কবর অথবা শ্মশান কাহিনি

শেলী সেনগুপ্তা

পাড়ার ছেলেরা খেলা ছেড়ে নদীর পাড়ে ভীড় করেছে। ফিস ফিস করে কথা বলছে, সবার দৃষ্টি নদীর দিকে। কেউ কেউ উবু হয়ে বসে কি যেন দেখার চেষ্টা করছে। সবার ফিস ফিস কথাগুলো একসাথে হয়ে মৌমাছির গুঞ্জনের মতো ঊড়ে যাচ্ছে। কেউ একটুও সরছে না নিজের জায়গাক থেকে। মনে হচ্ছে একটা জায়গা অনেক টাকা দিয়ে কেনা হয়েছে, সরে গেলেই হাতছাড়া হয়ে যাবে।
দেখতে দেখতে ভীড় আরো বেড়ে যাচ্ছে। পথ দিয়ে হেঁটে যাওয়া লোকগুলোও মাথা থেকে ছাতা নামিয়ে গুটাতে গুটাতে নদীর পাড়ের ভীড়ের মধ্যে জায়গা করে নিচ্ছে। চাইলেই কি আর জায়গা পাওয়া যায়? সবাইকে একটু ঠেলেঠুলে একপাশে দাঁড়ালেও, যার পাশে দাঁড়ানো হয়েছে সে আবার যথেষ্ট অধিকার সচেতনতার সাথে নিজের জায়গাটা বুঝে নিচ্ছে।
খেলার মাঠটা যত বড় ঠিক ততটুকু জায়গা জুড়ে নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে আছে গ্রামের মানুষ। একটু দূরে দূরে বউঝিরাও ঘোমটার ফাঁকফোকর দিয়ে দেখছে। হঠাত একটা শিশু তারস্বরে চিৎকার করে উঠলো। অন্যমনষ্ক মায়ের স্তনবৃন্ত মুখ থেকে সরে যাওয়াতেই এমন চিৎকার। মা সচেতন হয়ে শিশুকে শান্ত করতে করতে ভীড় থেকে বের হয়ে গেলো। কিন্তু মন পড়ে আছে নদীর পাড়ে। শিশুর কান্নার শব্দ সবাই নাড়া দিয়ে গেলো। কেউ কেউ নদীর পাড় থেকে সরে এসে মাঠের মধ্যে জটলা শুরু করেছে। এক এক জন এক এক রকম মন্তব্য করছে। কারো সাথে কারো কথা মিলছে। কেউ আবার পাশের জনের মন্তব্য উড়িয়ে দিতে নিজের মত প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছে।
এসময় সবাইকে তটস্থ করে দিয়ে মাদ্রাসার বড় হুজুর এসে হাজির হলো। পেছনে ছাতা ধরে আছে খালেদ মুন্সী। বড় হুজুর হাঁসফাস করতে করতে হাজির হলো। হন হন করে নদীর পাড়ের দিকে যেতে দেখে মানুষের বহরও নদীর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বড় হুজুর কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে দেখলো তারপর ফিরে এসে বললো,
- হোনো মিয়ারা, লাশ যহন আমাগো এলাকায় আইছে তহন দাফন কাফনের ব্যবস্থা করন লাগবো।
এমন সময় কুদ্দুস পাগলা বলে উঠলো,
- বড় হুজুর, হিন্দু না মোসলমান না জাইনা কেমনে দাফন কাফন করবেন।
- বেতমিজ ছ্যামড়া, বেয়াদবির জায়গা পাস না? এক বারি মাইরা মাথা ফাডাইয়া দিমু কইলাম।
বলেই বড় হুজুর অন্যদের দিকে তাকিয়ে বললো,
- তরা লাশডা তুইল্যা আন, বালা কইরা দেখ সুন্নত আছে নি। সুন্নত দেখলেই দাফন কাফন কইরা দিমু।
- আইচ্ছা, যাইতাছি,
বলেই কয়েকজন বেশ উৎসাহের সাথে নেমে গেলো। লাশটা অনেক্ষণ পানিতে থেকে বেশ শক্ত হয়ে গেছে। ওরা ধরাধরি করে এনে চিৎকরে শুইয়ে দিলো। লোকটার পরনে একটা কাপড়, অনেকটা গোছ করে পরা। একটা চামড়ার বেল্ট দিয়ে বেশ ভালোভাবে কোমরের সাথে আটকানো।
বড় হুজুরের নির্দেশে কয়েকজন বেশ উৎসাহের সাথে কাপড় খোলার কাজে লেগে গেলো। অনেক করসত করে কাপড়টা খোলা হলো।
গ্রামের লোকরা আবার হুমড়ি খেয়ে পড়লো, সবাই দেখতে চায় লোকটা হিন্দু নাকি মুসলমান। যারা সামনে ছিলো তাদের সরিয়ে দিয়ে পেছনের লোকগুলো হুমড়ি খেয়ে পড়তে চাইলো। একটু দূরে দাঁড়ানো মহিলাও উসখুস করছে। বড় হুজুর না থাকলে ওরাও একটু এগিয়ে যেতো।
কাপড় খোলা হলো, একজন আরেকজনের মুখের দিকে তাকাচ্ছে, কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। অনেকক্ষণ পানিতে থাকার কারণে ছোট ছোট জলজপোকা কাপড়ের ভেতরে ঢুকে গেছে। পোকাগুলো উর্ধমুখী পুরুষাঙ্গের নরম চামড়ার প্রায় সবটুকু খেয়ে ফেলেছে। এখনও খুটে খুটে খাচ্ছে।
বড় হুজুর বার বার দাঁড়িতে হাত বুলাচ্ছেন আর ভাবছেন কি করা যায়।
কুদ্দুস পাগলা হেসে কুটি কুটি। হাসতে হাসতে কখনো আকাশের দিকে দু’হাত তুলে নাচছে কখনো মাঠের মধ্যে গড়াগড়ি খাচ্ছে। বড় হুজুর হাতের লাঠি দিয়ে দু’ঘা দিয়ে দিলো, তাতে কুদ্দুস পাগলার হাসি আরো বেড়ে গেলো।

