লিটল ম্যানরা

পৌলমী গুহ

ছোটোবেলায় স্বাধীনতাদিবসের একটা আলাদা ব্যাপার ছিলো। প্রথমে শহর তারপর গ্রামে থাকার সুবাদে, বিষয়টার দু'টো আলাদা রূপ দেখতে পাওয়া গেছিলো। একটায় সেজেগুজে স্কুলে গিয়ে বাছা বাছা গান, পতাকা, বয়েজ লজেন্স। অন্যটা একটু আটপৌরে, স্কুলে গেলেও হয় বা টিভিতে 'বর্ডার' কি 'স্বদেশ' বা ক্লাসিক 'গান্ধী' দেখলেও চলে।
লালকেল্লার ভাষণ নিয়ে লোকে তখন মাথাও ঘামায় কম। ওই হাতে হাতে যন্ত্রটা নেই। চাইলেও টপাটপ সব তথ্য মাথায় ভর্তি করা চলে না। রয়ে-সয়ে সন্ধ্যার খবরে বা পরদিনের খবরের কাগজ অবধিও টেনে নিয়ে যাওয়া চলে। না জানলেই বা কি? সবাই জানে এতোদূরে ওসব লালকেল্লার আলো-মাইক, প্যারেডের মূল্য নেই।
অন্তত ক'জন তো সেরকমই জানতো। তার মধ্যে একজন ছিলো আমার দাদুর (মায়ের বাবা) ছাত্র। তখন বামফ্রন্টের যুগ, জ্যোতি বসু বেঁচে আছেন, রাজ্য রাজনীতিতে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের জায়গা নেই। লোকেও বিশেষ মাথা ঘামায় না সে নিয়ে। পার্টি অফিসে যেতে হয়, যায়। যদিও বা বামফ্রন্টের নীতি আদর্শ জানা থাকেও, বাড়িতে শীতলার সিন্নি দিলে পার্টির সবাই যায়ও। ওসব নিয়ে কেউ খুঁতখুঁত করলে "আরে ছাড়ান দ্যাও!" বলেই সমস্যার সমাধান হয়।
এরকম এক কর্মীই ছিলো আনারুল মামা। মামা কারণ আমার মামাদের সঙ্গে ভারী সখ্য। স্কুলের পাট চুকিয়ে দাদু রিটায়ার করলেও সে কাজে-অকাজে একটা লজঝড়ে সাইকেল নিয়ে 'স্যার'-এর সঙ্গে দেখা করতে আসতো।
তার পেশা যদিও ছিলো ঘড়ি সারাই, এবং বাজারে ছোটোখাটো একটা দোকানও ছিলো। কিন্তু তাকে দোকানে খুব কমই পাওয়া যেতো।
কারণটা হলো, সে চা-বাগানে ঘুরে ঘুরে এর-ওর বাড়ি খোঁজ নিতো। কার ছেলে স্কুল পালিয়ে সিনেমা দেখছে, কার মেয়ের জামা নেই বলে স্কুল যাওয়া হচ্ছে না ইত্যাদি। সব জায়গাতে মোড়োলি করার ফলে লোকজনও ডেকে ডেকে তাদের যাবতীয় সমস্যা উজাড় করে দিতো।
আর তার মধ্যে খাটা পায়খানা পাকা করা থেকে বউ পালানোর ক্ষতিপূরণও আসতো!
এসব গল্প শোনা যেতো আনারুল মামা দাদুর সঙ্গে দেখা করতে এলেই। কেউ যদি বলতো, "হ্যাঁ দাদা আপনে এতো লোক কই পান? লোকে আপনারেই ধরে ক্যান?" বেশ উদাস ভাব করে বলতো, "কে জানে ফ্যারেস্তা ঠাউর দিছে!"
