খোঁয়াড়

নভেরা হোসেন

গেন্ডারিয়ার বাড়িটা বোর্ড অফিসের একবারে লাগোয়া। একটা সরু গলি বোর্ড অফিসের পেছন থেকে বামে সোজা ঢুকে গেছে। দুটো লোক একত্রে হাঁটলে গায়ে গায়ে লেগে যায়। বৃষ্টির দিনে মাটি উঁচিয়ে ঘন কাদার পুর তৈরি করে রাখে। পা ফেলার জায়গা থাকে না। শরীর ঘিন ঘিন করে। বাপের বাড়িটা যত ঘিঞ্জিই হোক না কেন এই শহরে আকিমনের যাওয়ার মতো আর কোনো জায়গা নাই। ব্রাশে টুথপেস্ট লাগিয়ে জোরে জোরে দাঁত ঘষতে ঘষতে আকিমন রড দিয়ে গাঁথা দুই বাই তিন জানালা দিয়ে তাকিয়ে থাকে আর নানা কিছু চিন্তা করে। ঘরগুলো সব সারিবদ্ধভাবে একটার গায়ে আরেকটা যেন সেঁথিয়ে আছে। পেটে বাচ্চা আসার পর থেকেই আকিমনের যন্ত্রণার শুরু। প্রথম প্রথম মোহাম্মদ আকিমনকে অনেক যতœ-আত্তি করেছে কিন্তু মার্কেটের কন্ট্রাক্টের কাজটা চলে গেলে তখন আর খুলনা শহরে বাসা ভাড়া করে থাকার উপায় থাকে না। প্রথম কয়েক মাস মোহাম্মদ এদিক-ওদিক ঘুরল, খেপের কাজ করল কিন্তু ওর খুব ঢাকায় থাকার ইচ্ছে। গেন্ডারিয়ায় শ্বশুর-বাড়ির সরু গলিতে ঢোকার জন্য মোহাম্মদ অস্থির হয়ে ওঠে। আকিমন বাবা-মায়ের সংসারে আসতে চায় নি। মোহাম্মদের রাগের কাছে হার মেনে শেষে গাট্টি -বোচকা বেঁধে বাবার বাড়িতে এসে ওঠে। আকিমনের আসবাবপত্রের মধ্যে আছে একটা গোলাপ ফুল ছাপার ট্রাংক, দুইটা প্লাস্টিকের চেয়ার, বিছানাপাতি, অল্পকিছু বাসন-কোসন।
আকিমনের মা মেয়েকে দেখে লাফ দিয়া ঘর থেকে বের হয়ে আসে।
কী রে তুই?
হঁ। তোমাগো জামাইর ঘ্যানঘ্যানানিতে চইল্যা আইছি।
আইছসতো আমার মাথা কিনছস। তরে না কইছি এইমুখে পা বাড়াইবি না। নিজে পছন্দ কইরা বিয়া বইছস গিয়া আটিসের লগে হেয় পারে না খাওয়াইতে পরাইতে?
মা চুপ করো। মোহাম্মদ আইতাছে। তোমার মুখে এগুলান হুনলে শেষে আমারে ফালাইয়া চইলা যাইব।
হইছে। চইলা যাইব। তুই হারামি তারে লাই দিয়া মাথায় তুলছস।
মায়ের অশ্রাব্য গালি-গালাজের মধ্যে দিয়ে আকিমন বাপের বাড়িতে এসে ঢোকে।
সমস্তদিন পেটের ব্যথায় শুয়ে থাকতে থাকতে আকিমনের পিঠের চামড়ায় ছাতা পড়ে যাচ্ছে। দাওয়ার মধ্যে বসে আকিমন রোদ পোহায়। মা আকিমনকে বসে থাকতে দেখে মুখ ঝামটায়।
অভাগীর বেটি হাত-পা নাইড়া খা। আমিতো তগো লাইগ্যা শিন্নি খুলি নাই। ভাদাইম্যা। বদ। সাপের মতো হিস হিস করতে থাকে মা।
