রাংলাই ম্রো

কামরুল ইসলাম

রাংলাই ম্রো , আপনাকে দেখে আমার মনে হয়েছে আপনি নিস্পাপ। আমি কখনো বান্দরবনের ম্রো-দের গ্রামে যাইনি, চিম্বুকের কোলে এম্পুপাড়ার সেই মানুষগুলোর ক্রমশ ছোট হয়ে আসা জীবনের দিকে আমার তাকানো হয়নি কখনো , যেখানে আকাশ ও প্রকৃতি ডানা মেলে ওড়ে আর ওড়াতে চায় ম্রো শিশুদের। পাহাড়ের ভয়াল উঁচুতেও দখলের দেবতারা উনুনে সেঁকে নেয় জন্মান্তর কিংবা উন্মার্গের লালিত সুখ, ঐ উচুঁতেও হায়ানাদের কালো হাত অসম্ভব উৎপাত; রাংলাই, আপনার অপরাধ আপনি আদিবাসী ( আমাদের সংবিধান মতে উপজাতি ), আপনার অপরাধ আপনি প্রকৃতির বিশাল পালে বাতাস লাগিয়ে বাঁচতে চান বাঁচাতে চান পরিবেশ, আপনি নীল আসমানে দাঁড়িয়ে অসম্ভব চিৎকারে বলতে চান-- কারারুদ্ধ প্রজাপতির ডানায় দ্যাখো জমে আছে অসম্ভব রোদের চিৎকার, এসো হে, কিছুটা সময় হয়ে উঠি প্রজাপতিময়!
রাংলাই, দৈনিকের পাতায় প্রথম আপনার ছবিটি দেখেছিলাম, আপনার ভয়ানক অসুখ ,শ্বাসকষ্ট, এবং মৃত্যুরা আপনার চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে উলঙ্গ পোশাকে-- আপনার পায়ের ডাণ্ডাবেড়ি, হাতের হ্যান্ডকাপ তখনো আছে এবং আমরা জেনেছি একটি খেলনা পিস্তল আর অচল রিভলভারের সাজানো মামলায় মহামান্য অদালত আপনাকে ১৭ বছরের কারাদন্ড হেঁকেছে; তখন আমার মনে হয়েছে সম্প্রতি ঘটে-যাওয়া নাটকের অনেক দৃশ্য ; আপনার হাতদুটো ওরা ভেঙে দিতে চায়, কারণ, ঐ ভুমিদশ্যুরা চিরকাল প্রকৃতির শত্রু ; রাংলাই, যে দুরন্ত পাল রাত্রিকে বয়ে নিয়ে যায়, সেইদিকে আপনার পরিবেশবাদী চোখ ঝলসে উঠে, ছিঁড়ে ফেলে দিন ও রাত্রির ভেদাভেদ ; ওরা জানে না অরণ্যের অধিকার আপনাদের জন্মগত; ওরা আপনাদের জন্মবৃক্ষের শেকড় কেটে সেখানে ঢেলে দিতে চায় সভ্যতার অনন্ত তিমির-- এ এক অসভ্য দর্শন; আপনি বেঁচে থাকলে কোথায় হবে ইকোপার্ক , জমবে না দখলদারী-ব্যবসা , এই মহাসভ্যতার পৃথুল পাচায় লাথি মেরে, ঘাড় সোজা করে দাঁড়াতে হবে রাংলাই! জুমক্ষেতের ঘোর সন্ধ্যার কবিতা হয়ে আপনি গীত হবেন ঝোপ-জঙ্গলের সুরে।
আমরা ভুলিনি আলফ্রেড সরেন কিংবা চলেশ রিচিলের কথা, অস্পষ্ট সুতোয় বাঁধা আপনাদের জীবন একদিন ছুঁয়ে দেবে আকাশের নিবিড় পত্রালি-- রাংলাই, আপনার খবরটি পড়ার পর আমি যখন আমার সাত বছরের সন্তানের দিকে তাকালাম, তখন কোনো নির্জন পাহাড়ের কোলে চাঁদ উঠছে, তখন অধরা শিশিরে ধুয়ে যাচ্ছে পৃথিবীর আহ্নিক গতি, ক্ষুধার্ত জুমিয়ারা নিদ্রার ভাঙা চাঁদ বেয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছে উর্বশী মেঘ, সেই বিনম্র সময়ে আমার মনে হয়েছিল ,আপনার নি:সঙ্গ সন্তানদের কথা; রাংলাই, আপনাদের সুন্দর গ্রামটি আমি দেখতে পাচ্ছি, আমি দেখতে পাচ্ছি আপনার স্ত্রীর উদ্বিগ্ন মুখ, যার গীতল বুক থেকে খসে গেছে অনেক সবুজ, রাতের মোহনায় দাঁড়িয়ে যে নিরিবিলি দেখতে থাকে মানুষের বিপন্ন অসুখ; আমি