'আমরা তো সবাই মিলে বীর'

প্রসূন মজুমদার

মাঝেমাঝে মনে হয় এ জীবন ছোট মাঠে টেনিস বলে ক্রিকেট ম্যাচ বই আর কিছুই না। আহা! সেইসব ক্রিকেটের শীত! এপাড়ার সঙ্গে ওপাড়ার ম্যাচে বল আসছে গোলার মতো। আর একটার পর একটা এল,বি,ডব্লিউ - এর আবেদন খারিজ করে দিয়ে আম্পায়ার বলছে নট আউট। এই নট - আউট উচ্চারণ শ্রবণের তৃপ্তি যে ব্যাটসম্যান পায়নি তার কাছে জগৎ যেন বৃথা। আবার ভাবুন,সারাদিন ব্যাট করে চলেছেন গাওস্কর। একার হাতে টেনে নিয়ে যাচ্ছেন গোটা ভারতের স্পর্ধা।সারাদিনের পর স্কোরবোর্ডে যখন জ্বলজ্বল করে ওঠে 'গাওস্কর নট আউট' সেই অদম্য ইনিংস চাক্ষুষ করার অনুভূতি কি ভাষায় প্রকাশ করা যায়! 'এই তো জীবন কালিদা' বলে তখন যদি কেউ হতাশার পরিবর্তে একমুঠো তাজা গোলাপের গন্ধ পায় তাহলে সে কি নিতান্তই অমূলক!

আমাদের দেশ ও জাতির ইতিহাসে শুধু কেন বিশ্বের ইতিহাসেই যুগ যুগ জিও এমন কত বীর নট আউটকেই তো আমরা বীরের সম্মান দিয়ে এসেছি আজীবন। আর সেই বীরগাথার চর্চা করতে করতে ভুলে থেকেছি পাড়া ক্রিকেটের ওই নট- আউট ব্যাটসম্যানদের মুখগুলো।আজ লিখতে বসে তাদেরই কারো কারো মুখ যদি মনে পড়ে,যদি আমার আঙুল লিখতে শুরু করে সেই লজেন্সওলার কথা যাকে আমি মফস্বলের এক সামান্য স্টেশনে ল্যাম্পপোস্টের নিচে অতর্কিতে খুঁজে পেয়েছিলাম একদিন তাহলে কি তার কথা না বলে থাকা সম্ভব, না সেটা করা উচিৎ?

গোবিন্দকে আমি প্রথমে লক্ষই করিনি। ট্রেনের অপেক্ষায় বসে থাকতে থাকতে সেদিন বেশ বিরক্ত। নির্ধারিত সময় পেরিয়ে আধঘণ্টা অতিক্রান্ত অথচ ট্রেনের টিকিটি দেখা যায় না। এমনই সময় এক প্রশান্ত কন্ঠস্বরে চকিতে ফিরে তাকাতেই হল।গোবিন্দকে আমি চিনতাম। গোবিন্দকে আমি এভাবে চিনতাম না। গোবিন্দ ট্রেনে লজেন্স বিক্রি করে। বড় সুন্দর করে হাঁক দেয় রোজ।কিন্তু আজ তাকে শুনলাম অন্যকণ্ঠে। সে খুব আপনমনে আবৃত্তি করছে দুঃসময়। ' তবু বিহঙ্গ ওরে বিহঙ্গ মোর এখনি অন্ধ বন্ধ করো না পাখা।' এগিয়ে গিয়ে জানতে চাই এ কবিতা সে পুরোটা এত সুন্দর করে কীভাবে জানলো। সে বেশ স্বাভাবিক স্বরে বললো কবিতা পড়া তার বহুদিনের অভ্যাস। