বিকেলের পি এন পি সি, হারিজ যাদপেটিয়া আর রতন কাহার

কুন্তল মুখোপাধ্যায়

আমার জন্মের আগে যেসব ঘটনা ঘটে গেছে , সেগুলো কি আমার অভিজ্ঞতার মধ্যে পড়ে না ? অথবা এমন মানুষ যাকে আমি কখনও দেখিনি , কথা বলিনি , তিনিও কি আমার অভিজ্ঞতার মধ্যে পড়েন না ? অভিজ্ঞতা কাকে বলে ? কান্ট সাহেব কী বলবেন ? আমার জন্মের আগের সমস্ত পথ কি তাহলে রুদ্ধ হয়ে গেছে ধোঁয়া ধুলো আর কুয়াশার ভিতরে? অথবা জন্ম কাকে বলে ? শারীরিকভাবে জন্ম নেওয়াই কি জন্ম ? নাকি জেগে ওঠা ? নাকি সচেতন হয়ে ওঠার আর এক নাম জন্ম ?
আমার জন্মের আগেও তো এমন মানুষ অনেকেই এসেছেন যারাও পথ হেঁটেছিলেন... সবার কি ইতিহাসে স্থান হয় ? সে এক মহাকালের ট্রেন যেখানে সবাইকে স্থান দেওয়া যায় না ! অন্তত সাধারন মানুষদের তো নয়ই ! তাহলে তাদের কি বাঁচার কোন অর্থই নেই ? তাদের নিয়ে কোনও গল্প বা কাহিনী কি লেখা হবে না ? হবে তো ! কিন্তু সেটা ঐতিহাসিকেরা লিখবেন না , লিখব আমরা সাধারন মানুষেরা । যদি তাঁদের নিয়ে কেউই না লেখেন ? তাতে কী ? অসংখ্য এলোমেলো গল্পের মধ্যে জমে উঠবে আমাদের যাপন । শীতের দুপুরে অথবা বর্ষণক্লান্ত কোনও বিকেলে আকাশ যখন কথা বলতে চাইছে তখন এইসব চরিত্ররা আসবে । হাওয়ায় ভেসে থাকবে । এখানে ওখানে । কারণ মহাকালের ট্রেন ধরতে তাঁরা পারেননি । ইতিহাস বই থেকে খুব দূরে তারা পা ছড়িয়ে বসবে পি এন পি সি’র গল্পে , মা-মাসিমাদের স্মৃতিচারণে ।
জবা কাকীমা স্বামী মারা যাওয়ার পর কী কষ্টে , বেদনায় গড়ে তুলেছিলেন তাঁর নতুন সংসার তাঁর বাবার বাড়িতে । কীভাবে তাঁর বদরাগী বাবা এবং তাঁর নিজের প্রখর বুদ্ধিমত্তা -----এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রেখে বাবা-মরা দুই ছেলেকে আর মেয়েকে তৈরি করেছিলেন অথবা ঝরণা মাইমা তাঁর নকশাল প্রেমিকের সঙ্গে ঘর করতে এসে একরকম মেনে নিয়েছিলেন তাঁর সংসারের স্বপ্নে কোনদিনই তাঁর স্বামীর যোগদান থাকবে না ... ফলে একাই লড়াই করতে করতে শহরে একখানা বাড়ি করা ,মেয়েকে আর ছেলেকে পড়াতে পড়াতে আর পরিবারের প্রতি কর্তব্য করতে করতে হঠাৎ একদিন লক্ষ্য করলেন তাঁর ছেলেটি ড্রাগ এডিক্ট হয়ে গেছে আর তার সঙ্গে লড়াই করতে করতে তাঁর ছেলেকে হারিয়ে ফেলা ----- এসব তো ইতিহাসের অংশ হবে না , তবু এইসব মায়েরা কি অপেক্ষা করে থাকবেন কবে তাঁদের নিয়ে কোন ভাবুক কলম লিখে যাবে ? যদি তাঁদের নিয়ে কেউই না লেখেন ? তাহলে কি পরনিন্দার গল্পেই তাঁরা অমরত্ব পাবেন ! কিন্তু পরনিন্দার গল্প তো কখনও শাশ্বত হয় না ! তার বলার কথাটি প্রায় একই রকম । কিন্তু ঘটনা কেবলই পালটায় ! তাহলে কি তাঁদের এমন বেঁচে থাকা শুধু সময়ের শ্বাস প্রশ্বাসের সঙ্গে হাওয়ায় মিলিয়ে যাবে ?
