গল্পগুলো বলে যেতেই হয়

তমাল রায়

'তোমায় বেঁচে থাকতে গেলে গল্পগুলো বলে যেতেই হবে। সে কেউ শুনুক বা না শুনুক।' এভাবেই উদাস দুপুর শুনিয়েছিল পচাপুকুর ও কলোনিমাঠের গল্প। কলারে হ্যাঁচকা টান পড়তে,গিয়ে বসেছিলাম পুকুরপাড়ে। শ্যামলীদি,শেফালিদি সদ্য স্নান সেরে গেছে,পুকুরপাড়ে তাদের পায়ের জলছাপ তখনও স্পষ্ট। আলাপ হল গুবরে পোকা আর হাঁড়িচাচার সাথেও। ওই কথা,কথারা আর আমি,আমরা যেভাবে বড় হয়ে উঠি এই কথাজন্মে।

কথাজন্মের সমস্যা এই,তা কিছুতেই দূরবর্তী থ্রু ট্রেন,বা আগুন কিছুই আঁচ করতে পারেনা। তুমি,আমি,আপনি,তুই- যারা লিখিটিখি,তাদের জগত তো কথা-শিশমহল। অথচ কাঁচের ভিতরেও রয়ে গেল প্রাণ,তার শব্দ ভাষ্য হয়ে তোমার কাছে ধরা দিচ্ছেনা। সে তার দোষ,না'কি তোমার আমার?
তুমি তো জানতেই বল,নির্দিষ্ট কম্পানাংকের বেশি না হলে তা শব্দ হয়না। ধর মশা,ডানা যদি খুব দ্রুত না নাড়াতো,শুনতে পেতে,ডানার শব্দ? ধর তুমি হাত ঘোরালে সাঁই সাঁই শব্দ তখন হবে,যখন তোমার হাত ঘুরবে অতি দ্রুত। তার আগে নৈব নৈব চ! সে কথাই বলছিলাম। ধর ২৯ সেপ্টেম্বর,২০২০। পবিত্র অগ্নি পুড়িয়ে দিচ্ছে দলিত মেয়েটিকে। কে পোড়াচ্ছে? রাষ্ট্র। কেন? প্রমাণ লুপ্ত করতে। কেন করছে? দলিত কন্যাটিকে ধর্ষণ করেছে চার ঠাকুর সম্প্রদায়ের নষ্ট ঘৃণ্য জহ্লাদ। তুমিই বল,সেই অগ্নিদহনের কোথাও কোনো শব্দ ছিলোনা? না'কি তুমি শুনতে পাওনা সে সব শব্দ? মেয়েটির অপরাধ কী? গোরুর জন্য ঘাসবিচালি আনতে গেছিলো। তারপর ওর জিভ কেটে নেওয়া হল,তুমি শুনতে পেয়েছিলে সে শব্দ? ভেঙে দেওয়া হল মেরুদণ্ড,শুনতে পাওনি তাই না? দোপাট্টা বেঁধে একে একে চার রামভক্ত মেয়েটিকে...রাম রাজ্যে যেমন ঘটে। দিনটা ১৪ সেপ্টেম্বর। সোমবার ভরদুপুর,শহর কলকাতা বা ঢাকা তো অনেক দূর। দিল্লি থেকে আড়াই ঘন্টার পথ। সাড়ে তিন হাজার বছরের প্রাচীনতম সভ্যতার আরবান রাজধানী শুনতে পেয়েছিলো সেই আর্তধ্বনি? রাষ্ট্র শাসকের না প্রজারও? অথচ রাজা! সে দায়িত্ব নিয়ে পুড়িয়ে দিচ্ছে ধর্ষিতার দেহ,আটকে দিচ্ছে গণতন্ত্রের চতুর্থস্তম্ভকে। যাতে এই লজ্জা সংবাদ না হয়। লজ্জা কি সত্যি? না'কি ক্ষমতার দম্ভ? আচ্ছা বল লজ্জার, দম্ভের কি শ্রাব্য রূপ আছে? দম্ভ কি হিরো হতে পারে?
'যে কোনো স্বপ্নই আসলে ভাষা-হরফের বিনির্মান। তবে সমস্ত হরফিত ভাষাই স্বপ্ন নয়।'
ধর তুমি চা খাচ্ছো,ধোঁয়া উঠছে চা থেকে। সামনে মেলে রাখা প্রভাতী সংবাদপত্র। একটা শেষ না হওয়া মাল গাড়ি চলতেই থাকছে...কন্টেনারের মাথায় বসে দুটো শালিখ,পরস্পরকে কথা বলছে,বা বলার চেষ্টায়...