আমার কথা ভেবোনা

শিবু মণ্ডল

‘আমার কথা ভেবোনা, নদীর কথা ভাবো, মাটির কথা ভাবো,গাছের কথা ভাবো আর ভালোবাসার কথা ভাবো!’




মাতৃসদন আশ্রমের সামনে দিয়ে বয়ে যাওয়া গঙ্গার একটি ধারা


প্রায় দু’বছর পর এলাম এই দিকটায়, মানে কন্‌খল পেরিয়ে জগজিতপুর গ্রামে।বেশ কয়েকবছর হল এখানে চাষের জমি প্লট বানিয়ে বানিয়ে বিক্রি করছে প্রমোটারের দল। তৈরি হচ্ছে বড় বড় বিল্ডিং। তবে এবার এসে দেখলাম বাড়ির পাশাপাশি ফ্ল্যাটও তৈরি হচ্ছে। রাস্তার দুধারে আরও অনেক বিল্ডিং মেটেরিয়ালের দোকান গজিয়ে উঠেছে। মোবাইলের জিপিএস নির্দেশ অনুযায়ী একটা টার্ন নিতে গিয়ে যেখানে এসে দাঁড়ালাম সেখানে একটি রাস্তা মূল রাস্তা থেকে বামদিকে চলে গেছে। রাস্তার ধারের এক কোণে একটি গুমটি দোকান-মালিককে মাতৃসদন আশ্রমের ঠিকানা জানতে চাইলে দোকানদার আমাকে বামদিকের রাস্তাটিই ইশারায় দেখিয়ে দিলেন। বেশকিছুদিন ধরেই মনে মনে ভাবছিলাম সেখানে যাবার কথা। ভক্তদের প্রচারের আলোর বাইরে থাকা এই ভিন্ন ভাবধারার আশ্রমটির খবর গতবছর আমার জ্ঞাতে আসে সংবাদ মাধ্যমের একটি খবরের সৌজন্যে। যখন সেই আশ্রমের এক সন্ন্যাসী বিখ্যাত পরিবেশবিদ ও আই আই টি কানপুরের প্রাক্তন ডিন শ্রী জি ডি অগ্রবাল উরফ স্বামী জ্ঞানস্বরূপ সানন্দ গঙ্গাবক্ষে জলবিদ্যুত প্রকল্পের প্রয়োজনে বাঁধ ও অবৈধ খনন রুখতে সরকারী হস্তক্ষেপ চেয়ে আমরণ অনশনে বসেন। ১১১ দিন পরেও কোনও রফাসুত্র বের হয়নি এবং অনশনরত অবস্থাতেই প্রশাসন তাঁকে জোর করে হৃষীকেশের এইমস্‌ হাসপাতালে ভর্তি করলে পরের দিনই তাঁর মৃত্যু হয়। তারপর থেকেই আগ্রহ বেড়েছিল মাতৃসদনে যাওয়ার। খুঁজিনি যে তাও নয়। তবে কনখলের ভিআইপি আশ্রমগুলোর আশেপাশেই খুঁজেছিলাম। আর সেই খোঁজাতে আন্তরিকতা না থাকার কারণেই শেষে হয়ত আর পাইনি।
গলির পাকা রাস্তাটি একটু দূরেই কাঁচা হয়ে সোজা চলে গেছে গঙ্গার দিকে। রাস্তার দুপাশে কোনও বাড়িঘর চোখে পড়ল না। তবে পাঁচিল ঘেরা একর একর খালি জমিগুলি যে কোনও না কোনও আশ্রমের তথা ট্রাস্টির অধীনে তা তাদের ফটক ও সাইনবোর্ড দেখেই বোঝা যায়। রাস্তার শেষে গিয়ে যে নদীটির পাড়ে উঠলাম সেটি গঙ্গার মূল ধারা নয়, আবার মূল ধারাও বটে। আসলে হৃষীকেশের পর হরিদ্বারে গঙ্গা বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে রক্তজালিকার মত বিভিন্ন শাখায় ছড়িয়ে পড়ে।ব্যখ্যা করে বললে বলা ভালো স্বাভাবিক জলধারাকে উপরের বিভিন্ন পাহাড়ে বাঁধ দিয়ে আটকে দেবার ফলে নিচের বিস্তীর্ণ নদীখাতের জায়গায় জায়গায় বালির চরা গজিয়ে উঠে নদীকে বিভিন্ন ধারায় ভাগ করে দিয়েছে।