নওয়াবালি

নাহার তৃণা

এলোপাথাড়ি বৃষ্টির ফোঁটা নন্দীদের পুকুরের শান্ত জলকে উস্কোখুস্কো করে দিচ্ছিলো। চাতালে দাঁড়ানো নওয়াবালি নন্দীদের টিন-বেড়ার পাঁচিল পেরিয়ে পুকুর, পুকুরটাকে চুমু খাওয়ার ভঙ্গিতে নুয়ে থাকা নিমগাছটা দিব্যি দেখতে পায়। এ পাড়াটাও আগে হিন্দু পাড়া হিসেবে পরিচিত ছিল। এখন হাতে গোনা কয়েক ঘর হিন্দুর বাস। কৈশোরে নওয়াবালির নিজের চোখে দেখা এ পাড়ার জৌলুশ। সব এখন কেমন শুনশান। এখন ওর দোকান যাওয়ার সময়। উটকো বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচতে টিনশেডের নীচে দাঁড়িয়েছে। পুকুরের জলে বৃষ্টির খুনসুটি দেখতে দেখতে নওয়াবালির মাথায় টুক করে দুটো লাইন ফাৎনার মতো নড়চড়ে ওঠে। আঃ! বিরক্তসূচক একটা শব্দ করে পুকুর থেকে দৃষ্টি তুলে পথের দিকে তাকায় নওয়াবালি। বিরক্তিটা কবিতায় বার বার 'জল' শব্দটা এসে পড়ছে সে জন্য, নাকি একগুঁয়ে বৃষ্টির থামার লক্ষণ না দেখে, সেটা নওয়াবালির কাছেও স্পষ্ট নয়। যদিও নওয়াবালির বিশ্বাস শব্দের ধর্ম হয় না। জাতপাতও না। পানি কিংবা জল যে নামেই ডাকা হোক, সবার জন্যই তার কাজের ধারা সমান। কিন্তু তার যে দু'চারজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু আছে, তাদের সেকথা কিছুতেই বোঝানো যায়নি।

বাজারে তার বিস্তর বদনাম, সে হিন্দুঘেঁষা। কাজও করে হিন্দু মালিকের শাড়ির দোকান 'শ্রীময়ী দেশী শাড়ি হাউজে’। তার আশেপাশের লোকজনদের ভাবখানা এমন যেন সে সাধা ভাত পায়ে ঠেলেছে। এইচ.এস. সি ফেল নওয়াবালি একটা কাজের সন্ধানে হন্য হয়ে কম ঘোরাঘুরি তো করেনি। কেউ তাকে একটা কাজ দেবার সহৃদয়তা দেখায়নি। বাধ্য হয়ে সে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল এই জেলাশহর ছেড়ে কাজের খোঁজে রাজধানী শহরে যাবে। তখন নিতাই কাকা ডেকে তাকে দোকানটায় বসিয়েছিল। নিজের শহরের ছাওয়ালটাকে বড়ো শহরের ভিড়বাট্টায় কাজের খোঁজে হারিয়ে ফেলার আশঙ্কা বেজেছিল নিতাই কাকার দরদী বুকে। আশেপাশের কত তুতো চাচা মামাই তো তার দুর্দশার সাক্ষী ছিল। কই তারা তো কেউ থোড়াই কেয়ার করেনি। হাফিজ চাচার চালের আড়তে হিসাব লেখার কাজটা দেবার জন্য কম অনুনয় করেনি নওয়াবালি। ওর স্বভাবে নাই তাই গলা তুলে কারো সাথে এসব নিয়ে হুজ্জুতে যায় না। পরিবারহীন একাকী জীবনে নিজের মতো থাকে, কাজ করে। আর ক্রেতার আনাগোনা কম থাকার অবসরে টুক করে গদির নীচে রাখা খাতাটা খুলে কবিতা লেখার চেষ্টা চালায়। রতন তার কবিতার খুব ভক্ত। গল্পগুজবের ফাঁকে প্রায় সে জানতে চায় নবাব ভাই নতুন কবিতা লেখলা কিছু? রতনের আন্তরিক উৎসাহটা ভারী ভালো লাগে নওয়াবালির।

