সমাধি

দেবদ্যুতি রায়

মানুষটা কেমন টুক করে মরে গেল! কথা নেই বার্তা নেই। নেহারুর ভারি অবাক লাগে ভাবলে। এই কদিন আগেই যে মানুষটা উঠানে একটা চৌকিতে চিত হয়ে শুয়ে আকাশ দেখত, জড়ানো ঘরঘরে গলায় গল্প করত, খোঁজখবর নিতো সবার- সেই মানুষটা এখন এই ভুরভুরে নরম মাটির নিচে শুয়ে কী করছে? নেহারুর মাঝেমাঝে মনে হয়, ঐ মাটির তলা থেকেও বুঝি মানুষটা ঘাড় উঁচিয়ে আকাশ দেখতে চায়।

গত কদিন থেকে বলতে গেলে নেহারু এই সমাধির পাশ থেকে ওঠেইনি। ওর বউ আয়না গজগজ করতে করতে ধরে বেঁধে নিয়ে গেছে দুয়েকবার, তো কোনোরকমে গাটা ধুয়ে ভাতটা খেয়েই নেহারু আবার ফিরে এসেছে এখানে। আবার কোনো জরুরি কাজ মনে পড়লে সে নিজে থেকেই গেছে বাড়িতে, তড়িঘড়ি কাজটা শেষ করেই ফিরে এসেছে এই কাঁঠাল গাছটার তলায়। রাতে অবশ্য ওর ছেলে বউ এখানে থাকতে দেয় না ওকে, তবে একেবারে ভোরবেলা আবার ফিরে এসে ঠায় বসেই থাকে।

এমন করি যে আইত দিন পড়ি থাকোচেন কব্বরের গোরোত, তাতে কার কী লাভটা হওচে কও তো মোক- কাল রাতে রেগেমেগে জানতে চেয়েছিল সবুজ, নেহারুর বড় ছেলেটা। পাশেই জ্বলজ্বলে চোখে দাঁড়িয়ে ছিল আয়না।

তা নেহারু ওর ছেলে বউয়ের এমন আচরণে মন খারাপ করে না। সত্যিই তো ও রাত দিন সমাধিটার পাশে বসে থেকে কার কী উপকারটাই বা করতে পারছে? মড়া মানুষের সমাধির পাশে এমন ছন্নছাড়ার মতো সারাদিন বসে থাকা কেই বা মানতে চায়? আর শুধু কি ওর ছেলে বউ? ঠাকুদ্দার ছোট ছেলের বউটাও তো কাল সন্ধ্যা প্রদীপ দেখাতে এসে বলেই বসলো- নেহারু, তোর কি বাড়িত কোনো কাম কাজ নাই বাহে? এই জাগাত সারাদিন বসি থাকিস ক্যান?

ওরাও হয়তো বিরক্ত ওর ওপর। হবারই কথা। নাহয় নেহারু এই কয় বছরে একেবারে ছায়ার মতো ছিল ঠাকুদ্দার সাথে কিন্তু তার সমাধির পাশে এমন করে বসে থাকার কোনো যুক্তি কারো মাথাতেই আসার কথা নয়। নেহারু তাই তখনও কিছু উত্তর দেয়নি ঝর্না কাকির কথার। কেবল নিজের মুখটা ঠাকুদ্দার সমাধির ঝুরঝুরে মাটির দিকে আরেকটু ঝুঁকিয়ে দিয়েছে। আর কত কিছু ভেবেছে আকাশ পাতাল। সেদিন ঠাকুদ্দাকে শেষবার দেখতে কত কত মানুষ যে এসেছিল রে বাবা! এত মানুষ! আর কেউ মরে গেলে এত লোককে সে আসতে দেখেনি শোকের বাড়িতে। ঠাকুদ্দার বাড়ির বাইরের উঠানটায়, কাছারি ঘরের ভেতরে সেদিন পা ফেলার মতো জায়গাও ছিল না যেন। দু চার গ্রামের হিন্দু মুসলমান ছাড়াও আশেপাশের সব স্কুলের মাস্টাররাও এসেছিল, আর এসেছিল নেহারু যাদের চেনে না এমন অসংখ্য ছেলে বুড়ো। এই এত এত মানুষ কি ঠাকুদ্দাকে ভালোবেসে দেখতে এসেছিল? নাকি এমনিই? জানে না অবশ্য নেহারু।

