সন্ধ্যা নামার পরে

মোহছেনা ঝর্ণা


শতবর্ষী প্রাচীন বটগাছটার তলে এসে দাঁড়াতেই কেমন অদ্ভুত একটা শিহরণ হলো সারা শরীর জুড়ে। বিকেলের নরম রোদে বর্ষার থৈ থৈ বিলের পানি হীরকখন্ডের মতো চিকচিক করছে। দখিণের বাতাসটা এসে গায়ে আলতো করে ছুঁয়ে প্রশান্তির প্রলেপ দিয়ে যাচ্ছে। বিলের পানিতে ঘন কচুরিপানা। সেই কচুরিপানায় আবার বেগুনি রঙের ফুল। আমাদের পাশ দিয়ে বিভিন্ন বয়সী অনেক কৌতুহলী চোখ হেঁটে যাচ্ছে। একটা ছোট বাচ্চার হাতে একগুচ্ছ শাপলা ফুল। রিমি ছেলেটাকে ডেকে কয়েকটা ছবি তুলল। ওর হাতের স্মার্ট ফোনের জুম রেজুলেশন খুবই ভালো। বাচ্চাটাকে ভীষণ মায়াবী দেখাচ্ছে ছবিতে। বিলের পানিতে গায়ে হাওয়া লাগাবো বলে ইঞ্জিন নৌকার জন্য বসে আছি। গতকালও পুরা বিলটা ঘুরেছি নৌকায় করে। সমুদ্রের মাঝে বড় বড় জাহাজে নাবিকদের কেমন অনুভূতি হয় কে জানে। হাওয়ার নুপূর বাজছিল যেন। আমার নিজের কাছে মনে হয়েছিল এটা বোধহয় স্বপ্নদৃশ্য। কিন্তু সন্ধ্যা নামার পরপরই আমাদের ফিরে আসতে হলো। তাই পূর্ণিমার আলোয় চিকচিক করা বিলের দুর্লভ সৌন্দর্য আর দেখা হয়নি। আক্ষেপ ছিল বলে আজ আবার ব্যবস্থা করা হলো। কিন্তু আমরাই পরে সিদ্ধান্ত নিলাম আজ আর বিকালে নয় সন্ধ্যা নামার পরেই যাবো। সন্ধ্যার আগ পর্যন্ত তাই বটগাছটার পাশেই বসে মানুষ দেখি। কত রকম মানুষ! কত রকম তাদের চাহনি! এসব মানুষের সাথেই মিশে আছে আমাদের বাবা। শ্রাবণের বৃষ্টির পরশে চারপাশের গাছপালা, ক্ষেতের ধান সব মায়াবী সবুজে নিজেদের মেলে ধরেছে।
এই বটগাছটা নিয়ে কত গল্প শুনেছি বাবার মুখে! বটগাছের নিচে গ্রাম্য মেলা হতো, রাতভর যাত্রাপালা হতো, সেই যাত্রাপালায় বাবা সিরাজ উদ দৌলার পার্ট করতো, আবার এই গাছের নিচে বসেই ডাকাতিয়া নদীর অপরূপ সুধায় সুর চলে আসতো মনে। বাঁশির সুরে মাতাল হতো সঙ্গীরা। বাবা সুর তুলতো মোহন বাঁশিতে... ও কী ও গাড়িয়াল ভাই... কিংবা আকাশের ওই মিটিমিটি তারার সাথে কইবো কথা....