তবে গন্ডগোল যে হতো না তা নয়। কারো মেয়েকে ধরে বিয়ে দিয়ে দিচ্ছে শুনে আটকাতে গিয়ে খুব অপমানিত হয়েছিলো। গন্ডগোল বড়ো‌ আকার ধারণ করতে পার্টি অফিস থেকে লোকজন ছুটে গেছিলো। সেযাত্রায় মেয়েটির বিয়ে বন্ধ‌ হয়নি বটে তবে আনারুল মিঞার আফশোস ছিলো, "ছেড়িটার লেখাপড়া হইলো না!"
দাদু যখন মারা গেলেন সে বাইরে কোথাও ঘুরতে গেছিলো। বয়স বেড়েছে, সাইকেলটা নিয়েই এসেছিলো দেখা করতে। বললো, "ভালো ভালো মানুষগুলা চইলা যাইতেছে।" আমরা মজা করে বললাম, "কিন্তু মামা আপনে তো আছেন।" একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো, "কি করুম, কাজের শ্যাষ নাই যে!"
এই কাজের দায়িত্ব কে কবে তাকে দিয়েছিলো, সেইই জানে। তবে দায়িত্ব পালন করে যাওয়ার তাগিদ বোধ করি মৃত্যুকেও ঠেকিয়ে রাখবে!

এরপর স্বাধীনতা দিবসের রূপ বদলে গেছে মায়ের চাকরিক্ষেত্রে এসে। বড়ো স্কুল, অনুষ্ঠানের অভিনবত্ব আছে। তায় রাজবাড়ির কাছারিঘরটাই টীচার্স রুম বলে বিরাট জায়গা জুড়ে অনুষ্ঠানের মহড়া হয়। সব মিলিয়ে একটা উৎসব উৎসব ব্যাপার। আর সেই উৎসবে শেষ মুহূর্তে নাচের সাজ ঠিক করতে গিয়ে আলাপ হয় রূপা মাসির সঙ্গে। হাস্যমুখী দর্জির কাজে পারদর্শী রূপামাসির মেয়েও এই স্কুলের ছাত্রী। আমার সব ইচ্ছে মেনে ঠিকঠাক নাচের পোশাকটি আগের দিন রাতে দিয়ে গেলেন। মা তার নিপুণ কারুকার্য দেখে বেশ ক'খানি চুড়িদার, জামার পিস কিনে ফেললো। বাড়িতে যেতেই শশব্যস্তে উঠে আসলেন। ছোট্ট ঘর একটুখানি, সেখানে চার-পাঁচখানা সেলাই মেশিন। ক'জন আটপৌরে শাড়ি, সালোয়ার কামিজ পরা বউ ও মেয়েরা কাজ করছে। কাটা কাপড়ের গন্ধ ছড়িয়ে আছে ঘরখানায়। পীড়াপীড়ি করে চা আর শরবত খাইয়ে ছাড়লেন। ওটা প্রথম পরিচয় ছিলো।
একই পাড়ায় থাকার সুবাদে গল্পটাও জেনে ফেললাম আমরা আরেক প্রতিবেশিনীর কাছে। অনেক কমবয়সে বিয়ে করে বাড়ি ছেড়ে চলে গেছিলেন। মেয়ে হওয়ায় বর বাড়ি থেকে বের করে দেয়। হ্যাঁ সতীন এনেও হাজির করেছে। পড়াশোনা শেষ করেননি, চাকরিও পাবেন না। মেয়েকে নিয়ে বাপের বাড়ি ফিরে সেলাইয়ের কাজ ধরেন। সহজে হয়নি, বাঁকা কথার ধার মা আর মেয়েকে প্রচুর কেটেছে।