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল,সুকান্ত তার ভালো লাগে। অবাক হই নি। তবে এবার হলাম যখন সে জানতে চাইল 'আনন্দভৈরবী' কবিতাটা আমার কাছে পাওয়া যাবে কিনা। শক্তি চট্টোপাধ্যায়!' পড়ো তুমি?' সে বলে শক্তি,সুভাষ,জয় সবার কবিতাই পড়ে। স্টেশনে দাঁড়িয়ে বই-এর দোকানে কবিতার বই দেখতে পেলেই কিনে ফেলে। একটু অসুবিধে হয় টাকাপয়সার। তবু কেনে।শক্তির এই কবিতাটা তার কাছ থেকে হারিয়ে গেছে,কিন্তু পড়তে খুব ইচ্ছে করছে তার। তারপর বাড়িতে এলো সে। বসে বসে টুকে নিল আনন্দভৈরবী। ভৈরব আনন্দ হল সেদিন। শুনলাম বাড়িতে তার বউ - ছেলে কবিতা পড়া নিয়ে বড় গঞ্জনা করে।তবু কবিতা কী ছেড়ে থাকা যায়! না,কবিতা লেখে না সে,কবিতার ব্যাখ্যাও লেখে না। সে পড়ে,নিজের মনে কবিতা আওড়ায়। তারপর ট্রেন এলে লজেন্স বেচতে ওঠে। দশ টাকায় ছটা লেবু লজেন্স। তবু তার জীবনের ছটা জানিয়ে দেয় কবিতার দিগন্তে আমরা না,গোবিন্দই নট - আউট।

এর মধ্যেই কীভাবে যেন পালটে যেতে থাকে পশ্চিমবাংলা। গোবিন্দর বাংলা,আমার বাংলা কীভাবে আর কেনই বা যে সাম্প্রদায়িক দলকে আসন পেতে দিল সে কথা বোঝার কোনও পথ গোবিন্দর জানা নেই, যেমন জানা নেই লাহিড়ী কাকুর। মোড়ের ঠিক উপরে যে বাড়িটায় লাহিড়ীকাকুরা থাকে তার পলেস্তারা খসে পড়তে চায়। ওরা দুই ভাই,এক বোন কেউই বিয়ে করেনি? না বোধহয়। লাহিড়ীকাকুর বোন বিধবা। ওই বাড়িতেই থাকে। লাহিড়ীকাকু সামান্য টিউশন করে কিছু। বিকেলে মোড়ের দোকানে এসে বসে। চা খায়। বোন তো চা করে দিতেই চায় না আজকাল। কী কারণে তার এতো রাগ কাকু বোঝে না। একমনে কাগজ পড়ে কিছুক্ষণ। সন্ধ্যায় পড়িয়ে নিয়ে স্টেশনে যায়। ট্রেনে চড়ে। এক স্টেশন পরেই কাকু একটা ঘর ভাড়া নিয়েছে ইদানীং। সেখানে থাকে রাবেয়া। রাবেয়াকে কাকু দেখতে পায় বারুইপুর স্টেশনে রোজ ভিক্ষে করতে। স্টেশনেই তো একা একা বসে থাকতো কাকু। রাবেয়াকে একদিন বলে বসল যে তাকে যদি ঘর দেয় তাহলে কি আর ভিক্ষে করবে রাবেয়া? কাকুর প্রস্তাবটা প্রথমে বিশ্বাস করতে পারেনি রাবেয়া। অবাক চোখে তাকিয়ে থাকতে থাকতে সে জানতে চায়,'কি করে দেবে ঘর? আমার নাম তো রাবেয়া'। কাকু হাসে। রাবেয়া তো মানুষের নাম?