শতবর্ষ ব্যবধানে পৃথিবীতে আসা করোনা মহামারির দিনেও বাবা খুব উদ্যমী ছিল। বয়স তার উদ্যমকে এতটুকু মলিন করতে পারেনি। সেই মুক্তিযুদ্ধে এক কিশোর যেমন ছিল ষাটোর্ধ্ব বয়সেও সেই একই উদ্দীপনা লালন করতেন নিজের মধ্যে। মুক্তিযুদ্ধের সময় বাবাকে কিছুতেই তার দল যুদ্ধে নিবে না। ১৫/১৬ বছর বয়সী কিশোর রণাঙ্গনে অস্ত্রের বহর আর বিস্ফোরণ দেখলে প্যান্ট ভিজিয়ে ফেলবে এমন কথাও নাকি বাবার গ্রুপ লিডার বলেছিল। কিন্তু গেরিলা হামলায় বাবার সাহসিকতাপূর্ণ অসাধারণ নৈপুণ্যে মুগ্ধ হয়ে সেই লিডারই বলেছিল এ তো "ক্ষ্যাপা খুঁজে ফেরে পরশপাথর" এর ক্ষ্যাপা। এমন সাহসী ক্ষ্যাপারা আছে বলেই দেখবি আমরা নিশ্চিত জিতে যাবো।
বাবারা জিতে গিয়েছিল। কিন্তু এই জিতের পেছনে বলিদানের গল্পগুলো সব আর সবার জানা হয় না।
করোনা ভাইরাসের ভয়ে আমরা সবাই যখন হোম কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছিলাম বাবা তখন পাড়ার মাছ বাজার আর সব্জি বাজারের দোকানদারদের হ্যান্ড স্যানিটাইজার আর মাস্ক সাপ্লাই দেয়ার কাজে ব্যস্ত ছিল। পাড়ার চেনা রিকশাওয়ালাদের ঘরে চাল, ডাল, পেঁয়াজ, আলু, তেল, নুন পাঠানোর জন্য কমিশনারের অফিসে দৌড়াদৌড়ি করছিল। নিজের ব্যক্তিগত ফান্ড উজাড়ের পাশাপাশি বন্ধুবান্ধব পরিচিত সবার কাছ থেকে টাকা যোগাড় করে পাড়ার চার পাঁচজনকে সাথে নিয়ে দিনের পর দিন ছুটে বেড়িয়েছে। আমার মার কথা ক্ষ্যাপা সিকান্দার মুন্সী কোনো দিনই শোনেনি। আর এই অতিমারির কালে মার কথায় গৃহবন্দী হয়ে নিজে বাঁচার কথা চিন্তা করবে তা আমরা কল্পনাও করিনি। যখন ত্রাণের চাল, ডাল, তেল চুরির খবরে মিডিয়া সয়লাব, অক্সিজেনের অভাবে, চিকিৎসার অভাবে হাসপাতাল ঘুরে ঘুরে পথেই নিস্তেজ হয়ে গিয়েছিল বাবা তখন খুব অস্থির হয়ে পড়েছিল! এমন দুঃসহ দিনেও কেউ এত নির্মম আচরণ করতে পারে! বারবার বলতো ৭১ এর দুঃসময়ের সাথে এই অতিমারির দুঃসহ চিত্র মিলে যাচ্ছে। তবে তখন তো শত্রু দেখা যেতো। কিন্তু এখনকার শত্রু এই ক্ষুদ্র অনুজীব তো দেখার সাধ্যও নেই। এরমধ্যে মানুষ হয়ে যদি মানুষের সাথে এমন অমানুষের মতো আচরণ করতে হয় তবে নিজেকে মানুষ পরিচয় দেয়াটাই লজ্জার হয়ে যাবে এক সময়।
মা অবশ্য মাঝে মাঝে টিপ্পনী কাটতো। বলতো, হুম মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেটের মতো মানুষ পরিচয়টাও নাহয় লুকিয়ে রেখে দাও। মার কথা শুনে মুখটা গম্ভীর করে ফেলতো বাবা। আমরা দু’বোন মিটিমিটি হাসতাম তাদের খুনসুঁটি দেখে। মা সব সময় বলতো, তোদের বাবার কাজ হচ্ছে ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো। তোদের দাদি বলে গেছে এই কথা আমাকে। সেই ছোট্ট বেলা থেকে নাকি উনি মানবসেবা করে বেড়াতেন।
মার কথা শুনে প্রতিবারই বাবা হা হা করে হেসে বলতো, সত্যিই যদি মানব সেবা করতে পারতাম! আর কেউ কেউ যদি ঘরের খেয়ে বনের মোষ না তাড়ায় তবে দেখবে বনের মোষেরা একদিন আস্ত ঘর খেয়ে ফেলবে! ঘরের মানুষও খেয়ে ফেলবে। মনে রেখো প্রকৃতি কিন্তু সব কিছুতেই নিপুণ ব্যালেন্সিং করে চলে।