তবে ওই বেঁচে থাকার তাগিদ। সেজন্যেই দাঁত চেপে পড়ে থাকতে থাকতে আজ সেলাইয়ের কাজ করেই দিন গুজরান হচ্ছে। তবে এটুকু হলে গল্পটা লেখার প্রয়োজন পড়তো না। রূপামাসির আসল গল্প হলো, নিজের জীবনের বিষটুকু থেকে শিক্ষা নিয়ে বাকিদের অমৃতমন্থন শেখানো। কাস্টমারের চাহিদা অনুযায়ী সব কাজ সেরে পাড়ার মেয়ে-বউদের নিজের স্বল্প বিদ্যাটুকুই উজাড় করে দেন। ওইই তাঁর ধ্যান-জ্ঞান এখন। এর জন্যে কোনোও দক্ষিণাই নেন না। ওইটুকু একটা মহিলার ভেতরে এতোটা শক্তি দেখে পাড়ার লোকেও আর বাঁকা কথা বলতে সাহস পায় না। বরং এককালে যারা মুখ বেঁকাতো তারাই শাড়ি-চুড়িদারের পিস নিয়ে ওই ঘরটার দরজায় টোকা দেয়, "রূপাদি এইটা…"
রূপামাসি মনীষীদের জীবনী কতোটা পড়েছিলো কে জানে? স্কুলের খাতায় নিশ্চয়ই রচনা লিখেছিলো। মেয়ের পড়া দেখিয়ে দিতে দিতেও কখনো সেসব মনে পড়ে যায় হয়তো। নিজে স্বাধীনতা অর্জন করে নিতে পেরেছে বলেই কি বাকিদের তার স্বাদ নিতে শেখাতে চায়? জানি না।


আরেকজনকে চিনতাম। না ঠিক চিনতাম বলা উচিত নয়, দেখতাম। এক বৃদ্ধ। কলেজ-জীবনে সকালে উঠে টিউশন পড়তে যাওয়ার পথে ওঁর সঙ্গে দেখা হতো। উনি ডেকে ডেকে রাস্তার কুকুরদের বিস্কুট খাওয়াচ্ছেন। যেদিন টিউশন থাকতো, ওই রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় সে দৃশ্য দেখাও আমার রুটিনে পড়ে গেছিলো। রিক্সাওয়ালাকে জিজ্ঞাসা করলে হাসতেন সেই দাদা, বলতেন, "এনাকে সবাই চেনে্ যেখানেই যাবে দোকানে হোক বা ক্লাবে, বিস্কুট নিয়েই যাবে!" ভাবতাম কতোরকমের অদ্ভুত লোকে পৃথিবীটা ভর্তি। এক আইনজীবী দাদার কথাও মনে পড়ে যাচ্ছে। কাজ না থাকলে স্কুটার নিয়ে বেরিয়ে ফুটপাতের ভিখিরি, নাক দিয়ে সিকনি ঝরা বাচ্চাদের ডেকে খাওয়াতেন। যে পরম মমতায় তাদের কাছে ডেকে নিতেন, তার তুলনা পাইনি। অথচ প্রশংসা করতে গেলেই চোখ কটমট করে তাকাতেন। বোধহয় বলতে চেয়েছিলেন, মানুষ হয়ে এটুকুও শান্তিতে করতে পারবো না?
অথবা আমার দিদা। রোজ দুপুরে সবার খাওয়া হয়ে গেলে নিজে খেতে বসবে যখন সেসময় কেউ এলেই তাড়াতাড়ি ভাত বেড়ে দিতো। কংগ্রেসের আমলে যখন লঙ্গরখানা খুলতে হচ্ছে, সেসময় দিদা নিজের মুখের ভাত কতোজনকে ধরে দিয়েছে মা-মাসিরাও ঠিকঠাক জানে না।
এই লেখা যখন ঘটছে, মনে পড়লো ছোটোবেলায় পূজাবার্ষিকী 'আনন্দমেলা'-তে মতি নন্দীর একটা গল্প পড়েছিলাম। 'ননীদা নট আউট'। সেই গল্পের ননীদা একজন ক্রিকেট পাগল কোচ কাম ক্যাপ্টেন। দলের ভালো প্লেয়ারকে স্ত্রী'র কানের দুল বেচে ব্যাট কিনে দিয়েছিলেন যাতে সে পরের ম্যাচে নামে।
এই আধপাগলা লোকগুলো মিলে পৃথিবীটাকে কেমন সিনেমার হ্যাপি এন্ডিং-এর মতো বানিয়ে রাখে, আমরা তার কতোটুকু খোঁজ রাখি!