স্বপ্ন মরে না

পঙ্কজ বিশ্বাস

একটা আঁশটে গন্ধ। গন্ধটা ক্রমশ ঘন হচ্ছে। ছাইরঙা আলোতে অবশেষে সিঁড়িটা পেল। পা টিপে টিপে ওঠে। টানা বারান্দা। মেঝে জুড়ে খসে পড়া পলেস্তরা, খড়, পালক। একটা পাখি ডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতে রেলিং টপকে উধাও হয়ে গেল। প্রাগৈতিহাসিক কোনও বাড়িতে এসে পড়েছে বলে মনে হয়। তেত্রিশ বছর আগেকার একটা দৃশ্যের পুনরাভিনয় যেন! প্রবল শ্রাবণ। হ্যারিকেনের হলুদ আলোয় চারপাশ কেমন স্বপ্নালু। খুনিরা কাজ হাসিল করে ধুপধাপ শব্দে নেমে যাচ্ছে। হাতে রক্তমাখা ধারালো অস্ত্র। মুখগুলো গামছা দিয়ে আড়াল করা। বাড়ির ছেলেটি মেঝেতে কাটা মাছের মতো ছটফট করছে। বৃদ্ধা মায়ের প্রাণফাটা কান্না ছেলের আর্তনাদকে ছাপিয়ে উঠছে। অতনু নির্বাক দর্শক। গরম রক্তে ভিজে উঠছে ওর পায়ের পাতা।
গতকালের কথা। ইউনিভার্সিটি না থাকলে লাঞ্চের পর সোজা লাইব্রেরিতে গিয়েই অতনু বসে। রিডিং রুমে ঢুকে দেখে বিশেষ কেউ নেই। জানালার ধারের এক কোণায় গোকুল মাষ্টার বইয়ে মুখ গুঁজে আছেন। অতনু ‘দ্য মোটরসাইকেল ডায়ারিজ’ নিয়ে উল্টো দিকে বসে। কতক্ষণ কেটেছে খেয়াল নেই। হঠাৎ ‘এই যে’ বলে রাশভারী গলায় গোকুল মাষ্টার সামনে দাঁড়ান। অতনু থতমত খায়। স্বভাবত দাঁড়িয়ে পড়ে।
‘এই লাইব্রেরিটা গড়ে ওঠার পিছনে কার অবদান তুমি জানো?’
না, জানে না। সেই ছোট থেকেই এখানে আসছে। ‘শহীদ ক্ষুদিরাম পাঠাগার’ বলেই একে জেনে এসেছে। প্রতি বছর ১১ আগস্ট ক্ষুদিরামের স্মরণে এখানে অনুষ্ঠানও হয়। অতনুও আসে। কই কারও কাছে তেমন কিছু শোনেনি তো!
‘জানো না তো! কেইবা বলবে! ভাগ্যের পরিহাস! বুঝলে ভাগ্যের পরিহাস! কনকবাবুর নাম শুনেছ? কনক সান্যাল? পূর্ব পাড়ার?’