এর থেকে কিছু শাখা ক্যানালের রূপ পেয়ে দিল্লী ও হরিয়ানার দিকে চলে গেছে আর বাকি শাখাগুলি হরিদ্বারের পর আবার একত্রিত হয়ে বয়ে গেছে।এমনি একটি শাখা হর-কী-পৌড়ী ঘাট থেকে বেরিয়ে কন্‌খলের দক্ষপ্রজাপতি মন্দির ও মা আনন্দময়ী আশ্রম ছুঁয়ে আরও দূরে মাতৃসদন আশ্রমের পাশ দিয়ে বয়ে গিয়ে পরে মূল নদীখাতে মিশেছে। ওপারের ঘাসে ভরা চরায় আর কিছু নেই মানে বসতি নেই, শুধু ছোট ছোট ন্যাড়া গাছ সরু সরু ডালপালা মাথায় নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দূর থেকে দেখা না গেলেও বোঝা যায় ছোট ছোট পাতা গজাতে শুরু করেছে। দু’চারজন মানুষের মাথাও দেখা গেল, খুব সম্ভবত গুজ্জর হবে,এদিক ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে গরু ও মোষের দল। ঘন তৃণভূমি ও বনভূমির জন্য বোঝা যাচ্ছে না তবে আরও এক-দেড় কিমি অন্তরে দুটি বড় বড় চরা আছে। পূর্বোত্তর কোণে অনেক দূরে পাহাড়ের মাথায় চণ্ডীদেবীর মন্দিরটি দেখা যাচ্ছে।
রাস্তাটি যেখানে এসে পাড়ে উঠেছে সেখানে একটি নিম গাছের তলায় পাতা পঞ্চায়েতি বেঞ্চিতে তিনটি লোক লোকসভা ভোট নিয়ে কথা বলছে। কে কোন প্রার্থীকে ভোট দিয়েছে আর কে কোন দলকে ভোট না দিয়ে নিজের ভোটটি বিফলে যাবার হাত থেকে বাঁচিয়েছে- এইসব আর কি। দুদিন আগেই এখানে ভোট হয়ে গেছে। চারপাশে তাকিয়ে একটি গেরুয়া রঙের সেতু ছাড়া কিছুই নজরে পড়ল না। অগত্যা বসে থাকা লোকগুলির উদ্দেশে মাতৃসদন আশ্রমটি কোথায় জানতে চেয়ে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলাম। দুজনই একসাথে ডানদিকে হাত দেখিয়ে বলল- ওই তো! নুড়ি পাথর বিছানো পথটি শ-দেড়শ মিটার দূরে একটি সাইনবোর্ডের সামনে গিয়ে শেষ হয়েছে যেখানে দু’জন লোক গাছের ছায়াতে প্লাস্টিকের চেয়ার পেতে বসে আছে। এরপর শুধু ঝোপজঙ্গল, ডানদিকে ছোট কাঠের গেট ও টিনের ঘেরা দেওয়া একটি বিশাল বাগান। সাইনবোর্ড না থাকলে বোঝাই যেত না যে এটি একটি আশ্রম। হরিদ্বারের বিভিন্ন আখরা ও আশ্রম যারা ঘুরে দেখেছেন তারা জানেন এখানে এক একটা আশ্রম মানে বিত্ত ও বৈভবের প্রশ্নাতীত নিদর্শন সে স্থাপত্যের দিক থেকে হোক বা ব্যবস্থার দিক থেকেই হোক। সেই অভিজ্ঞতা থেকে দেখলে মাতৃসদন আশ্রমকে গ্রামের একটি বাগানঘেরা গৃহস্থবাড়ি বলেই মনে হয়। এতটাই নির্জন বাড়িটি যে গেটের সামনে বসে থাকা সাধারণ পোশাক পড়া লোকদুটিকে উপেক্ষা করে অবাধে প্রবেশ করতে চাইবে না কেউ। প্রকৃতপক্ষে পারবেও না। কারণ দুজন লোকের মধ্যে একজন পুলিশের লোক। অন্যজন আশ্রমের কর্মী তথা