আহা! আমার বাবা! বাবা বলতো, একটা কাঁঠাল গাছের জীবন দেখ মা। আমরা কাঁঠাল খাই, কাঁঠালের বিচিও খাই, কাঁঠালের ভোঁতাটাও গরু খায়। কাঁঠাল পাতা ছাগল খায়। কাঁঠাল গাছের কাঠ দিয়ে ফার্নিচার হয়। মরে গিয়েও আগুনের খোরাক হয়। এমনকি কাঁঠালের কষ দিয়ে গ্রামে আমাদের মা বোনেরা কপালে টিপ দিত। সাদা সাদা কষটুকুও কত কাজে লাগে! আর প্রাণভরে নিঃশ্বাস নেয়ার জন্য অক্সিজেন তো আছেই! একটা কাঁঠাল গাছের জীবনও তো আমার মতো সাধারণ মানুষের চেয়ে অনেক বেশি অর্থবহ। শুধু অকাতরে বিলিয়েই গেলো নিজেকে। আর জন্মে যদি কোনো জীবন বেছে নেয়ার সুযোগ পাই তবে আমি অবশ্যই কাঁঠাল গাছের জীবনই বেছে নিবো রে মা।
কাঁঠাল জীবনকে ভালোবেসেই কি না বাবা একদিন কাউকে কিছু না জানিয়ে মৃত্যু পরবর্তী তার চক্ষুদুটি দান করার সমস্ত কার্যক্রম সম্পন্ন করে আসলেন সন্ধানীতে। তিনি থাকবেন না। কিন্তু তার চোখের আলোয় আলোকিত হবে অন্যকেউ। মাকে বললো, লিপির মা, দেখলে কেমন সারপ্রাইজ দিলাম তোমাকে! সারাজীবন তোমাকে দেখার সাধ আমার মেটেনি, মরনের পরও সেই সাধ অক্ষত রাখার আয়োজন করে আসলাম। চোখের আলোয় দেখেছিলাম চোখের বাহিরে। মার মুখে ছিল লাজুক হাসি। ছোট বাচ্চাদের আদিখ্যেতা দেখে বড়রা যেমন মজা পায় বাবার উচ্ছ্বাস দেখে আমরা সেরকম মজা পাচ্ছিলাম।
অতিমারির দিনে সাধারণ ছুটিতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় আমি ঘরেই থাকি। মাঝে মাঝে অবশ্য অনলাইনে ক্লাস নিতে হয়। এসব ভার্চুয়াল ক্লাসে সত্যিকারের কোনো আমেজ নেই। তবু সংকট কাল পার করার চেষ্টা। ছাত্র-ছাত্রীদের সান্নিধ্য যে এত ভালোবাসতাম এই দুর্যোগ কাল না এলে হয়তো এভাবে টেরই পেতাম না। এই করোনাকালীন সময়ে আমার ছোট বোন রিমি রোজ ব্যাংকে যেতো দেখে মা খুব মন খারাপ করতো।সারাক্ষণ বলতো, ব্যাংকাররা যেন মানুষ না। ব্যাংকারদের বুঝি করোনা ছেড়ে দেবে! আমাদের ক্ষ্যাপা বাবা তখনো মাকে সান্ত্বনা দিতেন, পরাজয়ে ডরে না বীর! মৃত্যু সে তো জীবনের সাথে আলিঙ্গন করেই আছে। মরার আগে মরে যেও না। কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হয়ে যখন একের পর এক ব্যাংকারের মৃত্যুর খবর শুনতে পাচ্ছিলাম মা ভয়ে কুঁকড়ে থাকতো। প্রতিদিন রিমি ঘর থেকে বের হওয়ার সময় মা দরজা ধরে দাঁড়িয়ে থাকতো আর বিড়বিড় করব দোয়া দরূদ পড়তো। রিমির অফিসে ওর এক সহকর্মী যখন কোভিড-১৯ পজিটিভ হলো সেদিন থেকে অফিস ১৪ দিন বন্ধ ছিল। প্রত্যেকে হোম আইসোলেশনে ছিল।
সেসময়টাতে আমরা আমরা বাবার কথা ভেবে বেশ টেনশনে ছিলাম। কারণ বাবার ডায়াবেটিস, ব্লাড প্রেশার সবই হাই।যদিও এসব নিয়ে আলাদা করে টেনশনের কিছু ছিল না। কারণ বাবা এসব অসুখ বিসুখকে থোড়াই কেয়ার করতো। কিন্তু কোভিডের আচরণের কারণে আমরা ভয় পাচ্ছিলাম। সেসময় অবশ্য কিছু হয়নি। তার কিছুদিন পর হঠাৎ করেই সন্ধ্যার দিকে বাবার প্রচন্ড জ্বর শুরু হলো। তিনদিন জ্বর আর কাশির সাথে হঠাৎ করেই শুরু হলো প্রচন্ড শ্বাসকষ্ট। ডাক্তার নেই, চিকিৎসা নেই, আইসিইউ বেড নেই, হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানোলা নেই, করোনা সাসপেক্টেড হলে এই হাসপাতালে হবে না, করোনা পজিটিভ না হলে ওই হাসপাতালে হবে না, এই হওয়া না হওয়া করতে করতে তিনটা