যের অন্যপূর্ব শব্দধ্বনিমাধুর্য্যের অনুরণনের সুত্রে খুঁজে নিতে চাই ‘চলচিত্রী’ সত্যজিৎ-কৃতি।


তিনটি সংলাপ

· কোথায় এলাম রে ? ওগুলো কী রে ?

· অমাবস্যার আলো

· ‘কিন্তু এক হলে কতো তফাত ’...



তিনটি ছবি

· ট্রেনের দৃশ্য(পথের পাঁচালি ) : যে শব্দ-চিত্রপটের মাধ্যমে ‘দেশীয়’ মানুষ সর্বপ্রথম অনুভব করেছিল আধুনিকতার সর্বব্যাপী আগ্রাসন। ক্যারাভানের কাফিলার বদলে যন্ত্রের আগমন। সে যে আগুয়ান,সেই শব্দটি বহুক্ষণ ধরে কানে বাজছিল।সোর্স অব সাউন্ড,থুড়ি,শব্দের উৎসটি আমরা জানিনা।ক্রমে শব্দ + দৃশ্যবস্তুর বিস্ময়, তার অনুভবিক ব্যাপ্তি,তার ‘সর্বব্যাপী’ শব্দ-স্রোতময়তা, আর
তার ‘অপসৃয়মান’একরাশ ধোঁয়া।

· পুরোনো কলকাতা,তার বনেদিয়ানা : দি ইস্ট মিটস ওয়েস্ট মুহূর্ত, (মর্ডানিটি)/ আধুনিকতা আর(ট্র্যাডিশন)/ প্রাচীনত্বের

‘বি’-ফল টানাপোড়েন, মুকাবলা। অতল-নিতল-বিতল অন্তঃস্থলে নিহিত ‘সুপ্রাচীন- সুস্থায়ী- সংস্কারধর্মী’ টেক্টোনিক প্লেটের “অবশ্যম্ভাবী’ স্থানচ্যুতি= বিশ্বম্ভর-ভূপতি- সিদ্ধার্থ- সোমনাথ।


· টাটা সেন্টার : উচ্চতার প্যারাপিটে ভর দিয়ে নিও-কলোনিয়াল ‘শহুরে’ময়দান। পনেরো- বিশ তলা উঁচু স্কাইক্র্যাপারে মাটির হুল্লোড়—তালগোল পাকিয়ে পৌঁছয় । তারা অর্থবহ নয়.১৯৭০-এও নয়.২০২০-এও নয়।তারা ভূতের ঐকতান।দুনিয়াজোড়া বুর্জ-দুবাইগুলো আরো উচ্চতা ছুঁতে চায়,তাই তারা কেন্দ্রিত হয়ে পড়ে,গোষ্ঠীবদ্ধ মানুষ যেরকম—তীব্র, সুতীক্ষ্ণ, সূঁচালো : যে উচ্চতায়


কৃষিবিল নিয়ে হইচই থাকে না। খাবার টেবিলে বসে ‘পারিবারিক’এক মিনিটের নীরবতা : ধনেপাতায় ভুসভুসিয়ে ওঠা সে পুরোনো গন্ধ আর নেই— কেন থাকে না ? এইসব ভেবেটেবেই মদীয় ‘ইহজাগতিক’ দায়িত্ব সমাপন। ভারতবর্ষ দেখেছিল ‘প্রি-কলোনিয়াল’ গ্রেট এক্সোডাস। দু’-পাঁচশ কি.মি. হাঁটা অগুনতি হাঁটুতে কুড়ি-কুড়ির ‘দি গ্রেট ইনফ্লাক্স’ রিয়ালিজম!


তিনটি মন্তব্য

· বার্ট কারডুল্লো : রায়ের ছবিতে কোন নায়ক নেই, ভিলেন নেই; হার-জিত নেই ।

· সত্যজিৎ রায় : ‘I have made political statements more clearly than anyone else, including Mrinal Sen.’(সূত্র—উদয়ন গুপ্তকে দেওয়া শ্রীরায়ের সাক্ষাৎকার)

· সত্যজিৎ রায় :‘My films are stories first and foremost ... Of course a certain amount of commitment is unavoidable. But I never want to be a propagandist. I don’t think anybody is in a position to give answers to social problems— definitive answers at any rate.