প্রহরী। আশ্রমের ভিতরে যেতে চাই জেনে পুলিশের লোকটি কয়েকটি প্রশ্ন করে আমি কোথা থেকে ও কী উদ্দেশ্যে এসেছি তা জেনে নিল। তারপর যখন নিশ্চিত হল যে আমি কোনও খারাপ উদ্দেশ্যে নয় শুধু ব্রহ্মচারী আত্মবোধানন্দের দর্শনের জন্যই এসেছি তখন আশ্রমের প্রহরীকে দিয়ে খবর পাঠাল। দু’মিনিট বাদেই প্রহরটি এসে গেটটি খুলে দিল। ভেতরে একটি লম্বা একচালা ঘর দেখিয়ে বলল যে স্বামীজী সেই ঘরেই আছেন। আর আমি যেন আত্মবোধানন্দের খুব কাছে না যাই, দূর থেকেই দর্শন করি। ঠিক আছে বলে ভেতরে ঢুকি। ঘরটি গেটের উল্টোদিকে মুখ করা। আমি পাশ দিয়ে ঘুরে সামনে এলাম। তিনটি রুমের সামনে টানা বারান্দা। বারান্দার এককোণে লোহার জালি দিয়ে রান্নাঘর বানানো হয়েছে। রান্নাঘরের সামনের রৌদ্রে দুটি মধুর শিশি শুকোতে দেওয়া। বারান্দার মাঝামাঝি একটি কম্বল পাতা কাঠের চৌকিতে বসে আছে রুগ্ন এক যুবক। মাথার চুল ঘন হলেও গোঁফ-দাড়ি তত ঘন নয়। এনার ছবিই তো আসার পথে বিভিন্ন স্থানে চিপকানো পোস্টারে দেখতে পেলাম। তাতে অবিরল ও নির্মল গঙ্গার জন্য যেসব দাবী করে সরকারের হস্তক্ষেপ চেয়ে আত্মবোধানন্দ অনশনে বসেছে তার একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেওয়া আছে। সাদা ধুতি ও গেঞ্জি পরিহিত ব্রহ্মচারীকে চিনতে অসুবিধা হল না। হাতজোড় করে প্রণাম জানালাম। তিনিও হাতজোড় করলেন। শরীরের অপ্রস্তুত ভঙ্গি ও মুখের অমলিন হাসিতেই বোঝা যায় বয়স ছাব্বিশ-সাতাশের বেশি হবে না। সামনের উঠোনে রাখা চেয়ার দেখিয়ে বসতে বললেন। আমি চেয়ারটা বারান্দা থেকে আর একটু দূরে সরিয়ে আম গাছের ছায়ায় নিয়ে বসলাম। উল্টোদিকে একটি যজ্ঞশালার সামনে বসে আরও চারজন সন্ন্যাসী ধ্যান করছে। পাখির ডাক ছাড়া আর কোনও আওয়াজ নেই বাড়িটিতে।
মাতৃসদন আশ্রমে সেদিন আমি কীজন্য গিয়েছিলাম তা আমার কাছে স্পষ্ট ছিলনা। হয়তো কৌতূহলবশতঃ, বা হয়তো বিভিন্ন সময়ে আশ্রমের সন্ন্যাসীদের গঙ্গাকে বাঁচানোর জন্য অনশনে বসা এমনকি সমাজ, সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য তাঁদের চরম আত্মত্যাগই হয়তো আমার মত সাধারণ নাগরিকের মনেও বিষয়টির গম্ভীরতা সম্বন্ধে ভাবতে বাধ্য করেছে। সেই ভাবনা থেকেই হয়ত সেখানে যাবার তাগিদ অনুভব করেছিলাম। আবার সেই তাগিদ বা কর্তব্যবোধ থেকেই যখন এই নিবন্ধটি লিখছি ততদিনে ব্রহ্মচারী আত্মবোধানন্দের অনশনের ১৯০ দিন হয়ে গেছে। তবে বিষয়টি এতই সংবেদনশিল যে তা নিয়ে নিরপেক্ষ প্রতিবেদন লেখা গেলেও ব্যক্তিগতভাবে কিছু লেখা সত্যিই কঠিন। সেদিন আশ্রমে বসে বসে অনেক কথাই ভাবছিলাম, মনে