জয়পরাজয়

শাহনাজ নাসরীন

পুকুরঘাটের বাঁধানো উঁচু চত্বরটায় বসে শফিকুজ্জামান পা নাচায় আর বিরবির করে। মেনিমুখো মিচকা বিলাইটা জিতে গেল শেষ পর্যন্ত! আজ যেন বিলাইয়ের মধ্যে বাঘ দেখলো সে। গম্ভীর মুখ আর জোর গলা বাঘের গর্জনের কথাই মনে করে দিয়েছে। আর এই সবের পিছনে কিনা তারই ছেলে! তার ছেলে এত লায়েক কবে কোন ফাঁকে হলো শফিকুজ্জামান কিছুতেই বুঝে উঠতে পারে না! স্বাধীনতার সময় সে তো ছিল গেদা সে স্বাধীনতার এত কী বুঝলো! আর যতই বুঝুক এই মেনিমুখো প্রতিবেশি যে তার বাপের এক নম্বর শত্রু তা কি এই ছেলে ভুলে গেছে? বাপের নুন খেয়ে শত্রুর গুণ গায় এমন নেমকহারাম ছেলে তার কেমনে হইল!
শফিকুজ্জামান আর মেনিমুখো তাদের যৌবনকাল থেকে প্রতিবেশি হলেও শফিকুজ্জামান এই এলাকায় স্থানীয় না এরকম একটা প্যাঁচ লাগিয়ে মেনিমুখো তাকে হেয় চোখে দেখত। কথা মিথ্যে নয়। মেনিমুখোর বাবা এই বাড়ি করেছিল মেনিমুখো তার তিনবোনসহ এখানেই বড় হয়। এই ভিটায় তাদের নিজস্ব কবরস্থানও আছে। মেনির মা এই বাড়িতেই মারা গেলে ছেলেমেয়েদের কান্নাকাটিতে বাড়ির পেছনে একটুদূরে তাকে কবর দেয়া হয় চোখের সামনে থাকবে বলে। মেনির তিনবোনের যথাসময়ে এ বাড়ি থেকেই বিয়ে হয় কাছাকাছি বিভিন্ন যোগ্য পাত্রের সাথে ফলে তাদের গুরুত্ব পাড়ায় আরও বেড়ে যায়।
শফিকুজ্জামান যখন এই পাড়ায় আসে তখন তার একেবারে ভগ্ন দশা। তাদের গ্রামের প্রথম এন্ট্রান্স পাশ শফিকুজ্জামানের রেলওয়ের চাকরিতে পোস্টিং হয় মুর্শিদাবাদে। মুর্শিদাবাদ যাওয়ার আগে তার বাবা ছেলেকে বিয়ে করান এবং বউকে ছেলের সাথে মুর্শিদাবাদ পাঠিয়ে দেন ছেলের শরীর ও মন নিরাপদ থাকবে আশায়। সবকিছুই ঠিকঠাক চলছিল। বাড়িওয়ালা মাসি তার স্ত্রী আকলিমাকে মেয়ের মতোই ¯েœহ করতো। আকলিমা সম্পন্ন বাড়ির বাপসোহাগী মেয়ে। ঘরকন্না খুব ভালো জানতো না মাসিমাই তাকে শেখাতে শেখাতে যথাসাধ্য সাহায্য করতো। আকলিমা গর্ভবতী হলে তো মাসিমা পুরোপরি মা বনে গেল। এরকম সময়ে শুরু হলো রায়ট। মাসিমা প্রথমে বললো ভয় নেই আমি তোমাদের কোন ক্ষতি হতে দেব না। কিন্তু হননকালের নৃশংসতার রূপ সম্পর্কে কারোরই ধারণা ছিল না। ফলে একদিন যখন মাসিমার ভাড়াটের খোঁজে দরজায় ধাক্কা পড়লো মাসিমা তাদেরকে ওয়াল টপকে পালিয়ে যেতে সাহায্য করলো।