কিছুক্ষণ আগে মাথায় ভেসে ওঠা লাইনদুটো লিখে ফেলতে পারলে ভালো হতো। কিন্তু সাথে কাগজ কলম তো নাই। দোকান পর্যন্ত যেতে যেতে, আরো অনেক হারিয়ে যাওয়া লাইনের মতো হারিয়ে না যায় সে ভাবনায় নওয়াবালি মনে মনে আউড়ে নেয় লাইন দুটো। বৃষ্টি একটু ধরে আসতেই নওয়াবালি হন্তদন্ত হয়ে বাসস্টপের দিকে ছুটে। রতন আজ আসবে না। ওর মায়ের শরীরটা ভালো নাই, ছুটি নিয়ে গ্রামের বাড়ি গেছে দেখতে। আজ তাকেই নিতাই কাকার বাড়ি থেকে দোকানের চাবি আর জগাইকে নিয়ে আসতে হবে। এরপর দোকান খোলা, ঝাড়পোছ, ধুপ জ্বালানোর পর ভেতরের গোডাউন থেকে লালসালুতে বাঁধা মূল্যবান শাড়ি কাপড়ের গাট্টি বের করে রঙ ধরে ধরে নিদির্ষ্ট তাকে শাড়িগুলো দ্রুতহাতে গোছানো। সব শেষে দোকানে ক্রেতা টানার মূল আকর্ষণ ম্যানিকুইনটাকে হাল ফ্যাশনের শাড়ি চুড়ি টিপে সাজিয়ে দোকানের বাইরে দাঁড় করানো। সব কাজ তার একাই সামাল দেয়া লাগবে আজ।

এতসবের মধ্যে ম্যানিকুইনটাকে সাজানোর কাজটা নওয়াবালির সবচে' পছন্দের। প্রতিদিন সে নিজ হাতে যত্ন করে সাজায় পুতুলটাকে। রতন এ নিয়ে ঠাট্টা করে প্রায়। বলে নবাব ভাই, এইটারে পুতলা কম তোমার বিবি বেশি মনে হয়। ধরা পড়ে যাওয়াটা লুকায় না নওয়াবালি। সত্যিই, প্লাস্টিকের এই নারী মূর্তিটাকে তার রক্ত মাংসের মানুষই মনে হয় যেন। তার গোপন মানসী। তার একটা নামও দিয়েছে নওয়াবালি। 'শ্রীময়ী' নামটা তার খুব ভালোলাগে। ম্যানিকুইনটাকে সে মনে মনে ওই নামেই ডাকে। বিড়ির টানার অবসরে ওর সামনে দাঁড়িয়ে মনে মনে কতশত কথা যে বলে নওয়াবালি তার ঠিক নাই। ওর খাতার অর্ধেক কবিতা শ্রীময়ীকে ভেবে লেখা।

কমলা আর কচি কলাপাতা রঙা পুরো জমিনময় জরির পেটানো বুননের নজরকাড়া শাড়িটা ম্যানিকুইনকে পরাতে পরাতে কবিতার লাইন দুটোর কথা মনে হয়। দশদিক সামাল দিতে গিয়ে টুকে রাখার কথা মাথাতেই ছিল না তার। সেসময়ের ভাবনাটা এখন ঠিকঠাক মনেও নাই। শাড়ির আঁচলটা বুকের কাছে নিয়ে এসে কায়দা মাফিক কুচি তোলার ফাঁকে লাইন দুটো হাতড়ায় মনে মনে। ম্যাচিং চুড়ি টিপ পরানোর পরও মনের কাছে ভিড়ে না ভেসে যাওয়া লাইন দুটো। 'জল' শব্দটাই বার বার তার মাথায় ঘুরতে থাকে।