অনেক প্রশ্ন জমেছিল এই অনশন নিয়ে। না মাতৃসদন আশ্রমের স্বচ্ছতা, নীতি ও আন্দোলন নিয়ে কোনও প্রশ্ন ছিল না। প্রশ্ন ছিল তাদের আন্দোলনের ধরণ দেখে। এর আগেও দেখেছি এই আশ্রমের তিনজন সন্ন্যাসী একই দাবীতে অনশন করতে করতে প্রাণত্যাগ পর্যন্ত করেছে। আর আজও আমি স্বচক্ষে একজন ছাব্বিশ বছরের যুবা ব্রহ্মচারীকে একই দাবীতে চরম আত্মত্য্যাগের পথে ধীরে ধীরে এগিয়ে যেতে দেখছি। এখানে পরিবেশ ধ্যানের পক্ষে ভীষণ অনুকূল। আম, কাঁঠাল, রুদ্রাক্ষ, জবা, লেবু গাছের ছায়াতে, মায়াতে, হাওয়াতে মানুষ ও পশুপাখি একাকার এখানে। সামুহিক ধ্যানের প্রভাবে কিনা জানি না তবে এই পরিবেশের প্রভাবে কিছুক্ষণের জন্য হলেও আলাদা করে নিজের অস্তিত্বকে অনুভব করতে পারছিলাম না। সবাই যেন একই প্রকৃতি এখানে!

ব্রহ্মচারী আত্মবোধানন্দ



ধ্যান শেষ হতেই চশমা পরিহিত এক সন্ন্যাসী সামনে এসে দাঁড়াল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে প্রণাম জানালাম। তিনিও আমার নাম ও কোথা থেকে এসেছি জিজ্ঞেস করল।এবং শেষে কেন এসেছি তাও জিজ্ঞেস করল। আমি কি বলব বুঝতে পারছিলাম না। আর কিই বা বলতাম যে একজন ব্রহ্মচারীর অনশন দেখতে এসেছি! অথবা মনের মধ্যে যেসব প্রশ্নগুলি জেগেছিল তার উত্তর পেতে এসেছি। আবার কথা প্রসঙ্গে নিজের বক্তব্যও রাখতে পারতাম যে তাঁদের কিছু দাবী বিশেষ করে গঙ্গা ও তার উপনদীর উপরে জলবিদ্যুৎপ্রকল্পের জন্য নির্মিত বা নির্মীয়মাণ বাঁধগুলি উঠিয়ে নেওয়া কতটা বাস্তবিক। রাজনৈতিকভাবে জিতে আসা একটি সরকার তাঁদের সব দাবী মানবে না জেনেও কেন এই আন্দোলনকে চরম ত্যাগের পথে নিয়ে যাওয়া! আমার যুক্তিবাদী মন এটা মানতে পারছে না যে নিজপাপ স্খালনের কর্তব্যটি যে সমাজ ও রাষ্ট্র তার নিজের কাঁধে নিতে প্রস্তুত নয় সে সমাজের জন্য হে সন্ন্যাসী, হে ব্রহ্মচারী তুমি কেন নিজের প্রাণ ত্যাগ দিতে চাইছ? আচারে, ব্যবহারে হাজার দ্বিচারিতা, মিথ্যাযাপন,
নির্লজ্জ স্বার্থসিদ্ধির পরেও আমরা সাধারণ নাগরিকেরা সুযোগ পেলেই যেনতেন প্রকারে নিজেকে সৎ, রাষ্ট্রপ্রেমি,সমাজের হিতকারী প্রমাণ করে নিশ্চিন্তে সন্তানের গলা জড়িয়ে রাতে ঘুমাতে যাই। সেখানে তোমার তো সংসার নেই, সন্তান নেই,তুমি কেন আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মের কথা ভেবে গঙ্গাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য নিজেকে শেষ করে দিচ্ছ? এখানে এসে যে আমার ভীষণ কষ্ট হচ্ছে! মনে হচ্ছে তোমাকে হাতজোড় করে মিনতি করি যে ‘ এই অনশন তুমি তুলে নাও। জীবনের ঊর্ধ্বে আর কিছু হতে পারে না!’