এরপর শুধু প্রাণ নিয়ে ছোটা। ফেরার কোন উপায় আর ছিল না। শফিকুজ্জামানের পকেটে যে ক’টি টাকা ছিল আর স্ত্রীর গায়ের গয়না এগুলো সম্বল করেই স্ত্রীকে নিয়ে প্রাণে বেঁচে দেশে ফিরতে পারলো। বাকী সব পড়ে থাকলো মুর্শিদাবাদে। এমনকি তাদের প্রথম সন্তানও পথেই পড়ে থাকলো। ভয় আর পরিশ্রমে গর্ভ নষ্ট হলো আকলিমার। দেশে ফিরে শফিকুজ্জামান প্রথমেই স্ত্রীকে তার বাপের বাড়ি রেখে এলো ভালো চিকিৎসা আর সেবার জন্য। নিজে গেল অফিসে রিপোর্ট করতে। এদিক থেকেও তখন হিন্দুরা পালাচ্ছে। অফিসেই তার এক কলিগ জানালো সে তার বাড়ি বিক্রি করে ইন্ডিয়া চলে যাবে শফিকুজ্জামান কিনবে কিনা। শফিকুজ্জামান নিজেই তখন ফকির প্রায় তবু মেনিমুখোদের উল্টোপাশে ছোট একটা উঠানসহ টিনের ঘরটি দেখে তার খুব পছন্দ হলে শ^শুরকে মুখ ফুটে বলেই ফেললো। যৌতুক নয় ধারই চেয়েছিল। এত শস্তায় এমন বাড়ি দেখে শ^শুর খুশি হয়েই সাহায্য করেছিলেন টাকা জোগাড় করতে কষ্ট হলেও। সেই থেকে শফিকুজ্জামানের মেনিমুখোর প্রতিবেশি হওয়া।
মেনিমুখোর বাড়িতে বুড়ো বাপ গেদা এক ছেলে আর বাজখাই পোঁয়াতি বউ। সকালে সে সাদা শার্ট সাদা প্যান্ট পরে গলায় একটা মাফলার ঝুলিয়ে সাইকেল চালিয়ে অফিসে চলে যায় আর সারাদিন বাজখাই বউটার গলার আওয়াজ শোনা যায়। এই দুই বাড়ির অন্দরমহলে খাতির হলো না আকলিমার অসুস্থতার কারণে সে পাশের বাড়ি যেতে পারল না আর পাশের বাড়ির বাজখাই বিবি নাকি জুতা সেলাই থেকে চ-ীপাঠ একাই করে। অন্যবাড়ি বেড়াতে যাবার কোন সময়ই তার নেই। মিয়া বিবি কেউই প্রতিবেশিকে পাত্তা দিলো না। সেই থেকে শফিকুজ্জামানের ভেতরে ভেতরে শত্রুভাব। মানুষগুলোও তার একেবারে পছন্দ হলো না। মেয়েমানুষ পুরো সংসার নিয়ন্ত্রণ করবে আর স্বামীর কোন শব্দই শোনা যাবে না এ শফিকুজ্জামানের সহ্যের অতীত। সেই বিতৃষ্ণা থেকে লোকটার সাথে তারও কথা বলতে ইচ্ছা করে না এমনকি নামটা বলার আগেই কী করে যেন মিচকা, মেনিমুখো এইসব বিশেষণ চলে আসে।
কিছুদিন পর মিচকার বউয়ের বাচ্চা হলো খালাস নাকি বউ নিজেই করেছে। আকলিমার কাছে এ কথা শুনে তো শফিকুজ্জামানের টাসকি খাওযার জোগাড়। আকলিমা বললো. পাড়ার মালিশবুড়ি যে কিনা সপ্তাহে একদিন আকলিমার শরীরে মালিশ দেয় সে বলেছে আগের বাচ্চাও এভাবেই হয়েছে। মালিশবুড়ি মুখ কুঁচকে বলেছে কোন সেবাটেবা নেয় না, কাইজকামের একটা লোক রাখে না, খেতা(কাঁথা) সিলাইতে কাউরে ডাকে না এমন কিপ্টা বেডি। শফিকুজ্জামান তাদের গ্রামের বাড়িতেও দেখেছে দাই এসে পোয়তিকে আঁতুর ঘরে নিয়ে যায়। সাথে পোঁয়াতির মা বা শাশুড়ি বা কাছাকাছি সম্পর্কের এক দু’জন মুরুব্বিও থাকে। ব্যথা উঠলে গরম পানি, আগুন, শাড়ির টুকরা, বাঁশের