একা সব কাজ গোছাতে গিয়ে কেমন হাঁপিয়ে ওঠে নওয়াবালি। এসব কাজে রতনটা করিৎকর্মা। জগাইয়ের থাকা না থাকা প্রায় সমান। জন্ম থেকেই এক হাত বিহীন জগাই সব কাজ গুছিয়ে করে উঠতে পারে না। তাছাড়া বুঝিয়ে বললেও জগাইর সব বুঝে নিতে সময় লাগে। দোকান পাহারার কাজ করে সে বসে বসে।

বছর দশেক আগে বাজিতপুর হাট থেকে শাড়ির লট নিয়ে ফেরার পথে জগাইয়ের দেখা পায় নিতাই কাকা। ক্ষিদের সাথে এঁটে উঠতে না পেরে হাটের কোনো দোকান থেকে পুরী খাওয়ার অপরাধে মারমুখী জনতার হাত থেকে নিতাই কাকা জগাইকে ছিনিয়ে আনে। জগাইর বয়স তখন চৌদ্দ কি পনেরো। রতন মজা করে বলে, শাড়ির সাথে ওরে ফিরি পাইছে কাকায়। এরকম কয়েকজন ‘ফিরি’ অনাথ, পরিবারহীন লোকের ঠাঁই নিতাই কাকার বাড়ি। তাদের কেউ কামলা খাটে, গরু বাছুর দেখাশোনা করে। ফসলের মাঠে নিড়ানি দেয়। রতন আর জগাই শ্রীময়ীতে কাজ করে। নিতাই কাকা ওদের থাকার ব্যবস্হা হিসেবে হেঁশেলের পেছনের খালি জমিতে টানা টিনশেডের একটা ছাপড়া তুলে দিয়েছে।

নিতাই কাকার এহেন দানছত্রের ঘোর বিরোধী সুবলদা। নওয়াবালিরা জানে নিতাই কাকার কিছু একটা হয়ে গেলে তাদের সবার কপাল পুড়বে।

বছরের এ সময়টা বিয়ের মৌসুম, সামনের মাসে বেশ কাছাকাছি সময়ে ঈদ আর পূজা। সব মিলিয়ে দোকানে এখন প্রচুর ক্রেতার সমাগম হয়। দুপুর গড়ানোর আগেই দুরদার আশাতীত শাড়ি নেমে যায়। দুপুরের দিকে খানিক ঝিমিয়ে বিকাল নাগাদ আবার রমরমিয়ে চলে শ্রীময়ী। এ অঞ্চলে শ্রীময়ী শাড়ি হাউজের একটা সুনাম আছে। ভালো জিনিস ভালো দামে কেনার জন্য অনেক দূর থেকেও ক্রেতারা আসে। মানুষজন আর আগের মতো ইন্ডিয়ান শাড়ির খোঁজ করে না। দেশীয় শাড়ির কাজ, কাপড়, রঙ কম কিসে ইন্ডিয়ান শাড়ির চেয়ে! নিতাই কাকা নিজে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে কাপড় যাচাই বাছাই করে আনেন। বিয়ে, পূজা,ঈদকে সামনে রেখে এবারও দোকানে নতুন ডিজাইন, রঙ বনুনের শাড়ি এসেছে।

কখনও কখনও বিকালের দিকে একবার এসে ঘুরে যায় নিতাই কাকা। তাঁর বড়ো ছেলে সুবলদাই দোকানের সবকিছু দেখা শোনা করেন। সুবলদার ব্যবহার মোটেও ভালো না। মাঝেমধ্যে ওদের সাথে এমন আচরণ করেন, নওয়াবালির তখন ইচ্ছা করে কাজের মুখে লাত্থি মেরে চলে যায়। কিন্তু যাবেই বা কোথায়। ভালো মানুষ নিতাই কাকার প্রতি কৃতজ্ঞতা আর শ্রীময়ীর মায়া যাওয়ার পথ আগলে রাখে।