‘ এমনিই এসেছি’ কোনমতে শুধু এটুকুই বলতে পারলাম সন্ন্যাসীর প্রশ্নের জবাবে।
‘এমনিই এসেছ!’ যেন এক তীব্র কষাঘাতের মত এসে লাগল সন্ন্যাসীবাক্যটি। যেন তিনি বলতে চাইল যে দেখ তোমরা নাগরিকেরা ও তোমাদের নির্বাচিত সরকার সবাই একইরকম ভীরু ও স্বার্থপর। আমাদের এই আন্দোলন ,এই ত্যাগ তোমাদের কাছে এক তামাশা ছাড়া আর কিছু নয়। গঙ্গার স্বচ্ছতা, তার নির্মলতা তার পুনরুজ্জীবনের ইস্যুগুলি তোমাদের কাছে গৌণ! এগুলি তোমাদের মহান সমাজসেবকরূপে প্রমাণ করবার একটা সুযোগ ও রাজনৈতিক হাতিয়ার মাত্র! এগুলি নিয়ে তোমরা মোচ্ছবে মেতে উঠতে পারো আর সেই মোচ্ছবের আড়ালে নিজেদের লোভ ও ভোগ চরিতার্থ করতে তোমাদের কোনও বাঁধা নেই।
বুকে যে কষ্টটা হচ্ছিল সেটির পরিবর্তে এখন এক অস্থিরতা টের পাচ্ছি। সন্ন্যাসী যেন আচমকা একটি আয়না তুলে ধরলেন আমার সামনে। তাতে নিজের ও এই সমাজের নির্লজ্জ উলঙ্গ চেহারাটি দেখতে পাচ্ছি । বুঝতে পারলাম ব্রহ্মচারী আত্মবোধানন্দর জন্য যে কষ্টটা হচ্ছিল সেটি আসলে তাঁর জন্য নয় ওটা আমার নিজস্ব ভয়। ভয় এটা ভেবে যে পরবর্তী প্রজন্মের কথা ভেবে প্রাণ ত্যাগ তো দূরের কথা সামান্যতম ভোগবিলাস ত্যাগ করার শক্তিও কি আছে আমার?
‘ উনি আমাদের গুরুজী।যান দেখা করে আসুন।’ ধ্যান শেষে একজন অশীতিপর সন্ন্যাসী আত্মবোধানন্দের স্বাস্থ্যের খোঁজখবর নিচ্ছিলেন। শরীরের ওজন কতটা, ডাক্তার কখন আসবে চেক্‌-আপ করতে তাও জেনে নিচ্ছিল অন্য এক আশ্রমিকের কাছ থেকে। পরে অবশ্য জানতে পারি যে চশমা পরিহিত সেই প্রথমজন হল সন্ন্যাসী দয়ানন্দ আর গুরুজী হলেন আশ্রমের প্রধান সন্ন্যাসী স্বামী শিবানন্দ সরস্বতী।
কাছে গিয়ে গুরুজীকে প্রণাম জানালাম।প্রণাম গ্রহণ করে তিনি যজ্ঞশালার পাশেই একটি কুটিরে প্রবেশ করে গেল। আমি মনের অস্থিরতা কমানোর জন্য এলোমেলোভাবে কিছুক্ষণ চারপাশের প্রকৃতিতে মনোনিবেশ করার চেষ্টা করলাম। বাগানে অনেক জবাফুলের গাছ,সাদা, লাল দুরকমই, ফুল ফুটে আছে। জবার পাশাপাশি কিছু সুগন্ধি ফুল খোঁজার চেষ্টা করলাম কিন্তু পেলাম না, তবে রান্নাঘরের পিছনদিকটায় কয়েকটি বড়বড় রুদ্রাক্ষের গাছ দেখতে পেলাম। ফলও ধরেছে তাতে। সেইদিকেই একটি বিড়াল তার বাচ্চাদের নিয়ে রান্নাঘরে ঢোকার চেষ্টায় বেড়ার ফাঁকফোঁকর খোঁজার চেষ্টা করছে। মা বেড়ালটি না পারলেও বাচ্চাগুলি কোনোমতে মাথা গলাতে পারলেও শেষ পর্যন্ত লোহার জাল লাগানো থাকায় রান্নাঘরে ঢুকতে ব্যর্থ হচ্ছে তবুও তারা বারবার চেষ্টা করে যাচ্ছে।