অদ্ভুত একটা অস্থিরতা নিয়ে অতনু বাড়ি ফেরে। সারা সন্ধ্যে বিছানাতেই পড়ে থাকে। একটা অব্যক্ত যন্ত্রণায় তার হৃদয় খানখান হয়ে যেতে থাকে। মাথার শিরা ছিঁড়ে পড়তে চায়। একটা অতীতকে কেন এত আপন মনে হয় অতনুর? যে অতীতের বর্তমান নেই। ভবিষ্যৎ থাকতে পারে কি? ইতিমধ্যে মা তিন বার খেতে এসে ফিরে যায়। শেষে ‘খিদে নেই’ বলে বিশ্রীভাবে ফিরিয়ে দেয়। ছেলের মেজাজ দেখে আর ঘাঁটায় নি। ঘুমের মধ্যেও অতনু বারবার জেগে ওঠে। মনে হয় একটা ছায়া ওর দিকে চেয়ে আছে। নিস্পলক। ভোর হতেই সাইকেল চালিয়ে সান্যাল বাড়িতে এসে পড়েছে। স্বপ্নতাড়িতের মতো।
কনকবাবু শহরের কলেজ থেকে পাশ করা গ্রামের প্রথম বি.এ। রাজনীতিতে হাতেখড়ি ওই কলেজেই। শহর থেকেই যেন একটা সংকল্প নিয়ে গাঁয়ে ফেরেন। না হলে তাঁর মতো ব্রিলিয়ান্ট ছাত্রের নিদেনপক্ষে একটা মাস্টারি চাকরি জুটিয়ে নেওয়া কোনও অসম্ভব ব্যাপার ছিল না। কিন্তু নিশ্চয়তার জীবন সবাই গ্রহণ করলে স্বপ্ন দেখবে কে? তিনি এখানকার গরিবগুব্বো মানুষগুলোর সুখে, দুঃখে জড়িয়ে পড়লেন। কার বাড়িতে ‘চাল বাড়ন্ত’, কার ঘরের খড়ের চালা ভেদ করে জল পড়ছে, কিংবা কোন মহাজন পাওনার জন্য চাষির গলা টিপে ধরছে – কোনও ব্যাপারেই তিনি হাত গুটিয়ে বসে থাকতে পারেন না। দানের ব্যাপারেও খুল্লামখুল্লা। পৈতৃক সম্পত্তি তো কম ছিল না! তাঁর স্বর্গীয় পিতা অমূল্যচরণ তো ছোটখাটো একজন জমিদারই ছিলেন বলা যায়। প্রকৃতই কনক সান্যাল যেন দশটা গাঁয়ের চাষাভুষো মানুষগুলোর ‘মাথার ছাদ’। তাই পঞ্চায়েত ইলেকশনে তাঁর জয়ী হওয়াটা যেন শুধু সময়ের অপেক্ষা ছিল।
কিন্তু তাঁর এই উত্থান অনেকেই মেনে নিতে পারে নি। পার্টির লোকেরাই তাঁর প্রধান শত্রু হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কেননা তাঁর প্রখর দৃষ্টি এড়িয়ে তারা কোনও ‘সুবিধা’ করতে পারছিল না। তাই তাদের ‘পথ’ দেখতে হয়েছিল। শেষমেশ ...
বারান্দা থেকে একটা ভেজানো দরজার দিকে চোখ যায় অতনুর। ভিতরে ঢোকে। সামনের দেওয়ালে কতগুলো তাক। বইয়ে ভর্তি। অবশ্য বই বলে এখন তাদের আর চেনার উপায় নেই। উইয়ে মাটি করে দিয়েছে। তবু ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছে হল। দক্ষিণের জানালা খুলে কিছুক্ষণ দাঁড়াল। ওপারে সবুজ বনরাজি। বাতাস ওর চুলে বিলি কাটছে। হঠাৎ চোখ পড়ল একটা বিবর্ণ ফটোফ্রেমের দিকে। শিহরণ জাগে। মানুষটাকে দেখার লোভ হয়। কিন্তু অত উঁচু থেকে নামাবে কি করে? পাগলের মতো এ ঘর ও ঘর ছোটে। একটা ভাঙা চেয়ার পেয়ে যায়। সেই নড়বড়ে চেয়ারটাতেই উঠে ছবিটা নামায়। মুখ দেখা যায় না। উপরে ধুলোর পুরু সর। রুমালটা বের করে ঝাড়ে। চে গুয়েভারা? আলবের্তো কোর্দার তোলা সেই ছবিটা না? চোখ রগড়ে আবার দেখে। বারবার দ্যাখে। ঘোর লাগে অতনুর। যেন বলিভিয়ার জঙ্গলে এসে পড়েছে। পুবের নরম সোনালি রোদে অতনুর মুখকে উত্তেজিত দ্যাখায়।