পার্শ্বচরিত্রেরা

মানবেন্দ্র সাহা

বরং একটি ছবির কথা বলি। লেন্সবন্দী একটি স্থিরচিত্র। ছবিটি হতে পারে পুরোনো দিল্লির কোনো একটি ব্যস্ত গলিপথ। অথবা মধ্য কোলকাতার কোনোএক সংখ্যালঘু মহল্লা। হতে পারে এন্টালি, হতে পারে মোমিনপুর বা রাজাবাজার। রঙচটা কিছু পুরোনো বাড়িঘরের পাশ দিয়ে দৈনন্দিনতার গতিপ্রবাহে হেঁটে চলছে কর্মময় শহর। তবু যেন নোনাধরা জীর্ণ দেওয়ালের গায়ে হেলান দিয়েছে সভ্যতার এক একটি বাতিল চাকা। যদিও উপযুক্ত পরিবেশ পেলে এখানেও মাঝে মাঝে কার্নিশ থেকে ঝুলে পড়ে সবুজ লতাপাতা। শহরতলি থেকেও দূরে অনেক দূরে আছে যে অন্য পৃথিবী, তারও একটা অস্ফুট রিদিম আছে এখানে, নিজস্ব একটা রিদিম। এমনি বোঝা যায়না। তবে বোঝা যায় গলিপথের প্যাডেল রিক্সায় পা রাখলে। বোঝা যায় দুইদিকে দুধের ক্যান ঝোলানো পুরোনো এম এইটটির ফটফট শব্দে। এসকলই হলো ছবিটির ছোট্ট ছোট্ট উপাদান। এতকিছুর মধ্যেও ছবিটিতে ক্যালানের মত করে দাঁড়িয়ে রয়েছে যে দেওয়াল তার শরীর জুড়ে সেঁটে আছে ক্যাঁটকেটে বেমানান হলুদ রঙের বিজ্ঞাপন। নিতান্ত নিষ্প্রয়োজনে দেওয়াল আঁকড়ে থাকা একটা রুচিহীন বিজ্ঞাপন। কিন্তু এ সবকিছুকে ছাপিয়ে ছবিটির মধ্যে যেখানে দৃষ্টি আটকে যায় বারবার, তা হলো বোরখা পরিহিতা মায়ের হাত ধরে হেঁটে চলা বালগোপাল। আহা! আহা! যেন একটুকরো ভারতবর্ষ। যেন মা ফতেমা আর বালগোপাল হাত ধরাধরি করে পরমানন্দের রসাস্বাদন করছে। আর এখানেই আটকে যায় আপামর ভারতবাসীর ধর্মের কচকচানি, আর এখানেই আটকে যায় সমগ্র আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক চক্রান্ত। যেন মা ফতেমা ব্রজবালককে কোলে টেনে নিয়ে বলছে দ্যাখো ওহে মোল্লা মুরুব্বীর দল, চেয়ে দেখো এই হলো আমাদের ভারতবর্ষ।

কিছুদিন আগে ফেসবুকে এই ছবিটিই পোস্ট করেছিলাম। ছবিটি ফেসবুকেই পাওয়া, সুতরাং নির্দিষ্ট কারও কাছে ঋণ স্বীকার করতে হয়নি। এরকম ঘটনা আকছার ঘটে। সৃষ্টি এমন একটি জিনিস যা সময়ের স্বাভাবিক গতিময়তায় সঞ্চারিত হতে থাকে কাল থেকে কালান্তরে। কিন্তু স্রষ্টা অনেকসময়ই হারিয়ে যায়। এটাই নিয়ম এটাই স্বাভাবিকতা।

ছবিটির কথায় আসি। ছবিটি পোস্ট করার পর আগ্রহ ছিলো মন্তব্যের। প্রতিটি মন্তব্যেই মুলত ছবির ঐ বিশেষ অংশটির কথাই উল্লিখিত হয়েছে বারবার। ঐএকটি অংশই যা ভারতবর্ষের অখণ্ডতাকে প্রকাশ করছে। সার্বভৌমত্বের কথা বলছে। ছবিটির বাকি উপাদানগুলির কথা কেউ বলছেনা। একজনও না। তবে কি ছবির বাকি উপাদানগুলি সবই অপ্রয়োজনীয়। কোনো ভূমিকাই নেই তাদের। সেই নোনাধরা জীর্ণ দেওয়াল, সেই দেওয়ালে হেলান দেওয়া বাতিল চাকা। সেই প্যাডেল রিক্সা, সেই কার্নিশ থেকে ঝুলে থাকা অপরাজেয় সবুজ প্রাণ, এরা কি নিতান্তই অপ্রয়োজনীয়। উত্তর- না না না। কখনোই না। প্রতিটি ছবিতে প্রতিটি উপাদানের নিজস্ব ভূমিকা থাকে। একটি সরিয়ে নিলেই ছন্দপতন। আর এই ছোট্ট ছোট্ট উপাদানগুলি সুসজ্জিত হয়ে তৈরি হয় চালচিত্র। আর এই চালচিত্রই তো আমাদের ভারতবর্ষ। এই পুণ্যভূমিকে দেখতে হলে যেতে হবে শহরের কোলাহলে। যেতে হবে গলির গলি তস্য গলিতে। যেতে হবে প্রত্যন্ত গ্রামের কোনো কৃষিমেলায়। যেতে হবে আমাদের রোজনামচার পরিচিত গ্রামিন নাগরিক গল্পগুজবে। তার জন্য কোনো পাহাড় ডিঙানো তাত্ত্বিক জ্ঞানের দরকার নেই। দরকার নেই ইতিহাস খোঁজার নাম করে পৃথিবীকে বারংবার ধর্ষণ করার।



