দাহ

তপতী বাগচী

মাঝরাতে কঁকিয়ে উঠেছিল ফোন।কৃতীর ঘুম খুব পাতলা। লাফিয়ে উঠে ধরেছে।ফিরে এসে শুতে শুতে আমাকে ধাক্কা দিয়ে বলল – অ্যাই, সুমনদার ফোন।
-চিতু ! মা এই মাত্র চলে গেল রে ! আমাদের সবাইকে ফেলে চলে গেল।
দেখলাম ঘড়িতে একটা পঁচিশ।
- তোর মোবাইল নাম্বার আমার কাছে নেই, তাই ল্যান্ডফোনেই…
-তুই কি একা ? নান্টু, ঝুম্পা ওরা…
-ভাই গতকালই মা’কে একটু ভাল দেখে গৌহাটি রওনা দিয়েছে। আর ঝুম্পা বোধহয় আসতে পারবেনা।দিন কুড়ি আগে অতীন, মানে ওর বরের একটা স্ট্রোক হয়ে গেল।
- ঠিক আছে, আমি তাহলে বাপ্পা ,রাণা,দিগেন ওদেরকে খবর দিয়েই রওনা হচ্ছি। আচ্ছা, তোদের বাড়িটা ঠাকুরপাড়ার ঠিক কোথায় বলত ?
-ও, তুই তো এ বাড়িতে কোনোদিন আসিসনি।‘মা দুর্গা প্যাথলজিকাল ল্যাব’ চিনিস তো।তার উল্টো দিকের গলিতে ডান হাতে তিন নম্বর বাড়ি। দোতলা। নাম ‘মাতৃ-নিলয়’।
শেড থেকে বাইক বার করতে গিয়ে হাতপাগুলো কেমন যেন অসাড় লাগছিল।ভাদ্রের শুরু। বোধহয় কৃষ্ণপক্ষ চলছে। অন্ধকার বেশ জোরালো।উল্টো দিক থেকে জোলো হাওয়া চোখে মুখে ঝাপটা মারছিল। বার বার অন্যমনস্ক হয়ে যাচ্ছিলাম।মাধুকাকীমা চলে গেলেন ! হু হু করে ছোটোবেলাটা চলে আসছিল চোখের সামনে।
সবাই মোটামুটি তাড়াতাড়িই পৌঁছে গেছে।দিগেনের বাড়িটা দূরে।ও একটু পরে এল । পাড়ার ডাক্তারকে অনেক অনুরোধ করার পর ডেথ সার্টিফিকেট পাওয়া গেছে। কাকীমা তার চিকিৎসাধীন ছিলেননা। পাড়ার কয়েকজন ছেলে এসেছে দেখলাম।রাণা শববাহী গাড়ীর ব্যবস্থা করে ফেলেছে।আমরাতো কাকীমাকে নিজেরাই নিয়ে যেতে পারতাম।কাকীমা কি এতই ভারী ?
উত্তরমুখে শোয়ানো হয়েছে দেহটা। বেশ শীর্ণ মনে হল।সেই চুলের ঢাল আর নেই।যা যা করবার,সুমনকে দিয়ে যা যা করানোর,বাপ্পা করাচ্ছিল।এসব ব্যাপারে আমাদের ভেতর ও ই ওস্তাদ।ঘি টি মাখানোর পর জল ছিটিয়ে স্নান করানো হল।শুদ্ধ করা হল। জানিনা কেন। আগুনই তো শেষশুদ্ধি করে নেবে।চিতার ওপর রাখা হল শরীর।ওপরে কাঠ সাজিয়ে দেবার আগ মুহূর্তে সরিয়ে নেয়া হল শেষ আবরণ ,ভাঁজ করা নতুন তাঁতের শাড়ীটা।শুধু রুগ্ন শান্ত মুখটুকু অন্ধকার আকাশের দিকে মুখ করে জেগে রইল। সুমনকে দিয়ে বাপ্পা আর পুরোহিতমশাই মুখাগ্নি করাল।আগুন ছড়াতে লাগল কাঠে কাঠে।আমি চোখ সরালাম। ইলেক্ট্রিক চুল্লীতে সুমনের এত আপত্তি কিসের কে জানে।
