আনসাং হিরো: একজন পিতা ও মাতা প্রসঙ্গ

জুনান নাশিত

মুক্তিযুদ্ধের প্রায় দু’বছর পরে আমার জন্ম। একেবারে স্বাধীন বাংলাদেশে। একটু বড়ো হতে হতে যুদ্ধ-সময়ের নানা গল্প শুনেছি। আব্বা ও আম্মার মুখে, বড়ো ভাইবোনদের কাছেও। তারা যদিও তখন কিশোর কিশোরী ছিলেন কেবল।কৈশোরিক স্মৃতি থেকে যতোটুকু পেরেছেন শুনিয়েছেন।
১৯৭১ সালে আব্বা লাকসাম অতুল হাইস্কুলের ডাকসাইটে ইংরেজির শিক্ষক ছিলেন। স্কুলটির নাম পরে লাকসাম পাইলট হাই স্কুল হয়ে যায়। আমার দুজ্যাঠাও ছিলেন শিক্ষক। বড়োজন পয়ালগাছা বহুমুখি উচ্চ বিদ্যালয়ের বাংলার এবং ছোটজন ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক।
বড়ো জ্যাঠা এলাকায় রশিদ স্যার হিসেবে সবচেয়ে বেশি পরিচিত। আর আমার আব্বা ছিলেন করিম স্যার হিসেবে। এরা সকলেই এলাকায় খুবই সম্মানীয় ছিলেন। আব্বার অনেক ছাত্রই মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশ নিয়েছিল। আর যুদ্ধের দুঃসময়ে তারা তাদের প্রিয় স্যারের কাছে এসে সাহায্য চাইতেও দ্বিধাবোধ করেনি। স্যারও অকাতরে ছাত্রদের সহযোগিতা করতে পিছ পা হননি।
যে গ্রামে আমার জন্ম তার নাম রতনপুর। কুমিল্লা জেলার বরুড়া থানায় তার অবস্থান। বেশি বড়ো নয়, বলতে গেলে ছিমছাম ছোট একটি গ্রাম। খুবেই গুছানো। আমাদের গ্রাম থেকে তিন কি সাড়ে তিন কিলোমিটার দূরে মুদাফ্ফরগঞ্জ বাজার। সেখানে ছিল পাকিস্তানী সেনা ক্যাম্প। আর কুমিল্লা চাঁদপুর মহাসড়ক থেকে আমাদের গ্রামে ঢোকার রাস্তার দৈর্ঘ্য এক কিলোমিটারের মতো হবে। এ মহাসড়কের একেবারে পাশে এবং গ্রামের রাস্তায় প্রবেশ মুখে যে গ্রাম তার নাম দূর্গাপুর। তখন এ গ্রামের সকল বাসিন্দাই ছিল হিন্দু ধর্মাবলম্বী। যুদ্ধ শুরুর পর কুমিল্লা-চাঁদপুর সড়ক ধরে আর্মিদের যাতায়াত বাড়তে থাকায় এ এলাকার হিন্দুরা অনিরাপদ হয়ে পড়ে। তারা তখন নানাদিকে নিরাপদ জায়গায় চলে যেতে শুরু করে। যাদের অনেকের আশ্রয় হয়ে উঠেছিল আমাদের বাড়ি। ঝুঁকি জেনেও আমার আব্বা তাদের অনেককেই আশ্রয় দিয়েছিলেন। খাইয়েছিলেন। এমনই একজন নিত্যগোপাল দাস। তিনি চৌমুহনী কলেজের অংকের শিক্ষক ছিলেন। তার পুরো পরিবার একনাগাড়ে ১৮ দিন আমাদের ঘরে ছিলেন। পরে আগরতলা সীমান্ত দিয়ে ভারতে আশ্রয় নেন।
চান্দিনা, বরুড়া, লাকসাম, কচুয়া ও কুমিল্লা সদর নিয়ে যে সাব সেক্টর ছিল তার কমান্ডার ছিলেন নূরুল ইসলাম মিলন। তিনি আমার বড়ো জ্যাঠার ছাত্র ছিলেন। মুদাফ্ফরগঞ্জ বাজারটি ছিল বোয়ালজুরি খালের কিনারে। খালের ওপর ছিল ব্রিজ। এক পর্যায়ে সিদ্ধান্ত হলো ডিনামাইট দিয়ে ব্রিজটি উড়িয়ে দেয়ার। আর এ সংক্রান্ত সকল পরিকল্পনা হলো আমাদের কাচারি ঘরে বসে। আমার আব্বার সার্বিক সহযোগিতা ও তত্ত্বাবধানে। যে রাতে ব্রিজটি সফলভাবে উড়িয়ে দেয়া হয় তার পরদিন ভোরে আব্বা আম্মাসহ পরিবারের সকলকে আমার নানা বাড়ি পাঠিয়ে দেন নিরাপত্তার কথা ভেবে। শাহারাস্তির নাওড়ায় আমার নানাবাড়ি। কিন্তু সে জায়গাটিও নিরাপদ মনে না করায় তারা সকলে আরো দক্ষিণে অনেকবেশি জলা জংলা এলাকা লফসরে চলে যান।
