আমার যুদ্ধ

প্রতিমা দত্ত

আমার জীবনের কথা শুনতে চাইছো …জীবনের সংগ্রামের কথা, কি যে বলি ! কোনোদিনতো বলা হয়নি কারুকে। সবকিছু মনেও নেই হয়তো।জীবন মানে তো যুদ্ধই ।আর আমরা যারা দেশভাগ দেখেছি,নিঃস্ব উদবাস্তু হয়ে এদেশে এসে মাসের পর মাস ক্যাম্পে থেকেছি তাদের জীবনের পরবর্তী যুদ্ধগুলোও খুব কঠিন হয়ে যায়। ভাবতে গেলে থৈ পাইনা । লিখতে গেলে তো মহাভারত ।অত জায়গা আছে তোমাদের বইতে ?
...নাঃ, এটা একটা ঠাট্টার কথা। সব কথা বলাও যায়না, লেখাও যায়না।
একটা কথা কিন্তু খুব সত্যি জানো ,সময় যখন ঘাড়ের ওপর এসে পড়ে, তখন কোথা থেকে যে শক্তি আসে, ভাবি, আমাকে পারতেই হবে। আর পেরেও যাই। আমার গুরু সহায়। পরে অবশ্য মনে হয় ,যে শেষ পর্যন্ত লড়াইটা চালালো সেই মানুষটা কি আমি ? ঠিক আছে, জানতে যখন চাইছো, এক বারের কথা বলি ছোট্ট করে।
তখন তোমাদের মেসোমশাই কোচবিহারে গ্রামসেবক ট্রেনিং-সেন্টারে কাজ করতেন। ওটা কোচবিহার রেল স্টেশনের কাছে।মাঠের ধার দিয়ে রাস্তা ।রাস্তার পাশ দিয়ে সারি দেয়া সুন্দর ছোট্ট ছোট্ট কোয়ার্টার।ইলেক্ট্রিক কানেকশন, জলের কল ।ঝকঝকে গোছানো। মনে আছে ,পাঁচ নম্বর কোয়ার্টারে ছিলাম আমরা।তা,হঠাৎ বলা নেই কওয়া নেই চা-বাগানের চাকরী নিয়ে কোচবিহারের সরকারী চাকরী ছেড়ে দিলেন তিনি। কারণ জিজ্ঞাসা কোরোনা,তাঁর সারাজীবনই এই খামখেয়ালিপনা। সেখানে নাকি বড্ড ঘুষের উপদ্রব।
চারটে ছোটো ছোটো বাচ্চা।সঙ্গে দেওর আছে। চারদিকে শুধু চা-বাগান,গাছ-গাছালি আর জঙ্গল।প্রথমটায় একটা গেস্টহাউসে কিছুদিন আমাদের রাখা হল।তারপর কোয়ার্টারে এলাম।সেখানে বড় বড় ঘর-বারান্দা ।ঘরে আলো নেই,পাখা নেই । মাত্র কয়েক ঘর বাঙালী।দুই কোয়ার্টারের মাঝে একখানা ছোটখাটো আম কাঁঠাল নারকেল সুপারী জাম জামরুলের বন বলতে পারো । সন্ধে লাগলেই অন্ধকার। থৈ থৈ করে জোনাকি। আলো জ্বলতো শুধু ফ্যাক্টরী, হসপিটাল আর সাহেবকুঠি মানে ম্যানেজারদের বাংলোতে। কোচবিহারে কয়লার উনোন ছিল। এখানে কাঠের চুলো। আস্তে আস্তে সব সইয়ে নিচ্ছিলাম।
নতুন জায়গা। অচেনা মানুষজন। সে যাই হোক, অফিসের কাজ করে কয়েক মাসের মধ্যেই আমার স্বামী ইংরেজ ম্যানেজারদের সুনজরে পড়লেন। তারা আবার কাজের কদর করতো খুব।বছর খানেক পরেই তাঁকে প্রমোশন দিয়ে উঁচুপদে দেওয়া হবে ঠিক হল। জানতে পেরে বাগানের অন্যান্য স্টাফদের ভারী গোঁসা।এ কেমন কথা ! একটা নতুন লোক সবাইকে টপকে মাথার ওপর বসবে ? তারা অফিসে নানান রকম শলা-পরামর্শ করতে লাগল। সেগুলো হয়তো তিনি শুনে ফেলেছিলেন।