অরণ্যের প্রহরীরা

ইমন ভট্টাচার্য

রাত্রি গভীরতর হচ্ছে। দোতলার সামনে ব্যালকনি নয়, ছাদ। রেলিং দিয়ে ঘেরা। ধারেকাছে অস্পষ্ট বাল্বের আলো। একপাশে দু-একটা জামাকাপড় মেলা রয়েছে। আকাশ নিরেট স্লেটের মত। রাত্রির ব্ল্যাকবোর্ড। বয়স্ক এক মানুষ দাঁড়িয়ে রয়েছেন প্রহরীর মত। বলছেন ওই যে বৃহস্পতি, ওই যে বৃশ্চিক, হাফ চাঁদ শনির দিকে সরে এসেছে। আমাকে তারা চেনাচ্ছেন। এই আদিশিক্ষা, প্রথম পাঠ- নক্ষত্র চিহ্ন এঁকে দিল মনে। কে এই মানুষটি! এক চিরকালীন প্রতিপালক! শিক্ষক! নাকি ছদ্মবেশী দিয়েগো আলভারেজ। অনেক চিনেও পুরো আকাশকে একজীবনে অতি সামান্যই চেনা যায়। সব তারার তো নাম হয় না। আমি নিজে নক্ষত্র নই, কোনোদিন হতেও পারব না কিন্তু অভ্যেসের বশে নক্ষত্র পরিচয় করিয়ে দিতে পারি। কেন জানি, আনসাং হিরো বলতে আমার কেবলই মনে পড়ে আমার শিক্ষকদের কথা। যাদের দেখে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলাম, যাদের দেখে স্বপ্ন দেখতে শিখেছিলাম। যাদের মতো হতে গিয়ে বুঝেছি, তারা কত দূর্গম গিরিচূড়ার মত। আমি হেরে গেছি, চিন্ময় স্যার, আপনাকে আরেকবার বলি।
চিন্ময় স্যার- কে আমাদের স্কুলে আমরা হঠাৎ পেলাম। ক্লাস ফাইভে উঠে শুনি, নতুন স্যার এসেছেন স্কুলে। তিনি ডক্টরেট। জীবনবিজ্ঞান নিয়ে গবেষণা করেছেন। ক্লাসে প্রথম দিন এক ছাত্র প্রশ্ন করে উঠল, স্যার, আপনি কী আবিষ্কার করেছিলেন? স্যার খুব গম্ভীর মুখে বললেন, ছবি আঁকার চক। এতে সবাই খুব হতচকিত হল এবং কেউ কেউ হেসে ফেলল, বিশেষতঃ লাস্ট বেঞ্চের ছাত্ররা। স্যার পড়া পড়া খেলা শুরু করলেন। কোনোদিন ক্যুইজ করান, কোনদিন হয়ত বোর্ডে একটা মানুষের মুখ আঁকলেন। তারপর চোখ বেঁধে একে একে ছাত্ররা এল গোঁফ আঁকতে। তারপর যা হয় আর কী! এইভাবে পড়ায়, খেলায়, মজায় আমাদের প্রিয় স্যার হয়ে উঠলেন চিন্ময়বাবু। ছাত্রদের উৎসাহ দেওয়া, শাসন করা, উদাহরণ সৃষ্টি করা- সবই খুব সরল, হালকা চালে। কোথাও ভার মনে হত না, আবার কোথাও সম্ভ্রমের অভাবও হয় নি। আমাদের চোখে চিন্ময়বাবু এক আদর্শ মানুষ। স্যারের শাস্তিগুলো অদ্ভুত ছিল। যেমন- “হাঁটু খুলে নেব”, “ড্রেনে দাঁড় করিয়ে সিমেন্ট করে দেব”, “চল্‌ ফোট্‌”- এমন আরও কত কী! স্যারকে একদিন দেখলাম, টিফিন পিরিয়ডে গেট টপকাতে। বললেন- “আজকে ডিস্কো ড্যান্সার