আমি দিগেন আর রাণা চিতা থেকে দূরে নিমতলায় এসে বসেছি। শ্মশানে এলে এটাই আমাদের জায়গা।কব্জী চোখের সামনে তুলে দিগেন বলল-শেষ হতে হতে আরো ঘন্টা তিনেক।বাপ্পা সুমনকে নিয়ে টিনের শেডের তলায়।হ্যালোজেনের ভুতুড়ে আলোয় এখান থেকে ওদের প্রোফাইলটা পাওয়া যাচ্ছিল। দু’হাতে হাঁটু জড়িয়ে ঘাড় নুইয়ে বসে আছে সুমন।যে যা বলেছে যন্ত্রের মত করেছে সব।নান্টুর জন্য খারাপ লাগছিল।ঝুম্পা ঐ অবস্থাতেও ছুটে এসেছিল। নান্টুটা কতদূরে পড়ে রইল।
বর্ষার ভরানদী পাক খেয়ে খেয়ে বয়ে যাচ্ছিল।এখান থেকে পট্ পট্ করে কাঠফাটার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে।আগুনের স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে যাচ্ছিল বাতাসে।দু’একটা রাতপাখি কখনো কখনো ডানা ঝাপ্টাচ্ছে।দিগেন সিগারেট ধরাল।আমাকেও দিচ্ছিল একটা। ইচ্ছে করলনা। রাণা বিড়ি ধরিয়েছে।জানকীরাম মাঝে মাঝে লম্বা বাঁশ দিয়ে আগুন খোঁচাচ্ছে। একটু দূরে পাড়ার ছেলেগুলো বোতল আর ভাঁড় নিয়ে গোল হয়ে বসেছে।
কিছুক্ষণ পরে রাণা হঠাৎ বলে উঠল-ধুস্ শালা !জীবনটা যে কি মাইরী !
দিগেন বলল-সুমন কেমন পাথরের মত বসে আছে দ্যাখ,ওর ভাবসাব আমার মোটেই ভালো লাগছেনা।
- ও ঠিক হয়ে যাবে।কিছুটা সময় যেতে দে ,সামলে উঠবে।
- চিন্তা করিসনা, রিংকু শক্তধাতের মেয়ে। সুমনের মত নয়।ও ঠিক ম্যানেজ করতে পারবে।
ওদের কথাগুলো মাঝে মাঝে ফেড আউট হয়ে যাচ্ছিল।আমার মাথায় যে কথাটা ঘুরপাক খাচ্ছিল রাণা ফস্ করে সে কথাটাই বলে বসল – ইস্ , প্রবীরকাকু কিছু জানতেই পারলনা।
- ওই লোকটার নাম নিবিনা তো । কাকীমার শরীরটা পুড়ছে এখনো।
রাণা বলল- আচ্ছা… প্রবীরকাকুর ডান দিকের গালে একটা বিশাল বড় আঁচিল ছিলনা রে ? দিগেন হাতের সিগারেট ছুঁড়ে ফেলে বলল - কেন রে শালা , খুঁজতে বেরোবি নাকি ?
–না,ভাবছি অতবড় আঁচিলটা নিয়ে কাকু নিজেকে লুকিয়ে রাখল কেমন করে ? আমার মনে হয় কি বলতো ? দুটো ব্যাপার হতে পারে। এক নম্বর লোকটা অন্য কারো সাথে কোথাও সংসার পেতে বসে গেছিল…
-দু’নম্বর ?
-সেটা হল, মালটা হয়তো সাধু ফাধু হয়ে হিমালয়ে চলে গেছিল, ঠান্ডায় টেঁসে গেছে …
-গেছে তো গেছে। সে খবরটা এলেও তো পারত।
- এটাই তো আসল কথা রে দিগেন। কাকীমা কিন্তু প্রবীরকাকুর চাকরীটা সেই পেলেন… শুধু… শুধু…।
- সাত সাতটা বছর, চিন্তা করতো…
-শালার হারামীর বাচ্চা ইউনিয়নের লীডারগুলো।এক্সপ্লয়টে শনের চূড়ান্ত একেবারে।
-আরে বাবা ,মৃত্যুর প্রমাণ না পেলে কি করা যাবে ?