মানুষটা সৎ, শান্ত আর একটু ভীতু প্রকৃতির। ছোটখাটো পরিস্থিতিতেও ঘাবড়াতেন। এমনিতেই চিরকালের পেটরোগা। উদ্বেগে দুশ্চিন্তায় পেটের অসুখ আরো বাড়ল।বিছানায় পড়ে গেলেন একেবারে । দু’দিন পর সকালে খবর দিয়ে বাগানের ডাক্তারকে নিয়ে আসা হল বাসায়।ডাক্তার দেখে ওষুধ দিল। রাত্রে শুরু হল পেটে অসহ্য যন্ত্রণা আর রক্ত-পায়খানা । সারারাত বেডপ্যান ভরে শুধু রক্ত ফেললাম। আমার এখনো মনে হয়,ইচ্ছে করেই ওরকম ওষুধ দেয়া হয়েছিল। ডাক্তারের সে মাসেই রিটায়ারমেন্ট। চাকরী যাবার ভয়ও ছিলনা।
বাগান থেকেই তাঁকে কোচবিহার হসপিটালে ভর্তি করে দিল।আমি বাচ্চাদের নিয়ে বাগানে। আর ঠাকুরপো সঙ্গে গেল দেখাশোনা করতে।সে যে কি দিন ! টাকাপয়সা জলের মত গেল।যাই হোক,তিনি দু’মাস পরে একটু সুস্থ হয়ে ফিরলেন। অফিসে গেলেন। কিন্তু তাঁর নাকি চাকরীটাই আর নেই।
বেশ মনে আছে, সকাল ন’টা হবে। আমি বসে বসে মুড়ি ভাজছি। পাগলের মত চেহারা নিয়ে ঢুকলেন রান্নাঘরে। হাতে একটা বড় খাম। – আর মুড়ি ভেজে কি হবে, এখন তো সবাই মিলে রাস্তায় থাকতে হবে। তার জন্য তৈরী হও। শুনলাম তিনি নাকি শারীরিক ভাবে চাকরী করার অযোগ্য।তাই ওই পোস্টে অন্যলোককে নেয়া হয়েছে।
ইউনিয়নের লোকজন এল ।অনেক আশ্বাস দিল। আদালতে মামলা শুরু হল। কেস মিটমাট না হওয়া পর্যন্ত বাসাটায় থাকতে পারব আমরা।কিন্তু খাব কি ? মাইনেপত্র নেই।রোগীমানুষটাকে নিয়ে সাত জন। বড়মেয়েকে দেড়বছরের নিয়ে এপারে আসা আমাদের। খালি হাতে। সমস্ত সোনা বর্ডারে কেড়ে নিয়েছিল।যা একটু হাতে কানে তাও তাঁর চিকিৎসায় গেছে। আমার বয়েস তখন কত ? কত আর,…এই ২৬/২৭ হবে…
শুরু হল লড়াই। একই কোম্পানীর তিন বাগান পাশাপাশি। মোট ১৮০ টাকা প্রতিমাসে চাঁদা তুলে আমার হাতে দিতেন সবাই মিলে।সেটা ১৯৬৭ সাল।তিনি আবার অসুস্থ হলেন। শুধু তাঁর ওষুধ কিনতেই ৩০/৩৫ টাকা চলে যেত। তাঁর পথ্য, সবার মুখে কিছু তুলে দেওয়া্র জন্য বাকি টাকাটুকু মরুভূমিতে শিশিরবিন্দু। নিজের কথা ধরিনা,আমার ছোটো ছোটো বাচ্চাগুলো কি শেষে না খেয়ে মরবে ? আমি কি করে চোখের সামনে দেখব সেটা ? আমার স্বামী ? দেওর ? ভাবতে ভাবতে আর ভাবতে পারিনা। তখনো বাচ্চারা বিপদের কথা জানেনা। কিছু তো করতেই হবে।সবাইকে বাঁচাতেই হবে।কিন্তু কি করব কিচ্ছু জানিনা।যেদিকে তাকাই ,অন্ধকার…