Besides no propaganda really works.(সূত্র—কেয়া গাঙ্গুলিঃসিনেমা,

এমার্জেন্স অ্যান্ড দি ফিল্মস অব সত্যজিৎ রায়)।



ধানিলঙ্কার মতো টুকটুকে লাল ঠোঁট বাড়িয়ে টিয়াপাখিটি টেনে আনল একটি সিপিয়া ট্যারট কার্ড— ‘প্লিজ রিওয়াইণ্ড দি টেপ,ড্যাডি’— অপ্রকাশিত এই থিসিস-শীর্ষকটি(সূত্র-ড ি. এন. রোডোউইক- ভার্চুয়াল লাইফ অব ফিল্ম, ২০০৭) কি প্যারালাল সিনেমার ভবিষ্যত সম্বন্ধে সেরা সারমর্ম বিবেচিত হতে পারে না? প্রকৃতপ্রস্তাবে, ফরাসি l’art pour l’art, বা শিল্পের জন্য শিল্প কিংবা ইতালীয় নিও-রিয়ালিজম বা নব্যবাস্তবতাবো্ধের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়েছিল স্বাধীন ভারতের ‘নিউ ওয়েভ’ সিনেমা। সেই নব্য-নন্দনতত্ব অনুসারে শিল্পের কোন রাজনৈতিক বা ধর্মীয় কিংবা অন্য যে কোনোও ধরণের পৃষ্টপোষকতার প্রয়োজন ছিল না। ‘নিউ ওয়েভ’ সিনেমার লক্ষ্য ছিল সিনেমার ভাষা ও আখ্যানবস্তুকে বাস্তবসম্মত/ যুক্তিসঙ্গত করে তোলা। অতএব চিত্রনাট্য সেভাবেই তৈরি করা হত আর এ বিষয়ে পথিকৃৎ ছিলেন স্বয়ং সত্যজিৎ রায়।মনে রাখা দরকার যে তাঁর সমসাময়িক চলচ্চিত্রকারদের মধ্যে একমাত্র সত্যজিতই ছিলেন স্বয়ং এক অতি উঁচুমানের সাহি্ত্যিক,শাস্ত্রীয় ও লোকসঙ্গীত-বিশারদ এবং অনন্য প্রচ্ছদশিল্পী। আমরা জানি যে চলচ্চিত্র শুরু থেকেই সাহিত্যনির্ভর ছিল।আর গল্প বলার নিখুঁত কৃতকৌশলই ছিল সত্যজিত-কৃতির মূল স্তম্ভ। কিংবা ‘ডিটেলিং’-য়ের দিকে অভূতপূর্ব নজর।লহমায় মনে পড়ে “সেন্টিনেল’ কাগজটি বন্ধ ঘোষণা হওয়ার মুহূর্তে প্রেসের দেওয়াল-ঘড়িতে ১০টা ০৯।কিংবা মনুষ্যসৃষ্ট ‘আকালের’ অনুষঙ্গে প্রজাপতি ও বর্ণময় ফুলের উপস্থাপনার সূত্রে প্রকৃতির ‘আনডিস্টার্বড’ শ্রী ও সৌন্দর্যের ‘অনাবিল’ বদান্যতা,তার সুচারু বাখান।


নজর করার মতো বিষয় হল তাঁর ছবিতে কাহিনির বুনটের সঙ্গে পারিপার্শ্বিকতার অনবদ্য তালমেল। পোস্ট-কলোনিয়াল ‘ভারতবর্ষীয়’ আধুনিকতার অর্থ = গুটিকয় বাঁধ, সেচ-ব্যবস্থা বা বৃহৎ শিল্পায়নের যন্ত্রানুষঙ্গ ছিল না। পক্ষান্তরে, নায়কোচিত চরিত্রবিহীন চিত্রনাট্যের প্রধান চরিত্রগুলো হল ‘বিশ্বাস’- মূল্যবোধ- মানবতা- স্ত্রীশিক্ষা ও স্বাধীনতা বনাম খলনায়কসুলভ অবক্ষয়ী সংস্কারাচ্ছন্নতা, যন্ত্র-সভ্যতার বস্তুবাদী অশ্লীলতা অথবা ‘সস্তা’ ‘গিমিক-সর্বস্বতা’। শ্রীরায়েরই লেখা ‘অডস্‌ এগেনেস্ট আস’বইয়ের ৫৮-৫৯ পৃষ্ঠা থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছেন শ্রীমতী কেয়া গাঙ্গুলিঃ— “ What we can do— and do profitably— is to explore new themes, new aspects of society, new facets of human relationships. But if you want to do that, and be serious and artistic about it, you cannot afford to sugar your pill for the masses who are used to tasty morsels of make-believe। অস্যার্থ, সত্যজিৎ বিশ্বাস করতেন যে আমরা নিজেরাই ‘সক্রিয়ভাবে’ অতীতের অংশ হতে পারিনা, নিশ্চিতই, কিন্তু সেই অতীতের দিকে তর্জনী তুলে নানাবিধ প্রশ্ন তুলতে পারি বটে। আর সে কারণেই তাঁর ছবিতে অজস্র সংঘাতে মেতে ওঠে যাপিত অতীত বনাম সদ্যস্বাধীন ‘প্রশ্নমুখর’ বর্তমান। অন্যভাবে বলা হলে—তাঁর ছবিতে উঁচুদরের ডুয়েলে মত্ত হয় করাপশন বনাম নির্ভরতা, আভিজাত্য বনাম সাংস্কৃতিক নবায়ন, অনশন বনাম হোর্ডিং, কৃষ্টি বনাম অনাসৃষ্টি, মন(অবলম্বন)বনাম নিয়ন্ত্রণ(কৌশল), সমাজবাদ বনাম ধনবাদ, সরকারি বনাম বেসরকারি, রাষ্ট্রীয়তা বনাম আঞ্চলিকতা, প্রান্তিক বনাম শাহরিক-য়ের সমাবেশ।সিনেমার ‘আধুনিকতা’-কে,নিও-রিয়া লিজম তত্ত্বকে তিনি স্বাধীনোত্তর ভারতের তথাকথিত “পোস্টমর্ডাণ’ সংরক্ষণশীল/ প্রাচীন / গতানুগতিক / ক্ষয়িষ্ণু আধুনিকত্বের বিরুদ্ধে খুল্লমখুল্লা ব্যবহার করেছেন। শ্রীরায়ের নেতৃত্বে “নিউ ওয়েভ’ আভা-গার্ডিস্ট চিত্রপরিচালকেরা বরং চলচ্চিত্র নামক শিল্পমাধ্যমটিকে সস্তা বিনোদনের ‘ঐতিহ্যশালী’ ধারা থেকে বিচ্ছিন্ন করে নতুন দৃষ্টিকোণের স্বচ্ছতা দিয়ে, প্রাচীন বনাম নবীনত্বের দ্বন্দ্বযুদ্ধে ব্রতী করে সমাজমুখী করে তুলতে চেয়েছিলেন। এবং সত্যজিতের সেই প্রকল্প বহুলাংশেই সফল হয়েছিল। সেই অর্থে তিনি ছিলেন নতুন পথের দিশারী, পথিকৃৎ--ভগীরথ। অথচ, তাঁর প্রতি সদর্থক সৌজন্যটুকুও দেখাতে কুন্ঠিত হতেন তাঁর সমসাময়িক অনেকেই। বলা হত যে রায় ভিন্নকালের, ভিন্নরুচির, (অ)- সমকালের। তিনি যন্ত্রনির্ভর, অমানবিক ধনবাদের কঠোর সমালোচক। সুতরাং, তিনি সমালোচিত হয়েছেন নানাভাবে। এক সাক্ষাৎকারে(সূত্র কেয়া গাঙ্গুলি) মাদার ইন্ডিয়ার সাফল্যময়ী অভিনেত্রী শ্রীমতী নার্গিস বলেছিলেন যে শ্রীরায় নাকি বিদেশে ভারতের ‘বিকৃত’ ছবি তুলে ধরে ভারতকে মলিন-(অ)গৌরবান্বিত করেছেন ।