ঠাকুদ্দা নেহারুর আপন ঠাকুদ্দা নয়। তবে এমন মানুষ যদি আপন না হয় তো আপন কে, সে কথা নেহারুর মাথায় খেলে না। এই যে এত বড় গ্রাম, এখানে একটা কারো ক্ষমতা ছিল ঠাকুদ্দার মুখের ওপর কথা বলে? সাত পুরুষে প্রচলিত শবদাহের বদলে ঠাকুদ্দার যে সমাধি দেয়া হলো, তাও তো তার নিজেরই ইচ্ছায়, মৃত্যুর আগেই এই কথা জানিয়ে রেখেছিল সেই কোনকালে। এমনই প্রতাপ ছিল মানুষটার। না না, ঠাকুদ্দার ভয়ে নয়- তাকে ভয় অবশ্য লোকে করত তার চণ্ডাল রাগের কারণে। দোষের মধ্যে এইটাই ছিল তার বড় দোষ। তবে তার মুখের ওপর লোকে কথা বলতে পারত না অন্য কারণে। এই যে এত বড় তল্লাট, এখানে তার মতো বিদ্যা, তার মতো বুদ্ধি আর বিবেচনা আর ছিল কার? লোকে তাই মন থেকে সম্মান করত ঠাকুদ্দাকে, এলাকার ছেলে বুড়ো সবাই। এলাকায় কোনো একটা ঝামেলা, তো ঠাকুদ্দা যা বলবে সেটাই শেষ কথা। এই একটা মানুষের ওপর যসবাই চোখ বুজে ভরসা করতে পারত না কি?আর তো কাউকে এমন দেখল না নেহারু এ জীবনে, ঠাকুদ্দার ছেলে, নাতিগুলাও তাদের বাপ ঠাকুদ্দার মতো হলো কই?

বর্ষা ছেড়ে যাই যাই সময় এখন। নেহারু আকাশের দিকে এক পলক চোখ তুলে দেখে, সাদা তুলা তুলা মেঘ সারা আকাশে। আর সেই মেঘেরও ওপরে ঘন নীল রংয়ের চাদর বিছানো। ঠাকুদ্দা এত আকাশ দেখতে ভালোবাসত কেন কে জানে। শেষের দু তিনটা বছর তো নেহারু বলতে গেলে তার সব সময়ের সঙ্গী ছিল, রাতেও সেই থাকত ঠাকুদ্দার কাছারিঘরে, মেঝেতে একটা মাদুর পেতে। বড় আশ্চর্য স্বভাব ছিল ঠাকুদ্দার, শত শত কাজের ভিড়েও কিছুক্ষণ পর পর মাথা উঁচু করে আকাশের দিকে ঠায় তাকিয়ে থাকত। তারপর আবার একটু পরেই মন ফেরাত নিজের কাজে। কতবার ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করেছে নেহারু- ও ঠাকুদ্দা, তোমরা সারা দিন আইত দেওয়ার পাকে দ্যাকেন ক্যানে? কী আচে ওই দেওয়াত?

ঠাকুদ্দা প্রতিবার ওই একই উত্তর দিয়েছে- দেওয়াটা কত বড় দেকচিস নেহারু? সউগ কিছুর চায়া কত বড়, কত বিশাল!

ব্যস! ঠাকুদ্দা আর কিছু বলেনি কোনোদিন। মানুষটা নিজের কাজের বাইরে আর কীই বা তেমন গল্প করত ওর সাথে? আগের দুই টার্মের চেয়ারম্যান ঠাকুদ্দার কাছে কত মানুষ কাজে অকাজে সাহায্য চাইতে কী এমনিই দেখা করতে আসত রোজ। শেষের দিকে বছরখানেক ধরে তার হাঁপানির টান বেড়েছিল, একটানা কথা বলতে পারত না, একটানা বসেও থাকতে পারত না, কোমর নাকি টনটন করত, পিঠে ব্যথা করত। রোজ দুই তিনবার করে পিঠ আর কোমর মালিশ করে দিত নেহারু। কাছারিঘরের চৌকিটাতেই বেশিরভাগ সময় কাটত তখন ঠাকুদ্দার। তবু কোনো মানুষের কথা না শুনে তাকে কি ফেরত পাঠিয়েছে মানুষটা? নেহারুর মনে পড়ে না।