ঘড়িতে দশটা বাজতে দশ মিনিট বাকি। ঠিক দশটায় সুবলদা দোকানে এসে উপস্হিত হবেন। দোকানে এসেই মালাই দেয়া এক কাপ গরম গরম চা আর মিষ্টি পান না হলে চলে না সুবলদার। নওয়াবালি খানিক চিন্তায় পড়ে যায়। রতনের হাত ছাড়া চা-পান ইত্যাদি খাওয়ার ব্যাপারে সুবলদার একধরনে আপত্তি আছে। নিতাই কাকা অত বাছবিচার মানেন না। তাঁর কথা হলো ছাওয়ালটা দোকানের খদ্দেরদের কাছে কত কথা খরচ করে শাড়ি কাপড় বিক্রি করে। তাতে যে রুজিরোজগার সেইটেও তো তালি খাবার কথা না। ওতেও তো ওর হাত আছে , তার বেলা! অতশত জানিনে বাপধন, মানুষই আমার কাছে সব..তার মনে কষ্ট দিয়ে, জাতপাত ধুয়া পানি খাবার পারবো নে। ওইরাম বাপের ছাওয়াল কেম্নে এত বেরহমদিল নওয়াবালির বুঝে আসে না। সুবলদার মেজাজের ঝড় আজ জগাই আর তার উপর দিয়ে যাবে সেটা বুঝতে পেরে আসন্ন মুসিবতের সম্ভাবনায় নওয়াবালির কপালে ভাঁজ পড়ে।

যতটা বর্ষাবে ভেবেছিল, সুবলদা ততটা গর্জনে যাননি আজ কেন জানি। তবে দোকানে পা দিয়েই এরকম সময় রতনটা কেন ছুটি নিতে গেল, আর বাবাই বা কেমন ছুটি দিয়ে দিলো ইত্যাদি নিয়ে একচোট বকাঝকা সেরে নিয়েছেন সুবলদা। সকাল থেকেই আজ দোকানে প্রচুর ক্রেতা সামাল দিতে হয়েছে। সুবলদাও হাসিমুখে ক্রেতা ভালোই সামলিয়েছেন। এমন কি জগাইটা পর্যন্ত আজ অনেক কথাই একবার বলাতেই বুঝে গেছে। বার কয়েক দৌড়ে গিয়ে ‘গনেশ এণ্ড সন্স’ রেস্তোরাঁ থেকে চা- মিষ্টি আনা নেওয়া করেছে। সকালের ধকলের পর দুপুর গড়ানোর সময়টায় দোকান ফাঁকা ছিল।

অমুক ভাই তমুক লও লও লও সালাম বলতে বলতে বড়োসড়ো একটা মিছিল দোকানটা পেরিয়ে গেল। এই হয়েছে এক মজা। বিভিন্ন নেতা, পাতি নেতা, তস্য নেতারা ছোট্ট এই শহরটাকে ধন্য করতে মাঝে মাঝেই শহর থেকে এসে পায়ের ধুলো দেন। সেরকম কোনো নেতার আগমন ঘটেছে হয়ত। এই অঞ্চলের দলীয় এবং বিরোধীপক্ষের মধ্যে সম্পর্ক দেশের আর দশটা এলাকার মতোই বিষময়। দুপক্ষের ভেতর নানা কারণে হাঙ্গামা লেগেই থাকে। দোকানে বসে বসে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কোন্দল-ক্যাচালের জের হিসেবে ধাওয়া পালটা ধাওয়া দেখতে মন্দ লাগে না। রতন তখন মজা করে হাতটাকে মাইকের মতো মুখের কাছে গোল করে মুড়ে নিয়ে হেঁড়ে গলায় চেঁচায়, 'নারদ! নারদ! হাত থাকতে মুখে কেন'। সত্যিই সত্যিই যখন মুখ ছেড়ে হাতের কাজ শুরু হয় তখন যথারীতি ভাঙচুরের মচ্ছব চলে। আর পাল্লা দিয়ে আশেপাশের দোকানে শাটার পড়তে থাকে দমাদম। নিতাই কাকার বলা আছে সেরকম কিছুর আভাস পাওয়া মাত্র দোকানের ঝাপ বন্ধ করে তালা ঝুলিয়ে তারা যেন নিরাপদে সরে যায়। আগে জান তারপর অন্য কিছু।

