পরী

নীলিমা দেব

পাখিটার সামনে থেকে মেলা আকাশটা টেনে নিয়ে গ্যালো
সিন থেকে তিরিপি তিরিপি গ্রো করছে শীত
জল খুলে খুলে আজাদ ……


সেদিন রক্তিমার দুধভোরে থোকা-থোকা আকাশ নরম হয়ে কেমন চারপাতা স্বাধীনতা রঙের উঠোন! পরীর চোখে যখন প্রথমবার দেখেছিল তখন একটা খোকাপৃথিবী নীড় বুনতে বুনতে রক্তিমার পায়ে । বহুদিন পরে দুমুঠো উষ্ণতা আবার পাখি খুলে দিয়েছে রক্তিমার যত্নে তুলে রাখা স্বপ্নভোরাই এ । বাইরে তখন ঢাকের শব্দে তুলতুল শরৎ। আজ মহাঅষ্টমী ।রক্তিমার কোলে অনন্যপৃথিবী।তিন মাসের পরী এই এক ঝলক লক্ষ্মী, তো একঝলক কচি মহামায়া…যে মায়ায় এক ঘর বেঘরে আলো রক্তিমার চাঁদমুখের নতুন কসম!আজ রক্তিমার জীবনের কুসুম কুসুম নতুন অধ্যায় মলাট খুলে কদম কদম বাড়ায়ে যায় ---- রক্তিমা মা হল, জন্ম দিয়ে নয়, একটা ছেঁড়া জন্মকে নাম দিয়ে-পরী । ত্রিমাসিক পরীর দুধেল হাসিতে রক্তিমা আরও একবার রাঙা হল ঘুরে দাঁড়াবার তাগিদে।ভুবনভুলানো এই হাসিই রক্তিমার এক টুকরো নতুন সূর্য …

একই রকম ভাবনার আমেজ পাশাপাশি কাত হলে দুটি পুঁতি এক সুতোতে গীতবিতান রচে যায় নিরিবিলি!তেমনি রক্তিমা আর প্রিয়া কলেজের বেসমেট থেকে কবে আর কিভাবে একে-অপরের বেস্ট ফ্রেন্ড হয়ে গ্যাছে নিজেরাও কী জানতো! সাইন্স নিয়ে একই কলেজে ভর্তি হয় দুজনে। কলেজে পাশাপাশি ভাড়াবাড়িতে থাকত ভিন্ন জায়গা থেকে আসা দুই উদাসীন। একসাথে সেই স্মৃতিশহরের খোলা আলোয় অবাধে রিক্সায় এলোমেলো ঘুরেফিরে, এক বালিশের ঘুম, এক থালার খাবারের স্বাদ, নির্জনে জুরিনদীর ফুটন্ত জ্যোৎস্নার মেহেক ভাগ করে গ্যাছে কত বেলা-অবেলা এবং এভাবেই একে অন্যের আকাশে হাত বুলিয়েছে একান্তে ,আজ ১৫ বছর পরেও দুই শহরের দুরত্বের মাঝে সেই একই স্রোত ঝলমলে ঢেউ মেলে অবগাহন করে চাঁদনির খুঁটিনাটি।শুধু বদলে গ্যাছে সময় ও তার রকমারি গল্পের রহস্যরা।

আসলে দুরত্ব যে কত কাছের দূরে না গেলে জানা যায় না । যেমন জানা যায় না একেকটা পূর্ণিমারাতের নিজস্ব অন্ধকার পরাধীনতার থেকেও কত পরাধীন! কতটা যাতনার হতে পারে একেকটা শেল্ফ ডিফেন্ডেন্ট নারীজীবনেরও আনাড়িবেলার ফুটপাত । দেশ স্বাধীন তো হল কিন্তু নারীস্বাধীনতার ঔরসে এখনো ভিক্ষার ঝুলি মা কচলায় অবেলায় ।রক্তিমা সোশ্যাল ম্যানেজমেন্ট পড়ার জন্য দ্বিতিয় বর্ষেই অন্য শহরে চলে যায় । তাতে কী! আরও নিখুঁত হয় নৌকোর জরুরী ।তখনের এসটিডি কলে বুথে বসে ঘণ্টা পেরিয়ে যেতো দুজনের মৃদু আলাপে, কখনো কান্নায়,আবেগে … বান্ধবীরা হয়তো এমনি বহুজন্মের মিলনসূত্র নিয়ে বেহাগ হয় আজো। আর তাই কলেজে থাকাকালীন তাদের এই বন্ডিং অন্যান্য সহপাঠীরা ঈর্ষার চোখে দেখতো । এমনকি প্রিয়ার বয়ফ্রেন্ডও জিলাস ফিল করতো কোথাও একটা । কিন্তু রক্তিমাকে নিজের গহন মনের আয়না মনে করতো প্রিয়া আর তাই সাতকাহন খুলে দিতে পারতো অনায়াসে তার কাছেই। রক্তিমার চলে যাওয়াতে প্রিয়া একা হয়ে যায় ঠিকই কিন্তু রক্তিমার জন্য মন কেমন করা ভালোবাসা কখনো এক বিন্দু কম অনুভব করেনি। প্রিয়া বিবাহসুত্রে কলেজের পর কেরালা চলে যায়। আর রক্তিমা ইউনিভার্সিটিতে প্রথম হয়ে গোল্ডমেডেল নিয়ে বেরিয়ে দিল্লিতে জব নিয়ে চলে যায়। মাঝে ছ’বছর কেটে যায় ওদের দেখা হয়না। রক্তিমা আবার নিজের শহরে চলে যায় ট্র্যান্সফার নিয়ে।ওর রাজকুমার সেখানেই চাকুরীরত ।রক্তিমা যেমন অপরূপা সুন্দরী তেমনি খুব হ্যান্ডসাম ওর মনের মানুষ – রজত। এই বিরল সৌন্দর্যের প্রিয়জুটি বিয়ে করে সংসার শুরু করে যথারীতি ।