ধারালো টুকরা সব প্রয়োজন মতো দাই চেয়ে নেয়। সন্তান হলে এসে ছেলে না মেয়ে জানায়, আজান দিতে বলে। অথচ এদের বাড়িতে কেমনধারা বাচ্চা হওয়া এটা! মেনিমুখোকে বিকেলে দেখেছিল বাঁশঝাড় থেকে বাঁশ কাটছে। এখন বুঝতে পারে নিশ্চয় বাচ্চার নাভিকাটার জন্যই। কিন্তু সন্তান জন্মের সময় মেয়েলোক যেরকম পাশবিক চিৎকার দেয় তাতো আঁতুরঘরের সীমানা ছাড়িয়ে খোদার আরশ পর্যন্ত নাকি কাঁপিয়ে দেয় এই বাজখাই গলার সামান্য টু পর্যন্ত শোনা গেল না তো! এরপর আরও পাঁচটি ছেলে তাদের হয়েছে একই পদ্ধতিতে। একা এক নারী কি করে নীরবে সব সামলায় তা শফিকুজ্জামানের কাছে শেষ পর্যন্ত এক বিষ্ময়ই হয়ে রইল।
এদিকে প্রথম গর্ভ নষ্ট হওয়ার পর আকলিমার শরীর সারতে সময় লাগলো। গর্ভধারণ করতে আরও দেরি হলো। ডাক্তার দেখিয়ে দেখিয়ে গর্ভধারণ যখন করলো শুরু থেকেই শফিকুজ্জামান তার বিধবা ফুফুকে গ্রাম থেকে আনিয়ে নিলেন। ফুফু রান্নাবান্না ঘর সংসার সামলান। আকলিমা কিছুই খেতে পারে না তাকে ডাক্তারের নির্দেশমতো পথ্য রেঁধে খাওয়ান। আরও যে সব দায়দায়িত্ব ফুফু নিজে যা পারেন করেন বাকিটা শফিকুজ্জামানকে নির্দেশ দিয়ে করান। ফুফুকে সাহায্য করার জন্য কাজের একটি লোকও রাখা হয় এবং যথাসময়ে হাসপাতালে আকলিমা বেগম একটি মেয়ের জন্ম দেন। এরপরের বছর জমজ দুটি ছেলে হলে আকলিমা বেগম পুরোপুরি বিছানায় পড়েন আর ফুফু এ বাড়িতে স্থায়ী হয়ে যান। একজন নার্সও রাখতে হয় আকলিমা বেগমের দেখাশোনার জন্য। বাচ্চাদের যতেœর জন্য আরও একজন কাজের লোক। সংসারের এই জেরবার অবস্থার মধ্যে মেনিমুখোকে দেখলে শফিকুজ্জামানের পিত্তি জ¦লে যায়। নিজেকে কেমন পরাজিত লাগে। মেনিমুখোর মনের ভাব অবশ্য বুঝা যায় না। সে জগতে কারও সাথেই তেমন কথা বলে না। শফিকুজ্জামানের মনে হয় এরকম বাজখাই স্ত্রী সাথে থাকলে মানুষের কথা বলার সক্ষমতা কমে যাওয়ারই কথা।
আকলিমা সুস্থ হওয়ার পর আরও এক ছেলে এক মেয়ে জন্ম দিয়েছে। শফিকুজ্জামানও বুদ্ধি খাটিয়ে পাড়ার বড় মানুষদের সাথে মেলামেশা, ভাব ভালোবাসা বাড়িয়ে আস্তে আস্তে নিজের অবস্থান অনেকটাই সংহত করেছে। শুধু এই ঘাটের মরাকে এখন আরও অসহ্য লাগে। সেই সাদা শার্টপ্যান্ট গলায় বারোমাস মাফলার সেই টুং টুং সাইকেল চালিয়ে অফিস যাওয়া ফেরার পথে সাইকেলে ঝোলানো বাজারের ব্যাগ ছেলেগুলো বাবাকে দেখে দৌঁড়ে এলে সাইকেল থেকে নেমে হেঁটে হেঁটে গল্প করতে করতে ঘরে ঢোকে যেন বাবা নয় বন্ধু ওদের। এইভাবে ছেলেমেয়ে মানুষ হবে