সেবার এমনই তুলা তুলা মেঘের দিনে জগেনের মেয়ের বিয়ে ছিল, মনে আছে নেহারুর। গরিব মানুষ জগেন নিজের প্রায় সর্বস্ব শেষ করে মেয়ের বিয়ের যোগাড় করেছিল। তারই আপন জ্যাঠা নেপাল কাকা বিয়ের দিন কিন্তু একেবারে বেঁকে বসলো, দশের খাওয়ায় মণখানেক পাঁঠার মাংস খাওয়াতেই হবে, নাহলে তারা কেউ বিয়েবাড়িতে উঠবে না। জগেন পারলে নেপাল কাকার হাতে পায়ে ধরে, এক মণ কেন, দশ কেজি পাঁঠার মাংসও সে তখন কিনতে পারবে না। দশ না খেলে ‘ঠ্যাক’ হয়ে যাবে জগেন, মেয়ের বিয়ে কী করে হবে? সে কী এক বিশ্রী অবস্থা! ঠাকুদ্দা কিন্তু সন্ধ্যার পরে নেপাল কাকাকে ডেকে এমন ধমক দিয়েছিল যে সে সঙ্গী সাথী নিয়ে প্রথম ব্যাচে বসে দশের খাওয়া খেয়ে এসেছিল, পাঁঠার মাংসের নামও করেনি আর। ভালোয় ভালোয় মিটে গিয়েছিল ফুলনের বিয়েটা।

এমনি আরো কত কত ঘটনা মনে পড়ে নেহারুর। মানুষটা আজ নেই কিন্তু সেই ঘটনাগুলো? ঠাকুদ্দা না থাকলে এই গ্রামে কত কী উল্টাপাল্টা হয়ে যেতে পারত! শুধু কি এই গ্রাম? নেকিরহাটের চোরপাড়াটার পাশে ঠাকুদ্দাই তো ছোট্ট বাজারটা বসাল, প্রথম প্রথম কত যে আপত্তি করেছিল মানুষ! ঐ চোরপাড়ার হাবুল, যোগেশ ওরাও কি করেনি? এতদিনের চুরির পেশা, মানুষ কি সে ছাড়তে চায় এক কথায়? ঠাকুদ্দা কিন্তু কিচ্ছু শোনেনি, কারো একটা কথাও না। সোজা বলেছিল, এই দোকান করি দিনু তোমারগিলাক, আর যেন একবারও মুই না শোনো যে তোমরা চুরি কইরবার গেইচেন!

না, ও পাড়ার কেউ আর চুরির পেশায় থাকেনি তারপর। সবাই অবশ্য দোকান করেই সংসার চালিয়েছে, তাও নয়। ওদের কেউ কেউ এখন খেতের কিষানি বা ঘরবাড়ির কামলা খাটার কাজ করে। রিকশা ভ্যানও বোধহয় চালায় দুই একজন। তা ওদের মন যা চায়, তাই করেই খাক, তাতে আপত্তি নেই কারো। এলাকার মানুষের যে রাত বিরেতে ঘরবাড়ি ফাঁকা হবার ভয়টা প্রায় পুরোটাই কেটে গেছে, তার মূলেও কিন্তু ঠাকুদ্দাই।

ঠাকুদ্দাকে নিয়ে আড়ালে আবডালে হাসত কেউ কেউ। দুই টার্মের চেয়ারম্যানগিরিতে ঠাকুদ্দা প্রায় তিন চার বিঘা জমি বেচে দিয়েছিল। আজ অমুকের মেয়ের পরীক্ষার ফি, তো কাল তমুকের ছেলের চাকরির জন্য দৌড়াদৌড়ি। ঠাকুদ্দা ছাড়া আর কাকেই বা পাশে পেয়েছে এই বিন্যাটারির মানুষ? তবু নিজে বিপদ থেকে উদ্ধার পেয়ে গেলে পরে তাদেরই অনেককে নেহারু বলতে শুনেছে- মানুষ চেয়্যারম্যানি করি জমির ওপোর জমি কেনোচে, আর দেকো এই নলিত চ্যারম্যানোক, বাপের জমি ব্যাচে ভুতিনাশ করি দেইল…

