নিবর্তন

ফাহমিনা নূর

ননীগোপাল সরকার আর শোভনলাল সরকার কিভাবে পুরো পরিবার হতে বিচ্ছিন্ন হয়েছিলেন সে ইতিহাস জানতে হলে ফিরে যেতে হবে সাতচল্লিশের পটভূমিতে। দেশভাগ, স্বাধীনতা যেভাবেই দেখি না কেন ঘটনাটি যখন একটি পরিবারকে চিরে দু’টুকরো করে রেখে দেয় তখন দেশ ছাপিয়ে একটি স' মিলের চিত্র ভেসে ওঠে মানসপটে। এঁদের বাবা প্রীতমলাল সরকার অস্ত্র হাতে বৃটিশদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন। দেশ স্বাধীন হবে এ প্রত্যয় ছিলো বটে কিন্ত মানচিত্র যে পরিবারটির মাঝে এভাবে দেয়াল তুলে দেবে সে নিয়ে এতটা শঙ্কা ছিলো না। আদি নিবাস হুগলি জেলার উত্তরপাড়া হিন্দমটরে থাকলেও প্রীতমবাবুর বেড়ে ওঠা চট্টগ্রামের জামালখানে। বিয়ে করে থিতুও হয়েছিলেন এখানে। সঙ্গত কারণে তাই পেয়েছিলেন পাকিস্তানের নাগরিকত্ব কাম্যও ছিল তা। কিন্তু একটা পিছুটান রয়ে গেলো হুগলিতে। সম্পত্তি সেখানেও কম নয়। প্রায় দুই একর জমির উপর দ্বিতল বাড়িটির আর্থিক মূল্য যাই হোক তার এন্টিক মূল্যের তুলনা হয় না। তাই ভালো দামে ক্রেতা পেলেও বিক্রির পথে গেলেন না সংস্কারে বাঁধলো বলে। তাছাড়া দেশ স্বাধীন হলো বটে তবু 'স্বাধীনতা' নামক রাশভারি শব্দটি বাদে বাকি সবই অনিশ্চয়তার রাংতায় মোড়া। তাই হুগলিতে একটা ঠিকানা রেখে দেয়া যৌক্তিক বোধ হলো। আপন দাদা ছাড়াও খুড়তুতো ভাইয়েরা ওখানেই আছেন। তাঁদের ভরসায় রেখে এলেন উল্লিখিত দুই পুত্রকে প্রতিবেশি রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে। বাকি দুই পুত্র মোহনলাল আর হিরালাল সহ কন্যা রমা রয়ে গেল পিতামাতার সাথে চট্টগ্রামে।

সময় বহতা। লাফিয়ে চলে আসি ২০২০ এ। অনেকটা সময়। গঙ্গার জল অনেক বয়ে গেছে পদ্মার পানি অনেক গড়িয়েছে মাঝের এই দীর্ঘ সময়ে। এর মাঝে আরো দুটো জেনারেশন বেড়ে তৃতীয় জেনারেশন আসতে শুরু করেছে পরিবারে। আসা যাওয়ার করেই ভাগ হয়ে যাওয়া পরিবারটি সংযুক্ত ছিলো একে অপরের সাথে। ননীগোপাল গত হয়েছেন আরো বছর সাতেক আগে। শোভনলালও তাঁর তিরাশিতম জন্মদিন পালনের পর বয়সকে আর অস্বীকার করতে পারেন না। ইদানিং খুব শৈশব টানছে। প্রথমদিকে ঘন ঘন আসা হলেও কর্ম জীবনে ব্যস্ত হয়ে পড়ায় তাঁর আসা হতো না খুব চট্টগ্রামে। তাছাড়া এরাই খুব ঘন ঘন যেতো বলে আসার খুব প্রয়োজনও হতো না। ছেলেমেয়েরা আসতো হৈ হুল্লোড় করে যেতো। তিনি অনেকটা নিভৃতিবাদী বলে এসব এড়িয়ে যেতেন। কিন্ত ২০২০ এর শুরু থেকেই তাঁর মনে হচ্ছে বছরটি অন্য রকম। মনের ভেতর পাখি ডাকছে বলছে চলো উড়াল দেই বলেই উড়ে উড়ে যাচ্ছে দমদম হয়ে পতেঙ্গার আকাশে।
সুযোগও এসে গেলো মোহনলালের মেয়ের ঘরে নাতনির বিয়ের নিমন্ত্রণ পেয়ে। বিয়ে মার্চের বারো তারিখ। দশ তারিখে বেলা তিনটায় তিনি পা রাখলেন তাঁর শৈশবে স্মৃতিমাখা জামালখানের বাড়িতে।