আকিমন ঐসব কানে তোলে না। তুললে এই বাড়িতে মোহাম্মদকে নিয়ে থাকা যাবে না। তবু আকিমনের মনটা অস্থির হয়ে ওঠে। আকিমন ভাবে মা ছোটকাল থেকেই ওকে দেখতে দেখতে পারে না। বড় বুবুর লেইগ্যা হের জান ফাইট্টা যায়। বড় বু যখন তালাক নিয়া ফিরা আইল তখনকার ঢং দেখে কে ? হেরে বিয়া দেয়ার জন্য হাজার হাজার টাকা খরচ করছে অথচ আকিমন সোমত্থ মেয়ে তার দিকে মায়ের নজর নাই। আর আছে একখান পোলা হের জন্য কালিগঞ্জের জমিটা বেচল। কী লাভ হইছে? পোলা এখন খোঁজ নেয় মায়ের? তাও দিন রাইত পোলা পোলা। মাকে দু -চোখে দেখতে ইচ্ছে করে না আকিমনের।
মাথার ওপর সূর্য চড়ে গেলে মোহাম্মদ ঘুম থেকে ওঠে। উঠেই ডাকতে থাকে, আকিমন ঐ আকিমন।
আকিমন কোনো শব্দ করে না। মুখে কুলুপ এঁটে বসে থাকে।
কেন যে শয়তানটার বুদ্ধিতে এই খোঁয়াড়ে আইসা উপস্থিত হইলাম, আকিমন রাগে নিজের চুল টানতে থাকে।
মোহাম্মদ চকি থেকে নেমে আকিমনের গা ঘেঁষে বসে, ওই তোর কী হইছে? পোয়াতি হইয়াতো মেজাজ-মর্জি একবারে রানী ভিক্টোরিয়া, কথা কস না কেন?
আকিমন সরে বসে, কী, কী চাও? আমি এখন চাঁদ-বদন করে বইসা থাকমু? কাজ-কর্ম কিছু করবা না?
মোহাম্মদ আকিমনের কুঁচকানো ভুরু দেখে হাসে।
শ্বশুরবাড়ি প্রেত্থম আইসা দুই-চারটা দিন শাশুড়ির আদর সোহাগ খামু, না শান্তি নাই। বউটা পিত্তি জ্বালাইয়া দেয়। বিরবির করতে করতে মোহাম্মদ খালি পেটেই আকিমনদের সাপের মতো লকলকে সরু গলিটা পার হয়ে বের হয়ে যায়।
আকিমনের মা ঝাঁ ঝাঁ করে ওঠে।
লায়েক। লায়েক সাহেব। আটিস। পারবিতো ওই ট্রাকের তলে বইয়া জীবন কাটাইতে। পেটে ভাত নাই, কাম করবে না, যা গিয়া রিকশা চালা।

আকিমন মায়ের প্যাচাল থেকে বাঁচার জন্য ঘরে খিল দেয়। বিছানার ওপর এক টুকরো ফুটফুটে আলো এসে পড়েছে, পেটের কাপড়টা সরিয়ে আকিমন একটু সরিষার তেল পেটে মালিশ করতে থাকে, ভেতরটা কেমন নড়েচড়ে ওঠে। হা হয়ে নিজের ফুলে ওঠা পেটের দিকে তাকিয়ে থাকে আকিমন। মনটা শিরশির করে ওঠে। মোহাম্মদ মানুষটা ভালো। কখনও ওরে না খাওয়াইয়া রাখে নাই। ট্রাকের ছবি আঁকার কাম ছাইড়া লোভে পইড়া খুলনার নিউ মার্কেটে রঙমিস্ত্রির কাম নিলো তখন ভালোই কাটতাছিল দিন। সপ্তাহে সপ্তাহে মাছ, মাংস, মাসে একবার ম্যাটিনি শো। কে জানত মোহাম্মদ রাগারাগি কইরা কাজ ছাইড়া দিবে।
মাথার ওপর কড়া রোদ উঠলে আকিমনের মা দরজা ধাক্কাতে থাকে।
কী ঘুমাইয়া পড়লি? ভাত খাবি না?
না খামু না। আকিমন তেজের সাথে উত্তর দেয়।
কেন তর লাইগ্যা কি পোলাও পাকাইতে হইবো?