একদিন খুব ভোরে উঠে রান্না, রোগীর ব্যবস্থা সব কিছু সেরে, চিকিৎসার কাগজপত্র নিয়ে “কোচবিহার যাচ্ছি” বলে রওনা দিলাম। জীবনে সেই প্রথম একা এভাবে বাড়ি থেকে বেরোনো।লেখাপড়া কিছুইতো শেখা হয়নি। কিন্তু জীবন… দ্যাখো কাকে কিভাবে কি শেখায় ! একটা মাত্র বাস তখন ঐ বাগান থেকে যেত। আর একটা বাসই ফিরত। বাসে তো উঠে বসলাম, জানিনা কি করব , কার কাছে যাবো । বাসে বসে বসেই ঠিক করলাম, কোচবিহার হসপিটালের ডি এম ও র কাছে যাই। খুঁজে খুঁজে তাই গেলাম। ভাগ্য ভাল কোয়ার্টারেই ওনাকে পেলাম । উনি আমার সঙ্গে দেখা করলেন। বললাম, এই হসপিটাল থেকে আমার স্বামীকে এমন একটা সার্টিফিকেট দেওয়া হয়েছে যে তাঁর চাকরী চলে গেছে। আমার চারটে ছোট ছোট বাচ্চা, বেকার দেওর, অসুস্থ স্বামী। আমাকে সাহায্য করার মত কেউ নেই এপারে। আপনি দয়া করে আমার স্বামীর চিকিৎসার ব্যবস্থাটুকু অন্তত করে দিন…।
উনি আমার হাত থেকে সমস্ত কাগজপত্রগুলো নিয়ে মন দিয়ে দেখলেন। ওখানে লেখা ছিল যে, ডি এম ও র ডিসচার্জ সার্টিফিকেটে আমার স্বামীকে ফিজিক্যালি আনফিট করা হয়েছে। উনি অবাক হলেন। বললেন, কোনোভাবেই একথা সত্যি নয়। তুমি ভীষণ বিপদে পড়ে আমার কাছে এসেছ মা,তাই যেটা তোমাকে দেওয়াটা উচিত নয়, সেই সার্টিফিকেটের কপি তোমাকে দিচ্ছি। এটাতে তোমার কিছু সুরাহা হবে হয়তো। একটা কপি নিজের কাছে রেখে এই কাগজটা ইউনিয়নের কাছে জমা দিও।
সেদিন ফেরার পথে ক্লান্ত, সারাদিন না খাওয়া ,(খাব কি ? হাতে বাসভাড়াটুকুই ছিলনা ঠিকমত ) কোনোভাবে একটা প্রাইভেট লরী করে পাশের বাগান পর্যন্ত পৌঁছলাম।রাত্রি তখন আটটা। বাসা সেখান থেকে প্রায় আরো দেড় কিলোমিটার। লরীর লোকজন বলল,আজ এই বাগানেই চেনা কোনো বাড়ীতে থেকে কাল সকালে যান দিদি । কিন্তু আমি বাচ্চাগুলোকে ফেলে গেছি। নিজের কথা চিন্তা না করে তাই অত রাত্রে অন্ধকারেই রওনা দিলাম । একা একাই হাঁটতে শুরু করলাম গুরুদেবকে স্মরণ করে। রাস্তার দু’পাশে ঘন বাঁশবন, দিনের বেলায়ই অন্ধকার থাকে,হাতীর ভয়ে লোকে সাহস করেনা হাঁটতে। কিন্তু আমি তো মা।আমি ভয় পেলে কি করে চলবে। জানো তো ,আমার ছোটোটাকে বাঁচাতে আমি এই বাগানের বাসাতেই কাঠের খড়ম ছুঁড়ে গোখরো সাপের ফণা থেঁৎলে দিয়েছি।
কিছুদূর যাবার পর পেছন থেকে টর্চের আলো পড়ল গায়ে। আমাদের পরিচিত একজন পাশের বাগান থেকে ফিরছেন। আমাকে একা এভাবে দেখে ভীষণ অবাক । উনি সাইকেল থেকে নেমে আমার সঙ্গে হেঁটে বাসা পর্যন্ত পৌঁছে দিলেন।
