উমনো ঝুমনোর গল্প

তন্বী হালদার

চারদিকে নির্জন মাঠ। ধান উঠে যাওয়ার পর মাঠগুলোকে দেখলে যেন বুকের ভেতরটা হাহাকার করে ওঠে। মাঠগুলোর ভেতর দিয়ে বিধবা স্ত্রীলোকের ধূধূ সিঁথির মতো চলে গেছে মেঠো পথ। অনেক দূর থেকে হাওয়ায় ভেসে আসে কোনও রেলগাড়ির আর্তনাদ। আধফোঁটা চাঁদের ঘোমটার আড়াল থেকে ছড়িয়ে পড়েছে কিছু সাদা আলো। এই মৃদু আলোর রেখা আরও কঠিন ভয়ঙ্কর করে তোলে অন্ধকারের নির্মম উদাসীনতাকে। এই পৃথিবীকে একসময় অনেক ভালোবেসে পৃথিবীর ওপারে হারিয়ে গেছে যারা, বাতাসের শব্দ যেন তাদেরই দীর্ঘশ্বাস। বেঁচে থাকার আকুল লড়াই ওদের দুই বোনের ভিতর। টিকে থাকার সমস্তরকম লড়াইয়ে ডারউইনের তত্ত্বকেও হার মানিয়ে দেয় উমনো, ঝুমনো। ওরা লাশ বয়। লাশবাহক। পচাগলা বস্তাভরা লাশগুলোকে ওরা বয়ে নিয়ে যায় ভ্যান রিক্সা করে।
- এই দিদি এট্টুস জেরাই নিতি পারলি হত না?
- তুই টচ মার ঝুমনো, আমি টানতেছি।
- তুইও তো টানলি এত সময়, এট্টুস ব না। খাড়া করা ঐ ঐ যে ডোবাটার পাশে আমগাছডার তলে। তবে শালা যা গন্ধ তার ঠেলায় বসা যাবি নি।
- হ্যাঁ। বাতাস দেলে পড়ে পেটের নাড়িভুঁড়ি উল্টে বেরিয়ে আসতে চাইছে।

অষ্টাদশী উমনোর বুক খালি করে একটা দীঘর্শ্বাস বেড়িয়ে আসে। রাতজাগা কোটরে বসা চোখদুটোয় মায়াবী হাসে – আমাদের আবার খেরাপ ঘেরান! পচা লাশ বইতে বইতে গোটা গাঁয়ের লোকের কাছেই আমরা পচে গেছি রে। সমস্ত শরীল জুড়েই আমাদের পচা লাশের ঘেরান। সক্কলে আমাদের খারাপ চোখে দেখে। ঘেন্না করে।
ঝুমনো ঝাঁঝিয়ে ওঠে উমনোর উপর। দুই চোখে তার আগুনের ফিনকি ছোটে। বিদ্রূপের হাসিতে চাপুরচুপুর হয়ে একদলা থুতু ফেলে থুঃ করে – থুঃ মারি তোর গাঁয়ের লোকের মুখি। তোর খালি এক কথা। আরে আঙগো যখুন দিনির পর দিন উপোস যায় তখন ওঙগো কি একদিনও খোঁজ নিতি আসে? খালি ফোঁপর দালালি সব।