আকিমনের চোখটা জ্বালা করে ওঠে। মোহাম্মদ জামাই মানুষ তারে মা ভাতটা খাইতেও সাধে না। সকালবেলা বেচারা খালি পেটে বাইর হইয়া গেল।
আকিমন দরজা খোল। পা দিয়া দরজায় লাথি দিতে থাকে আকিমনের মা।
আকিমন বাহির হ। তরে কী বসায় বসায় খাওয়ামু? হারামজাদী, আজ তোর তেজ বাইর করতাছি।
আকিমন দরজা খুলে বাইরে আসে, তার চোখে রাগ।
মা আকিমনের হাতে ভাতের থালা তুলে দেয়। কড়া বেগুনভাজা আর ডাল। আকিমন খিদার চোটে শব্দ করে খেতে থাকে।
আস্তে খা। গলায় বিষম খাবি। মা কোমল সুরে বলে।
আকিমনের চোখে পানি চলে আসে, সে পোড়া লাল মরিচ ডলে ডলে চুমুক দিয়ে ডালটা খেয়ে ফেলে।
এই মাকে আকিমন কখনও চিনতে পারে না। তার সমস্ত রাগ ক্ষোভ সে আজীবন আকিমনের ওপর ঢাইলা দিছে। সে যখন বখশিবাজার ট্রাক স্ট্যান্ডের আটিস মোহাম্মদের লগে ভাইগা গেল তখন মা গিয়া ওদের প্রথম বাসর ঘরে থুতু ফালাইয়া আসছিল। ওই দিন চিল্লাইয়া সারা বস্তি এক করছিল। আকিমন শরমে, লজ্জায় মুখ তুলতে পারে নাই। মোহাম্মদের কাছে বড় গলা করে মায়ের গল্প করছিল। সব ধূলিস্মাৎ করে দিয়েছিল মা।

দুপুর গড়িয়ে বিকাল হয়ে এলে আকিমনদের বেড়ার ঘরে হু হু করে শীত এসে ঢোকে। আকিমন পা ছড়িয়ে পেটটা আরাম করে মেলে দেয়।
পাশের ঘরের জবার মা এসে জানতে চায়, আকিমন তর যেন কয়মাস হইল?
আকিমন চুপ করে মাটিতে নখ দিয়ে আঁচড় কাটতে থাকে। একটু লজ্জা করে।
জবার মার কৌতূহল মেটে না সে কানের কাছে মুখ নিয়া বলে, মোহাম্মদ তরে খুব পেয়ার করে না?
আকিমন লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ায়, পেটের বাচ্চার কথা মনে থাকে না। একটু চোট লাগে কোমরে।
বিকালটা পড়ে এলে আকিমনের বাবা মেয়ের জন্য হাতে কলা, জিলাপি নিয়ে বাড়ি আসে।
আকিমন গভীর চোখে বাবার দিকে তাকায়। লক্ষ্মীবাজারে বাবার সিলভারের দোকানে সে কতবার গেছে, ভাইয়ের সাইকেলের সামনে বইসা পুরোটা লক্ষ্মীবাজার ঘুইরা বেড়াইছে। বাবা কাস্টমার বসাইয়া আকিমনরে নিয়া হাজীর বিরিয়ানি খাওয়াইতে নিয়া যাইত। আগের কথা মনে হইলে কইলজাটা মোচড় দিয়া ওঠে। স্কুলে পড়ানোর জন্য বাবা কতো চেষ্টা করল। পাড়ার বখাটেগুলার জন্য স্কুলে যাওয়া বন্ধ হইয়া গেল। এসব ভাবতে ভাবতে আকিমন ঘুমে ঢুলে পড়ে। রাত বাড়তে থাকলে আকিমনের মা এসে মেয়ের হাত ধরে হেঁচকা টান মারে। ইটের খোয়ার ওপর পড়তে পড়তে আকিমন দাঁড়িয়ে পড়ে।
কিরে ভাত গেলন লাগব না? আমারে তরা পাইছস কী? বাপ রঙ কইরা কলা আনছে। পিরিতি দেখলে গা জ্বইলা যায়। পেটেরটার লাইগ্যা এতো টান? মনে হয় পেটের মধ্যে লাত্থি মারি। বেজন্মা। পেট বানাইয়া আসছে। স্বামীর খাওয়ানের মুরোদ নাই হাঙ্গা করছে। তরে আমি তালাক দিয়া নিয়া আসমু।
আকিমন মায়ের কথা শুনে তেলে-বেগুনে জ্বলে ওঠে, অনেক সহ্য করছি। এখন আমার দিন খারাপ সেইজন্য এত মুখ ঝামটা সহ্য করতাছি নাহলে কবে চইলা যাইতাম।
যাস না কেন? ঐতো একখান পালোয়ান স্বামী তর, তারে লইয়া চুলায় যা। আমার ঘাড়ে চাপছস কেন?