- এদিকে জ্যান্ত মানুষগুলোওতো মরে যাবার জোগাড় হয়েছিল।
-মাঝে মাঝে কাকীমার কথা ভাবি জানিস,ভাল-মন্দর ব্যাপারে যাচ্ছিনা। কথা হচ্ছে সমস্যার মুখোমুখি দাঁড়ানোর সাহস।
রাণা বলল- ঠিক বলেছিস। জানিস, আমার না তখন মাঝে মাঝে খুব ভয় হত, ঘটনাটা আমার জীবনে যদি ঘটে যায় ?
কথাগুলো আমার ভাল লাগছিলনা। বললাম- থামবি তোরা ? কিছুক্ষণ কাঠ ফাটার আওয়াজ ছাড়া আর কিছু থাকলনা।
চিতার লম্বা আগুনের শিখা শেষরাতের হাওয়ায় কেঁপে কেঁপে দুলে দুলে জ্বলছিল। কাকীমার শরীর একটু একটু করে পুরোটাই আগুনের বশবর্তী এখন। জ্বলছে পুড়ছে। জ্বলে পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে।রাঙাজ্যেঠী বলতেন-পুড়বে মেয়ে, উড়বে ছাই/তবে মেয়ের গুণ গাই।
নদীটা, ওপারের ঝোপঝাড়,বালির চর,বাতাসে বয়ে আনা জলকণা- এসবের ভেতর দিয়ে ধীরে ধীরে একটা দিনের জন্ম হচ্ছিল।এই দিনটার কাছে কাকীমার কিছু পাবার নেই ।সমস্ত কিছু থেকে নিজেকে চুপিচুপি সরিয়ে নিল একটা মানুষ।এই পরিপ্রেক্ষিত কি কখনো সেটা বুঝতে পারে ? না কি পেরেছে ? ভাসমান সহস্র তরঙ্গ কি এই সংবাদ ধরে রাখল ? বয়ে নিয়ে যাবে অন্য কোথাও ?
বছর খানেক আগে একদিন সুমন এসেছিল আমার অফিসে।বলল-মা’র যে কি হয়েছে,সারাদিন হাত ধুচ্ছে, পা ধুচ্ছে,স্নান করছে হাজার বার…
বললাম – ডাক্তার দেখিয়েছিলি ?
-লাভ কিছু হয়না ।ওই কয়েকদিন একটা ঘোরের মধ্যে থাকে,ঘুম ঘুম ভাব, তারপর সেই আগের মত।সারাদিন এক কথা,নোংরা, বড্ড নোংরা,আমাকে ধরিসনা তোরা , ছুঁসনা…। বাবলিকে পর্যন্ত কাছে ঘেঁষতে দেয়না।অদ্ভুত বিহেভ করে।
- ট্রিটমেন্ট কন্টিনিউ কর, সেরে যাবে। অনেকেরই তো হয়। আমার ছোট পিসীকে তোর মনে আছে ? পিসীর হয়েছিল।ডাক্তার বলেছিল অবসেসিভ কম্পালসিভ ডিজর্ডার, ওসিডি। বেশ অনেকদিন ধরে ওষুধ খেতে হয়।
- চিতু, তুই একদিন বলে দ্যাখনা, তুই বললে মা হয়তো শুনবে ।ডাক্তারের কাছে যেতেই চায়না।ভাবতে পারিস,মা ঠাকুরঘরে ঢোকেনা।চাকরীটাও তো ছেড়ে দিল।
- তাই ! কবে ?
- কে জানে কবে ।ব্যবসার ঝঞ্ঝাট নিয়েই সারাদিন যায় আমার। বাড়ি ,সংসার রিংকুই সামলায়।ও আমাকে বলল। বেশ ক’দিন ধরে অফিসে যাচ্ছিলনা মা , প্রথমে ছুটি, তারপর একেবারে রেজিগনেসন।
-কিছু জিজ্ঞেস করিসনি ?