---' উঁহু,মেয়েমানুষের '।
কাকু সেই মেয়েমানুষকে নিয়ে বাড়ি গেল।লাহিড়ীবাড়ি। বোনের মুখঝামটা খেয়ে বেরিয়ে এল ওরা। তারপর কাকু স্থির করে পরের স্টেশন মল্লিকপুরে একটা ঘর ভাড়া নেবে রাবেয়ার জন্যে।সেখানেই থাকে এখন রাবেয়া।পড়িয়ে নিয়ে সন্ধ্যায় বাজার করে কাকু। রাবেয়ার কাছে যায়। রান্না করে,গল্প করে,রাতের খাবার খায়।তারপর ফিরে আসে রোজ।
চেনা মনে হচ্ছে এই গল্প? মনে হচ্ছে ভিন্নধর্মের দুই নরনারীর প্রেমকাহিনী। হ্যাঁ,একধরণের প্রেম তো বটেই। প্রেমই বটে কারণ কামগন্ধ নাহি তায়। রাবেয়া এখন আশি।অশক্ত।কোনোমতে রান্নাটুকু করতে পারে এখনো। ভিক্ষে করতে হয় না বলে ভারি খুশি। আর খুশি এটা জেনে যে পৃথিবীতে এখনো মানুষ বেঁচে আছে। ওই ফিরে আসছে লাহিড়ীকাকু। বিয়ে করেনি তো?বিধবা বোনকেও বুঝতে হয়।তার মন তো অত মুক্ত নয়! এইসব নিয়ে কারো সঙ্গেই কথা বলতে চায় না কাকু। বেশিরভাগ লোকেই মজামস্করা করে।কেউ বলে ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো।আর কেউ প্রশংসা করলে অবাক চোখে তাকায় লাহিড়ীকাকু।' ৬০ বছর বয়স হলো এখনো কি রাবেয়াদের কথা ভাববো না! ' ওই হেঁটে যাচ্ছে আমাদের লাহিড়ীককাকু। সমস্ত মিডিয়ার আলোর বাইরে নিজস্ব আলো নিয়ে একা। লাহিড়ীকাকু নট -আউট।
এই তো গেল গাওস্করসুলভ নট- আউট ব্যাটসম্যানদের নিয়ে দুখান কথা। এইবার যাদের কথায় আসবো তাদের আমার পাঠক আম্পায়াররা বেনিফিট অফ ডাউট নট আউট ঘোষণা করবেন কিনা জানি না তবে আমি তাদের উদ্দেশ্যে তর্জনী তুলে প্যাভেলিয়নের দিকে দেখাতে পারিনি। এই পর্বে প্রথমেই যার কথা মনে আসছে তাকে করোনায়আক্রান্ত পৃথিবীর পালটে যাওয়ার আগে আপনারা অনেকেই নন্দনচত্ত্বরে দেখে থাকবেন। লোকটা মাঝেমধ্যেই কারো দিকে এগিয়ে যাচ্ছে আর বাড়িয়ে দিচ্ছে নিজের লেখা কবিতার বই। লোকটা অক্ষয়চাঁদ। সে কিন্তু আমাদের মতো ভদ্রসভ্য কবিতাপ্রয়াসীদের আড়চোখে দেখে আর চোখা চোখা খিস্তি দেয়। তাকে বাংলা অকাদেমির কবিসভায় কোনোদিন দেখতে পাবেন বলে মনে হয় না। তবু লোকটা কবি। সে দিনের পর দিন দাঁত মাজে না। মুখের দুর্গন্ধের কথা বললে সে জানতে চায়, ' বাঘেরা কি দাঁত মাজে'? আমি তো ঘুণাক্ষরেও তার কাছে কভু ঘেঁসি না। কে হায় হৃদয় খুঁড়ে খিস্তি কুড়াতে ভালোবাসে। ভদ্র কবিদের বাবুসমাজে তাকে নিয়ে হাসিঠাট্টা চলে। শোনা যায় বামফ্রন্ট আমলে কবিতাদরদী মুখ্যমন্ত্রী একবার যখন বডিগার্ড পরিবৃত হয়ে বাংলা অকাদেমির কোনো কবিসভা অলংকৃত করে বেরিয়ে আসছিলেন তখনই সচকিতে সে মুখ্যমন্ত্রীর রক্ষাবেষ্টনী ভেদ করে গলে যায়। একেবারে মুখ্যমন্ত্রীর পথ আগলে দাঁড়িয়ে তার বই এগিয়ে দিয়ে পয়সা চায় এবং পায়ও।