আছে।” চিন্ময়বাবু খুব একটা মারতেন, বকতেন না। কিন্তু তাঁর বকুনি খেয়ে বহু ছেলে শুধরে গিয়েছিল। পাঁচ বছর স্যার আমাদের স্কুলে পড়িয়েছিলেন। স্যার যেদিন চলে যাবেন, সেদিন ওনার বাড়ি গিয়েছিলাম। কলেজে চাকরি পেয়ে স্যার পুরুলিয়ায় চলে যাচ্ছিলেন। অনেক কথা বলেছিলেন। বলেছিলেন, “চরৈবেতি,চরৈবেতি।” স্যার সত্যিই আনসাং হিরো। কটা লোকই বা জানে স্যারের নাম। জানার কথাও নয়। ওইদিন একটা রেকর্ডে আমাদের তিমির ডাক শুনিয়েছিলেন স্যার। কী অদ্ভূত গুমরে ওঠা, অস্পষ্ট ডাক। অবুঝ একটা কষ্ট। একটা বিরাট মনখারাপের তিমি যেন জলের অনেক তলায় নিয়ে যাচ্ছিল আমাদের। তারপর একদিন দেখেছিলাম স্যারকে। চাদর মুড়ি দিয়ে রিক্সা করে স্কুলে ঢুকছেন। সেই শেষ। পুরুলিয়া যাওয়ার বছর তিনেকের মধ্যেই হার্ট অ্যাটাক। কিন্তু যে ছাত্ররা স্যারের সঙ্গে এসেছিল, স্যারের সঙ্গেই বেরিয়ে গেছে স্কুল থেকে, তারা কোনোদিন ভুলতে পারবে না চিন্ময়বাবুকে।
আরেকটু বড় বয়সে আরেক স্যারকে দেখলাম। সায়েন্স ছেড়ে বাংলা পড়তে এসেছি, কিন্তু সায়েন্সের গুমোর তখনও যায়নি। টাকমাথা, ফুলহাতা শার্ট গুঁজে পরা সেই ভদ্রলোক আমাদের বললেন, যে বাংলা পড়ার একটা ধরণ হয় আলগোছে, জানলা দিয়ে বাইরের দৃশ্য দেখতে দেখতে। আরেকটা ধরণ হয় খাটিয়ে। যেভাবে ডাক্তারি, ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি পড়ে লোকে, সেভাবেই বাংলাটা পড়ো। শুনে মন আহ্লাদে ভরে উঠল।
স্যার পড়াতেন। ক্লাসগুলো শেষ হয়েও শেষ হত না। তা রবীন্দ্রনাথ, বঙ্কিম বা সাহিত্যতত্ত্ব- যা-ই হোক না কেন। ক্লাসের শেষেও কথা চলত, আমি একটু বেশী প্রশ্ন করতাম। স্যার কিন্তু সব প্রশ্নের উত্তর দিতেন। তর্কও লাগত। তর্ক যে কত জরুরি একটা বিষয়, তখনই শিখেছিলাম। ফার্স্ট ইয়ারের ছাত্র বলে সামান্যতম অবজ্ঞাও দেখিনি। সাহিত্য, সাহিত্যতত্ত্ব, সাহিত্য- সমালোচনাকে কতটা নিষ্ঠা নিয়ে ভাবা যায়, তার একটা প্রায় পৌরাণিক ছবি স্যারের মধ্যে দেখেছিলাম। বাংলা ডিসিপ্লিনকে প্রায় একার হাতে তৈরি করেছেন যাঁরা, স্যার তাঁদের একজন। ছাত্রদের ভালোবাসা পেয়েছেন ঠিকই, কিন্তু এই রদ্দি বাংলা বাজারের ঘুঘুর বাসা ভাঙতে গিয়ে যে অন্যায় নিন্দা ও অপমান পেতে হল তাঁকে, তা প্রায় কৌমলজ্জার বিষয় হওয়া উচিত। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক পুরস্কার তিনি পাননি (জানি তিনি ওসবের কেয়ার করেন না), যা পাওয়া একান্তই উচিত ছিল। আমার চোখে তপোব্রত ঘোষ এক আনসাং হিরো।