মাঠে অনেকগুলো দল, প্রত্যেক দল নিজেদের মতামত দিচ্ছে। এক এক দলের এক এক মত।
এতোক্ষণ পরে গ্রামের মহিলারা লাশের কাছে আসার সুযোগ পেলো। সবাই ই এক বার করে দেখে সরে যাচ্ছে। যাওয়ার সময়র মুখে আঁচল চাপা দিচ্ছে। কম বয়সীরা লজ্জা পাচ্ছে, তারপরও দেখছে আর দেখেই মাথার ঘোমটা আরো একটু টেনে সরে।

এমন সময় অনেকগুলো শিশু কাঁদতে কাঁদতে নদীর পাড় ধরে ছুটে আসছে। ওদের চোখ নদীর দিকে। ‘বাবা’ ‘বাবা’ করে চিৎকার করছে। কাউকে খুঁজছে, ওদের হাহাকারে নদীর ঢেউ থেমে যাওয়ার উপক্রম। অনেক দূর থেকে ছুটে এসে ওরা মানুষের জটলা দেখে থমকে দাঁড়ালো। ওদের মধ্যে একটা শিশু বলে উঠলো,
- ঐ যে আমাদের বাবা।
আবার সবাই ‘বাবা’ ‘বাবা’ করে ছুটে এলো। লাশটাকে ঘিরে বসে মাতম শুরু করলো। এক এক জন তো মাটিতে গড়িয়ে গড়িয়ে কাঁদছে। ওদের কান্নার শব্দে চারপাশ ভারী হয়ে উঠেছে। ওদের মধ্যে একজন একটু বড়, সে সবাইকে সামলানোর চেষ্টা করছে।
বড় হুজুর খালেদ মুন্সীকে বললো,
- ওহান থেইকা নীল গেঞ্জি পরা পোলাডারে ডাইকা আন।
খালেদ মুন্সী হন্তদন্ত হয়ে ছুটে গিয়ে ছেলেটাকে ধরে নিয়ে এলো। ছেলেটা চোখ মুছতে মুছতে কাছে আসলো।
- অই ছ্যামড়া, বেডা তোগো কি লাগে?
- আমগো বাবা।
- কি কস? তরা এত পোলাইনের বাপ হেই বেডা?
- হ, আমগো বাবা।
- কই থাহস?
- কদম তলি গেরামত।
- বেডাই মরলো ক্যামনে?
- কাইল ডাকাইত পড়ছিলো, বাবারে মাইরা ভাসাইয়া দিছে।
বলেই হু হু করে কেঁদে ফেললো।
- এয় ছ্যামড়া, কাদ্দিস না। অহন ক, বেডা কোন জাতের?
- কি কন?
- কই, বেডা হিন্দু না মোসলমান?
- বাবা তো আমগো বাবাই, বাবার আবার জাত কি?
- কয় কি ছ্যামড়া, দাফন কাফন করন লাগবো তো, বেডায় কি নামাজ পড়ত?
- দেহি নাই।
- বেডায় কি মুর্তিপূজা করত?
- দেহি নাই।
- তয়, বেডায় কি করত?
- আমগো মত পোলাপাইনগোরে রাস্তা থেইকা কুড়াইয়া আইনা হ্যার আশ্রমত রাখত।
- কোন আশরম?
- অনাথ আশ্রম।
- হেইডা কোনহানে?
- নদীডা যেহান থেইকা শুরু অইছে হেইখানে।
এটুকু শুনেই বড় হুজুর হন হন করে হাঁটতে শুরু করলো, বিড় বিড় করে বলে গেলো,
- অজাত-কুজাতের আবার দাফন-কাফন কিয়ের?
বড় হুজুরের সাথে সাথে অনেকেই মাঠ ছেড়ে চলে গেলো।
যারা তখনও দাঁড়িয়ে আছে তাদের সামনে নেচে নেচে কুদ্দুস পাগলা বলছে,
‘ দেহো দেহো, বেডা আসমান মুহি এন্টেনা তুইলা দিয়া ভগবানরে হ্যার জাতের খরব জিগাইতাছে, হালায় বাইচ্ছা থাইকা জাত লাগে নাই, মইরা জাত খোঁজে, হা হা হা।