ভ্যানটা আমগাছতলায় দাঁড় করিয়ে প্যাডেল থেকে নামে রুমনো। লাশ ভরা বস্তাটার দিকে তাকায়। এই লাশটা আজ তাদের চারশো টাকা আয়ের ব্যবস্থা করে দিয়েছে। ভাইবোন, পঙ্গু বাবা, মা সব চড়ুই পাখির মতো হা মুখ নিয়ে বসে আছে। হাঁড়িতে ভাতের গন্ধ বগবগিয়ে ফুটবে। সবার মুখে হাসি ফুটবে। কদিন নিশ্চিন্তি। ফের লাশের খবরের অপেক্ষা।
আমগাছটার তলায় ঠেস দিয়ে পা ছড়িয়ে বসে ঝুমনো। বাড়ি থেকে পলিপ্যাকে বয়ে নিয়ে আসা তালপাটালি দিয়ে মুড়ি খেতে থাকে। বলে – আয় দিদি, চারডি গালে দে, সেই কোন সক্কালে দুটো পান্তা খেয়ে বেরিয়েছি।
উমনো তবু চুপ করে দূর আকাশের একটা জ্বলজ্বলে নক্ষত্রের দিকে চেয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। মনে মনে ভাবে মানুষ মরে গেলে নাকি তারা হয়ে যায়। আচ্ছা অপঘাতে মরলেও কি তারা হয়ে যায়? তাহলে এই লোকটা কি ঐ তারাটা! অকারণেই চোখে জল আসে উমনোর। ডানহাতের চেটোর উল্টো পিঠ দিয়ে চোখের জলটা মুছে নেয়। ভ্যানের হ্যান্ডেলের থলিতে ঝোলানো জলের বোতলটা নিয়ে এসে বোনের পাশে বসে। চারটি মুড়ি গালে দিয়ে চিবোতে চিবোতে বলে – হ্যাঁরে বোন, সত্যিই গাঁয়ের লোকের চোখে আমরা খুব খারাপ .........।
উমনোর কথা শেষ হওয়ার আগেই ঝাঁঝিয়ে ওঠে ঝুমনো – ধ্যাৎতেরি তোর খালি এক কথা। গাঁয়ের কুনো ভদ্দরলোক আমাদের খেতে দেয় শুনি? যা না যা, কুন মরদের বাচ্চা তোরে বে করে বাচ্চার মা বানিয়ে ঘর বাঁধবে দেখি? তুই মা হবি ঠিকই। কিন্তু সেটা বেজম্মা বাচ্চা। পরিচয় থাকবে না কুনো।
- আঃ ঝুমনো চুপ কর। এসপ শুনতি আমার একদম ভালো লাগে না। ঝুমনোকে থামিয়ে দেয় উমনো।
মুড়ির প্যাকেটটা মাটিতে নামিয়ে রেখে গজগজ করতে থাকে ঝুমনো – হ্যাঁ তোর খালি খালি স্বপন দেখা। জেগি জেগি দেখ, ঘুমায়ে ঘুমায়ে দেখ। জীবনভোর দেখ। তুই আমি বাদ দে আরও পাঁচখানা ভাইবোন। নে সংসারের জোয়াল টেনি চল। হেঁইয়ো হেঁইয়ো। লাশ বয়ে চল। কোনদিন তোরে কেউ বে করতি আসপেনি। যদি কুনোদিন কুনো ব্যাটাছেলের লাশ সিধা খাড়ায়ে দাঁড়ায় তবেই সেইদিন তোর বে হবে।
- ঝু – ম – নো। চীৎকারটা একটু বেশী জোরেই করে ওঠে উমনো।

নিশুতি রাতের নিস্তব্ধতাকে খানখান করে ভেঙে ভেসে চলে ডাকটা। মনে হয় যেন কোনও মহাজাগতিক তরঙ্গকে বয়ে নিয়ে চলেছে এই ডাক। দূর থেকে অনেক অনেক দূরে। মাথার উপর নাম না জানা কোনও রাতচরা পাখি ডানা ঝাপটিয়ে চলে যায়। নৈঋত কোণ থেকে শিস দেওয়ার মতো একটা আওয়াজ ভেসে আসে। নিশুতি রাতের নিশাচর প্রাণীদের সাথে এক হয়ে গেছে ওরা দুই বোন। অদ্ভুত এক একাত্মতা গ্রাস করেছে ওদের দুজনকে।
উমনো ঝুমনোর পাশে ঘন হয়ে বসে। বলে – ঝুমনো তুই ইতু পুজোর গল্প জানিস? সেখানেও দুই বোন আছে। তাদের নামও উমনো-ঝুমনো। তারা তাদের বাবার জন্য বানানো পিঠে থেকে দুটো খেয়েছিল বলে তাদের বাবা তাদের জঙ্গলে রেখে আসে। সেখানে অনেক দুঃখকষ্ট সয়ে ইতুপুজোর বিধান পায়। ইতুমায়ের পুজো করে তাদের বাপ-মায়ের সাথে মিল হয়। কুঁড়েঘর প্রাসাদ হয়, গোলাভরা ধান হয়, হাতিশালে হাতি হয়, ঘোড়াশালে ঘোড়া হয়। রুপোর থালে মাগুর মাছের ঝোল দে দাদখানি চালের ভাত খায়। তারপর তাদের যখন বে’র বয়স হয় রাজপুত্তুর আর মন্ত্রীপুত্তের সাথে বে হয়ি যায়। আমরাও এ বছর অঘ্রাণ মাসে প্রতি রবিবার ইতুপুজো করবানে।
ঝুমনো মায়াভরা চোখে উমনোর দিকে তাকায় – তুই খুব ভালো রে দিদি।
তারপর বুক উজাড় করে একটা দীঘর্শ্বাস ছেড়ে বলে – চ ওঠ এবার।