নার্গিস :— ‘তোমার কেন মনে হয় যে’পথের পাঁচালি’ গোছের ছবিগুলো বিদেশে

জনপ্রিয়তা পেয়েছে?

সাক্ষাৎকারী :- আপনি নিজেই বলুন ।

নার্গিস :- কেননা, বিদেশিরা ভারতকে ‘দুর্দশাগ্রস্ত’দেখতে চায়।ভারতের সেই ছবিটাই

ওদের মনে গাঁথা রয়ে গেছে আর তাই যে ছবি সেরকমই দৃশ্য সাজায়, তাকেই ওরা খঁটি বলে মনে করে ।


সাক্ষাৎকারী :- কিন্তু শ্রীরায়ের মতো একজন প্রথিতযশা পরিচালক তেমন করবেন কেন?

নার্গিস :– শুধু পুরষ্কার জেতার জন্য। বাণিজ্যিকভাবে সফল নয় ওঁর ছবি।

সাক্ষাৎকারী :- শ্রী রায়ের তবে কি করা উচিত?

নার্গিস :– আমার মনে হয় রায়ের উচিত “আধুনিক ভারত’-কে তুলে ধরা।

সাক্ষাৎকারী :- “আধুনিক ভারত’অর্থে কী বোঝাতে চাইছেন?

নার্গিস :– বাঁধ-টাধ!



ঝুপ করে দু-চোখের দখল নিল 'চারুলতা'-র প্রথম ফ্রেম—দাঁত দিয়ে সুতোর বন্ধনী কেটে নেওয়ার পরমুহূর্তেই চারু খোঁজ করছে 'ব্রজ-'র। আমার চেতনাবৃত্তে ওই সুতো ইক্যুয়ালস্‌ টু নিজস্ব যাপিত অতীত,জৈব-জাগতিকতার রেশম কী ডোরি, যে তন্তুটির বয়ন-বুনটে গড়ে ওঠে পরম-আপন ভূ-বিশ্বের এমব্রয়ডারড আদ্যক্ষর "বি"(লক্ষণীয় যে শব্দটি 'ভূ'-এর পরিবর্তে ইংরাজি " B'.। পোস্টমর্ডানিজম-পুনরা ুনিকতা- উত্তর ঔপনিবেশিকতা নিয়ে আমরা কতো হাজারকোটি শব্দচিত্রে কলুর বলদ হয়ে আছি, অথচ শুধু ক্লোজ-মিডশটের অনুভবী নৈপুণ্যে তিনি বুঝিয়ে দিলেন যে ইংরাজ চলে গ্যাছে,ঠিকই; কিন্তু ইংরাজী থেকে যাবে-বঙ্গীয় নান্দনিকতায়—কারুবাসন ায় :নেশা হয়ে, নিখিল আনন্দ হয়ে চিরস্থায়িত্ব পাবে বঙ্গীয় মননে। আর তাই তার প্রাচীনত্বের নাড়ীর বাঁধুনি খুলে ফেলা। চ্যারিটি বিগিনস অ্যাট হোম সূত্রানুসারে জটাজুট ছিন্ন করে বিমলা- সুতপা- আরতি- চারুলতার আবিষ্কার— চৌকাঠের অপরপাড়ে আর্থ-সামাজিক ভিন্‌জগত, তার সীমান্তহীনতা।



