উইথ ক্লোজড আইজ

পায়েল চ্যাটার্জী

ইলার একটা আস্ত উঠোন ছিল। ভাঙাচোরা নয়। ছোটবেলা। উঠোনের দক্ষিণ দিকে একটা গন্ধরাজ লেবুর গাছ ছিল। ওসমান চাচা ইলাদের বাড়ি এলেই গাছটার পাশে বসতো। "টিন ভাঙ্গা, লোহা ভাঙ্গা, পুরনো কাচের শিশি বোতল...."। সুর করে ডাক। ইলার ভালো লাগতো না। বাতিল জিনিসপত্র বিদায়ের ডাক। কার কাছে বাতিল! ইলা বুঝত না। আধুনিকীকরণের রাস্তায় বাধা হয়ে দাঁড়ানো কিছু তুচ্ছ জিনিস। ওসমান চাচার কথা খুব ভালো লাগতো ইলার। বাবার কথার মত নয়। "অবসোলেট থিংস আর নাথিং বাট গার্বেজ"। বাবা বলতো।"ওগুলো স্মৃতি! আমরা স্মৃতি কেনা-বেচা করি”। ওসমান চাচা বলতো। প্লাস্টিকের ঢাকনাওয়ালা সেই বাক্সটা। তেঁতুলের বীজ ভরা। এক্কা-দোক্কা খেলা। "বেশ মজবুত আছে বাক্সটা"। ওসমান চাচা ওজন করতে করতে বলেছিল। "দাঁড়িপাল্লা ঠিক আছে তো? এদিক-ওদিক কোরো না কিন্তু"। দুর্দশাগ্রস্ত ওজন পরিমাপক যন্ত্র। তাই বাবার অবিশ্বাস। স্মৃতির ওজন কত হয়! ইলা বোঝেনা। ওসমান চাচার গায়ে খুব ঘামের গন্ধ। মা আঁচল চাপা দিত নাকে। ইলা শুধু চোখ বন্ধ করতো। স্মৃতিদের যাওয়ার সময় আসত বছরে তিন-চারবার। ইলার অবসন্ন লাগত।


এই ওসমান চাচাই আসে না বেশ কয়েকমাস ধরে। বাবার আক্ষেপ। "পুরনোগুলো না সরলে নতুন ওয়াল পেইন্টিংগুলো আনতে পারছি না"। ইলার আঁকা একটা ছবি দাদু বোধহয় ফ্রেমিং করে দিয়েছিল। ওই দিকের দেওয়ালে ঝোলানো। ইলার স্মৃতিরা হালকা হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না। সব জমে যাচ্ছে। অবশেষে চাচা এল একদিন। জানা গেল ‘দ্যাশের' বাড়ি গিয়েছিল। সেখানে কোন অনাথ আশ্রমের ছেলেপিলেদের খাওয়ার ব্যবস্থা করতে। যা রোজগার করে তার বেশিরভাগটাই নাকি ওদের জন্য দিয়ে দেয়। অনেকদিন ধরে। "গিয়ে শুনি ওদের কয়েকদিন ধরে শুধু সোয়াবিন,ভাত দেয়া হচ্ছে, একটা করে ডিম খাওয়ানোর ব্যবস্থা করে এলুম। না খেলে শরীর থাকবে কেমন করে"। মা বিরক্ত। বাড়ির জমে যাওয়া পুরনো জিনিসে। ঘামের গন্ধে। বাবা তাড়া দেয় ওসমান চাচাকে।
-এটুকু তো রোজগার! দিয়ে দিলে খাও কি! নাও তাড়াতাড়ি করো।
-একটা মানুষ।চলে যায় ঠিকই। ‘দ্যাশ' ভাগের সময় নিজের বাপ-মাকে হারিয়েছি। ওদের দেখে নিজের কথাই মনে পড়ে।
ইলার নাকে প্রকট হয়ে উঠছে ঘামের গন্ধটা। রান্নাঘরের গন্ধ, বাবার পারফিউমের গন্ধকেও ছাড়িয়ে যাচ্ছে।


ইলার আজকাল অস্বস্তি হয়। ইউনিভার্সিটি থেকে ফিরেই দেখে ওসমান চাচা ঝুড়ি নিয়ে বসে আছে। বেমানান লাগে। বাড়ির রেনোভেশন চলছে। ওসমান চাচা আজকাল নাকি রাজমিস্ত্রির কাজে ঢুকেছে। সেসব বকবক করতেই থাকে। সেই লেবু গাছটার পাশে বসেছে। দুটো গন্ধরাজ লেবুর আশায় বসে থাকে।''ভাত দিয়ে খাবো''। গাছটা কাটা পড়বে এবার। ওসমান চাচাই সব ব্যবস্থা করে দেবে।"কিছু টাকা-পয়সা হয়তো নেবে, আবর্জনা মুক্ত করার জন্য বাইরের অন্য লোককে চট করে বিশ্বাস করা যায় না"। বাবার গলায় অবিশ্বাস। ইলার উঠোন ভাঙা পড়ছে। সেটা আধুনিক ধাঁচের ড্রইংরুম হবে। সভ্যতা এগোচ্ছে। ওপাশে একটা ওয়াশরুম করা হবে। বাবার কাছে বাইরের অনেক লোকজন আসে। পুরনো বাথরুমটা তারা ব্যবহার করবে। ওসমান চাচাও হাত-টাত ধোয় কখনো। পুরনো বাথরুমটা দেখিয়ে দেবে মা। ইলার অবসন্ন লাগছে। ইউনিভার্সিটিতে ঝামেলা হয়েছে আজ। কোন এনজিও থেকে লোকেরা এসে ডোনেশন চেয়েছিল। কিছু ছেলেমেয়ে দিয়েছিল। কেউ দিতে চাইনি। তাই নিয়ে অশান্তি। রূপককে ফোনে ট্রাই করলো। যথারীতি সময় নেই কথা বলার। নতুন হাইরাইজ প্রজেক্টের সব দায়িত্ব ওর। ইলা এখন চোখ বন্ধ করবে। ভালো দেখতে পায় ওতে। বায়োস্কোপের মত কিছু ছবি ভেসে আসবে। একটা উঠোন। গন্ধরাজ লেবুর গাছ। শেকড়। শেকড়টা উপড়ে ফেলা হচ্ছে। মাটির তলার জীবগুলো বেরিয়ে আসছে। গিজগিজ করছে। ওসমান চাচা সব জড়ো করে নিচ্ছে ওর ঝূড়িতে।

