কবিতাগুচ্ছ

অর্ঘ্য রায়চৌধুরী

১.

নিলাম


ঝোপের আড়ালে এক দেহ
রক্তাক্ত, জল ছাড়া পুকুরের মতো
খোলা চোখ, ফিরছিলো বাড়ি
মিছিলের শেষে কেউ ফড়িঙের মতো
ডানা দুটো ছিঁড়ে নিয়ে গেছে

অথচ জ্যান্ত ছিলো সে
ভাতের থালায় একটু আগেও
পেয়েছিলো মায়ের ছোঁয়া
মাছেরা সাঁতরে গেছে নদীপথ জুড়ে
উঠোনে কলমীলতা, খাঁচায় পাখির ডাক
টবে এক চিঠির মতন, ঝুলেছিলো ফুল

অথচ বৃষ্টি এসে শুষে নিতে পারেনি
কিছু দাগ, রক্তের ভেতর চোখের শুকনো
জল মিশে গেছে কিছুখন আগে মিছিলের
আগে, নির্জন পথে ভেসে এসেছিলো বুলেটের
সাথে, সকালের ধোঁয়া ওঠা ভাতের সুঘ্রাণ

এখন চলবে খেলা, তারপর শহীদের
মর্যাদা পাবে, সামান্য দাবীর খোঁজে
রক্তের বিছানায় শুয়ে, কিছুখন আগে
ভেবেছিলো এবার সুরাহা হবে
এইবার ভাতের থালায় দেখা দেবে
ধানক্ষেত, বহু চোখে মেপে নেওয়া জমি
হয়তো কুয়াশা ঘেরা সন্ধের আগে বলে যাবে
আমি এক প্রপিতামহ, নিলাম চাইছে কিছু লোকে।


২.

পর্দা সরে যায়


সেই লোকটা,
এসপ্ল্যানেডের গুমটি থেকে
বিড়ির প্যাকেট কেনা সেই লোক,
দশটা পাঁচটা অফিস করা সেই লোক,
ডেলি প্যাসেঞ্জারি করা সেই লোক,
একদিন হঠাৎ দেখি আমার শরীরের ওপর
হেঁটে এসে বলে গেল তার কথা, শিকড়ের নিচে জমে থাকা ব্যথার উপাখ্যান।
আর আমি অবাক হয়ে দেখলাম,
তার সারা শরীরে মীড় আর গমকের খেলা,
অলৌকিক প্রভায় একে একে ষটচক্র ভেদ
করে উঠে চলা সাপ, নিঃশ্বাসে মাছের সাঁতার।
দেখলাম গন্তব্যের দিকে ছুটে চলা ছোঁয়াচে অটো, স্কাইস্ক্র্যাপারের মাথায় গোধূলির আলো সবটুকু স্তরে স্তরে পাহাড়ি বৃষ্টির মত লেগে আছে তার শরীরে।

সেই লোক,
সেই অচেনা গলির মুখে হাততালি দেওয়া
জানলার পাশে পড়ে থাকা সেই লোক,
এভাবেই কথা বলতে বলতে খোলস ছাড়ল,
শরীরের দুপাশে মেলে দিল ডানা,
বলে গেল সপ্তপাতাল ভেদী পথের হদিশ,
নাইটের মৃত্যুর শেষে অতলান্ত ক্ষীরোদ সাগর থেকে উঠে আসা সহস্র ফনা শেষ নাগের শঙ্খধ্বনি, যোগারুঢ় যোদ্ধার অহ্ময় তূন লম্পট ইন্দ্রের কামুক দৃষ্টি দেখে চেয়ারের ভাষার বদল। টেবিলের নিচে চুপিসাড়ে বসে থাকা নীলচে শেয়াল, সব।

সে চলে গেলে দেখি ঘন অন্ধকার,
গলিপথ, মর্জিনার হাত ধরে হেঁটে
যায় সেই লোক, চোখ তার আজও বাঁধা,
মুখে স্মিত হাসি সেই লোক।

৩.

ম্যাপের বাইরে


হরিপদর কাছে কিছু সকাল আর রাত্রি আছে
ভাঙাচোরা বাড়ি, একটা হৃদয় থেকে কিছু
ঢেউ, রাতের শুনশান পথ।
হরিপদর হাতের পাতায় একটা সরু গলি
চলে গেছে আধো লন্ঠন হাতে পলেস্তরা খসা
দেওয়ালের দিকে।

তবু যদি মাঝরাতে কলিংবেল বেজে ওঠে
তার ডানায় ভর করে একটা আস্ত পৃথিবী,
আর তখন তাকে চেনা যায় না।

সে দৌড়াতে থাকে, দৌড়াতে দৌড়াতে
খুলে ফেলে দেয় তার যাবতীয় নির্মোক
শ্মশান থেকে ফ্লাইওভার, সর্বত্র জ্বালিয়ে দেয়
আলো, আর দিন শেষে ফিরে আসে অন্ধকার ঘরে।

হরিপদ নামে একটা লোক আছে
হরিপদ নামে বেশ কিছু লোক

একটা সমুদ্র বয়ে নিয়ে চলেছে, যার নাম কোনও ম্যাপে লেখা নেই।


৪.

খবরে সে নেই


লোকটার নাম কি কেউ জানে না।
লোকটা বৃষ্টি পড়লে বাড়ি ফেরে কি না
জানে না কেউ। লোকটা কান্না পেলে ফাঁকা
ঘর পায় কি না কেউ শোনেনি। লোকটা
কখন ফেরে, কি খায়, কোথায় থাকে তাও
তোমার জানা নেই। শুধু সবাই জানে এই শহরেই সে আছে কোথাও, একটা না, অগুন্তি সেই লোকটা রোজ ডেলি প‍্যাসেঞ্জারী করছে, বাজারে যাচ্ছে
দৌড়াতে দৌড়াতে ঠিক লাফ দিয়ে ধরে ফেলছে বাসের হাতল, কল কারখানায় মেশিনের সামনে ঘেমে নেয়ে হাঁফিয়ে উঠছে, গাড়ি চাপা পড়ছে, মিছিলে গলা ফাটাচ্ছে, রক্তদান শিবিরে রক্ত দিতে দিতে ভাবছে এই রক্তে ঠিক বেঁচে উঠবে কেউ।
লোকটা রোজ জন্ম ও মৃত‍্যুকে বারবার অগ্রাহ‍্য করে তোমার সামনে এসে দাঁড়াচ্ছে।
আর তুমি খবরের কাগজ খুলে দেখে নিচ্ছ রাশিফল, বাজার দর, রাজনীতি, কিছু সুড়সুড়ি সকাল সকাল।
অথচ ওই লোকটাই খবরের কাগজ দিয়ে যাচ্ছে
তোমাকে, ছাপাখানায় কাজ করতে করতে
একদিন চিতায় উঠে ছবি হয়ে যাচ্ছে, অথচ কোন খবরেই সে নেই।