ক্লান্ত ভঙ্গিতে গদিতে বসে বসে মিছিলটার চলে যাওয়া দেখেন সুবল। প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন, ‘কিরে নবা আইজ আবার কিডা আসিলো ইধারে? উত্তরপাড়ার পৌরসভার মাঠে সন্ধ্যায় তো কীর্তনের আসর বসিবার কথা। তালি মিটিং কন্ডে হবেনে জানিস? বাজারের দিক কিসু তো চোখে পড়েনাই। পৌরসভার মাঠে হলি তো বেড়াছেড়া লাগিবার পারে, নাকি র‍্যা? তুই এক কাজ কর..জলদি জলদি পা চালায়ে জেনে আয় দেকিনি’। এদিকটায় মিটিং ফিটিং হলে রাস্তায় রিকশা, বাস-গাড়ি ইত্যাদির বিদঘুটে জট পাকিয়ে যায়। তেমনটা হলে অনেক ক্রেতাই এমুখো হতে ভয় পান। ঘণ্টা দুয়েক আটকে থাকার ধাক্কা। সেরকম হলে এখন দোকান বন্ধ করে বাড়ি ফিরে যাবেন। ভাবতে ভাবতে, বসবার ভঙ্গি বদল করে আধশোয়া হয়ে গদির আশেপাশে ছড়িয়ে থাকা একটা বালিশ টেনে নিয়ে মাথা রাখেন সুবলকান্তি। ওদের বসবার জায়গাটা বেশ পুরু গদিতেই শুধু মোড়া নয়, আশেপাশে প্রচুর বালিশের ব্যবস্হা আছে। ফাঁকা দোকানে সুযোগ পেলে রতন নওয়াবালিও মাঝে মধ্যে বালিশ জড়িয়ে খানিক গড়িয়ে নিতে কসুর করে না। জগাইকে ডেকেও আনা যায় না গদিতে। মাটিতে আসন পিঁড়ি হয়ে পাঁচগুটি খেলে আর নিজের মনে ফিক ফিক করে হাসে।