এটি দৃশ্য। এই দৃশ্যের একটি ভাষ্য লিখেও ফেললাম। তা কি স্বপ্ন হল? না। ধর,তখন দুপুর ,দুপাশের মকাই ক্ষেতের মাঝ বরাবর চলে গেছে আলপথ। খালি পায়ে কোমরে দোপাট্টা বেঁধে এগিয়ে যাচ্ছে দলিতকন্যা। যেতে যেতে কথা হল,ছড়িয়ে থাকা পাখিদের সাথে যারা খুঁটে খাচ্ছে খাবার। ওপাশে ভীমচাচা ক্ষেতে পানি দিচ্ছে। সে দেখলো। তারপর নেমে গেল পাশের নাবালে। ঘরের গৃহপালিত নিরীহ প্রাণীদের জন্য ঘাস বিচুলি নিতে এসেছে সে। এক মনে কাটছিলো। মাথায় রোদের তেজ প্রবল। কাজ শেষ। যে পথ দিয়ে এসেছিলো। সে পথেই ফিরবে। তেমনটাই হবার কথা। হল না। ফেরার পথেই ধরলো ওরা। ঝাঁপিয়ে পড়লো চারজন মানুষ। ঠাকুর সম্প্রদায়ের তাই হয়ত একটু বেশি মানুষ! আর একে একে নেমে এলো মেয়েটির শরীরের ওপর। এটি একটি দৃশ্য। স্বপ্ন নয়। এমন ভয়াল গা ঘিনঘিনে দৃশ্যকে দুঃস্বপ্ন বলে বটে কেউ। যুদ্ধের প্রকৌশল থাকে,নৈতিকতা থাকে। এ এক নীতিহীন যুদ্ধক্ষেত্র। তা বলে ভেবোনা,ওই যন্ত্রণাকাতর শরীর ভাষাহীন,প্রতিবাদহীন। ওই যে গোঙানি উঠে আসছে ওর নিস্তেজ শরীর থেকে,দৌড়ে এসেছে মা,তাকে তুলে নিয়ে যাচ্ছে ভাই,প্রতিটি দৃশ্যই আসলে নির্বাক,ছোট জাত,তাতে কী! আসলে জানো নিরীহ হতদরিদ্র মানুষ নিজের হরস্কোপ নিজেই লেখে। ওরাও এ দৃশ্যে সেগুলিই লিখে যাচ্ছে...লুকিয়ে পড়ছে বীরপুঙ্গব বড় জাত! কিছু পর রাষ্ট্র,না'কি ধৃতরাষ্ট্র(!) এসে বীরপুঙ্গবদের ঢাল হয়ে দাঁড়াবে। সে দাঁড়াক,এই গোঙানি,ভাই আর মা'র নীরব অথচ প্রাণ বাঁচানোর চেষ্টার দীর্ঘ দৃশ্যটিতে সংযোজিত হতে বাকি,আলিগড় হাসপাতাল,সফদরজং ফের দেহ ফিরে আসছে,সেই ক্ষেতে। আর ২৯ সেপ্টেম্বর রাতে এক নির্লজ্জ,বেহায়া দুকান কাটা রামরাষ্ট্র যারা রাত আড়াইটেয় পবিত্র অগ্নিতে নিক্ষেপ করছে মেয়েটিকে। এই দীর্ঘায়ত করুণ যন্ত্রণাদগ্ধ দৃশ্যমালা ইতিমধ্যেই নির্মাণ করেছে,একটি স্বপ্নকে। তা স্থান কাল পাত্র নির্বিশেষে নির্মাণ করছে এক হিরোর।
প্রকৃত হিরো কিন্তু হিরো(হিরোর লিঙ্গ বিভাজন একটি গর্হিত কাজ) হব বলে জন্মায়না। সে আর সকলের মতই ভীড়ে মিশে থাকা,ভীতু অতি সাধারণ মানুষ। কালচক্র,যাকে ঘটনা বা দুর্ঘটনা বলেও আখ্যায়িত করা যায় তার মধ্যে দিয়ে সে হয়ে ওঠে হিরো। হাথরাস বা বেগমগঞ্জ,নোয়াখালিও যেভাবে হয়ে উঠলো হিরো।
যারা ভাবছিলেন হাথরাস থেকে বেগমগঞ্জ নোয়াখালি,কোথাও শ্রাব্যতা নেই! এত এত কান্না তার কোনো ভাষ্য,শ্রাব্যতা নেই? প্রতি ১৬ মিনিটে নারীর ওপর নেমে আসছে নির্যাতন,এই উপমহাদেশে,তার শ্রাব্যতা নেই,তারা ভুল ভাবছিলেন।
প্রবল নিরীহ,ভীরুও সাহসী হয়ে ওঠে যখন সে বোঝে প্রতিপক্ষ ভয় পেয়েছে। আর সাহসের আছে হরফ,কথা ও কথামালা। এবং স্বপ্ন।
কথাজন্মের সমস্যাগুলো কাটিয়ে তখন সে বুঝে ফেলছে আগুন বা মধ্যরাতের থ্রু ট্রেনের ব্যথা বা প্রতিবাদী গল্পগুলো।
কথারা আবার বন্ধু প্রিয়,তাই একা আসেনা। সদলবলেই...পরিযায়ী সহস্র ঘরমুখী মরে যাওয়া নিরীহ তখন উঠে দাঁড়িয়েছে,আর সে মিছিলে পা মিলিয়েছে
জয়ন্তী মঙ্গলা কালী ভদ্রকালী কপালিনী।
দুর্গা শিবা ক্ষমা ধাত্রী স্বাহা স্বধা...
মধুকৈটভবিধ্বংসী বিধাতৃবরদে
রূপং দেহি জয়ং দেহি যশো দেহি দ্বিষো জহি
মা। সাথে হাথরাস বা বেগমগঞ্জের মত শত সহস্র নিপীড়িত কন্যা জায়া…
উৎসব আসছে...মনে রাখাতে,
বাঁচতে তোমায় বলে যেতে হবে তোমার গল্পগুলো,সে কেউ শুনুক বা না শুনুক,কারণ ভবিষ্যতের গর্ভেও লুকিয়ে আছে অতীত ও বর্তমানের ব্যথা-কালচেতনাময় কথার অখণ্ড আকাশ,তা কখনোই মিথ্যে হতে নেই।