আধুনিক প্রযুক্তিকৌশলকে (হার্ডওয়্যার) আর দেশীয় গল্পগাথাগুলোকে (সফটওয়্যার)
আখ্যা দিয়ে শ্রীমতী সঙ্গীতা গোপাল 'সাম ব্রিফ রিফ্লেকশন অন টেকনোলজি, সিনেমা অ্যান্ড দি পোস্টকলোনিয়াল অ্যানকানি' প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন যে মেলিস’-য়ের লাইফ অফ ক্রাইস্ট দেখে দাদাসাহেব ফালকে খুবই অনুপ্রাণিত হয়ে মন্তব্য করেছিলেন যে সিনেমার মতো তাৎক্ষণিক ও উদ্ভাবনী প্রয়োগকৌশলের মাধ্যমে ভারতবর্ষের পুরোনো গল্পগাথাগুলো বা দেব-দেবীর আখ্যানগুলো চিত্রায়িত করাই হল ভারতীয় সিনেমার বিশেষত্ব। সিনেমা নামক আমদানিকৃত ‘প্রয়োগকৌশল’-টির সূত্রেই জাতীয়তাবাদী ও উত্তর-ঔপনিবেশিক ভাবকল্পের বিকাশ ঘটেছিল। এই প্রসঙ্গে (১৮০ ডিগ্রি ভিন্নসুরে যদিও) শ্রীমতী গোপাল অকপটে জানিয়েছেন যে আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার সত্ত্বেও ভারতীয় চলচ্চিত্রে, বস্তুত, হদ্দ পুরোনো, প্রাচীনপন্থী বিষয়গুলোরই চলচিত্রায়ণ হয়েছে। যদিও—টেকনোলজির অর্থ হল প্রগতি ও নতুনত্ব।অর্থাৎ, সিনেমামাধ্যম ও সিনেমার নিহিতার্থ, প্রযুক্তি ও আখ্যানধর্মিতা- বিবৃতির মেলবন্ধন না ঘটায় হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যার-য়ের মধ্যে বিস্তর ফারাক— কৃত্রিম ও খাঁটির দ্বিত্ব-দ্বৈবিধ্য, বাস্তবিক বৈভিন্ন্য বজায় রয়ে গেছে। সুতরাং, বলা যায় যে বাণিজ্যিক বিনোদনের লক্ষ্যে জনপ্রিয় সিনেমার আখ্যানবস্তু, মোটামুটিভাবে, ফর্মূলানির্ভর এবং জাঁকজমকপূর্ণ অতিনাটকীয়তায় পর্যবসিত হয়ে গিয়েছিল। (ফালকের নজরে তা উত্তর-ঔপনিবেশিক হলেও) পুরোমাত্রায় আধুনিক হয়ে ওঠার সঙ্গে এইসব জনপ্রিয় সিনেমার কোনো সম্পর্ক ছিল না। পক্ষান্তরে, আভা-গার্দ নতুন সিনেমার মূল লক্ষ্য ছিল আধুনিক প্রযুক্তির সাহচর্যে-সাহায্যে ভারতীয় চলচ্চিত্রকে সমাজ ও জীবনমুখী করে তুলে বৈশ্বিক দরবারের উপযুক্ত করে তোলা। আর সেই লক্ষ্যে সিনেমায় শব্দ-সংযোজন বিশেষ গুরুত্ব লাভ করে, এমনকি সঙ্গীতও—চিরাচরিত সঙ আর ড্যান্স সিকোয়েন্স বা নাচাগানার মোহজাল ছিঁড়ে, নিছকই শূন্যস্থান পূরণের “জনপ্রিয়’ দাবি-দাওয়া ত্যাগ করে সিনেম্যাটিক বাক্য-অর্থ- ভাষার সহকারী–সহচারী হয়ে ওঠে। ‘গুগাবাবা’-র নাচ-গানের দৃশ্য বা তার অতুলনীয় ‘উদ্ভাবনী’ সঙ্গীতময়তা, ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর—নিশ্চয়ই এক নতুনত্ব, অন্যপূর্ব ও বিরল দিগ্‌দর্শন হিসাবে উপস্থাপিত হয়েছিল। শব্দ যেন সত্যসত্যই চিত্র’-র দয়িতা ; বস্তুত, তাঁরই নির্মিতির সরলতায় শব্দ যেন ‘সর্বপ্রথম’ নিজস্ব বৈভব খুঁজে পায়। শব্দের সাথে ‘স্বনন’ যুক্ত হয়ে এক নতুন ধারার ‘নিও-রিয়ালিজম’ সৃষ্টি হয়; স্টুডিওর নিভৃতিতে ‘সংযোজিত’ পোস্ট-ট্রুথ জাতীয় নির্মিত শব্দরাজি নয়, বরং দৃশ্যের পৃষ্ঠভূমিরই এক অতি আবশ্যিক / ‘অবিচ্ছেদ্য’ অঙ্গ হয়ে ওঠে। এইখানেই ‘সত্যজিতীয়’ গল্প বলার আভা-গার্দ বিশেষত্ব,অভিনবত্ব—যে অনুষঙ্গে পথের পাঁচালির থিম সঙ্গীত পরবর্তী সিনেমার ‘সূত্রধর’ হয়ে ওঠে, ওই ‘রিফ্রেন’টুকু অনেক না–বলা বাণীর আকূলতা নিয়ে হাজির হয়। শব্দ-স্বননের এই তাড়না থেকেই হয়তো, পরবর্তীকালে, সত্যজিৎ নিজেই সঙ্গীতের দিকটি দেখাশোনা করতেন।

পথের পাঁচালির ট্রেন-দৃশ্যটি ভারি ইতিহাসসম্মত ডিটেলিং-য়ে সুমহান। ট্রেন অর্থে আধুনিকতা, গতিময়তা এবং সুদূরের তৃষ্ণা। ট্রেন অর্থে নব-উপলব্ধ ধারণা। মুকুটহীন দুর্গতিনাশিনী দুর্গা। আর তার সঙ্গী নবীন জীবন ওর্ফে ‘অপু’-র মাথায় রাজকীয় রাংতা-মুকুট, চারপাশে কাশফুলের বন। কাশফুল=উৎসবের প্রহর। শব্দমুখর আধুনিকতা ঢুকে পড়ছে আঙ্গিনায়। যন্ত্র আগুয়ান। কিন্তু তার চলন শৃঙ্খলিত, তার চলন সুনির্দিষ্ট। সে এক নতুন বিস্ময়। তাকে ছুঁয়ে-ছেনে দেখা চাই। তার কাছে যাওয়া চাই। অপু-দুর্গাও খুঁজে নেওয়ার সেই দৌড়ে সামিল হয়। ট্রেন আসে ‘পিছ-দিগন্ত’ হতে, হাজির হয় ধোঁয়া উড়িয়ে। সে এগিয়ে যায়, রেখে যায় ‘ক্ষণস্থায়ী’ বিস্ময়।হাওয়ায় ভেসে ভেসে তা সুদূরে মিলায়। দুর্গা-ই টের পায় প্রথম দূরাগত আধুনিকতার “আকস্মিক’ শব্দ-ঝঙ্কার। ‘মহানগর’ ছবির ট্রাম-দৃশ্যের সঙ্গে ‘পথের পাঁচালি’র ট্রেন-দৃশ্যের মধ্যে আধুনিকতার প্রবহমানতার স্বাক্ষর রয়েছে। প্রদর্শিত হয়েছে গ্রামকাহিনীর পরিবর্তন। কলকাতা ততদিনে শহরে রূপান্তরিত হয়েছে। পরিবহণের ধরনধারণ পালটে গেছে। শহরমুখী হয়েছে জন-জীবন। শব্দ-অক্ষর-ধ্বনির চূড়ান্ত এক প্রক্ষেপে সূচিত হয় পরিবর্তন—অপু’র বিস্ময়—“কোথায় এলাম রে? ওগুলো কী রে ?