না তা শফিকুজ্জামান হলফ করে বলতে পারে। শফিকুজ্জামান অবশ্য সন্তানের ব্যাপারে খুবই সচেতন। সে বাড়ি ফেরার সময় হলেই ছেলেমেয়ে পড়ার টেবিলে। পড়তে বসে কেউ ঝুড়ালে সোজা সরিষার তেল চোখে লাগিয়ে দেয় আর পাড়ার ছেলেদের সাথে খেলাধুলা একদম নিষেধ। একবার তার অনুপস্থিতির সুযোগে জমজের ছোটটা মাঠে খেলছিল খেলায় এমন মগ্ন ছিল যে বাপের ফেরাটা দেখতে পায়নি। এমন মাইর দিয়েছেন সেদিন যে প্যান্টে পেশাব করে দিয়েছিল। এরপর থেকে কাউকে আর মাইর দিতে হয় না ডাক দিলেই ঘাম ছুটে যায়। শফিকুজ্জামান একজন লজিং মাষ্টারও রেখেছে ছেলেদের ভালো লেখাপড়া আর দেখাশোনার জন্য।
এখন তার একটাই চিন্তা মেনির ছেলেগুলিকে পড়িয়েছে প্রাইমারি স্কুলে। কিন্তু এখন তো তারা এবং তার ছেলেরা একই সরকারি হাই স্কুলে পড়ে । ওরা আবার বড় ক্লাশের ছাত্র। যদি তার বাচ্চা ছেলেদেরকে কুবুদ্ধি দেয়। এরাতো স্কুলে যায় আর সারাদিন পাড়ার ছেলেদের সাথে এ টিম বি টিম বানিয়ে খেলে। কিন্তু পরীক্ষার রেজাল্ট আনতে গিয়ে শফিকুজ্জামান তাজ্জব। এই ছেলেরা প্রত্যেকে যার যার ক্লাসে ফার্ষ্ট হয়েছে। এত ভাল নাম্বার নাকি এর আগে কেউ পায়নি। শফিকুজ্জামানের বোধগম্য হয় না একটা ছোটঘরে বিচ্ছুগুলি একসাথে পড়েও কিভাবে এমন ভালো রেজাল্ট করে।
মেট্রিক পরীক্ষায় মিচকার বড় ছেলে স্ট্যান্ড করে। পরের বছর মেঝটাও তাই। ইন্টারমেডিয়েটেও একই ফল। এরপর বড়টি স্কলারশিপ নিয়ে বিদেশ গেল পেছন পেছন ছোটটিও গেল। তিন নম্বরটিও তেমন আশা জাগিয়ে রেখেই কলেজে ভর্তি হয়েছে। এসময় রাজনৈতিক অস্থিরতা চলছে। ও বাড়ির ছেলেরা মিছিলে যায় ফলে শফিকুজ্জামানের ছেলেদের মধ্যেও উত্তেজনা। এরকম অবস্থায় তিনি কঠোর শাসন জারি করলেন। সামনে মেট্রিক পরীক্ষা এখন ঘাড় ঘুরানোও বন্ধ। শুধু পড়া আর পড়া। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলো। বড় মেয়েটাকে বিয়ে দেয়ার জন্য অস্থির তিনি। কখন কী হয়। এলাকার শান্তি কমিটির চেয়ারম্যানের সাথে অবশ্য তার খাতির আছে। তবু তার ভয় কমে না। ঘরপোড়া গরু তিনি। প্রথমে তিনি টিনের চালে কচুরিপানা বিছালেন তার উপর আম কাঁঠালের বড় বড় ডাল কেটে ছড়িয়ে দিলেন যেন প্লেন থেকে ঘরবাড়ি বুঝা না যায়। এরপর বাড়ির পিছনে বিশাল গর্ত কাটালেন। ওপরটা ঢেকে দিলেন চ্যালা কাঠ আর গাছের ডাল দিয়ে। একপাশে সামান্য খোলা রাখা হলো। আক্রমণ হলে ওখান দিয়ে ঢুকে পড়তে হবে আর ডালপালা টেনে ঢেকে ফেলতে হবে।