ঠাকুদ্দাকে ঠিক কীসের মতো মনে হয় নেহারুর? ঠাকুদ্দা মানুষটা আসলে ঠিক কীসের মতো ছিল? নিলোর ডাঙ্গার ঠিক মাঝখানে চারপাশে অজস্র ঝুড়ি নামিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বটগাছটার মতো- একা, বিশাল? নাকি যে আকাশটা দেখতে খুব ভালোবাসত ঠাকুদ্দা, সেই আকাশটারই মতো অসীম? নেহারু জানে না ঠিক তবে ঠাকুদ্দার কথা ভাবলেই ওর চোখের সামনে সেই পুরনো বটগাছ আর এই সীমাহীন আকাশটা ছাড়া আর কিছু ভেসে ওঠে না।

সমাধিটার উঁচু হয়ে থাকা নরম মাটির গায়ে বিকেলের ছায়া পড়ছে একটু করে। নেহারুর মনে পড়ে উঠতে হবে এবার। কালো গাইটা ও ছাড়া আর কেউ দুইতে পারে না। এখন বাড়ি না গেলে আয়না হয়তো চোখমুখ গরম করে আবার ডাকতে চলে আসবে। তবু উঠি উঠি করেও কেন যেন পা সরে না নেহারুর। আর একটু সময় বসে যেতে ইচ্ছে করে ওর।

ওর পাশে পায়ে পায়ে এসে কে দাঁড়ায় এই অবেলায়। নেহারু চোখ তুলে দেখে- ঠাকুমা। এই কদিনে ঠাকুমা যেন হঠাৎ করে বুড়ি হয়ে গেছে আরো। সাদা থানে শরীর জড়ানো ফর্সা টুকটুকে ঠাকুমাকে এখন একটা নিষ্প্রাণ সিমেন্টের পিলারের মতো দেখায়। ঠাকুমার প্রাণহীন এই মূর্তি দেখে নেহারু সভয়ে ডাকে- ঠাকু!

ঠাকুমা সাড়া দেয় না। কী অত দেখে এই সমাধিটার গায়ে নেহারু ঠাহর করতে পারে না। সে আবার ডাকে- ঠাকু!

এবার ঠাকুমা বসে পড়ে ওর পাশে, সবুজ ঘাস সেখানে একটু মলিন। নেহারুর দিকে একরাশ ক্লান্তি নিয়ে ঝুঁকে ঠাকুমা ফিসফিসিয়ে বলে- মানুষটা প্রতিপদ দোষ পাইছে নেহারু, তুই কিরিয়ার দিন পইয্যন্ত একনা থাকিস তার সাতে।

ঠাকুদ্দার কিরিয়া মানে শ্রাদ্ধ আর পাঁচদিন পরে, রবিবারে। প্রতিপদ দোষের কথা ঠাকুদ্দা মরে যাবার দিনই শুনেছিল নেহারু। এই দোষ পেলে মৃতের কী হয়, সে জানে না। ঠাকুমাও বোধহয় জানে না। কিন্তু নেহারু সেদিনই ঠিক করেছিল তার কর্তব্য।

ঠাকুমার দিকে তাকিয়ে সে মাথা নাড়ে, কিরিয়া পর্যন্ত কেন, হয়তো তারও অনেকদিন পর পর্যন্ত সে এখানে এভাবেই বসে থাকবে; ঠাকুদ্দাকে একলা ছেড়ে যাবে না। যতটা বেশি সময় পায়, বসে থাকবে এই সমাধির পাশেই। হঠাৎ একটা বাতাস আসে দক্ষিণ দিক থেকে। সে বাতাসে ঠাকুমার শাড়ির আঁচল ওড়ে, সে বাতাসে নেহারুর সাতচল্লিশ বছর বয়সী ঝাঁকড়া চুল ওড়ে। সে বাতাস যেন ওর কানের কাছে ফিসফিসিয়ে বলে- নেহারু, মোর ওপোর এত ক্যানে মায়া রে তোর? ক্যানে?