"মেঠো চাঁদ রয়েছে তাকায়ে
আমার মুখের দিকে,-- ডাইনে আর বাঁয়ে
পোড়ো জমি-- খড় -- ন্যাড়া-- মাঠের ফাটল,
শিশিরের জল.."
অথবা
"বাঁশপাতা -- মরা ঘাস--আকাশের তারা,
বরফের মত চাঁদ ঢালিছে ফোয়ারা"

কবি এখানে হেমন্তের ছবি আঁকছেন। ধান কাটা হয়ে যাওয়ার পর যে হৈমন্তিক প্রকৃতি, তার ছবি আঁকছেন। এবং সে ছবিতে কতই না যত্ন করে টুকরো টুকরো প্রতিটি উপাদান নিয়ে হেমন্তের চালচিত্রে বসিয়েছেন জীবনানন্দ। তাতে কোথাও কোনোদিন কবিতা মেদবহুল হয়ে পড়েনি। বরং কবিতাগুলি হয়ে উঠেছে আমাদের আরও কাছের, আমাদের আরও বেশি চেনা।

এরকম ভাবেই সাহিত্যে, ইতিহাসে, বিজ্ঞানে এমনকি জীবনের প্রতিটি দৈনন্দিনতায়, প্রতিটি নির্মাণের পিছনে থাকে অজস্র পার্শ্বচরিত্র। যারা অপরিহার্য হয়েও যেন সে বিশাল নির্মাণের ছায়ায় অনালোকিতই থেকে যায়। তারা সভ্যতার এক একটি চাকা। তাদের কাঁধে ভর করেই সময় এগিয়ে চলে সামনের দিকে। অথচ ইতিহাস তাদের স্বীকৃতি দেয়নি কোনোদিনই। বিশাল তাজমহলের প্রতিটি পাথরের গায়ে কতশত শ্রমিকের রক্ত লেগে আছে। অথচ ইতিহাস তো শাহজাহানের কথা বলে। তাদের কথা তো বলেনা। তাহলে তারা কি এমনিই ফুরিয়ে গেলো। কিছুই বাকি নেই তাদের ভূমিকা! আছে সবটুকুই আছে। দেখার মত চোখ থাকলে আজও দেখা যায় নিস্তব্ধ জ্যোৎস্নায় প্রতিটি পাথরে আজও খিলখিলিয়ে ওঠে অজস্র শ্রমিকের তৃপ্ত আত্মা। প্রতিটি কারুকার্যের বাঁকে আজও আজ লেগে আছে আছে কতশত শিল্পীর আঙুলের স্পর্শ। কে বলেছে পার্শ্বচরিত্ররা থাকেনা। তারা থাকে, এবং সপ্রতিভ ভাবেই থাকে শুধু প্রতিষ্ঠানের লেখা ইতিহাস কখনও কখনও হয়তো তাদের ভুলিয়ে দিতে চায় কোনো মনোহারি গল্পের মোড়কে। কিন্তু তারা থাকে। নির্মাণের প্রতিটি অংশে নির্বাক নিশ্চুপ তাদের উপস্থিতি। কখনও কাঁচাপাকা চুলের এই অবিখ্যাত মানুষগুলি সংসারের কক্ষপথে অন্তহীন আবর্তনে বেঁচে থাকে। কখনওবা দাবিহীন বৈরাগ্যে ছিটকেও যায় সে কক্ষপথ ছেড়ে, দশরথ মাঝিদের মত। একাকী নির্জন কোনো রুক্ষ পাহাড়ের খাঁজে বসে অন্তহীন কাল ধরে শুধুমাত্র একটা ছেনি হাতুড়ির সাহায্যে নির্মাণ করে চলে প্রকৃত প্রেমের সৌধ। ছেনি হাতুড়ির সে অবিচ্ছিন্ন ঠুকঠুক শব্দ তরঙ্গায়িত হতে হতে মহাশূন্যের পথ অতিক্রম করে পৌঁছে যায় গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে। প্রতিটি মহাজাগতিক বস্তুর মধ্যে জানান দেয় তার উপস্থিতি। আসলে শব্দই তো ব্রহ্ম। আদিতেও ছিলো সুদুর ভবিষ্যতেও শব্দই থাকবে। সে শব্দ লেগে থাকবে নির্মাণের প্রতিটি পাথরের গায়ে। মৃত্যুহীন অপরাজেয় এইসব পার্শ্বচরিত্রেরা। ঠিক যেমন ছবিটির অলক্ষিত ছোট ছোট উপাদানগুলি।