কিন্ত তারপরেই বুদ্ধবাবুকে প্রশ্ন করে বসে ' আপনার মাথার চুলগুলো কী সাদা! নিচের গুলোও কি... ' এরপরেই ধুন্ধুমার। গার্ডেরা ঝাঁপিয়ে পড়ে তার ওপর।কথিত আছে যে সেদিন সহৃদয় কবি কালীকৃষ্ণ গুহ আর স্বয়ং বুদ্ধবাবুর হস্তক্ষেপে সে যাত্রা রক্ষা পায় স্বপন বিশ্বাস ওরফে কবি অক্ষয়চাঁদ।সে বাড়ি ফেরে বাংলামদে বুঁদ হয়ে।পকেটে বইবেচার সামান্য টাকা। কখনো বই না বিক্রি হলে হাঁড়ি চড়ে না তার বাড়ি। মেয়ে খিদেয় ককিয়ে উঠলে গালে কখনো মদ ঢেলে দেয়। কী ভয়ংকর এই কবি! তবু কবি। কবিতায় কখনো বিদ্যুৎ খেলে যায় তার লেখায়। তাকে আপনারা কবেই নক - আউট করে দিতে চেয়েছেন হয়তো। কিন্তু আমার বিচারে অক্ষয়চাঁদ বেনিফিট অফ ডাউটে নট - আউট। আজও নট - আউট।

এই লেখার শেষ করব যার কথা বলে সে মানুষটি বাংলার কবিতাপ্রয়াসী অক্ষয়চাঁদ নয় বরং বিশ্বকবিতার ইতিহাসে প্রকৃত অর্থেই অক্ষয়চাঁদ বলেই আমার বিশ্বাস। তিনি স্যার ফিলিপ সিডনি। স্বয়ং শেক্সপীয়ার তাঁর কবিতাভাবনায় প্রভাবিত হয়েছেন। সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান সিডনি দেশের জন্য যুদ্ধে গেছেন বারবার। অস্ত্র নামিয়ে রেখে লিখেছেন 'এস্ট্রোফেল আর স্টেলা'র মতো কাব্য।তাঁর প্রেমিকা বিবাহ করেছেন অন্যকে। কিন্তু সেই প্রেমিকা পেনেলোপিই তাঁর স্টেলা। তিনি রেনেসাঁর সময় নিজে চোখে দেখেছেন সেন্ট বার্থেলোমিউ দিবসের গণহত্যা। ইউরোপ ভ্রমণ শেষে তলোয়ার খাপ থেকে খুলে রেখে স্টিফেন গসন- এর 'দ্য স্কুল অফ এবিউস' - এর উত্তরে তুলে নিয়েছেন কলম আর 'ডিফেন্স অফ পোয়েসি'-র মতো অসাধারণ প্রবন্ধ উপহার দিয়েছেন আমাদের।শেক্সপীয়রের এক দশক আগেই তিনি তাঁর ' আর্কেডিয়া'য় ছন্দ এবং গঠনে নতুন দিশা দেখিয়েছেন আর তারপর যখন দেশের জন্য আবার তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে তখন এক স্প্যানিশ কনভয়ে হামলা করার সময় উরুর বর্ম খুলে পরিয়ে দিয়েছেন বন্ধু পেলহ্যামকে,কারণ পেলহ্যামের কাছে উরু-বর্ম ছিল না। সেদিন উরুতেই গুলি লাগে তাঁর। গুলিবিদ্ধ ফিলিপকে যখন পেলহ্যাম কাঁধে করে নিয়ে বেরিয়ে আসে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে, ফিলিপের হাতে ধরা জলের পাত্র।তিনি দেখতে পেলেন এক তৃষ্ণার্ত সৈনিক আকুল হয়ে তাঁর পাত্রের দিকে তাকিয়ে আছে। সম্ভ্রান্ত ফিলিপ বাড়িয়ে দিলেন সৈনিকের দিকে তাঁর হাতের পাত্র। ' Thy necessity is greater than mine'। আঘাতের বিষ ছড়িয়ে পড়ল সিডনির শরীরে।বাইশদিন পরে তাঁর মৃত্যু হল। আকাশে তবু আজও নিভল না ' এস্ট্রোফেল'। মানবতার মূর্ত প্রতীক এই ফিলিপ সিডনির জন্য এলিজি লিখেছিলেন এডমন্ড স্পেনসার।তাঁর সমাধির কাছে ফুল হাতে আজও দাঁড়িয়ে আছে বিশ্বকবিতা যেন সে-ই তাঁর স্টেলা,তাঁর প্রিয় পেনেলোপি। স্যার ফিলিপ সিডনি চির নট-আউট।