মহানগর – শুরুতেই দুমিনিট ধরে ট্রাম।কিন্তু ট্রামের কামরা-কাঠামো নয় বরং তার বৈদ্যুতিন পোল, ট্রলি। এগিয়ে চলেছে ট্রাম।তবে,সেই এগিয়ে যাওয়াটা অনুভববেদ্য,পুরো ট্রামটি দৃশ্য নয়।ট্রেন কিন্তু দেখা গিয়েছিল। ৫৫-তে আমরা যন্ত্রসভ্যতাকে আসতে দেখেছিলাম।পুরো চেহারা নিয়্রে সে প্রবেশ করেছিল।ধোঁয়া উড়িয়ে প্রস্থানও করেছিল।ধোঁয়া= জগজিত সিংহের গানের কলিটি মনে পড়ে ঃ ধুঁয়া উঠা হ্যায় / কহী আগ জ্বল রহী হোগী...’ আধুনিকতার মোড়কে মুড়ে রাখা শোষণের ‘আগ’ শেষমেশ ভারত জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। সে অন্য প্রসঙ্গ । ৬৩’-তে আমরা শুধু যান্ত্রিকতার ‘চলন’ দেখতে পারছি। শব্দের ঘটাঙ ঘট কানে ঢুকছে।১৬৯০-এর আগে পশ্চিমের পদশব্দ কান পেতে শোনা গিয়েছিল—হুগলিতে,বেতড়- ে।কিংবা চাঁটগা-সোনারগায়ে।দুর গা (ওর্ফে স্বয়ং উৎসব )টের পেয়েছিল সেই আগমন-বার্তা,তার ঘনায়মান উপস্থিতি; কিন্তু লোকে্ট,থুড়ি,সঠিক অবস্থানটি ঠাওর করতে পারছিল না।পিছ-মহল দিয়ে (কেমন ইতিহাসগন্ধী)তার আগমন ঃ তাদের আলোছায়াময় খেলাঘরের খুব কাছে,একরাশ মূর্তিমান বিস্ময় হয়ে সামনে আসে। তবে দাঁড়ায় না মোটে,চলে যায়।ট্রাম ও ট্রেন দৃশ্যের অবতারণার নৈপুণ্যে এক-দেড়শো বছরের জাগতিক ইতিহাস হাজির।১৮৫৫,ট্রেন হাজির হয়েছিল ভারতীয় যাপনচিত্রের দৈনন্দিনতায়; বৈদ্যুতিন ট্রামের প্রথম পদক্ষেপ ১৯০১-এ । ট্রেনের আসার পথের কোল ঘেঁষে কাশফুলের ‘সুজলাং-সুফলাং’ উপস্থিতি।অর্থনৈতিক পরিভাষায় যার অর্থ হয় কলকাতা তখনও কলিকাতায় পরিণত হয়নি।তবে উৎসবের কাশফুল হাজির।ট্রেনের মতোই ট্রাম লাইন ধরে চলে। তার চলার পথটুকুও প্রি-ডিজাইন্ড।কিন্তু ট্রামচিত্রে সভ্যতার ভিন্নরূপ।ধোঁয়া গরহাজির। পরিবর্তে বৈদ্যুতিক তার,ট্রলি,আবছা শহুরে প্রাসাদ। আর আকাশের ধূসর মজুদ্‌গি।কাপ্লিংগুলো তে বিদ্যুতের ঝিলিক। সংঘাতের দ্যোতনা কি?। চলমানতার ফলে ঘর্ষণ,বিদ্যুতের বিচ্ছুরণ কিন্তু যান্ত্রিক উপস্থিতির "সার্বিক" চেহারাটি,সর্বাঙ্গীণত বিহীন।ট্রামের সঙ্গে শহরাঞ্চলের সরাসরি সম্পর্ক,গ্রামীণ ভিত্তি নেই।বামুনের উপবীতের মতো ট্রাম হল কলকাতার নিজস্ব পরিচিতি।