‘প্রসাদ নিয়ে যাবেন কিন্তু’- স্টিলের ফ্লাস্ক উপুড় করে গ্লাসে জল ঢালতে ঢালতে আত্মবোধানন্দ আমাকে উদ্দেশ্য করে কথাটি বললেন। মাথা নাড়িয়ে আমি সম্মতি জানালাম। কিছুক্ষণের মধ্যে স্বামী দয়ানন্দ ও আরও দুজন আশ্রমিক বারান্দায় মাদুর বিছিয়ে সবার মধ্যাহ্নভোজনের ব্যবস্থায় লেগে পড়লেন। সবার মধ্যে আরও কিছু দর্শনার্থী ও পাহারারত পুলিশকর্মীটিও আছে। ক্ষুধা নিবারণের জন্য ভাত, ডাল, সব্জি যাকিছুই গ্রহণ করা হোক না কেন এখানে সবই প্রসাদ। মনে মনে উঠে পড়ার কথা ভাবতেই দয়ানন্দজীও প্রসাদ গ্রহণের অনুরোধ করলেন। অমান্য করতে মন চাইল না।তবে ইচ্ছে করছিল না কিছু খেতে। চোখের সামনে একজন ১৭২ দিন ধরে না খেয়ে আছে আর তাঁর সামনে কী করে খেতে বসি?
কে বলল না খেয়ে আছে ওইতো একটু আগেই একজন ফ্লাস্কের জল শেষ হতেই আবার ভরে দিয়ে গেল। শুধু জল নয়, মধু মেশানো জল! খাচ্ছে তো! এখনও তো বেঁচে আছে এই খেয়ে! আমার কোনও মন খারাপ করে লাভ নেই, ভয় করেও লাভ নেই। আমার পেট ভরা থাকলেও আবার খেতে বসতে পারি। এরপর কোয়ার্টারে ফিরে নিশ্চিন্তে ভাতঘুমটাও দিয়ে দেব।
আশ্রমের গেটের বাইরে বেরতেই দেখলাম একটু দূরে নদীর ধারে বনে একটি ময়ূর পেখম তুলে নাচছে। দূর থেকে দেখে মন ভরল না। যেন কিছুই দেখছি না এমন ভান করে ময়ূরটির কাছে যেতেই পেখম গুটিয়ে একটি গাছের ডালে উড়ে গেল।এতদিন আমি নিজেকে প্রকৃতি প্রেমিক হিসেবেই জানতাম। ময়ূরটি উড়ে যাওয়াতে আমার সেই ভুল ভেঙে গেল। বাইক স্টার্ট করে সেতুটির কাছে চলে এলাম। আসার পথেই মন করছিল সেতুটির উপর থেকে গঙ্গার বয়ে যাওয়া দেখি কিন্তু তা আর হয়ে ওঠেনি। এবার ফেরার পথে দেখছি অন্য একজন আমার সেই ইচ্ছেটি নিয়ে সেতুটির শেষপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। নিম গাছের ছায়া থেকে আগের লোকগুলি সরে গেছে তাদের পরিবর্তে চারটি কিশোর মোবাইল খুঁটাতে খুঁটাতে গল্পে মশগুল।তাদের পোশাক-আশাক ও পাশে রাখা বাইক দেখে বোঝা যায় যে তারা শহর থেকেই এসেছে। আমার বাইকটিও তাদের বাইকের পাশে রেখে ধীরে ধীরে সেতু ধরে এগিয়ে গেলাম আমার ইচ্ছে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা অন্য জনের কাছে।
- কী দেখছ?
- নদী বয়ে যায়!
- কোথায় থাকো?
- এই তো প্রবাহের পাশেই!
- তুমি কি রোজ আস এখানে?
- হ্যাঁ আমি এখানেই থাকি। ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত। কখনো কখনো রাতেও।
- কেন? কী করো এখানে ? অন্য কোনও কাজ করো না তুমি?