আকিমন বুঝতে পারে না মা তাকে এত অপছন্দ করে কেন? বড় বুবু তালাক হইবার পর গার্মেন্টসে কাজ নিয়া চইলা গেল। মার এতো সোহাগের মেয়ে শুনছি বাজারের দালালের লগে আছে। মা এখন বুবুর নাম শুনতে পারে না। আকিমন তো বাপ-মার অপছন্দে বিয়া করলেও খোঁজটা নিছে। প্রত্যেক ঈদে মার জন্য শাড়ি কিন্না পাঠাইছে। তার কি কম ভালোবাসা মার জন্য। মা তো সাধা ভাত পায় ঠেলতাছে। মার জন্য মাঝে মাঝে বুকটা হু হু করে ওঠে। এই সংসারের জন্য সারাজীবন খাইট্টা কী পাইল মা ? বড় দুই পোলা-মাইয়া উঁকিটা দিয়া পর্যন্ত দেখে না। চাচারা এককালে চুইষ্যা খাইছে। আকিমন বোঝে মার মনে অনেক কষ্ট, অপমান। তার জন্মের পরে বাপজান প্রথম প্রথম মুখ ঘুরাইয়া রাখছিল। মেয়ে দেইখা কেউ খুশি হয় নাই। তখন এই মা তারে পাইলা বড় করছে। আকিমনের বুক ভেঙে কান্না আসে, মা কেন তার মনটা বোঝে না। প্রথম সন্তান আসতাছে আকিমনের মনের মধ্যে কত ভয়, শঙ্কা আবার একটা আনন্দও ফড়ফড় করে উড়তে থাকে।

গেন্ডারিয়ার সার বাঁধা ঘরে মিটমিট করে বাতি জ্বলতে থাকে। পুরো স্পষ্ট কিছু দেখা যায় না। মোহাম্মদ ঢুলতে ঢুলতে বাড়ি ফিরে আসে। তার শরীরে সেন্টের সুগন্ধ। আকিমন পা ছড়িয়ে ঘরের সামনের একচিলতে বারান্দায় বসে থাকে।
মোহাম্মদ তার গা ঘেঁষে বেশ গদগদ হয়ে বলে, তুই কি হাতিরপুলের মার্কেট দেখছস?
না তো। হেইটা কী?
কী কইতাছি। সিঁড়িগুলান দৌড়াইতাছে। লাফ দিয়া ওঠা লাগবো । বুঝলি কিছু?
না। বোঝনের কাম নাই। কাম -কাজের খবর কী?
খবর নাই।
খবর নাই? এইরকম আর কতদিন চলব? বাপজানও কইতাছিল তোমারে দোকানের কাজে ঢুকাইয়া দিব। বইয়া বইয়া খাওন কে সহ্য করে?
আমি কি বইয়া বইয়া খাইতাছি ? দেখতাছি না কাজ-কাম। পরতায় না বনলে কী করমু ?
আকিমন ঝাঁজের সাথে বলে, থুইয়া দাও তোমার রঙ্গের কথা। পেটে একটা বাচ্চাÑ সেই হুঁশ আছে? আমি এইখানে থাকমু না। মার ঝামটি খাইয়া গেন্ডারিয়ায় পইড়া থাকতে পারমু না। মা ঠিকই কয় ভাদাইম্যা।
মোহাম্মদ আকিমনের কথা শুনে তিড়িক করে লাফ দিয়া ওঠে। ভাদাইম্যা। তুই কী? কই তুই কী? তর কোন ক্ষেমতাটা আছে? আমারে গলায় বিঁধাইয়া এখন মা-মেয়ে যা ইচ্ছা কইতাছস। আমি কিন্তু আর সহ্য করুম না।
সহ্য করবা না কইরো না। ডর দেখাও? আমি ছামেদা বেগমের কন্যা অতো ডর খাই না। চাইর হাত-পা আছে ঘরের বাইর হইয়া যামু।
মোহাম্মদ খেঁকিয়ে ওঠে। যাবিই তো। বোন গেছে তুইও যাবি।