ষাট-সত্তরের অভাবনীয় রাজনৈতিক অস্থিরতার সঙ্গী হয়েছিল অর্থনৈতিক ডামাডোলের সাঁড়াশিফন্দি। স্ট্রাইক- লকআউট- লোডশেডিং- ছাঁটাই- পণ্যঘাটতি- উৎপাদনশূন্যতা- মুনাফাহ্রাস- মূল্যবৃদ্ধি- খাদ্যাভাব- গেটমিটিং- পেটো-পাইপগান- পি.এল.৪৮০... সারা কলকাতা জেনে ফেলেছিল যে কোন দেওয়ালের মালিক কোনদল—ওয়াই-সি নাকি বেলচা-কাস্তে-হাতুড়ি!দে ওয়াললিখনের পারমানেন্ট সেটেলমেন্ট নথিবদ্ধ হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাচীরগাত্রের বকলমে 'প্রতিদ্বন্দ্বী'র প্রথম সিনের ইতিহাস-পঞ্জীতে। কলকাতার আকাশে-বাতাসে তখন নতুন করে পার্টিশনের জের, যুদ্ধের দামামা ফের, উদ্বাস্তুর ঢের। কান পাতলেই হয়তো আজো শোনা যাবে—‘মাগো,ফ্যান দাও!’-এর পুনর্চক্রিত কান্না, শান্‌কি-শাদায় জোলো খিচুড়ির সুবাসেই খুশি মুখ-চোখের সুহাস, হাতদুটোয় ই.আর/ বি.এন.আর-এর দ্রুতি,তার শব্দ হুসহাস, নকশালিজমঃ তার বিপ্লব-ভাবনা, ‘দি অ্যাগনি অব অয়েস্ট বেঙ্গল’-র বুকফাটা যন্ত্রণা,কেন্দ্রের বঞ্চনা ,রেলকম ঝমাঝম ‘হাতেলি পে জান’ চালওলি,অফিসকাছারিতে নিযুক্ত মহিলা-ব্রিগেড,’ছোটো ছোট মানুষের ছোট ছোট আশা,এ হল সেইসময় যখন কলকাতার আকাশ থেকে মুছে যাচ্ছে কলকারখানার ধোঁয়া। দেশভাগের ভ্রান্ত রাজনীতির ফলস্বরূপ অর্থনৈতিক লিউকোমিয়ায় আক্রান্ত ‘সিটি অব মাইগ্রান্টস’ কলকাতা। ভুঁইফোড়ের শহর ছেড়ে দূরদেশের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমায় সিদ্ধার্থ, জীবন ও জীবিকার সন্ধানে,আরতি পথে নামে।ঘর থেকে বাহিরে, আর বাহিরে গিয়ে ‘ঘরে’। যন্ত্রণাও এক, কিন্তু ফলবিচারে কতো তফাত!

প্রখ্যাত মনস্তাত্ত্বিক শ্রী আশিস নন্দী তাঁর 'An ambiguous journey to the city' বইতে সত্যজিতের 'পথের পাঁচালি' সম্বন্ধে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছেন যেমন শ্রীরায় আদ্যন্ত একজন শহরবাসী ছিলেন।সিগনেট প্রেসের হয়ে বিভূতিভূষণের "আম আঁটির ভেঁপু'র জন্য ইলাসট্রেশনের কাজ করার সময় তিনি গ্রাম-বাংলা সম্বন্ধে উৎসাহী হয়ে পড়েন।উনিশশো ষাট ঃ তিন-চতুর্থাংশ ভারত তখন গ্রামাঞ্চলে থাকে।ইংলন্ডের শতকরা ৯০ ভাগ শহর/নগরবাসী। ঔপনিবেশিক কাজকর্মের দৌলতে উনিশ শতকে গুটিকয় নগর-ব্যবস্থার সৃষ্টি হয়।সেগুলো ছিল প্রেসিডেন্সি টাউন।এর ওপরে ছিল গ্রামব্যবস্থার সম্পূর্ণ বিপরীতার্থক কল্পজগত—বৃহৎ নগর=অর্থনৈতিক কাজকারবারের কেন্দ্রভূমি বা মহানগরী।বলা হয়,সত্যজিৎয়ের ‘পথের পাঁচালি’ হল গ্রাম-ভারতের প্রকৃষ্ট নিদর্শন। ইন্ডিয়ান ভিলেজ মানেই হল রায়-এর ভিলেজ। সেক্ষেত্রে,নন্দী প্রশ্ন তুলেছেন যে

১)সত্যজিৎ রায় তাঁর গ্রামকে কোথায় খুঁজে পেয়েছিলেন ?

২)সম্যক পরিচয়ই যদি না থেকে থাকে,তাহলে তাঁর কল্পিত গ্রামচিত্রটি কীভাবে তাঁর সমসাময়িক মনন-চিন্তনকে, সম্পূর্ণত, প্রভাবিত করেছিল? তবে কি, শ্রী রায় মূল কাহিনিটির ওপরই খুব বেশিমাত্রায় নির্ভরশীল ছিলেন?
অথবা তাঁর দর্শকমহলেও গ্রামাঞ্চল সম্বন্ধে যথাযথ ধারণা ছিল না ?


নির্বাক চলচ্চিত্রের গুণমুগ্ধ অনুগামী ছিলেন সত্যজিৎ।স-বাক সিনেমার দিনকাল শুরু হবার পর হলিউড বা অন্যত্র সাহিত্য-নির্ভর কাহিনিচিত্র গড়ে ওঠা শুরু হয়। সেই ধারারই অনুসরণে বিভূতিভূষণের 'আম আঁটির ভেঁপু' শীর্ষক কাহিনি অবলম্বনে সত্যজিৎ ‘পথের পাঁচালি’ চলচ্চিত্রটি বানান। তাঁর সমসাময়িক চলচ্চিত্রকারদের সঙ্গে সত্যজিৎ রায়ের মনন-মানসিকতার এক সবিশেষ পার্থক্য হল যে বাংলা সাহিত্যজগতে সত্যজিৎ স্বয়ং একজন অত্যন্ত বড়োমাপের সাহিত্যিক ছিলেন। ফলে সাহিত্যের অন্তর্নিহিত সুষমা-নান্দনিকতার বিষয়ে গভীরভাবেই ওয়াকিবহাল ছিলেন, যে কারণে আদ্যন্ত শহরবাসী হয়েও তাঁর পক্ষে অনবদ্য পল্লিচিত্র তুলে ধরা সম্ভব হয়েছিল।