- ওই যে বললাম প্রতিমুহূর্তে গঙ্গার বয়ে যাওয়া দেখি। যখন জল কম আসে বুঝতে পারি উপরের পাহাড়ে ড্যামের গেট বন্ধ হয়ে গেছে। তখন হর-কী-পৌড়ী সহ গোটা হরিদ্বারে আলো ঝলমল করে। আর যখন জল বাড়ে বুঝি তখন বাঁধ খুলে দিয়েছে। শহরে তখন অন্ধকার নেমে আসে। গ্রামেও! আর সেই সময়টাতেই আমাকে রাত্রে থাকতে হয়।
- কেন?
- ওই অন্ধকারেই তো এই সেতু পার করে খনন মাফিয়ার দল নদীর বুক কেটে কেটে বালি, পাথর সব তুলে নিয়ে যায়। আমি যথাসাধ্য বাঁধা দিই। কিন্তু ওদের সাথে সবসময় পেরে উঠিনা। সরকারের কাছে নালিশ করার পরেও আমাকে কোনরকম সাহায্য না করে উল্টে মাফিয়াদেরই সাহায্য করে তলে তলে। আমিও দমবার পাত্র নই, এই যে দেখুন সেতুর সামনের মাটি কেটে কেমন খাল বানিয়ে দিয়েছি এখন দেখি কেমন করে ওরা ট্রাক্টর-ট্রলি নিয়ে যায় ওপারে।এরজন্য আমাকে খুনের হুমকিও দিয়েছে মাফিয়ারা। কিন্তু মজার কথা কী জানেন ওরা যখন তখন আমাকে মেরে ফেলতে পারে কিন্তু এখনও মারছে না। কেন বলুন তো?
- কেন?
- তার মানে ওরা ভয় পায়। আমাকে নয় সরকারকে। সরকার ইচ্ছে করলেই ফুস করে ওদের হাওয়া বের করে দিতে পারে। কিন্তু জানি তা করবে না। এই যে ওপারে যেখানে ছোট ছোট গাছ দেখছেন সেখানে একসময় গভীর বন ছিল। কত রকমের গাছ ছিল সব এই বিশাল বিশাল। সব সাফ করে দিল চোরের দল। তারপরেই আমি এই গাছগুলি লাগিয়েছি। দেখবেন একদিন এই বন আবার ঘন হবে। ওই যে ওই নিম গাছের তলায় যে চারটি বাচ্চা ছেলে বসে আছে ওদের মধ্যে একজনের প্রেমিকা আসবে স্কুটি চালিয়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই। তারপর ছেলেটি আর মেয়েটি প্রেম করতে ওই দূরের নদীর ঢালে নেমে যাবে সবার আড়ালে। ওখানে যে শিমূল গাছটি দেখতে পাচ্ছেন সেটি কিন্তু আগে ছিলনা। গরমকালে ছেলেটি ও মেয়েটির কষ্ট হত বলে আমিই লাগিয়ে দিই। খুব বেশিদিনের সম্পর্ক নয় ওদের অথচ দেখুন এর মধ্যেই গাছটি কী সুন্দর ফুলে ফুলে ভরে উঠেছে।...... কিন্তু তার পরেও একটা আশঙ্কায় থাকি আমি!
- কিসের আশঙ্কা ?
- ওই যে পাড়ের উপর কালো রঙের একটি গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে, দেখতে পাচ্ছেন?ওর ভিতরে বসে পাঁচজন যুবক মদ খাচ্ছে।
- আমি ঘাড় ঘুরিয়ে গাড়িটির দিকে তাকিয়ে দেখার চেষ্টা করলাম। আসার সময় গাড়িটা দাঁড়িয়ে ছিল বটে, ভিতরে ছেলেগুলো বসে কোকজাতীয় কিছু পান করছিল মনে হল, কিন্তু মদ হতে পারে ভাবিনি। তবে হ্যাঁ বাইরে নদীর ঢালের দিকে একটি মদের বাক্স পড়ে থাকতে দেখেছিলাম মনে পড়ল। সেটা তবে ওরাই ফেলেছে?