আমার নানাবাড়িতে হামলা হয়েছিল। উনারা আগেই সরে যাওয়ায় রক্ষা পান।
শুনেছি, মুক্তিযুদ্ধের সময়ে রোজার মাসে আম্মা অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। এরকমই এক সময়ে মধ্যরাতে আব্বা আম্মার বেডরুমের জানালায় টোকা। আস্তে করে কেউ ডাকছে, স্যার স্যার।
আব্বা জানালা খুলে দেখেন তার ছাত্রদের ৮/১০ জনের একটি দল। তারা ক্ষুধার্ত। খাবার চাচ্ছে, সাথে সাময়িক আশ্রয়। আম্মা অসুস্থ শরীরেও উঠে খোয়াড় থেকে মুরগি নিয়ে জবাই করেন । মুরগিসহ আরো কয়েকপদ রান্না করে তাদের সকলকে খাওয়ান।
এরকম নাকি প্রায়ই হয়েছে। বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের শেষের দিকে এসে অনেক মুক্তিযোদ্ধাই আমাদের ঘরে খেয়েছে, মাঝে মধ্যে থেকেছেও। তাদের ভারি ভারি অস্ত্র এবং গ্রেনেড লুকিয়ে রেখেছে আমাদের ঘরের খাটের তলায়। যুদ্ধের একেবারে শেষ দিকে আমাদের বাড়িতে মুক্তিযোদ্ধাদের যাতায়াত অনেক বেড়ে গিয়েছিল। বিজয়ের একেবারে দ্বারপ্রান্তে এসে মুদাফ্ফরগঞ্জ শত্রুমুক্ত হয়। সেদিনও ১৮ জন মুক্তিযোদ্ধার একটি দল আমাদের বাড়িতে ছিল। তাদের ভাগ ভাগ করে কয়েক ঘরে রাখা হয়েছিল।
জীবনের ঝুঁকি নিয়েও মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় ও খাবার দিতে পিছ পা হননি না আমার আব্বা, না আমার আম্মা।
ঝুঁকি ছিল অনেক। কারণ সেনা ক্যাম্প খুব বেশি দূরে নয়। তবে সৌভাগ্য বলতে হবে গ্রামের কেউ আমার আব্বা কিংবা আমাদের বাড়ির কারো সাথে বেঈমানী করেনি। আর আরেকটা দিক ছিল আমাদের গ্রামসহ আশেপাশের কয়েকটি গ্রামই ছিল তখন আওয়ামী লীগ সমর্থক। অর্থাৎ সকলেই ছিলেন বঙ্গবন্ধুর প্রতি অবিচল আস্থাশীল। কেবল অনেক দূরের দুটি গ্রাম দেওড়পাড় ও মইশালে কিছুজন ছিল মুসলিমলীগ সমর্থক। তবে একেবারে শেষ পর্যায়ে এসে আমাদের গ্রামেও হামলার পরিকল্পনা নেয় পাকিস্তানী সেনারা। কিন্তু ততদিনে মিত্র বাহিনীর বিমান হামলা শুরু হয়ে যাওয়ায় সেনারাই বিপর্যস্ত ও দিশেহারা হয়ে পড়ে।