একদিন মিচকার বাড়ি থেকে ডুকরে ডুকরে কান্নার শব্দ শোনা গেল সেও চাপা কন্ঠে। জানা গেল তার কলেজ পড়–য়া ছেলেটি আর্মির হাতে ধরা পড়েছে। তার বাবা অফিস থেকে ফেরার সময় দেখেছে তার ছেলে আর্মির গাড়িতে বসা। ছেলে একদৃষ্টে চেয়েছিল বাবার দিকে বাবাও ছেলের দিকে কিন্তু বাবার সাধ্য ছিল না ছেলেকে কেড়ে আনে। শফিকুজ্জামানের মনে হয় যা বিচ্ছু এমনই তো হবে। বড় দুইটা দেশে থাকলে তাদেরও তাই হতো। তার ছেলেরা যে তার অঙ্গুলিহেলনে চলে এই সাফল্যে সে গর্ববোধ করে।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর পাড়ার মানুষের পক্ষ থেকে পাড়ার প্রধান সড়কটির নাম শহীদ শাখাওয়াৎ সড়ক করার প্রস্তাব উঠলে শফিকুজ্জামানের ভীষণ মেজাজ খারাপ লাগে। মিচকার মাথা যে তাহলে আকাশ ছোঁবে। কিন্তু যেদিকে বৃষ্টি তার বিপরীতে ছাতা ধরার মতো বোকা সে না। সুতরাং চুপচাপ থাকে। রাজনীতির খেল সে সাতচল্লিশে দেখেছে কাজেই কোন কথায় কার বিরাগভাজন হবে সেই সতর্কতায় আস্তে বলে হলে তো ভালোই হয় কিন্তু সে তো নিখোঁজ শহীদ কিনা আমরা তো জানি না। আরেকটু অপেক্ষা করা দরকার না?
এরপর পদ্মা মেঘনায় অনেক জল গড়ালো। অনেকেই দেশ ছাড়লো অনেকে বেঘোরে মরলো। দীর্ঘ সময় বয়ে গেল এভাবে। মিচকা অবশ্য বসে থাকলো না। তার চুলদাড়ি এমনকি ভ্রু পর্যন্ত সাদা হয়ে গেছে। কন্ঠার হার তীরের মতো তীক্ষè হয়ে বেরিয়ে আছে। বেকার এখন সে। তবু সেই মলিন সাদা শার্ট প্যান্ট আর বারোমেসে মাফলার জড়িয়ে সারাদিন সাইকেলে করে কোথায় কোথায় ঘুরে। একদিন দেখা গেল নতুন প্রজন্মের সব ছেলেমেয়েদের সংগে নিয়ে সে মেয়রের কাছে গেল।
কদিন পরই মেয়র একটি নাগরিক সভা ডাকলেন। সেখানে মিচকা গভীর স্বরে চমৎকার একটি বক্তৃতা পাঠ করলো মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও শহীদ শাখাওয়াতের বীরত্ব বর্ণনা করে। আবেগে সবার চোখে জল চলে এলো। শফিকুজ্জামান এত বছর পর এসব ন্যাকামিতে যারপরনাই বিরক্ত হলেন। কিন্তু মেয়রসহ অন্যান্য গণ্যমান্যদের বক্তব্য থেকে বুঝতে পারলেন মিচকাকে বিলাই থেকে ব্যাঘ্র বানানো, ইতিহাস খুড়ে সমস্ত তথ্য জোগাড় করা, তরুণদের সংগঠিত করা মায় মেয়রের সাথে সংযোগস্থাপন সবই তার ছোট ছেলের অবদান। সবাই ছেলেকে আর এমন যোগ্য ছেলের বাবা হিসেবে তাকে ধন্য ধন্য করছে আর তিনি দাঁতে দাঁত চেপে বিগলিত হাসি কোনরকমে ধরে রেখে এই ছেলেটি কখন তার মুঠো থেকে বেরিয়ে গেল ভাবতে ভাবতে বাড়ি ফেরেন। ছেলে যদিও তার পাপস্খালন করেছে তবু নিজেকে তার প্রতারিত মনে হতে থাকে।