-রিংকু করেছিল।মা বলেছে, ঘেন্না লাগে।

মেঘ মেঘ আকাশে একটু একটু করে আলোর রং ধরছে।শেষ হতে হতে রোদ উঠে যাবে।আগুনের তেজ কমে এসেছে। আমার মাকেও রেখে গেছি এখানে। সে অনেক দিন হল।আমরা খুব ছোট তখন।কাকীমা আমাকে জড়িয়ে ধরে আকুল কাঁদছিলেন।আর আমি বুক ভরে কাকীমার শাড়ীর ঘ্রাণ নিচ্ছিলাম।
মা আর কাকীমার ভেতর একটা গভীর সখ্য ছিল।ভালবাসা ছিল।সেটা শুধু সেলাইয়ের নমুনা তোলা বা দুপুরের আড্ডায় আটকে ছিলনা। কাকীমাকে আমাদের ঐ অত বড় বাড়ির উৎসব অনুষ্ঠানে বেঘোর খাটতে দেখেছি। মাকেও দেখেছি অসুস্থ কাকীমার সেবার দায়িত্ব হাতে তুলে নিতে।
মা মারা যাবার পর বাবা আমাকে দু’ চোখে দেখতে পারতেননা। যেন আমিই মাকে মেরে ফেলেছি।বাবা বাড়িতে থাকলে আমি এদিক ওদিক পালিয়ে বেড়াতাম।কেউ নজরও করতোনা।মাধুকাকীমা ছিলেন আমার প্রধান আশ্রয়স্থল ।
আমি আর সুমন তখন বছর দশেক।নান্টু আমাদের থেকে দু’ বছরের ছোট।ঝুম্পা তো একেবারেই বাচ্চা।একদিন প্রবীরকাকু কথা নেই বার্তা নেই ব্যাগপত্র গুছিয়ে নিয়ে ‘ গয়া যাচ্ছি মা-বাবার পিন্ড দিতে ’ বলে রওনা হলেন ।একটা মানুষ যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেল।কেউ কিচ্ছু জানেনা। আত্মীয়- স্বজন, সহকর্মীরা, থানা-পুলিশ,কেউ কিছু করতে পারলনা।কত জল্পনা কল্পনা,কত কাহিনী,মহিলারা কেউ কেউ আবার সোজাসুজি কাকীমাকেই দায়ী করে ফেললেন।
কাকীমা তখন হতবাক,চূড়ান্ত দিশেহারা অবস্থায় প্রবীরকাকুর জন্য অনির্দিষ্ট অপেক্ষায় দিন কাটাচ্ছেন। মুহূর্তগুলো দেখেছি। প্রবীরকাকুর প্রতি তেতো বিরক্তিতে মন ভরে যেত।কাকু এমন কি মানুষ,কাছে থাকতেই বা কাকীমাকে এমন কি দিয়েছে যার জন্য কাকীমার এত অস্থিরতা !বাস্তবকে বুঝলাম পরে।ছুটির দুপুরে আমি সুমন বসে ক্যারাম খেলছি। কাকীমা ছাদ থেকে দুদ্দাড় করে নেমে এলেন। হাঁফাতে হাঁফাতে বললেন- সুমন চিতু তোরা এক্ষুনি দৌড়ে যা গলির মোড়ে,ইয়াসিনের দোকানের সামনে আমি যেন তাকে দেখলাম।সত্যি ! যা বাবা শীগগির যা। আমরা দুজন উঠে দৌড়ে গেলাম।ফিরে এলে উৎকন্ঠ প্রশ্ন।– সত্যি বলছিস কেউ ছিলনা ? আমি তো স্পষ্ট দেখলাম।এদিক ওদিক একটু দেখেছিলি ভাল করে ?
মন্দিরে মানত করা,গাছের ডালে পাথর বাঁধা,নখদর্পণ,ভাগ্যগণ া অনেক হল।সে সময়টা সুমনের সঙ্গে বন্ধুত্ব রাখতে আমাকে অনেক ছলের আশ্রয় নিতে হয়েছে।বোঝা না বোঝার মাঝামাঝি যন্ত্রণার বয়েস সেটা।শুধু সুমন নয়।কাকীমার দেবীর মত মুখ,আশ্চর্য চোখদুটো,সুঠাম চলাফেরা, সঙ্গে অদ্ভুত মাতৃত্ব আমাকে মুগ্ধ ঘোরে রাখত।কাকীমার পাকানো গরাস আমি আর সুমন এক পাতে বসে মুখে নিয়েছি কতদিন।রাঙাজ্যেঠী বলতেন – হতভাগী তোকে গুণ করেছে।আমি জানতাম সেই গুণের নাম ভালবাসা।
মাধুকাকীমা তখন সময় পেলে কাকুর শার্টগুলো কেচে শুকিয়ে বোতাম পরিয়ে পাট করে রাখতেন। বড় করে সিঁদুরের টিপ পরতেন।একদিন স্কুলে যাবার সময় সুমনকে ডাকতে গিয়ে দেখি বাড়ীটা কেমন অদ্ভুত ঠান্ডা। নান্টু চুপচাপ মেঝের ওপর উপুড় হয়ে শুয়ে ছবির বই দেখছে।সুমন একবাটি মুড়ি জল দিয়ে ভিজিয়ে খাচ্ছে।আমাকে দেখে হাসল। বলল দ্যাখনা ,সকাল থেকে মা’র খুব মাথাব্যথা ।ভাত হয়নি।তাই মুড়ি খাচ্ছি।তুই খাবি ?