দেখতে পাচ্ছি কোনো ম্রো তরুণীর প্রার্থনার দৃশ্য, বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা আপনার নামে পুঁজো দিচ্ছে আর কোনো জুমক্ষেতের আড়ালে বসে কোনো দম্পতি আপনাকে নিয়ে বলে যাচ্ছে বিরামহীন গল্প; আপনি তো মহামানব রাংলাই, আপনাকে যারা ধরে এনে নির্যাতন করেছে, তাদের বামন জানালায় কোনো পাখিভোর নেই, তাদের চোখে নেই ঘাসের নৃত্য কিংবা কোনো ডানাময় বসন্তের চিহ্ন-- প্রকৃতি, পাহাড় ও অরণ্যের শক্ররা দেশপ্রেমিক আর সন্ত্রাসীর পার্থক্য বোঝে না, কারণ, তারা অলৌকিক প্রদীপের নিচে সালঙ্কারা বিগ্রহের মুখ দেখে কাটিয়ে দেয় রাত ও দিনের সবগুলো প্রহর; রাংলাই, এই বাংলার বন্য শূয়োরদের খোয়াড়গুলো ওড়াতে হবে আকাশে, ভাসাতে হবে পূর্ণ যৌবন বিপন্ন পৃথিবীর দিকে, আপনার তর্জনীর শক্তিটুকু প্রকৃতির পুণ্যালোকে জেগে উঠুক--
পাহাড় আপনাকে চায়, আপনাকে চায় জুমক্ষেত, আপনার দিকে চেয়ে আছে অরণ্য ও সমুদ্র, আপনাকে চায় আদিবাসী নিরীহ মানুষ, অজস্র বৃক্ষ-গুল্ম নিরস্ত্র সরীসৃপ আপনাকে চায়-- রাংলাই, প্রকৃতির জরায়ু চুঁইয়ে পাহাড়ি ঢলের মতো উদ্দাম গতিতে নেমে এসে আপনি প্রথম দেখেছেন আকাশের নির্মল মুখ , আপনার মৃত্যু নেই, পাহাড়ের মতো শক্ত আপনার বুক, ভেষজ-মন্ত্র আপনার দুচোখে, কোনো ইতিহাস আপনাকে ধারণ করার ক্ষমতা রাখে না, কারণ, সমুদ্র ও পাহাড়ের যৌথ আত্মায় আপনার নাম লেখা হয়ে গেছে, আপনি বেঁচে থাকবেন গাছপালার উদার সংগীতে, কোনো প্রাচীন দেবতার দৃষ্টির ঘ্রাণে; রাংলাই, বেঁচে থাকার আনন্দটুকু সাথে নিয়ে বাঁচাতে হবে পাহাড় ও অরণ্য; দেখুন, পাহাড়ের ওপারে চাঁদ উঠছে, পাহাড়ের মাথায় এখন ম্রো বালকেরা হারানোর খেলায় মেতে উঠবে, বালিকারা অন্ধকার বেয়ে নেমে যাচ্ছে জঙ্গলের গোপন পথে--
গুপ্ত জ্ঞানের সমস্ত আতিপাতি দৃষ্টিতে গেঁথে জাগাতে হবে স্বপ্নের অদূরে দাঁড়ানো অরণ্যের সন্তানদের, যাদের মুখে আকাশ নেমে এসে চুমু দিয়ে যায়, সমুদ্র শোনায় গান আর লাতাপাতার ইশারায় যারা ভেসে বেড়ায় জীবনের শূন্যে; রাংলাই, দিন বদলের সময় আসছে ডানা মেলে ,আলো আসছে প্রচলিত ঘুম ছিঁড়ে , আমরা একদিন আপনার সুন্দর গ্রামটিতে উৎসবে যাবো, আমরা দেখবো চাঁদের আলোয় ম্রো তরুণীদের নাচ, নেচে নেচে ওরা ক্লান্ত শরীরে ঘুমিয়ে পড়বে পাহাড়ের ঘাসে আর কোত্থেকে ছুটে আসবে মৃদুমন্দ হাওয়া, সে হাওয়ায় বেজে উঠবে নির্ভার জীবনের গান ‘ আমরা বেঁচে আছি, জেগে আছি হে-- আমরা রয়ে যাবো, বয়ে যাবো নি:শঙ্ক চিত্তে ভূমির অধিকার কেড়ে নেবে কে -- আমরা জেগে আছি হে ’ রাংলাই, এই বাংলায় সাঁওতাল, গারো ,মগ, মং, বম, খাসিয়া, রাখাইন, ম্রো, হাজং, মুরং, কোচ ,টিপ্রা, কুকি, ওরাঁও, মারমা আরো সবাই আমরা একসাথে পাতার ক্যাম্বিসে ঘুমিয়ে থাকা বাতাসের মতো নন্দন স্বভাবে গেয়ে যাবো একদিন-- ‘ আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি ’--