২০২০। নানান সভা- সিম্পোসিয়াম- জ্ঞানগর্ভ আলোচনার ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকের আবহে, ফুল- মালা- চন্দনের ভরপুর আয়োজনে, শ্রীরায়ের শতবর্ষ উদযাপিত হবে।কিন্তু আশীষ নন্দী কিছু অক্ষরচিত্র এঁকেছেন। একটু নিবিষ্টচিত্তে আমরা কি প্রদক্ষিণ করব সেই শিলালিপি? নন্দী মনে করেন আজকের ভারতবর্ষে গ্রামজীবন নিয়ে কেউ আর চিন্তিত নন। সাতলক্ষ গ্রাম ছিল ভারতীয় উপমহাদেশে—১৯১১-য়, কবিগুরু- মহাত্মার কালে। চারলক্ষে নেমেছে তা—হালে। আগামীদিনে, পশ্চিমের নকল করে, বিশ্বায়নের হৈ-হুল্লোড়ে-প্রভাবে-প্ রকোপে বাকিবকেয়া গ্রামগুলোর অর্ধেকও হয়তো নগরায়ণের বলি হবে।ভারতীয় মন ও মানসিকতায়,নন্দী লিখেছেন, গ্রাম হল সেই এলাকা যেখানে অস্পৃশ্যতা এখনো বিরাজমান, অনুষ্ঠিত হয় ‘সতী’,জাতপাতের-ধম্মের বিচার-আচার পালিত হয় মহাগৌরবে যেখানে...unless the civilized intervene, the inhabitants continue to pursue the sports of homicide and robbery.' তাই আজ কোনো প্রযোজকই হয়তো পথের পাঁচালি বানানোর ঝুঁকি নেবে না!(কিন্তু,সেদিনও নিয়েছিল কি?)নন্দী লিখেছেন যে বৌয়ের’’গয়না বন্ধক রেখে ওই ছবি বানিয়েছিলেন সত্যজিৎ রায়।পড়া যাক বঙ্গীয় আত্মদর্শন—‘Today, no film producer will finance a project like Pather Panchali--- in this respect nothing has changed since 1955, when Ray made his film, but worse , no promising young filmmaker will choose to film something like Pather Panchali , or like Ray, pawn his wife's jewellery to do so. It is an open question whether that change has enriched or impoverished India's public culture.

চারুলতা-র রোজনামচায় সামান্য নজর বুলোলেই চোখে পড়ে (“সে-কালের’?) মেয়েদের রুদ্ধদ্বার জীবন। কিংবা একুশশতকীয় টাইমস্‌ প্রস্তাবনার রং-ঢংয়ে লুকানো সেকাল-একাল-আগামীর’ ‘শৃঙ্খলিত’ তিনকাল= বাইরের দুনিয়ার সঙ্গে মেলামেশার ব্যাপারে দু-হাজার বিশ-এর ‘প্রস্তাবিত’ সামাজিক প্রতিবন্ধকতা। কলোনিয়াল আপ্সটার্ট সমাজেই যদি এই হাল- হালত- হকিকত, তো অধিকাংশ(শতকরা ৯০%)মানুষের তো কথাই ওঠে না। খিড়কির বাইরে যে জগত, সাধারণের ব্যবহার্য যে সড়ক, সেখানেও কেবল পুরুষের আনাগোনা। লংশটে দড়িবাঁধা (অপসৃয়মাণ) বাঁদরের উপস্থিতি। ঘটনাচক্রে, গণ্ডিবদ্ধ বসতঘর- বারান্দার পরিচিত দৈনন্দিনতা /নিত্যনৈমিত্তিকতা ছেড়ে বাইরে আসে চারু, কিন্তু অভিজাত চৌহদ্দি ছেড়ে বড়ো সড়কের অংশীদার হিসাবে নয়— নিম্নবিত্ত- উদবাসিত আরতি যেভাবে ‘মহানগর’-এর সড়কে নিজেকে স্বাধীনভাবে মেলে ধরতে পেরেছিল। ‘মর্ডানিটি, গ্লোবালিটি, সেক্সুয়ালিটি এণ্ড দি সিটি’ শীর্ষক প্রবন্ধে (সূত্রঃ ‘গ্লোবাল সাউথ’ পত্রিকা,বসন্ত-২০০৮) বৃন্দা বসু মন্তব্য করেছেন যে—“opera glasses in her hand signify modernity,’। কিন্তু সেই মর্ডানিটি তো চারুর নিজস্ব নয়। সেই মর্ডানিটি একটি মাধ্যম, যা অন্যত্র লুকানো থাকে। অন্য ঘরের দেরাজ থেকে সেই ‘মর্ডানিটি’-কে খুঁজে আনতে হয়। আর নিজস্ব বৃত্তে ফিরে আসার পথে সেই মাধ্যমটি ‘বেশ দেখনদারির’ সঙ্গে বয়ে নিয়ে আসে: অর্থ হয়— সেটি একটি প্রদর্শনীর সামগ্রী; তাই গর্বের ধন, অহংকারের বস্তু। এ এক অনবদ্য ইতিহাসচারিতা। অনুবীক্ষণীয় ইতিহাস-লগ্নতা। সত্যজিতের ক্যামেরায় ধরা পড়েছে সেই ভারত যা ট্র্যাডিশন- মুক্ত হয়ে আধুনিকতার পথে হাঁটতে আগ্রহী। আরো নিবিড়ভাবে খুঁটিয়ে দেখলে মর্ডানিটি বা আধুনিকতার সেই মাধ্যমটি অন্যত্র কোথাও রাখা আছে— সে সম্বন্ধেও চারুর পূর্বানুমান রয়েছে। বাইনোকুলারটির সুত্রে আরো প্রকট হয়ে ধরা পড়ে যে মর্ডানিটির মাধ্যমে যে কোনও দূরের জিনিসকে কাছে পাওয়া যায়, আরো গভীরভাবে কোনো বস্তু বা বিষয়ের পর্যবেক্ষণ সম্ভবপর হয়ে ওঠে। গূঢ় ক্রোধমিশ্রিত বিস্ময়বোধ থেকে চারু সেই পর্যবেক্ষণ শক্তিটি ক্রমশ মিলিয়ে যাওয়া ভূপতির ওপর প্রয়োগ করে। ব্যক্তিগত পরিসরে বন্দি ভূপতি বস্তুত চারুর উপস্থিতিকে বিন্দুমাত্র গুরুত্ব্ না দিয়ে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে যায়। চারুও যেন তার প্রতি অমন অবহেলা- তাচ্ছিল্যবোধকে আরো গভীরতার সঙ্গে পরীক্ষা বা স্টাডি করতে চেয়ে অপসৃয়মান ভূপতির ওপর দূরবীণটিকে ব্যবহার করে। ক্লোজ-আপে আমরা ভূপতির মুখমণ্ডলটির ছবি দেখতে পাই। চারু-অমল-মন্দাবৌঠানের ত্রিকোণী উপস্থিতিতে উচ্চারিত হয়েছে নারী-জগতের নব্য-বিভাজিত গোলার্ধ—“প্রাচীনা” আর “নবীনা’। এবং এক অতি সূক্ষ্ম কন্ট্র্যাডিকশনের মাধ্যমে দৃশ্যটির অবতারণা করা হয়েছে। নবীনা শাস্ত্রজ্ঞ, নবীনা সঙ্গীতে রুচিসম্পন্না। কিন্তু তার হাতেই পরিচালক তুলে দিয়েছেন অতি পুরাতন এক নিদর্শন: অতি পুরানো এমব্রয়ডারি শিল্প—সুতো আর বয়ন-বুনটের চিরচেনা জগত। ভারী ইন্ট্রিগিং কৌশলে সিনেমাটির প্রথমতম দৃশ্যে নবীনা বহুযুগ ধরে চলে আসা বয়নবুনটের কাজটি শেষ করছে, দাঁত দিয়ে সেই বাঁধন কেটে নতুনত্বের সূচনা করছে।ইতিহাসের দিকে তাকালে পাই যে খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকের শক বা সিদিয়ানদের কাছ থেকেই সবচেয়ে পুরানো সূচিশিল্পের নিদর্শন পাওয়া গেছে। এছাড়াও, সোনা দিয়ে মোড়া বাইজান্টিয়াম সূচিশিল্প কিংবা চীনা তাং বংশের (৬১৮-৯০৭ খ্রিস্টাব্দ) এমব্রয়ডারির নমুনার ঐতিহাসিক প্রমাণ রয়েছে। ভারতবর্ষেও সূচিশিল্প একটি অতি প্রাচীন শিল্প, বিশেষত মুঘল জমানার সূচিচিল্পের ঢের ঢের ঐতিহাসিক নিদর্শন পাওয়া যায়। সতেরো শতকে সেইসব শিল্পসম্ভার ইওরোপের বাজারে প্রধান রপ্তানিদ্রব্য ছিল।