মনে হয় না সেটা । ইতিহাস বইয়ে না থাকলেও সে থাকবে আমাদের বেঁচে থাকায় । বিশেষত যখন জানি প্রকৃতিতে শক্তি ধ্রুবক । শক্তি হারিয়ে যায় না । তাহলে জবা কাকিমার শক্তি থেকে যায় কোথাও? কোনও প্রবল হাওয়ার রাতে সে এসে প্রবেশ করে অন্য কোনও বালক অথবা বালিকার মধ্যে ? আর সে অন্য এক মানুষ হয়ে জেগে ওঠে ?ঝরণা মাইমার পুত্রশোক সহ্য করবার ক্ষমতাও কি কখনও অন্য কোনভাবে কোনো পুত্রহারা জননীর হৃদয়ে এসে যাবে ? এই অতিলৌকিক আমাদের জীবনে তাহলে ইতিহাসের দরকারই বা কী ? বিশেষত যখন বুঝতে পারছি আমার ভিতরেও এসে যেতে পারে সেই শক্তি !
অথবা হারিশ যাদপেটিয়া ! পাঁচ ফুট ছয় । ডোকরা শিল্পী । পেতলের কাজ করেন ।মোমের কাজ । হারিশ যাদপেটিয়া । কালো পাথরের তৈরি শরীর । পেইন্টিং । স্কাল্পটিং । পট । হিন্দু ধর্মের আচার মানে , ঈদের নমাজও পড়তে যায় । পটুয়া-চিত্রকরেরা তো এমনই । নিজেদের গান আছে , ছবি আছে । শুধু শিল্প আঁকড়ে ধরেই এঁরা বাঁচতে চেয়েছিলেন । সাকিন – জবরদহ , রাজ্য-ঝাড়খণ্ড ।
-মাস্টার সে বছর একখান বাঘ মারলম
- বাঘ ? বলো কী ?
- হাঁ মাস্টার মেরিচি
- হারিশ এখন কোথায় থাকো ?
-কোনো ঠিক নাই মাস্টর ।
শহরের বাবুদের ভাষায় একে বলে বহেমিয়ানিজম । আমার ভাষায় বিস্ময় । আমি ওকে এরিস্টটল বলি মনে মনে । জানে না এমন কিছুই নেই প্রায় । অনেক বিখ্যাত শিল্পীর সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা ! হারিজ এক বিস্ময় আমার কাছে ! হারিজ শুধু কোনোদিন চাইল না কোনো পরিচিতি !