সুবলদার কথা মতো প্রায় সাথে সাথেই দোকান থেকে বেরিয়ে বড়ো রাস্তার মোড়ে গিয়ে দাঁড়ায় নওয়াবালি। মিছিলটাকে বড়ো রাস্তা পেরিয়ে উত্তর পাড়ার দিকে যেতে দেখা যায়। পুবপাড়া থেকে আরো একটা মিছিল এগিয়ে আসতে দেখে নওয়াবালি। এ মিছিলটা আগেরটা চেয়ে অত বড়োসড়ো নয়। ব্যানারে লেখা রয়েছে ‘শ্রীশ্রী কৃষ্ণাষ্টামী উৎসব। তিনদিনব্যাপী উৎসব, পৌরসভার মাঠে। আজ উৎসবের প্রথমদিন। সন্ধ্যায় কীর্তনের আসর’। কিন্তু একটু আগেই যে ওদিকে অমুক ভাই তমুক ভাই বলতে বলতে মিছিলটা গেল। ব্যাপার সুবিধার ঠেকলো না তার কাছে। বড়ো শহর থেকে নেতার আসাটা কি নিতান্তই কাকতলীয় কিছু নাকি তার পেছনে কোনো কারণ আছে! প্রায় প্রতি বছর পূজা আচ্চা ঘিরে হয় এপাড়া নয় ওপাড়ায় একটা না একটা কোন্দল লাগতে দেখে। কই তাদের ঈদে তো হিন্দুরা ক্যাচালের ছুতো খুঁজে না! অথচ কোনো একটা গণ্ডগোল ফেনিয়ে উঠলে উদোর পিণ্ডি বুদোর ঘাড়ে চাপানোর চলে অসুস্হ কূটকাচালি। বিশেষ করে মফস্বলের ছোটো শহরগুলোতে। এসব নিয়ে নওয়াবালির ক্ষোভের অন্ত নাই। ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের সাথে প্রায় এই বিষয়ে তার লেগে যায়। কেন রে, দেশটা কি তর আমার একার নাকি! এটা আর দশজন মুসলমানের যিরম হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টানদেরও সিরম। ভাবখানা ইমন য্যান কেউ ওয়াগের দয়া করি এদেশে থাকতি দেছে। মুক্তিযুদ্ধে বাপ চাচা হারানো নিতাই কাকা প্রায় বলেন, ‘অনেক দামে পাওয়া দেশ। ইয়াতে তর আমার সগলির সমান অধিকার রে নবা। বরং ওয়াগের চাইতে হামাকেরে দাবীটোই বেশি’। ওরকম দরদী মানুষটাকেও মাঝে মধ্যে হুমকির মুখে পড়তে হয়। চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম সামলানো লাগে। অথচ সাধারণ মানুষের জন্য তাঁর মন জুড়ে দরদ । ওদের সুখে দুঃখে দু’হাতে করেন; শুধু ধর্মের কারণে তাঁর সেসবের কোনো মূল্য থাকবে না! এসবই আসলে রাজনীতি। ধর্মের জিকির তুলে এক পক্ষকে অন্য পক্ষের বিরুদ্ধে লাগিয়ে দিয়ে নেতারা ফায়দা লুটছে। মুক্তিযুদ্ধে প্রাণ বির্সজন দেয়া চৌকিদার গরীবুল্লাহর নামও তাই কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না। নামটা কেবল সন্তান হিসেবে নওয়াবালির বুকেই লেখা থাকবে। সাতপাঁচ ভাবনার তাল কাটে ওর পাশ কাটিয়ে যাওয়া মানুষগুলোর হরে কৃষ্ণ হ রে হরে’র মৃদু স্তবে।

নওয়াবালি দ্রুত পায়ে দোকানে ফিরে এসে ঘটনা বিস্তারিত জানায় সুবলদাকে। গা ঝাড়া দিয়ে আধশোয়া থেকে উঠে বসেন সুবল। দোকান বন্দ করি তালি বাড়ি যাই ল। হুদাই হাঙ্গামা আর ভালো লাগে না নবা।
দোকান বন্ধ হবে কি হবে না ভাবনাটা একদল ক্রেতার আগমনে চাপা পড়ে যায়। নওয়াবালি ক্রেতাদের সামনে হাসিমুখে চাহিদা মতো শাড়ি খুলে খুলে দেখাতে থাকে। খুব গুছিয়ে কথা বলে নওয়াবালি। ওর সুন্দর কথায় ভোলেন অনেক ক্রেতাই। পরপর আরো কিছু ক্রেতা এসে পড়ায় দোকান সহসাই বন্ধ করা সম্ভব না বুঝে যান সুবলকান্তি। তার খুব ক্লান্ত লাগছে, সকাল থেকে এক নাগারে দোকানে বসেছেন আজ।
আড়মোড়া ভেঙে গলা তুলে নওয়াবালিকে জিজ্ঞেস করেন, নবা একা সামাল দিতে পারবি রে দোকান?
আমি তালি বাড়ি যাবো গা। আজ সুবলদার নরম সরম ব্যবহারে নওয়াবালি খুব কৃতজ্ঞবোধ করে। সেই কৃতজ্ঞতা থেকেই হয়ত ঘাড় নেড়ে জানায় সে পারবে। তবে তিনি যেন জগাইকেও সঙ্গে নিয়ে যান। ও বেচারাই বা থেকে কী করবে। সুবলকান্তি জগাইকে সঙ্গে নিয়ে বাড়ি চলে যান।

আজ সকাল থেকে ক্রেতার ঢল নেমেছে শ্রীময়ীতে। দু’হাতে শাড়ি দিয়েও কুলিয়ে উঠতে পারছে না যেন। রতনটা থাকলে এত চাপে পড়তো না। বেচারীর মা অসুস্হ। মা ছাড়া ছেলেটার আর কেউ তো নাই সংসারে...। ‘ওই শাড়িটা দেখান’, রতনের চিন্তা সরিয়ে ক্রেতার পছন্দ সই শাড়ি খুলে দেখানোয় মনোযোগ দেয় নওয়াবালি।