শ্রীরায়ের অন্যপূর্ব-অনন্য ইতিহাসবোধের স্বাক্ষর রয়েছে ‘চারুলতা’ সিনেমার প্রথম ও শেষ দৃশ্যে। এ ছবির প্রথম উচ্চারিত শব্দ হল ’ব্রজ’। সেই উচ্চারণটি ছিল একটি খোঁজ, একটি অনুসন্ধান। কেননা ব্রজ ধারেকাছে কোথাও নেই। শেষদৃশ্যের অবতারণায় কানে আসে— ‘ব্রজ,বাতি নিয়ে এসো।’ অতঃপর,‘ব্রজ-র নির্বাক উপস্থিতি। ব্রজ-র হাতে লণ্ঠন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘নষ্টনীড়’ গল্প অবলম্বনে সত্যজিত রায় ‘চারুলতা’ ছবিটি বানিয়েছিলেন। কিন্তু এই দুই দৃশ্যের বুননসৌন্দর্যে তিনি যেন স্বয়ং লেখককেও ছাপিয়ে গিয়েছন। ব্রজ কি প্রাচীনতা- কন্টিনিউটি- ট্রাডিশ্যনালিটি- সংস্কারের প্রতিভূ? চারু মানসিকভাবে ধ্বস্ত। জর্জরিত। বিবাহ–বহির্ভূত সম্পর্ক বা নব্য-আধুনিকতার মোহে প্রতিষ্টিত এবং সু-শৃঙ্খলিত সামাজিকতার গণ্ডি ডিঙ্গানোর বিষয়টি সুখকর সমাপ্তির দিকে এগোয়নি। এমনকি যথেষ্ট সম্ভাবনা সত্ত্বেও তার লেখক সত্তা যেন অবদমিতই থেকে যায়। মূর্তিমতী ‘অমাবস্যার আলো’। যা প্রকাশহীনা, যা অসুর্যম্পশ্যা, যা নিষিদ্ধ। আলোও যে নেই, তা নয়। স্বাধীনতা আছে, চিহ্নমাত্র হয়ে, চৌকাঠের এপারেই। তাই প্রাচীনত্ব-নবীনত্বের মাঝখানে ক্ষীণধারা সরস্বতীর মত সংস্কারের স্রোত বহমান থাকে। বিশ্বস্ত,অনিবার্য। তা অমুচ্য, তা দুরপনেয়, তা অবশ্যম্ভাবী।