আমাদের আশেপাশের কয়েকটি গ্রামেই মুক্তিযোদ্ধাদের আধিক্য ছিল। এ খবর জেনে সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে প্রায় এক হাজার পাকিস্তানী সেনা আমাদের পাশের গ্রাম পয়ালগাছার অদূরে বটতলা বাজার এলাকা ঘিরে ফেলে। অল্পদূরেই ছিল ২০/২৫ জন মুক্তিযোদ্ধার একটি দল। তারা প্রমাদ গুনলো। এতো অল্পসংখ্যক গেরিলা যোদ্ধার পক্ষে বিশাল সংখ্যার একটি সুসজ্জিত দলকে মোকাবেলা এক অর্থে অসম্ভব। তখন তারা গেরিলা কৌশলের আশ্রয় নিল। নূরুল ইসলাম মিলনের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা কয়েকটি ভাগে ভাগ হয়ে গেল। তারা তাদের বিভিন্ন অবস্থান থেকে গুলি ছুঁড়তে শুরু করল। এতে শত্রুপক্ষ ভাবল মুক্তিযোদ্ধারা সংখ্যায় অনেক। তারা পিছু হটতে শুরু করলো। কিন্তু পিছু হটারকালে তারা পয়ালগাছা হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক মোরতাজ আহমেদ চৌধুরীসহ বেশ কয়েকজন বেসামরিক নাগরিককে মানবঢাল হিসেবে ব্যবহারের জন্যে ধরে নিয়ে গেল। যদিও তাদের পরে ছেড়ে দেয়া হয়। সে দিনের সে যুদ্ধে পাঁচজন বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। সেনাপক্ষে আহত হয়েছে অনেক। কিন্তু নিশ্চিতভাবে কোন সেনা নিহত হয়েছিল কিনা তা জানা যায়নি। যদিও এলাকায় প্রচলিত রয়েছে ওই দিনের যুদ্ধে ১৮ জন সেনা নিহত হয়েছিল। সেদিনের সে গোলাগুলিকালে আমাদের বাড়ির সকলকেও বিভিন্ন জায়গায় লুকাতে হয়েছে। শুনেছি আম্মা তার ছোট ছোট সন্তানদের নিয়ে পুকুড়পাড়ের বড়ো একটি জামগাছের শেকড়ের আড়ালে লুকিয়ে ছিলেন দীর্ঘসময়। সেখানে তারা অল্পের জন্যে সাপেড় কামড় থেকে রক্ষা পান।
যুক্তিযুদ্ধের বিশাল এবং রক্তঝরা অনেক মর্মস্পর্শী ঘটনার কাছে এসব হয়তো তেমন কিছুই নয়। কিন্তু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে সাড়া দিয়ে এদেশের সাধারণ জনগণ যে যেভাবে পেরেছে সেভাবেই মুক্তিযুদ্ধকে কিভাবে সহযোগিতা ও সমর্থন দিয়েছে উপরে উল্লেখিত ঘটনাগুলো তারই প্রমাণ। আমার আব্বা আম্মা যে ভূমিকা নিয়েছিলেন মহান মুক্তিযুদ্ধকালে এ রকম অসংখ্য অবদানে ঋদ্ধ আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম। মুক্তিযুদ্ধকালে সম্পূর্ণ অচেনা অজানা মানুষকেও আশ্রয় দিতে অনেকেই কুন্ঠিত হননি। এটি তখনকার সময়ের অনেকটা সাধারণ চিত্র ছিল হয়তো, কিন্তু উল্টো ঘটনাও যে ছিল তারও তো প্রমাণ আছে যথেষ্ট।
দেশকে শত্রু মুক্ত করার সংগ্রামে সমর্থন জুগিয়ে এ দেশের সাধারণ লোকজন যা কিছুই করেছেন কখনও কিছু পাওয়ার আশায় নয়, কেবল দেশকে ভালোবেসে, দায়িত্বশীলতার জায়গা থেকে সর্বোপরি বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে সাড়া দিয়েই করেছেন। তারা নিজের জীবন ও পরিবারের ঝুঁকি বাড়িয়ে কেউ প্রত্যক্ষ আবার কেউবা পরোক্ষভাবে লড়ে গেছেন দেশ মাতৃকার জন্যে।
আনসাং হিরোরা পাদ প্রদীপের নিচে থাকেন না। তারা আড়ালে আবডালে থেকেই যথাসময়ে নিজের কাজটি করে যান। কোন কিছু পাওয়ার আশায় নয় দায়িত্ব মনে করে ও ভালোবেসেই তারা তাদের কাজটি করেন একান্ত নিঃস্বার্থভাবে।