প্রচুর বেচাকেনা হয়েছে আজ। সুবলদা যাওয়ার সময় দিনের বেচাবিক্রির ক্যাশ নিয়ে গেছেন। বিকালের পর থেকে এখন পর্যন্ত কম বিক্রি হয়নি। নওয়াবালি দ্রুত টাকাগুলো গুছিয়ে কাপড়ের থলিতে ভরে রাখে। ঘড়িতে এখন পৌনে সাতটা মতো বাজে। আশ্চর্যজনক ভাবে আজকে মিটিং কীর্তনের আসর সত্ত্বেও আশাতীত ক্রেতা এসেছিল। এমনটা সচরাচর হয়না। মিটিং ফিটিং মানেই ঘণ্টা খানেক ঝিমিয়ে দোকান বন্ধ করে বাড়ি ফেরা। নিতাই কাকা ভারী খুশি হবেন। ওঁর খুশি মুখটা নওয়াবালিকে অপার্থিব এক শান্তি যোগায়।

হঠাৎই দোকানের সামনে দিয়ে কিছু লোককে দুড়দ্দাড় ছুটে যেতে দেখে নওয়াবালি। বাইরে বেরিয়ে ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করে। পটাপট আশপাশের কিছু দোকানের ঝাপ নেমে যায়। নওয়াবালি দ্রুত দোকানে ঢুকে হাত চালিয়ে দামী শাড়িগুলো লালসালুর বস্তায় বেঁধে গোডাউনে টেনে নিয়ে রেখে আসে। ম্যানিকুইনটাকে সযত্নে কোলে তুলে ভেতরে রাখতে রাখতে একবার মুখটা দেখে নেয় শ্রীময়ীর। আজ সারাদিনে ওর সাথে কোনো কথাই হলো না। রাগ করো না গো বলে নাকটা টিপে আলগোছে নামিয়ে রাখে দোকানের ভেতর। টাকার থলিটা বাজারের ব্যাগে ভরে শাটার টেনে তালা ঝুলিয়ে পথে নামে নওয়াবালি।

সারাদিনের গুমোট গরমের পর এখন বেশ ফুরফুরে বাতাস। কিন্তু সে বাতাসে ভেসে আসে দুর্যোগের গন্ধ। কিছু লোক ছুটতে ছুটতে তার পাশ কাটিয়ে চলে যায়। গণ্ডগোলটা উত্তর পাড়াতেই লেগেছে এবং সেটা রাজনৈতিক দলের সভা আর জন্মাষ্টমীর কীর্তনের আসরকে ঘিরে সে বুঝতে আর বাকি থাকে না। হরিণপায়ে চলতে চলতে পথচারীদের আলাপ শোনে নওয়াবালি। ‘লাগিছে লাগিছে নামাজের ওয়াক্তে কীর্তন গাবার জন্ন কুন্দল লাগিছে। আরে বাবা এতই যখন গায়কির শখ তালি এট্টু সবুর করিলে কি ইমন আইসতো যাইতো। খুনখারাপির যোগ আছে কয়ে দিলাম….’ পেছনে একদল লোকের সম্মিলিত হৈহৈয়ে মৌমাছির চাকে যেন ঢিল পড়ে। মানুষগুলো ছত্রভঙ্গ হয়ে কে যে কোন দিকে ছুটতে শুরু করে সে হুশজ্ঞান থাকে না।

বাজারের ব্যাগটা বুকের কাছে আঁকড়ে ধরে নওয়াবালিও প্রাণপণ ছুটতে থাকে। ছুটতে ছুটতে হঠাৎই নওয়াবালির মাথায় সকালের হারিয়ে যাওয়া কবিতার লাইন দুটো ভুশ করে ভেসে ওঠে।