বহু নির্যাতিত মহিলা ও শিশুসহ অন্যান্য নাগরিকের সামাজিক কিংবা নৈতিক জীবনের অন্ধকার মুছে তাদেরকে দুমুঠো চাঁদ দেখানোই রক্তিমার কাজের স্পিরিট ছিল। রক্তিমারা আছে বলেই আজো সমাজের পীড়িত , লাঞ্ছিত , অবহেলিত নারীদের সাথে ন্যায় হয়। পিছিয়ে পড়া সমাজের গল্পগুলিকে নতুন আলোতে ধুয়েমুছে উন্মুক্ত আকাশের দিকে গড়িয়ে দেয় রোজ রক্তিমা তার বহুধা বিস্তৃত মহৎ কাজের মধ্য দিয়ে। অথচ তার নিজের জীবনে ততক্ষণে ঘোর অন্ধকার। সমাজে এখনো সাহসী, আত্মপ্রত্যয়ী, স্মার্ট, ঘোচানো, চাকুরীজীবী নারীরা সংবেদনশীল মননের জন্য বঞ্চিত হচ্ছে, অন্ধকারের সাথে সমঝোতা করতে হচ্ছে ভাবলে অবাক হতে হয় ।পরাধীনতার চাইতেও অসহ্য, নির্মম পরিস্থিতি তিলে তিলে শেষ করে দেয় তাদের বাড়ন্ত চাঁদের ফুটেজ । নারীরা ঘরে বাইরে আজও কতভাবে অসহায়।

রক্তিমাদের কোন সন্তান ছিল না। না ই থাকতে পারে। তাতে কি? এ নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর সুখদ বসন্তে কোথাও কোন পারস্পরিক যাতনার আবহ ছিল না । ওদের বেসামাল ভালোবাসা একে অপরের জমিনে সবুজ করে রাখত বেমালুম ঝর্না।রজত রক্তিমাকে কখনোই এর জন্য আপসোস করতে দিত না। বরং ভুলিয়ে রাখতো অতিরিক্ত ভালোবাসার অনন্ত আবেগে। কিন্তু ওদের দাম্পত্যসুখ কেন যে সহ্য হত না হেমলতাদেবির!