- একদম তাই। আগে কখনো দেখিনি জানেন। একদিন দেখলাম ওই প্রেমিক জুটির পিছু পিছু এসে পাড়ে দাঁড়াল। সেদিন আমি ওই নিমগাছটার ছায়ায় বসেছিলাম। জুটিটা শিমূল গাছের তলায় চলে যেতেই সেই ছেলেগুলি নিজেদের মধ্যে চাপাস্বরে কিছু আলোচনা করছিল। ওদের মধ্যে একটু তর্কাতর্কিও হচ্ছিল। আমি নিশ্চিত কিছু বদ মতলবেই ওরা ওই জুটির পিছু নিয়েছিল। তবে সেদিন আমি থাকাতে ওরা কিছু করার সাহস পায়নি। তারপর থেকেই প্রেমিক কিশোরটি ওর তিন বন্ধুকে সাথে নিয়ে আসে, যখনই আসে। আর আমি তো এখানেই থাকি। এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমি নদী, মাটি, গাছ আর ভালোবাসা পাহারা দিই!
- ফেরার সময় আমিও মনের আশঙ্কা চেপে রাখতে না পেরে তাঁকে বলেই ফেললাম যে ‘তোমার জন্য আমার ভাবনা রয়েই গেল!’
সে বলল ‘ আমার কথা ভেবোনা, নদীর কথা ভাবো, মাটির কথা ভাবো, গাছের কথা ভাবো আর ভালোবাসার কথা ভাবো!’

‘তুমি আমাদের নদীর কথা ভাবতে শিখিয়েছ, মাটির কথা ভাবতে শিখিয়েছ, গাছের কথা ভাবতে শিখিয়েছ আর ভালোবাসার কথা শিখিয়েছ! আমরা তোমার কথা ভাববো! আমরা সবাই তোমার কথা ভাববো!’

পরিশেষেঃ
বিগত ২৩ বছর ধরে গঙ্গা বাঁচাও আন্দোলনের প্রতি নিবেদিত হরিদ্বারের কন্‌খলস্থিত মাতৃসদন আশ্রমের পরম্পরা ও সংকল্প অনুযায়ী আশ্রমেরই ২৬ বছরের ব্রহ্মচারী আত্মবোধানন্দ গত ২৪ অক্টোবর ২০১৮ থেকে ৪ মে ২০১৯ পর্যন্ত দীর্ঘ ১৯৪ দিনের অনশন করেছিলেন। মাতৃসদন আশ্রম ও সেই অনশনকে আশ্রয় করেই উপরিউক্ত লেখাটি রচিত হয়েছে। সেই সময় ২৬-৪-২০১৯ তারিখে ‘রাষ্ট্রীয় স্বচ্ছ গঙ্গা মিশন’ এর ডিজি রাজীব রঞ্জন মিশ্র মাতৃসদনে এসে আত্মবোধানন্দ ও আশ্রম প্রধান স্বামী শিবানন্দের সাথে সাক্ষাৎ ও সমস্যার সমাধানের রাস্তা খুঁজতে বিশদে আলোচনা করেন। তার ফলস্বরূপ ৪-৫-২০১৯ তারিখে শ্রী রাজীব রঞ্জন মিশ্র’র তরফ থেকে ‘নির্মল ও অবিরল’ গঙ্গার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও রাজ্য সরকারকে নির্দেশ জারি করবে বলে লিখিত প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল মাতৃসদন আশ্রমকে। আর কেন্দ্রীয় সরকারের সেই প্রাথমিক হস্তক্ষেপে আশার আলো দেখতে পেয়ে ব্রহ্মচারী আত্মবোধানন্দ আশ্রমের ইতিহাসে এখনো পর্যন্ত সেই দীর্ঘতম ১৯৪ দিনের অনশনে বিরতি দেবার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কিন্তু তারপরেও মাতৃসদন আশ্রমের দাবি অনুয়াযী, সেই লিখিত প্রতিশ্রুতি মতো সরকার পদক্ষেপ ও কাজ এখনো শুরু না করায় আশ্রমের তরফ থেকে আন্দোলন জারি রাখা হয়। সেই আন্দোলনের অঙ্গ হিসেবেই সাধ্বী পদ্মাবতী, ব্রহ্মচারী আত্মবোধানন্দ ও সন্যাসী স্বামী শিবানন্দ সরস্বতী পালাক্রমে তাদের অনশন জারি রাখেন। বর্তমানে স্বামী শিবানন্দ ৩-৮-২০২০ তারিখ থেকে অনশন তপস্যায় ব্রতী রয়েছেন।