ফি ঋতুতে প্রকৃতি রাতের কতরকম রূপ পাল্টায় তা ওরা আজ জানে। ওরা দেখেছে নিকষ কালো অন্ধকার আবার ফুটফুটে জ্যোৎস্না। রাস্তার প্রতি বাঁকে অপেক্ষা করে কত নাম না জানা বিপদ। তবু পেটের দায়ে ওদের যেতে হয়। পৌঁছে দিতে হয় অপঘাতে মরা অচেনা অজানা মৃত দেহটাকে লাশকাটা ঘরে।
ঝুমনোর চোখদুটো জ্বালা করে ওঠে। কান্নার দলাটা গলার কাছে শক্ত মতো ডেলা পাকায়। মনে মনে ভাবে – দিদিটা সত্যি সত্যি বড় বোকা।
উমনো একটা লম্বা শ্বাস ফেলে বলে – তাড়াতাড়ি না পৌঁছোতি পারলি পাটি আবার ঝামেলা করবানে। তাছাড়া ফিরতি ফিরতি কাল দুপুর গড়ায়ে যাবে নে।
ঝুমনো কোমল স্বরে বলে – আমার পরে রাগ করলি দিদি?
হাসে উমনো – নারে। আসলে কি জানিস সবার ভাগ্য সোমান হয় না। ভগমান যারে যা দেয় খুশি মনে তা মেনে নিতি হয়।
ঝুমনো আবার একটা কি যেন বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু একটা দমকা বাতাসে লাশটার উৎকট পচা গন্ধ সারা শরীরে মেখে যায়। তিনদিনের জলে ডোবা বাসি লাশ। ফুলে ফেঁপে প্রায় দেড় মণ হয়ে গেছে। তিনটে বস্তায় মোড়ানো। উমনো উঠে দাঁড়িয়ে ভ্যানের সিটে বসে। বলে – তুই টচ মার ঝুমনো।

চাকায় পা দিয়ে প্যাডেল ঘোরাতে বেশ কষ্ট হয় উমনোর। আসার সময় আমানি হয়ে যাওয়া কতকটা পান্তা, নুন আর কাঁচা লঙ্কা ছাড়া পেটে কিছু পড়ে নি। ভাইবোনগুলোর অবশ্য তাও জোটে নি। কি প্রচণ্ড অভাব। সারাক্ষণ রাক্ষুসের মতো হা করে আছে। দাদাটা মাল বইতে গেছিল পাথরপ্রতিমা ঘাটে। বস্তা মাথায় পড়ে সেই যে হাসপাতাল গেল আর ফিরল না। জোয়ান ছেলের অকালমৃত্যুতে সত্তর বছরের বুড়ো বাপটা যেন আরও বুড়ো হয়ে গেছে। মাথাটাও বিগড়ে গেছে। সারাদিন বিড়বিড় করে কি সব বকে চলে। তবুও তো দুইবোনের মধ্যে কেউ অসুস্থ হলে ঐ বুড়োকেই আসতে হয় লাশ টানতে। পেটের দায়ে কি অদ্ভুত পেশাকে তাদের জীবিকা হিসাবে গ্রহণ করতে হয়েছে। লাশ বওয়া। চাষার ঘরের লোক অথচ জমিজিরেত কিছুই নেই। পরের জমিতে খেটে অন্নসংস্থান হত না। তাই বাবা গোপাল মণ্ডলের এ পেশায় আসা। নগদানগদি পয়সা। লাশ পিছু চারশো টাকা। কিছু নৌকো ভাড়া। ভ্যান মালিকের ভাড়া। টিফিন খরচ সব বাদ দিয়ে দেড়শো টাকার মতো হাতে থাকে।
উমনো ঝুমনোকে মধ্যরাতে প্রায় বাড়ি থেকে বের হতে হয়। থানা থেকে লাশ নিয়ে সুতোরবাঁধ নদী পেরিয়ে রামগঙ্গা। সেখান থেকে আঠাশ কিলোমিটার পথ দুই বোনে লাশ বয়ে আনে ডায়মন্ডহারবার মর্গে।
ভ্যানের উপর লাশটার পাশে বসে বসে ঝুমনো এতক্ষণ ঢুলছিল। ভ্যানটা হঠাৎ ব্রেক কষলে বস্তাটার উপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে।
উমনো রাগ করে বলে – কিরে বসে বসে তুই ঘুমাচ্ছিলি?
ঝুমনো চোখ কচলে বলে – কি হয়েছে?
উমনো অস্ফুটে উত্তর দেয় – ওরা।