শোবার ঘরে গিয়ে কাকীমার মুখের আঁচল সরিয়ে ডাকলাম। তাকাল। দেখি চোখদুটো লাল হয়ে ফুলে আছে।বাসী চুল এলোমেলো। কোলের কাছে ঝুম্পা খুনখুন করে কাঁদছিল আর ছোটো ছোটো হাতে মুঠো পাকিয়ে কাকীমার বুকে ঘুষি ছুঁড়ছিল।ছবিগুলো আমার মনের ভেতর কেমন একটা অকল্যাণের ভয় ঢুকিয়ে দিল।
পরদিন ভাঁড় ভেঙে তেরো টাকা পঁচিশ নয়াপয়সা আমি লুকিয়ে কাকীমার আঁচলে বেঁধে দিতে গিয়েছিলাম,যেমন করে মরা আরশোলা কাকীমার আঁচলে বেঁধে দিয়ে আমরা মজা দেখতাম।কাকীমা গিঁট খুলে টাকাটা আমার হাতে ফিরিয়ে দিয়ে বলেছিলেন-কাকীমাকে ভু্ল বুঝিসনা বাবা।তুই বড় হয়ে যেদিন নিজে আয় করবি, সেদিন দিস।আজ এই পয়সা নেবার আমার কোনো উপায় নেইরে !
সময় যথারীতি গড়াচ্ছিল ।কিন্তু প্রবীরকাকুর কোনো সংবাদ ছিলনা।ওদের দিনগুলো কেমন অন্যরকম হয়ে যাচ্ছিল।নতুন ভাঁজভাঙা জরিপাড় শাড়ীর সঙ্গে ছেঁড়া ব্লাউজ পরে বসে বসে কাকীমাকে গুল দিতে দেখেছি।মানে বুঝতে সময় লেগেছিল। জানালার কবাটে মাথা রেখে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতেন। কখনো রান্নাঘরের মেঝেতে দু’তিনটে পিঁড়ি লম্বা করে পেতে অসময়ে আঁচল মুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকতেন মাধুকাকীমা। সুমন নান্টু ঝুম্পা ওদের জামা কাপড়গুলো মলিন হতে হতে একসময় এদিক ওদিক দিয়ে ফুটো বেরিয়ে গেল।কাকীমার শরীর নিরলংকার হল দ্রুত।সারাক্ষণ একটা বুকচাপা কষ্ট হত আমার।ভাত মুখে দিতে চোখে জল আসতো।রাঙাজ্যেঠী বলত –বেশীবেশী !