ওসমান চাচা রোজ আসছে। ইলাদের বাড়িতেই রাজমিস্ত্রির কাজ করছে। রেনোভেশন। "দুটো পয়সা বেশি রোজগার করতে পারলে আমার গেরামের আশ্রমের ছেলেপেলে গুলোকে মাছ খাওয়াতে পারব মাঝেমধ্যে"। শুধুমাত্র বেসিক নিড পেয়ে বেঁচে থাকা ছেলেমেয়েদের কেমন দেখতে হয়? ইলা জানেনা। ইলার দেখতে ইচ্ছে করে। বাবার কাছে এনজিওর রিসিপ্ট দেখেছে। ওতে নাকি এক্সট্রা ট্যাক্স সেভিংস হয়। ওসমান চাচা কি সেভ করে? ইলার ওই অনাথ-আশ্রমে যেতে ইচ্ছে করে। বাস-ট্রেন। ঝামেলা। ইউনিভার্সিটি, নোটস, কেরিয়ার পেরিয়ে এসব হয়ে ওঠেনা। আমি, তুমি, আমরা। আটকে থাকে ইলা। 'ওরা' অবধি পৌঁছানো হয় না।

ইলার উঠোন এখন হালফ্যাশনের ড্রইংরুম। ওসমান চাচা সেদিন এসেছিল। পুরো বাড়ি ঝাড়পোঁছ করে কিছু পুরনো জিনিসপত্র নিয়ে গেল। ''রাজমিস্ত্রির কাজ চট করে পাইনা বাবু, কিন্তু রোজগারতো করতেই হবে আমার ওই ছেলেপুলেগুলোর জন্য"। ওসমান চাচার জামার বোতামগুলো বোধহয় ছিঁড়ে গেছে। গলা থেকে বুক অবধি দেখা যাচ্ছে। হাড়গুলো গোনা যাচ্ছিল। একটা, দুটো, তিনটে....। চোখ বন্ধ করতে হবে ইলাকে। ছাদটাও মা পরিষ্কার করাল আজ চাচাকে দিয়ে। ক্যান্ডেল লাইট ডিনার পার্টি হবে আজ রাতে ছাদে। হইচই। মোমবাতির আলো। মোমগুলো আগুনে গলে গলে পড়ছে। প্রত্যেক ফোঁটায় একটা মুখ দেখতে পাচ্ছে ইলা। জীর্ণ,শীর্ণ। মুখের হাড়গুলো গোনা যাচ্ছে। ইলা কি তবে হ্যালুসিনেট করছে!

মা খোঁজ করছিল ওসমান চাচার। চাচার ঘামের গন্ধে খুবই বিরক্ত হতো মা। কিন্তু পার্টির অনেক ঝামেলা। পরিষ্কার করা,গোছানো। ওসমান চাচা এলে মায়ের সুবিধে। ইলার ভালো লাগেনা এসব করতে। সব ভিড় মনে হয় তার। নিছক অপ্রয়োজনীয় আসবাবের মত।

ওসমান চাচা আর আসে না। বাবা খোঁজ করেছিল অনেকদিন। অন্য একজন এসেছে। কাজকর্ম নাকি খারাপ করেনা। ওসমান চাচা নাকি মরে গেছে। বাবা খবর পেয়েছে কোথা থেকে। কোথায় নাকি রাজমিস্ত্রির কাজ করছিল। হঠাৎ অসুস্থ। একেবারে সব শেষ। "বুড়ো বয়সে এত রোজগারের ভূত চাপলে এই হয়, নতুন ছেলেটাকে কাজ-কম্ম শিখিয়ে নিতে হবে"। বাবা শিখিয়ে নেবে। তদারকি করে। ইলা ড্রইংরুমের দক্ষিণ দিকে বসেছে,যেখানে লেবু গাছটা ছিল। খুব সুন্দর গন্ধ। লেবুর নাকি ঘামের? ইলা চোখ বন্ধ করছে। দেখতে পাবে এবার। ‘'উইথ ক্লোজড আইজ''।একটা গাছ। শেকড়টা মজবুত। ডালপালা। ছায়া। অনেকগুলো ছেলে মেয়ে খেলা করছে গাছের ছায়ায়। মাঝে মাঝে ক্লান্ত হচ্ছে। হি হি করে হাসছে। কানে কানে কথা বলছে দুটো বাচ্চা। ''আজ মাছ খাব"। গাছটা শুনছে। কি যেন ফুল ফুটেছে গাছটায়। টুপ করে একটা ফুল পড়ল।