আকিমনের কান লাল লাল হয়ে যায়। বারান্দা থেকে উঠে চকিতে গিয়া বসে সে। মোহাম্মদ সারাদিন রোদে ঘুরে ঘুরে রাতের দিকে বাংলা মদ খেয়ে ঘরে ফেরে। ভেবেছিলো বউর সাথে একটু সুখ-দুঃখের কথা বলবে । কিন্তু আকিমনের মেজাজ ফর্টি ডিগ্রি চড়ে আছে। তাতে অবশ্য মোহাম্মদের কিছু আসে যায় না। মোহাম্মদ ভাবে এক আকিমন গেলে হাজারটা জুটবে। ব্যাডা ছেলে হইয়া প্রত্যেক বেলায় শাশুড়ি, বউয়ের ঝামটা শোনা যায় না। হঠাৎ করে তার রাগটা একটু বেশি রকম চড়ে যায়।
আকিমনের হাতটা মোচড়ে দিয়ে মোহাম্মদ বলতে থাকে, আমি কি তরে ঘর থাইকা বাইর করছি? তুইতো আইছিলি। তখন জানতি না আমার চালচুলা? তখন কই ছিল তর দেমাগ? এক কথায় তো কাজি অফিসে চইলা গেলি।
আকিমন মোহাম্মদের কথায় ভীষণ ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। তার সারা শরীর দরদর করে ঘামতে থাকে।
চিল্লাইস না, চিল্লাইস না। ভাদাইম্যা। টেকের পুঁজি দিয়া ঢং করছ? মদ খাইছো ? আমার লাইগ্যা হাতে একটা জিনিস ওঠে না ? যে সন্তানটা আসতেছে সে কি আমার একার? তুই মনে এত রঙ পাস কই?
মোহাম্মদ আকিমনকে চোখ রাঙিয়ে বলে, পারুম না। তগো টানতে পারুম না। খাওন জুটে না আবার পেটে একটা বাঁধাইছে। যা হাসপাতালে গিয়া ফালাইয়া দে।
আকিমন মোহাম্মদের কথা শুনে তার ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে। নখ দিয়ে সারা বুকে আঁচড় কাটতে থাকে।
মোহাম্মদ একটা ধাক্কা দিয়ে স্ত্রীকে চকির ওপর ফেলে দিয়ে রাগে গজ গজ করতে করতে ঘর থেকে বের হয়ে যায়, পেছনে ফিরে তাকায় না।
আকিমন বেহুঁশ হয়ে পড়ে থাকে। মোহাম্মদকে দৌড়ে চলে যেতে দেখে আকিমনের মা এসে ঘরে ঢুকে দেখতে পায় চকির ওপর তার মেয়ে উল্টে পড়ে আছে। আকিমনের মা দৌড়ে বালতিতে করে পানি এনে তার মাথায় ঢালে। গরম তেল পায়ে ঘষতে থাকে। কানে কয়েকবার চিমটি কাটার পর আকিমন চোখ তুলে তাকায়। তার মাথাটা টলতে থাকে সারা শরীরে ব্যথা।
চকির ওপর পড়ে গিয়ে আকিমন পেটে খুব ব্যাথা পায়। হাত-পা শিরশির করে, চোখ উল্টে আসে। আকিমনের মা মেয়ের অবস্থা দেখে গলা ছেড়ে চিৎকার করে।
বদমাইশটা আমার মেয়েটারে মাইরা রাইখ্যা গেছে। হারামজাদা অরে আর বাড়ি ঢুকতে দিস না। কোনো শালায় যেন অরে আইতে না দেয়।
আকিমন চুপ করে বিছানায় পড়ে থাকে, কথা বলার শক্তি নাই। আকিমনের মা তেল এনে মেয়ের মাথায় ভালো করে মাখে। আকিমন ঘুমিয়ে পড়ে। ওর শরীর থেকে ঘন শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ ভেসে আসে। বাড়িতে গন্ডগোলের খবর শুনে মোড়ের দোকান থেকে ঘরে ফিরে আসে আকিমনের বাবা।

কিরে তরা কি সারাদিন কাইজ্যাই করবি? খাওন-দাওন দিবি না? ঐ আকিমন। আকিমন।
বাবার ডাকে আকিমন সাড়া - শব্দ করে না। তার সারা শরীরে মরণঘুম। মরার মতো পড়ে পড়ে ঘুমায় আকিমন। আকিমনের মা মেয়ের মাথায় বিলি কেটে দেয়। সারা দিনের ক্লান্তিতে আকিমনের মায়ের শরীরটা ঘুমে ভেঙে আসে। আকিমনের বাবার খাওয়ার পর মেয়ে জামাইর জন্য রান্না করা শোল মাছের তরকারি দিয়ে গোগ্রাসে ভাত গিলতে থাকে।