এই এলাকাটা ওদের। ঝুমনোর মনের ভিতর নাগরদোলায় দোল দেয়। ওরা মানে হীরুও আছে নিশ্চয়ই। জনা চারেক যুবক ভ্যানের দিকে এগিয়ে আসে। চাপাস্বরে বলে – অসুবিধা আছে। একটু পরে যেও।
ঝুমনো তবু হীরুকে দেখবার জন্য টর্চটা জ্বালিয়ে রাখে। হীরুর সঙ্গে চোখাচোখি হতেই হেসে টর্চটা নিভিয়ে দেয়।
উমনো সিট থেকে নেমে এসে ফিসফিস করে বলে – কাউরে খুন করবে নাতো?
ঝুমনো অসম্ভব বিরক্ত হয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলে – করলি পড়েও তোর তাতে কি.........।
ঝুমনোর এ ধরনের উত্তরে ঘাবড়ে যায় উমনো।
ঝুমনো ফের বলতে থাকে – তুই বলিস না আমাদের সব্ব অঙ্গে খারাপ ঘেরান। তালি পড়ে অন্যের মন্দও আমরা দেখতি যাব কেন?
ঝুমনোর এমনধারা কথাবার্তায় উমনো হা হয়ে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে।
আধঘণ্টা মতো পরে হীরুর দলবল এসে বলে – ক্লিয়ার।
ঝুমনোর সাথে আবার হাসি বিনিময় হয় হীরুর। হীরু ঝুমনোর হাতে কি যেন গুঁজে দিয়ে আঁধার কোণেই অদৃশ্য হয়ে যায়। ঝুমনো কাগজের মোড়কটা খুলে দেখে একটা সোনার নাকছাবি। উমনোকে কিছু না বলে কাগজের মোড়কটা ভেতরের জামায় ঢুকিয়ে রাখে। চোখদুটো তার মায়াবী স্বপ্নের আবেশে বুজে আসতে চায়। যেখানে প্রাসাদ না, নিকনো কুঁড়েঘর, পেট ভর্তী খাবার, পরনের ভদ্রপোশাক আর একজন ভালোবাসার মানুষ।

ঝুমনো এবার সিটে বসে। মনের আনন্দে জোরে জোরে প্যাডেলে চাপ দেয়। রাতের গর্ভ থেকে ভোরের আলোকে জন্ম দিতে প্রকৃতির আর খুব বেশী সময় নেই। নিভুনিভু রাতকে বিদায় জানিয়ে হাসের ডিমের কুসুমের মতো আলো ছড়িয়ে পড়ে রাতজাগা দুই বোনের চোখে। একটা পরিচিত দোকানের পাশে ভ্যান রেখে চা খেতে যায় ওরা।
দোকানদার হেসে বলে – তোমরা হলে ফাস্ট খরিদ্দার। কি কেসের লাশ ওটা?
ঝুমনো উত্তর করে – জলে ডোবা। ব্যাটা ছেলে।
দোকানের বেঞ্চিতে বসে চা বিস্কুট খেতে খেতে অন্যমনস্কের মতো ঝুমনো বলে – জানিস দিদি তোর ইতুমা পুজো না করেই আমায় রাজপুত্তুর জুটিয়ে দেছে।
চায়ের গ্লাসে চুমুক দিয়ে উমনো বলে – মানে?
ঝুমনো উদাস স্বরে ভোরের সূর্যটার দিকে তাকিয়ে বলে – হীরুরে আমি বে করবো।
আঁতকে ওঠে উমনো – হীরু ডাকাত।
চোখ বুজিয়ে ঝুমনো বলে – তাতে কি? আমিও তো লাশ বই।
তারপর খিলখিল করে হেসে বলে – বুঝলি দিদি এখনকার উমনো ঝুমনোর গল্পটা অন্যরকম। ইতুঠাকুর কিছু দেয় না। তুইও একজন মন্ত্রীপুত্তর জুটিয়ে নে।

দোকানদার লোকটা দোকানের সামনে কিছু মুড়ি ছড়িয়ে দিলে কাক আর শালিকের কোলাহলে এক মহাজাগতিক কাকলির সৃষ্টি হয়। অদ্ভুত এক মৌনতা গ্রাস করে ওদেরকে। মুষড়ে ওঠে উমনোর ভেতরটা। তার হেরে যাওয়া মন কিছুতেই যেন পেরে ওঠে না সহোদরার সাথে।
ঝুমনো গা ঝাড়া দিয়ে বলে – নে চ। পাটি এতক্ষণে এসি গ্যাছে। আজ আরও পঞ্চাশ টাকা বাগাবো। না দেলে এমন গাল দেব যে লাশ পাশ ফিরে শোবে। বেশী বেলা হলি ফিরতি কষ্ট হবে। ফিরি এসি আবার থানায় রিপোট জমা করতি হবে। যত্তসব ফ্যাঁকড়া। গে যদি শুনি ফের বডি হয়েছে তো আবার আসা।
মুক্তোর মতো হাসি ঝরে পড়ে ঝুমনোর মুখে। জিতে যাওয়ার আনন্দ। দুই বোনেরই চোখের কোণ ভিজে আসে বেদনা ও আনন্দে।