হাসপাতাল ঘুরে অবশেষে যখন আইসিইউ বেড আর হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানোলা ব্যবস্থা করা গেলো মনে হলো আমাদের নাকের ডগায় থাকা প্রাণ বায়ুটা আবার ঠিকঠাক কাজ শুরু করেছে। কিন্তু আইসিউতে থাকায় বাবার সঙ্গে আর আমাদের দেখা হচ্ছিল না। কোভিড টেষ্টের রিপোর্ট পজিটিভ এসেছে। ফলশ্রুতিতে অচ্ছুৎ আমরা। লকডাউন আমাদের বাসা। উদবাস্তুর মতো ভেসে বেড়াই আমরা মা, মেয়ে তিনজন। নার্স এসে খবর দেয় বাবার অক্সিজেন স্যাচুরেশন কমে যাচ্ছে। আমরা গভীর শূন্যতায় ডুব দিতে দিতে গোপন আশা করি না, কিছু হবে না, সব ঠিক হয়ে যাবে। সব নিশ্চয়ই ঠিক হয়ে যাবে।
সব ঠিক হয়নি। আমাদের ক্ষ্যাপাটে বাবা পরশ পাথর খুঁজে পেয়েছে কি না জানি না। তবে আমরা হারিয়ে ফেলেছি বেঁচে থাকার নির্ভরতা। শোকে পাথর হওয়ার আগেই রিমি মনে করিয়ে দিল বাবার চক্ষুদানের কথা। শুনে এই শোকাবহ অবস্থায় কে যেন অট্টহাসি দিল। এমনই নিয়তি যে এই অনুজীব বাহকের কারণে মৃত্যুর পরও মানুষকে শেষ বার স্পর্শ করা যাবে না, একটু কাছে যাওয়া যাবে না, আর চক্ষুদান তো সেখানে এক পরিহাস শুধু। আহ্! করোনা, এতো টা নির্দয় না হলে কি হতো না। কাঁঠাল জীবন চেয়েছিল বাবা আমার। কাঁঠাল জীবন। শুধু অন্যের জন্য নিজেকে বিলিয়ে দিতে চেয়েছিল মৃত্যুর পরেও। একটু করুণাও কি করা গেলো না!
বাবার চক্ষুদান করতে পারিনি আমরা। এই অক্ষমতায় যখন খড়কুটোর মতো ভাসতে থাকি নিজেদের মনের নদীতে ঠিক তখনই খবরটা এলো। নিভে আসা প্রদীপটা আবার হঠাৎ করে জ্বলে উঠলো। বাবা যাদের বিভিন্ন সময় আর্থিকভাবে সহযোগিতা করেছেন, ঘরবাড়ি তৈরি করে দিয়েছিলেন, অনেকের পড়ালেখায় হাত বাড়িয়ে ছিলেন এমনকি অনেককে বিদেশ পাড়ি দিতে পাসপোর্ট, ভিসা প্রসেসিং এর ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন বাবার সেই বনের মোষ তাড়ানো মোষেরা বাবাকে যে ভীষণ মনে রেখে দিয়েছে এবার গ্রামের মাটিতে পা না দিলে তা হয়তো আমরা জানতেই পারতাম না। আজ এই বটগাছটার নিচে দাঁড়াতেই সেই ভাষাহীন ভালোবাসাটুকুন অনুভব করছি। যেটা বাবা বেঁচে থাকতে কোনোদিন টেরই পাই নি। বাবার স্মৃতির উদ্দেশ্য বাবার বনের মোষেরা শহীদ মুক্তিযোদ্ধা সিকান্দার মুন্সী পাঠাগার উদ্ভোদন করেছেন আমার মাকে দিয়ে। সামগ্রিক অর্থে ছোট্ট আয়োজন। কিন্তু আমাদের জন্য কী বিশাল ব্যাপার! আমরা সন্তান হয়ে যা ধারণ করতে পারিনি এরা বাবার সামান্য সাহচর্যে এসে তা শুধু ধারণই করেনি, লালনও করে যাচ্ছে নিজেদের মধ্যে। মনে মনে বাবাকে স্যালুট জানাই আর এই ক্ষ্যাপাটে বাবার কন্যা হওয়ার জন্য নিজেকে আরেকবার ভাগ্যবতী শব্দটির সাথে সংযুক্ত করি।
বিলটা নদীর মতো। অনেক বিস্তৃত। আকাশে রূপালী চাঁদ। দূরের ঘরগুলোতে জ্বলে থাকা আলো বাতিঘরের মতো লাগছে। ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক, ব্যাঙের ডাক সব মিলিয়ে মায়াবী একটা আবহ। ইঞ্জিনের ভটভট শব্দ একটু কানে লাগছে। এইটুকু ব্যত্যয় বাদে আকাশ ভরা জ্যোৎস্নারাশির দিকে তাকাতেই দেখি চোখ ছলছল করে উঠছে। গুনগুন করে রিমি গেয়ে ওঠে অতুল প্রসাদের গান, আমি অকৃতি অধম বলেও তো কিছু কম করে মোরে দাওনি...