কবে থেকে যেন কাকীমা ব্যাগকাঁধে বাইরে বেরোতে শুরু করলেন।টানটান ফিটফাট হয়ে।কাকুর অফিসে যেতেন বোধহয়। সুমন একদিন চুপিচুপি খুশীখুশী গলায় বলল- জানিস মা’র চাকরী হচ্ছে,ওইযে যারা মাঝে মাঝে আসে আমাদের বাড়ীতে তারাই মাকে চাকরী করে দেবে বলেছে।
রাঙাজ্যেঠী ছিলেন পাড়ার রয়টার।চেহারার নিখুঁত বর্ণনা দিতে পারতেন,কোন বেলা কবে কবে কে কে যাতায়াত করছে ও বাড়িতে। দিন মাস বছর বসে থাকেনি। পাড়ায় বোধহয় কারুর জানতে কিছু বাকীও ছিলনা। সবাই এড়িয়ে চলত। আমি মারধোর খেয়েও জোর করে যেতাম।কাকীমার নিন্দেমন্দ আমার ভেতর একটা জেদীভাব তৈরী করে দিত। না গিয়ে পারতামনা। গিয়েও ভাল লাগতোনা। কাকীমা আমাকে কেমন এড়িয়ে চলতেন। কারণ বুঝতামনা ।কষ্ট পেতাম । রাগ হত খুব।
একদিন জ্যামিতিখাতা খুঁজে পাচ্ছিলামনা। মনে হল সুমনকে দিয়েছি বোধহয়। ও নিত মাঝে মাঝে।সেটা আনতে গিয়েছিলাম সন্ধে রাতে।আট সাড়ে আট হবে।দরজা জানালা বন্ধ দেখে ফিরেও আসছিলাম।হঠাৎ খুট করে খুলে গেল দরজাটা।একটা হাতাকাটা নাইটি গায়ে বেরিয়ে এসেছেন আমার মাধুকাকীমা । একদম অন্যরকম লাগছিল।সঙ্গে একজন টলোমলো মধ্যবয়স্ক লোক।গ্রিলের তালা খোলার অবসরে লোকটা কাকীমাকে পেছন থেকে বিশ্রীভাবে জড়িয়ে ধরেছে … ঘাড়ে গলায়…আমার দম আটকে আসছিল।মনে হচ্ছিল নোংরা কালো মোটা একটা টিকটিকি কাকীমা্র সর্বাঙ্গ চাটছে। কাকীমা তো টিকটিকিকে খুব ভয় পান। তবু গা থেকে ঝেড়ে ফেলে দিচ্ছে্ননা কেন? মুখে কই ভয়ের চিহ্ন নেইতো। কেমন নির্বিকার।ছিঃ!ঘেন্না লাগছেনা কাকীমার? গলি থেকে একটা পাথর তুলে ছুঁড়ে মেরেছিলাম।সেটা কোথায় লাগল দেখার জন্য দাঁড়াইনি আর ।
ছুটতে ছুটতে বাড়ি ফিরেছি।রাতে প্রবল জ্বর।বিশ্রী সব স্বপ্ন।প্রলাপ বকেছিলাম সারারাত। একরাতেই যেন বড় হয়ে গেলাম অনেকখানি ।বড় হবার যন্ত্রণা সেদিন বুক ফুটো ফুটো করে উল্কির মত বসে গিয়েছিল ।
এরপর ঠিক জানিনা কবে ওরা এপাড়া ছেড়ে চলে গেল।সুমন স্কুল বদলালো।শুনতাম কোথায় অনেক দূরে ভাড়াবাসায় থাকে। মাধ্যমিক পরীক্ষার পর কোনো একদিন দিগেনই বোধহয় বলেছিল কাকীমার চাকরী পাবার কথা।শুনেছিলাম কাকুর প্রাপ্য টাকাগুলো পরে ওরা বেশীভাগটাই পেয়েছে। সুমন হার্ডওয়্যার এর দোকান দিয়েছে। নতুন বাড়ি কিনেছে ঠাকুরপাড়ায়… এসব তথ্য না চেয়েও সময়মত কানে এসে যেত।
চিতায় জল ঢালছে সুমন।ধোঁয়ার কুন্ডলী ছাইসহ ওপরে উঠে যাচ্ছে।কতদিন ধরেই তো জ্বলছিল চিতাটা। ঠান্ডা হল।শান্ত হল ঘেন্না যন্ত্রণা দোষঘাট মান অপমান। জানকীরাম মাটির হাঁড়িতে কাকীমার অদাহ্য অবশেষটুকু সুমনের হাতে তুলে দিল।
হঠাৎ ভেতর থেকে আটকে থাকা চাপাকান্নার মত কি যেন ছিটকে বেরোলো আর তার দমকে মাটিতে লুটিয়ে পড়লাম আমি। চিতু নামের দশ/বারো বছরের সেই ছেলেটা আমার ভিতর থেকে শরীর ঝাঁকিয়ে চিৎকার করে উঠল,আমি কি তোমার কেউনা কাকীমা ? সুমনই সব ? তুমি ছাড়া আর কে ছিল আমার ? একদিনও কি, একটি বারের জন্যও কি তুমি আমাকে ডাকতে পারতেনা ? কেন ডাকলেনা কাকীমা ? কেন কোনোদিনও কাছে এসে মাথায় হাত রাখলেনা ? কেন পর হয়ে গেলে ? কেন ? থরথর করে কাঁপছিল শরীর। জ্ঞান হারাতে হারাতে মনে হল কেউ কি স্নিগ্ধ হাতে একবার ছুঁয়ে গেল কপালটা ?
=০=