কোন নিসর্গের কাছে হারিজ পেয়েছে এই নির্লিপ্তি !যেন কোনোকিছুই এসে যায় না তাদের ! আজ যখন দু-মিনিটের খ্যাতির জন্য সারা পৃথিবী মাতোয়ারা , হারিজের মতো মানুষেরা এসবকে দূরেই রেখে দিতে পারলেন জীবনভোর । ইতিহাস যা ধনীদের রাজাদের ক্ষমতাবানদের গুন কীর্তন করে , ইতিহাস এদের ব্যাপারে চুপ করেই থাকবে । অথবা এঁদের জন্যে বরাদ্দ থাকবে এক কি দুই লাইন । আমাদের সমাজের বিচিত্র-স্বভাব মানুষদের ব্যাপারে নীরব থাকবে সমকালীন সংস্কৃতির মাধ্যম । কিন্তু শক্তি ক্রমশ ব্যাপিত হবে । দিকে দিকে ।
আমাদের গতানুগতিকতায় যাকে বলা হয় গুরুত্বপূর্ণ , সেরকম আদৌ নয় । শিল্পীর সমস্ত চরিত্র নিয়েই সে বিভিন্নভাবে উপস্থিত আমাদের জীবনে । সে হতে পারে অমসৃণ সে হতে পারে রুক্ষ কিন্তু সে শিল্পী আর এই মন কিন্তু অনেক কিছু উল্টেপাল্টে দেওয়ার জন্যে জন্ম নিয়েছিল । আমরা নিতে পারিনি । আমরা মানে যারা স্টিরিওটাইপ । যারা সংজ্ঞা পেতে পেতে সত্যিকারের বিষয়ের সামনে পড়লে সত্যিকারের সংজ্ঞাহীন হয়ে যাই । আমাদের যাহাই ঘটুক , এইসব অসামান্য/ অসামান্যা-দের যেন কিছুতেই কিছু এসে যায় না !তাদের এই উদাসীনতাকে আমার প্রণাম । প্রণাম । কারন তাঁদের শক্তির অংশ আমিও । প্রতি মুহুর্তে আমার ভিতরেও সেই উন্মাদনা লগ্ন হয়ে উঠছে । এই শক্তি অন্তর্ভুক্ত না-হবার জন্য বিষণ্ণ হয় না । উদাসীন হবার ক্ষমতা অর্জন করে ক্রমাগত ।
আপনাকেও শ্রী রতন কাহার ।আপানাকেও কি মনে রাখবে আমাদের ললিত ইতিহাস ? রন-রক্ত-সফলতা-পিয়াসী ইতিহাস ? আপনি আমাদের শহরের লোকশিল্পী । কবিয়াল । আজও দারিদ্র যাকে তাড়া করে বেড়ায় , আজও মরা পোড়ানোর মিছিলে খঞ্জনী বাজাতে বাজতে যাকে হাঁটতে হয় ! লোককবি শ্রী রতন কাহার ।তাঁর যৌবনে তাঁর সমকালীনরা যখন ‘কলকাতার গান’ গাইতেন , তিনি তখন গাইছিলেন, লিখছিলেন ভাদু গান । আমার মাটির নিজস্ব আঘ্রাণ গায়ে মাখে তাঁর গান । প্রকৃতিই কি তাঁকে ছন্দশিক্ষা দিয়েছিলেন ? কোন ক্ষমতায় তিনি এত নিরভরণ কথা লিখতে পারেন – ভালোবাসা দারিনছিল মাথার সিতেনে ... সেই আলতামিরা গুহায় যে চিত্রকর এঁকেছিলেন বাইসন অথবা যে উদাসীনতায় অজন্তা অথবা ইলোরার শিল্পীরা একের পর এক কাজ করছিলেন গুহার ভিতরে ছবির অথবা ভাস্কর্যের অথবা কারমিনা বুরানার কবিতাগুলি লিখেছিলেন যেসব মানুষ তাঁদের ভালোবাসা আর ক্ষমতার ব্যাপন কি হয়ে চলেছে আমাদের মহাবিশ্বে ?
ইতিহাস অবশ্যই আমাদের কথা লিখবে না , তারও নিজস্ব রাজনীতি আছে । উল্টোদিকে আমাদের নিসর্গ আমাদের জীবন একের পর এক এমন মানুষকে নিয়ে আসবে আমাদের জীবনে আর শক্তির মন-বদল হবে বারেবারে , শক্তির দেহ-বদল হবে বারেবারে ... যেন সে এই কথাই বলতে চাইবে যে মানুষের লেখা ইতিহাস তার কোনো কাজেই আসে না ।

বিকেলের পি এন পিসি’র দল হো-হো শব্দে হাস্য করে উঠবে হঠাৎ ।

-