এভাবেই কোন কোন নারীজীবনের অভিশাপ হয়ে আসে আজো সেই তথাকথিত সামাজিক নারীকলঙ্ক--- কিছু কিছু শাশুড়ি নামের অশুভ ছায়াযামিনী একটা বয়ে চলা নদীকে গুটিয়ে পাহাড় বানিয়ে দেবার শিল্প কী করে যে রপ্ত করে আজও জানা নেই। কোন লজিকের কাছে ওরা বিকিয়ে দেয় মানবিকতার শেষতম সৌকর্য কে জানে! কি চায় ওরা ?কিসের স্পর্ধায় শাসকবৃত্তি গ্রহণ করে কুঁজো করে দিতে চায় জঠর ও তার ফাঁকের দুপাতা আকাশ ? কি পায় ওরা? মাতৃত্বের সুখ থেকেও বেশি কিছু? কি ছিল না রক্তিমার যার জন্য এভাবে লাঞ্চিত হতে হচ্ছে তাকে? একজন সুপ্রতিষ্ঠিতা, অসামান্যা সুন্দরী , সুহৃদ, লাবণ্যময়ি,সুভাষিণী, অমায়িক, শান্ত, ধীর , মেধাবি, কোমল , শুচিস্মিতা পুত্রবধূ রক্তিমা যাকে পেয়ে ধন্য হবার কথা ছিল অথচ হেমলতাদেবি সহ্য করতে পারছিল না তাকে। দুমুঠো নিবালা পর্যন্ত জুটত না সময়ে রক্তিমার। ওদের সংসারে কোনকিছুর অভাব ছিল না । সারাদিন অফিস করে বাড়ি ফিরে রক্তিমা ঠিক বুঝতে পারতো না এত নাপছন্দ , অনাদর কেন! ও সবরকম ভাবে চেষ্টা করতে শুরু করে সংসারকে ফুলেল করতে। সাংসারিক কাজে হাত বাটানো থেকে আর্থিকসাহায্য পর্যন্ত যাবতীয় সব করেও কোথাও কিছু স্বাভাবিক করা গেলো না বরং হারিয়ে ফেলছিল কাছের মানুষটাকেও। সারাদিন মায়ের মন্ত্রণায় রজতও কেমন অল্প সময়ের জন্য হলেও অবিশ্বাস, অবহেলা এগিয়ে দেয় রক্তিমার দিকে। অকালেই বসন্ত হারিয়ে ফেলে একটা সাজানো বাগান। ধীরে ধীরে রক্তিমা অসুস্থ হয়ে পড়ে শারীরিক ভাবে, এমনকি মানসিক স্থিতিও ঢলে পড়া সূর্যাস্তের ধুলোয় মিশে যেতে থাকে। অন্যসবার মতো রজতও রক্তিমার শারীরিক অবস্থাকে অবহেলা করতে থাকে । রক্তিমা হস্পিটালাইসড হয় । ৪৮ ঘণ্টার ভ্যান্টিলেশনে রাখা হয় আই সি ইউ তে । কত সহজ ভাবেই একটা স্বচ্ছপ্রাণকে মানসিক নির্যাতনে ঘায়েল করা যায় এভাবে! রজত নিজের ভুল বুঝতে পেরে লজ্জিত হয় । রক্তিমার পায়ে লুটিয়ে পরে। রক্তিমা বলে--- “ প্রার্থনা করো আমি যেন বেঁচে না যাই আর যদি যাই ও বাড়ির নরকে আর ফিরে যাবো না । তোমার মা একজন ট্রেন্ডি রাক্ষসী।“ প্রথমবার কোন মানুষকে নিয়ে এমন ভাষা খরচ করে লাচার রক্তিমা। কিই বা করতো এ ছাড়া ? এ যাত্রায় মৃত্যুর সাথে লড়াকরে বেঁচে যায়।ভালোবাসার পূজারী ছিল, তাই রজতকে অস্বীকার করতে পারে না । সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে যায় রজতের অভয়ে। কিন্তু অভিশাপ পাশ ছাড়েনি । কত জঘন্য সিন প্লে হয় সংসারে। রক্তিমা এবারে অবশ্য আর সেভাবে দুর্বল হয়নি।আত্মসম্মান জন্মগত অধিকার।আর সমঝোতা নয়। মেঘেরা আছে বলেই বৃষ্টির এত আদর। এনরিচ করে নিজের মনের ছক। আবিষ্কার করে ঘোলা আকাশ থেকে নিজভাগের চাঁদটুকু বের করে আনার আর্ট অর্থাৎ আর্ট অফ লিভিং রিভার্স হতে থাকে নিজের আঁকা নৌকোর পাদানিতে ।সেবারেই দীর্ঘ দুবছরের অপেক্ষার পর অনাথ আশ্রমের ফোন আসে পরীকে আইনি স্বীকৃতিতে কন্যা হিসেবে অ্যাডাপ্ট করার জন্য।বহুদিন পর রক্তিমার জীবনে ঘোড়া সেলাইয়ের শব্দ নিচু হয়ে এলো । আকাশটা একেবারে নুয়ে দিয়েছে সমস্ত রং । রক্তিমা , রজতের যৌথ ম্যারাথনে এবারে খোলামেলা শরৎ। পরীকে হেমাদেবির প্রথমে আপত্তি থাকলেও পরিস্থিতির চাপে স্বীকার করেই নিতে হয়। পরী আসার পর অনেক কিছুই বদলায়। পরীর চোখে রোজ স্বপ্ন সাজায়। পরী ই এখন রক্তিমার জন্নত। সমস্ত ঝড়কে তুয়াক্কা করে ইতিমধ্যে রক্তিমা ‘Women Empowerment’ এ রিসার্চ করে পি এইচ ডি ডিগ্রি লাভ করে নিজের মেধা ও আত্মবিকাশের স্পর্ধায়। ক্রমে মেধাভিত্তিক সরকারী পাব্লিক সার্ভিস কমিশন এক্সাম পাশ করে নিজের শহরেই ডেপুটি ডিরেক্টর হয়ে হাজারো দেশবাসীর জনহিতকর তথা সোশ্যাল ডেভ্লপমেন্ট এর কাজ নিপুণ ভাবে সামলাচ্ছ । রক্তিমারা ভালো থাকা ও ভালো রাখা দুই -ই নরচ্যার করতে শিখে যায়।

এভাবেই কত কত আগস্টের ব্যালান্স করতে করতে আকাশ ছিঁড়ে ফেলে রক্তিমপাখি, স্বাধীনতা টের পায় না এসব। আজাদ হোক সব খাঁচার গল্পরা ---- একটু নীল তাদের জানলা হোক । কত অবলা পাখিরা রক্তিমাদের দিকে তাকিয়ে চারদেয়ালে ঝুলিয়ে রাখে আজাদহিন্দ ফৌজ।

পতাকার শব্দ শোনা যায় ……