আকিমনের বাবা জানতে চায়, মেয়ের কী হইছে? ঘর থিকা বাইর হয় না কেন? খাইব না? আর বজ্জাতটা কই? আকিমনের মা স্বামীর এত প্রশ্নের জবাব না দিয়ে চুপ করে খেতে থাকে।
মাঝরাতে আকিমনের শরীরটা খুব খারাপ হয় বুক ঠেলে বমি আসে। কোমরে, পেটে চিনচিন ব্যথা। দুই কান দিয়া গরম বাতাস বের হচ্ছে। মইরা যামু নাকি ? আকিমনের মনে ভয় ধরে যায়। বহু চেষ্টা করেও সে চকি থেকে নামতে পারে না। অসাড় হয়ে পড়ে থাকে। সারাটা রাত পেটে ব্যথা নিয়ে চুপ করে বিছানার সাথে লেগে থাকে। গলায় কোনো জোর পায় না। পেটের ভেতর নড়াচড়াটা কেমন যেন থেমে গেছে। বুকটা ধড়ফড় করে ওঠে। ব্যথা সহ্য করতে না পেরে একসময় আকিমন চকি থেকে পা টেনে টেনে বারান্দায় নেমে আসে। চারদিক শুনশান। অনেক রাত। দূরের ঘরগুলো থেকে হল্লার শব্দ ভেসে আসে, আকিমন কোমর ধরে মায়ের ঘরে যায়, দরজাটা একটু ধাক্কা দিতেই ক্যাঁচ করে শব্দ হয়ে খুলে যায় একটা পাল্লা।
মা মশারির ভেতর থেকে বলে, কে আকিমন? কী হইছে?
আকিমন শব্দ করতে পারে না। গোঙানির মতো একটা আওয়াজ করে দরজার ওপর বসে পড়ে, পেটে অসম্ভব ব্যথা।
আকিমনের বসার শব্দ শুনে আকিমনের মা দৌড়ে নামে বিছানা থেকে। বিছানার ভেতর থেকে আকিমনের বাবা চিৎকার করে ওঠে।
আরে আমার মেয়ের কী হইল?
শীতের রাতে আকিমনের ভারি শরীর টেনে টেনে বিছানার ওপর তোলা হয়। তার সারা শরীর ঠাণ্ডা হয়ে আসে। আকিমনের মা মেয়ের বুকে কান ঠেকিয়ে ধুকপুক শুনতে পায় কিন্তু পেটে কোনো সাড়াশব্দ পায় না। আকিমনের রক্তপাত শুরু হয়।
চোখে-মুখে পানি ঢাললে আকিমন চোখ মেলে তাকিয়ে বলে, মা আমার কী হইছে? এমন লাগতাছে কেন? মোহাম্মদরে খবর দাও। আমারে হাসপাতালে নিয়া চলো। আমার বাচ্চাটা চুপ মাইরা গেছে কেন?
আকিমনের মা মেয়ের পেটে হাত রেখে স্থির হয়ে বসে থাকে, চোখে পলক পড়ে না। রক্তে ভেসে যায় বিছানা।

আকিমনদের ঘরে কথাবার্তার শব্দ শুনে জবার মা আরও কিছু মহিলাকে নিয়ে ঘরে এসে ঢোকে। ঘরে পিনপতন নিস্তব্ধতা। জবার মা আকিমনের পেটে কান পেতে থাকে সেখানে কোনো শব্দ শোনা যায় না। সমস্ত চরাচর যেন থেমে গেছে। আকিমনের শরীরটা হঠাৎ যেন বন্ধ হয়ে গেছে, গেন্ডারিয়ার খুপরি ঘরে মিটমিটে আলোতে আকিমনের পাংশুটে মুখটা আস্তে আস্তে কঠিন হয়ে যায়।।
শরীরের ভেতরে টিকটিক করে যে ঘড়িটা এতদিন চলছিল তার কোনো সাড়াশব্দ নাই, গেন্ডারিয়ার ঘুপচি ঘরগুলোর মতো আকিমনের দোহারা শরীরটাও মুখ থুবড়ে পড়ে থাকে।