আমার এই কঠিন দিনে আমার সঙ্গে ছিল আমার দেওর। কোচবিহার ছেড়ে সেই বাগানে যাবার পর এক কাকু, কাকিমা আর ভাই পেয়েছিলাম। কাকু ছিলেন ঐ বাগানের হসপিটালের কম্পাউন্ডার।তাঁরা ছিলেন আমার পরম ভরসা,আমার আপনজন । ঐ কাকুর বাল্যবিধবা বোন,বাগানের সবার পিসীমা। মাথাপিছু পাঁচটাকা নিয়ে তিনি সকাল বিকেল বাচ্চাদের পড়াতেন। সেটুকুও তো আমার কাছে তখন অনেক। বাচ্চাদের পড়া বন্ধ করে দিতে হল। পিসীমা কয়েকদিন পর নিজে বাসায় এসে আমাকে রীতিমত ধমকে বললেন, পড়া বন্ধ করলা কার হুকুমে ? মাইজ্যাটা ক্লাস ফোর এ উঠসে, বৃত্তি পরীক্ষার আর দুইদিন, সে কথা মাথায় নাই ? কাইল থিক্যা যদি না যায় , কান ধইরা হিড় হিড় কইরা নিয়া যাব দেইখো। আমারে টাকাপয়সা দ্যাখাইয়োনা…
বাগানের বড় গুদামবাবুকে অনেক মিনতি করে ঠাকুরপোর একটা দিনমজুরীতে কাজের জোগাড় হল। ওর শিক্ষাগত যোগ্যতা ছিলনা।চায়ের বাক্স বানানোর কাজ করত। প্লাইউড পেরেক হাতুড়ি রাংতা নিয়ে কাজ।কোনোদিনও্তো করেনি এসব । কয়েকদিন পর থেকে ওর হাতের আঙুলে ঘা হতে শুরু করল।কিন্তু কাজ বাদ দেয়নি কোনোদিন। তবু ওটুকুতে যে কিছুই হয়না বোঝোইতো ।
লেখাপড়া জানিনা। ভদ্রবাড়ীর বৌ। ঝি-চাকরের কাজ কেউ দেবেনা।তাছাড়া বাগান থেকেই কাজের লোক দেয়া হতো সব বাসায়। গলার হার বিক্রী করে সেলাই মেশিন কিনলাম। সেলাইএর কাজ সব রকম জানি। কিন্তু, ওখানে কয়েক ঘর মাত্র বাঙালী, ভরসা করে নতুন লোককে কেউ অর্ডার দেয়না। তবু কেউ কেউ অনুগ্রহ করত । নেপালী,মদেশিয়া ওদেরটাও সেলাই করেছি ।কিন্তু তাতে নুন ভাতেরও জোগাড় হয়না।
তখন আর কোনো পথ না দেখতে পেয়ে ভাবলাম ,শরীরে যেটুকু শক্তি আছে সেটা তো কাজে লাগাতে পারি।কম্পাউন্ডার কাকুর কাছে একমণ ধান ধার হিসেবে নিলাম।ধান সেদ্ধ করে,শুকিয়ে আধ কিলোমিটার হেঁটে যেতাম এক বাড়ীতে।তাঁদের বাজারে দোকান ছিল। সবাই দোকানবাড়ি বলত। সে বাড়িতে ঢেঁকীঘর আছে।সঙ্গে ছোট বাচ্চা দুটো থাকত।ঠাকুরপো সাইকেলে করে ধানের বস্তা পৌঁছে দিত । নিয়েও আসত । ঢেঁকীতে সে ধান কুটে যে চাল হত ,তা বিক্রী করে সংসার চালাতে শুরু করলাম। ঠাকুরপো বাগানের বাজারে বসে চাল বিক্রী করেছে।
এরমধ্যে একদিন গণেশ ছেত্রী বলে একজন নেপালী মানুষ এলেন । উনিও বাগানের কর্মী । তোমাদের মেসোমশাই কে শ্রদ্ধা করতেন। তিনি এসে খোঁজ খবর নিয়ে সব কিছু শুনলেন। পরের বেলাতে ২০ মণ ধান মোষের গাড়ীতে করে এনে লোক দিয়ে বাসায় তুলে দিলেন। বললেন, আগে বাঁচতে হবে, তারপর অন্য কথা। কোনোদিন সম্ভব হলে টাকা ফেরত দেবেন,না হলে মনে করব এবার আমার ওইটুকু ফসল হয়ইনি। জানিনা, বিনা স্বার্থে উনি যা করলেন তা কেউ কারোর জন্য করে কিনা...আমার আত্মীয়রা সব জেনেও মুখ ফিরিয়ে ছিল, একদিনের জন্যও কেউ খোঁজ নেয়নি। গুরুদেব এঁকে পাঠালেন বাঁচার রসদ জোগাতে। মনে বল আসলো। মনে হল,এবার তাহলে সবাই মিলে বাঁচব আমরা...