সুব্রতদা মানে আমাদের সুব্রত সরকার এখনও কোনো সরকারী পুরস্কার পাননি। তাঁর যে সেসব নিয়ে কোনো মাথাব্যথা আছে, এমনও নয়। কবিতার বিভাসকে তিনি হাতে ধরে ফেলেছেন বহুকাল, সেইসঙ্গে অস্বীকারও করেছেন যেন কবিতার মুহূর্তকে আজও ধরতে পারেননি তিনি। কী কবিতাটাই না লিখেছেন! যদিও বাদ দেওয়ার কোনো কারণই ঘটেনি, তবু যদি ছোট কবিতাগুলো বাদই দি, থেকে যাবে দীর্ঘ কবিতাগুলি- ‘তোমাকে মিথ্যা বলেছি’, ‘বহুৎ আঁধিয়ার হো বাবু, হামে কুছ রোশনি চাহিয়ে’ আর ‘ফারেনহাইট ফোর ফিফটি ওয়ান ডিগ্রি’। দীর্ঘকবিতার ইতিহাস যদি লেখা হয় বাংলা সাহিত্যে, তাহলে সুব্রত সরকারকে অন্যতম প্রধান একটি জায়গা দিতেই হবে। যদি তা না দেওয়া হয়, তবে মিথ্যা বলা হবে, সত্যকে অস্বীকার করা হবে।
কলোনির ভেতর থেকে সরু চোখে পৃথিবীটাকে দেখা। সেই দেখা, সেই প্রিজম এক আশ্চর্য উপহার। সুব্রত সরকারের মোটরসাইকেল, নারী, সুরার প্রবাদ চিহ্নিত করে না তাকে। চিহ্নিত করে এক পরমসুন্দর বেদনাবোধ, কবিতার প্রতি অপার্থিব ভালোবাসা। নাটক থেকে, খেয়োখেয়ি থেকে দূরে, যেন কবরখানার অযত্নলালিত খেয়ালি প্রকৃতির সৌন্দর্য তার কবিতায় বারবার উঠে এসেছে। আমার মনে হয়েছে, সুব্রতদা যতটা কবি সুব্রতদা, ততটাই বড় শিক্ষক। যে জ্ঞান অগ্রজরা, অনুজদের কাছে পৌঁছে দিতে চায় না, সুব্রতদা এই নিষ্ঠুর জীবনসংগ্রামে টিকে যাওয়ার শিক্ষাটাও দিয়ে দেয় কিন্তু সে সবাই জানেনা।
তাই সুব্রতদা আমার দেখা এক আনসাং হিরো তো বটেই।
পা হড়কে পড়ে যাওয়ার মত হলে বারবার মনে হয় একজনের কথা। যার কাছে ঘটেছিল নক্ষত্রপরিচয়, অক্ষরপরিচয়। ছাদ থেকে আকাশ দেখা আর পাতাল থেকে নক্ষত্র খোঁজা এক না। তবু চেষ্টা করি। অঙ্কে তবু বারবার ভুল হয়ে যায়।
তিনি আগলে রাখলেন সারাটা জীবন। ক্ষমা করলেন। সারাজীবন মফঃস্বলের কলেজে পড়িয়ে, বাজার করে, ডাইরি লিখে, বিড়াল পুষে দিব্যি কাটিয়ে দিলেন। উচ্চাকাঙ্খার খপ্পরে পড়তে তাঁকে দেখা যায়নি। আই. আই. টি.-র ফিজিক্স হওয়া সত্ত্বেও অহংকারের লেশমাত্র তাঁর নেই। তাঁর যে অঙ্কে ভুল হয় না। সাহিত্য না ভেবে জীবনটা তো অঙ্ক ভাবলেও পারতাম। হয়ত সেও এক অন্য কবিতা হতে পারত।