বিয়ে বাড়ির হুল্লোড় সারতে সপ্তাহ খানেক গেলো। কিন্তু মন চাইছে আরো কিছু দিন থাকতে। ফিরতি টিকেট ইচ্ছে করেই ওপেন রেখেছেন। ওদিকে হিন্দমটর থেকে তাড়া আসছে বারবার ফিরে যাওয়ার। কি এক রোগ বালাই কি না সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ছে। দেশে দেশে চলাচল বন্ধ হয়ে যেতে পারে। ছেলেপুলেরা আজকাল এমনভাবে জ্ঞান দেয় ভাবখানা যেন তারাই তাঁকে পেলেপুষে বড় করেছে। তিনি তাদের করেন নি।
কথাগুলো ভাবতে ভাবতেই হেমশেন লেইনের এই বাড়ির খিড়কি দিয়ে তার চোখ চলে যায় সামনের এপার্টমেন্টের ব্যালকনি গুলোতে। সারি সারি ব্যালকনি তাতে কত রঙ বেরঙের কাপড় ঝুলছে টানা দড়ি আর রেলিঙে। চোখ ঝাপসা হয়ে আসে এখানেই তো ছিলো বিস্তৃত খেলার মাঠ। বুকের ভেতর একটা চিনচিনে দোলা উজিয়ে উঠেই মিলিয়ে যায়। কত বদলে গিয়েছে জায়গাটা! কলকাতাও কি আর আগের মত আছে? তিনি নিজেও কি বদলাননি! সেই বয়স বারো কি তেরো ছিলো বাবা যখন তাকে কাকাদের জিম্মায় হুগলিতে রেখে এসেছিলেন। বড্ড অভিমান হয়েছিলো কিন্ত তার প্রকাশ ছিলো না। পিতার সিদ্ধান্তের বিপরীতে অভিমান প্রকাশের রেওয়াজটাই যে ছিলো না সে সময়। বুকের ব্যথাটা আবার ফিরে আসছে। তাকে দু বেলা হৃদরোগের অষুধ খেতে হয়। তিনি সতর্ক হন, ধীরে ধীরে কাঠের খিড়কির কাছ থেকে সরে চেয়ারে গিয়ে বসলেন। গরমটাও পড়ছে বেশ। এ ভরা বসন্তে তিনি দরদর ঘামছেন।
মনে হলো কামরায় কেউ এলো। তিনি চোখ তুলে চাইলেন সাদা শাড়িতে ও কে এলো! মা নয়? মা-ই তো। তিনি এখানে কি করছেন? কি করছেন মানে কী? এটা যে মা- বাবারই কামরা। মা লাল পেড়ে সাদা শাড়ি কেন পরেছেন? আজ কি দশমী? হ্যাঁ দশমীই তো। ঢাকের আওয়াজে বাড়ি মুখর হয়ে উঠেছে। মা কিছু বললেন ঢাকের আওয়াজে তাঁর কন্ঠ চাপা পড়তে পড়তে আবার উড়ে গেলো খিড়কি দিয়ে। যেতে যেতে ডাক দিয়ে গেলো 'শোভওওওন'। কন্ঠ সেই ডাক অনেকটা টেনে নিয়ে গেলো যেনে কোন দূর পাহাড়ের কোলে লুটিয়ে পড়ছে। শোভনও উত্তর দিলো একই ভাবে ধীর দীর্ঘ লয়ে.. " আসছি মাআআ"। চোখের মনি দুটো মাকে অনুসরণ করতে করতে স্থির হয়ে গেলো পূব আকাশে। হুগলির বাড়িতে তখন এক বৃদ্ধার হাত ফসকে পূজোর থালাটা গড়িয়ে পড়ে গেলো। মেঝেটা মাখামাখি হয়ে গেলো সিঁদুর রঙে।