সেই কুড়িমণ ধান থেকে কাকুর ধানের ঋণ শোধ করলাম।বাকী ধান দিয়ে ব্যবসা চালালাম দেড় বৎসর ধরে।যাঁদের বাড়ীতে ধান কুটতে যেতাম তাঁরাও অনেক সহ্য করেছেন। সব কাজকর্ম সেরে বেলা দুটো আড়াইটার দিকে যেতাম।সঙ্গে ছোটো বাচ্চা দুটো যেত। একটা দেড়, আর একটা সাড়ে তিন বছর।কোনো কোনোদিন বাচ্চাদুটো ওনাদের ঘরেই ঘুমিয়ে পড়ত। একটা বউকে রেখেছিলাম মজুরী দিয়ে। সে ঢেঁকীর গড় থেকে আধকোটা চাল ঝেড়ে ধান গুলোফের গড় এ ঢেলে দিত। আমি ঢেঁকীতে পাড় দিয়ে যেতাম আর আকাশ পাতাল ভাবতাম।চোখের ওপর ছোটোবেলাটা ভাসত।
আমি সম্পন্ন ঘরের মেয়ে ছিলাম।বাপের বাড়ীতে চারটে উঠোন জুড়ে ধান কলাই মেলা থাকত। সারা বছর ধরে সময়ের ফসল উঠত। সেগুলো ঝাড়াই বাছাই ,ঘরে তোলা , ধান কুটে চাল করার জন্য সারা বছর মুনিশ কাজ করত। আমাদের জমিতেই এক চাচি থাকত। সারা বছরের ধান কোটা, চিঁড়ে বানানো , খই মুড়ি ভাজা এসব সেই দেখে শুনে করত। রাজশাহী জেলার নাটোর মহকুমায় মাজগ্রামে আমার বাপের বাড়ী। বাবা কাকা জ্যাঠা সবাই মিলে বিরাট সংসার।১৫ জন ভাই বোন, তাছাড়া আত্মীয় স্বজনের আসা যাওয়া লেগেই থাকত। মা কাকীমাদের রান্না করতে হতোনা। উড়ে ঠাকুর ছিল। অপূর্ব তার রান্নার হাত। আমরা বোনেরা যে কি মজা করে কাটাতাম...পুকুরের জল তোলপাড় করে সাঁতার, ভোর বেলা উঠে আম কুড়োনো ...সারা দুপুর আম জাম কুল মাখা আয়েশ করে খাওয়া।পুতুল বিয়ের ধুম.... । কে কোথায় সংসার করছে এখন । এপার ওপার...। গাঙে গাঙে দেখা হয়, তবুতো বোনে বোনে দেখা হয়না...মা বাবা ভাই বোন সব কোথায় ! আর আমি এখানে কি দিন কাটাচ্ছি তারা যদি জানত ...! না, কেউ কিছু জানেনা।
দেড় বৎসর কি ভাবে যে কাটল! এখনও খুব মনে পড়ে। না ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে চোখ মাথা সব সময় যন্ত্রণা হত। পরিশ্রমে শরীর ভেঙে আসতো। তবে এটাও সত্যি যে মনের ভেতর একটা অদ্ভুত শক্তি চলে এসেছিল। আমার স্বামী ধীরে ধীরে ভাল হয়ে উঠছিলেন। মামলায় বাগান কর্তৃপক্ষ হেরে গিয়ে চাকরী ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হল। তবে অন্য বাগানে। একটু একটু করে সবার ঋণগুলো শোধ হল।টাকাপয়সার ঋণ শোধ হয়, মানবতার ঋণ তো কখনো শোধ হয়না।তাঁরা সকলে বেঁচে নেই আর,কিন্তু তাঁদের কাছে আমি সারাজীবন ঋণী থাকব।
ভেবোনা যে আমার সব যুদ্ধ থেমে গেল । কারো কারো জীবনে যুদ্ধ থামেনা কখনো। একদিকে যুদ্ধ না মিটতেই অন্য দিকে যুদ্ধের বাজনা বাজতে শুরু করে। এর থেকেও আরো কঠিন কঠিন যুদ্ধ লড়তে হয়েছে আমাকে। তবে আমি যে লড়াই করতে পারি,লড়ে জিততে পারি এই বিশ্বাস আমি এভাবেই অর্জন করেছিলাম। এই বিশ্বাসটুকুই আসল। কখনো মনোবল হারাবেনা। শক্তহাতে হাল ধরে রাখবে, দেখবে, দুর্যোগ একসময় কেটে যায়।