ইচ্ছেকুসুম

সাদিয়া সুলতানা

আমি জানতাম কাজটা করা ঠিক না তবু করে ফেলতাম। সপ্তাহে একবার কিংবা দুবার। অবশ্য রোজ যে নতুন কিছু থাকতো তা না। মায়ের মতো ব্যস্ত মানুষ কি আর রোজ ডায়েরি লেখার সময় পেতো? আমার না হয় রোজ পড়ার সময় থাকতো, লেখারও। ব্যস্ত মায়ের হাতে তো অত সময় থাকতো না। এখনো নেই। তবু আগে প্রায় রোজই মা ডায়েরি নিয়ে বসতো। মাকে কোনোদিন রাতে খাটের ওপর আসন গেড়ে বসে বালিশের ওপর ডায়েরি রেখে লিখতে দেখলে আমি লোভী লোভী চোখে ঘরের আশেপাশে ঘুরে বেড়াতাম।
বড় হতে হতে আমি কী করে যে মায়ের ডায়েরির লোভে পড়ে গেলাম! এ কি খুব পাপ? খুব অন্যায়? লুকিয়ে লুকিয়ে কারো ব্যক্তিগত কথা পড়ে ফেলা? বারে, মা তো আমাকেই সম্বোধন করে ডায়েরি লেখে! তবে কেন মায়ের ডায়েরি লুকিয়ে পড়া পাপ হবে? পাপ হলে হোক, আমি পড়বোই! স্টাডি রুমের কম্পিউটার টেবিলের ড্রয়ারের চাবি কেন মা ঘরের কি হোল্ডারেই ঝুলিয়ে রাখে? অত গোপন চাবি কেন মা আরো গোপন জায়গায় রাখে না? রাখলে আমার কী দোষ!
মনে নেই কবে কোন কৌতূহলে মায়ের ড্রয়ারে হাত দিয়ে আমি সাত রাজার ধন হাতে পেয়েছিলাম! সেদিন থেকে রোজ লুকিয়ে মায়ের ডায়েরি পড়তাম। পড়তাম মানে এখনও পড়ি। কিন্তু দীর্ঘ একবছর হয়ে গেল, মায়ের ডায়েরির পাতায় আর নতুন কিছু নেই। মা এখন আর ডায়েরি লেখে না। তবু আমি পেছনের পৃষ্ঠা উল্টাই। এই পৃষ্ঠাগুলো আমার খুব প্রিয়। মায়ের ডায়েরি আমার শৈশবের রংধনু রং মাখা। এই ডায়েরি পড়তে পড়তে আমি হাসি, কাঁদি।
মা অফিস থেকে ফিরলে খুব ইচ্ছে হয় মাকে জড়িয়ে ধরে বলি, আর লিখো না কেন মা? আমি যে অপেক্ষায় থাকি! কিন্তু বলতে পারি না।
বাবা আর মায়ের জন্য আমার সব সময়ের অপেক্ষা। তাদের ঘরে ফেরার, তাদের ছোঁয়া পাওয়ার, তাদের কণ্ঠস্বর শোনার। এই অপেক্ষায় থাকতে থাকতে আমিও মায়ের মতো লিখতে শুরু করেছি। ডায়েরি, মাই ডিয়ার ডায়েরি। আমার আর মায়ের ফেলে আসা প্রতিদিনের গল্প, আমার আর মায়ের যাপিত প্রতিদিনের গল্প লিখি সেখানে।
ছেলেবেলার যেই সময়ের স্মৃতি মনে করতে পারি, তার প্রথম দৃশ্য হচ্ছে, মা আমার চুলে ঝুঁটি করতে করতে বাবাকে বকছেন, ‘উঠেছো? এখনো বিছানা ছাড়ছো না? রেডি হচ্ছো না? গোসলে যাও, আনন্দীর ব্যাগ গোছাও, আমি আর পারছি না। রোজ দেরি করে গাড়িতে ওঠো! ভাল লাগে না আর। আমার সকাল শুরু হয়েছে কখন কিছু কি টের পাও?’
বাবা টের পেতো না। আজও পায় না। বাবা শুধু টের পায় ডিমে লবণ কম না বেশি, ভাজি হাড়ির তলায় ধরে গেছে কিনা, সখীর রুটি পুড়ে গেলো কিনা। কিন্তু আমি টের পেতাম, মায়ের সকাল কখন শুরু হতো। বিছানায় মায়ের গায়ের ওম আমাকে ছেড়ে যেতেই আমি টের পেতাম, মা ছুটছে। রান্নাঘর থেকে বেডরুম। চুলা থেকে আলনা। দাদার জন্য ডিমপোচ, বাবার জন্য ডিমভাজি, আমার জন্য ডিম সিদ্ধ। আমার স্কুল ড্রেস, বাবার শার্ট, গেঞ্জি, লুঙ্গি আলনাতে রাখতে রাখতে মা কখন যে নিজে শাড়ি পরে ম্যাজিকের মতো রেডি হয়ে যেতো, আমি অবাক হয়ে যেতাম।
শাড়িপরা পরিপাটি মাকে তখন অন্যরকম লাগতো, মনেই হতো না একটু আগে এই মানুষটিকে বুয়ার মতো কাজ করতে হয়েছে। সব রঙের শাড়ির সঙ্গে মায়ের কপালের লাল টিপটা কী অদ্ভুতভাবে যে মানিয়ে যেতো!
মা এখনো শাড়ি পরে, টিপ পরে না। তবু মা এখনো খুব পরিপাটি। মায়ের সকালের ছুটোছুটি এখন কমে এসেছে। যেদিন থেকে আমি নিজের কাজ নিজে করছি সেদিন থেকে মায়ের সকালটা দীর্ঘ হয়েছে।
আমাকে তৈরি করবার তাড়া নেই। টিফিন দেবার ঝামেলা নেই। আর সখী আমাদের বাড়িতে থাকার পর থেকে মায়ের রান্নাঘরের ব্যস্ততা কমে এসেছে। তবু অফিস যাবার আগে সংসারের দাঁড়িকমা ঠিক করতে করতে আজও অফিসের গাড়ির জন্য মাকে দৌড়েই যেতে হয়।
বাবা সময়ের কাছে হেরে যায় আর মায়ের কাছে সময় বারবার হেরে যায়। আমি বরাবর তাই দেখছি, সেই ছোট্টবেলা থেকে এখন অবধি। দশ বছর আগের মতো এখনো সময়ের সাথে লুকোচুরি খেলে মা সপ্তাহে একবার আমার চুলে শ্যাম্পু করে দেয়, মাসে একবার হাতের-পায়ের নখ কেটে দেয়, কোনো কোনো দিন বিকালে আমার বান্ধবী চর্যার মতো চোখ বড় বড় করে জানতে চায়, ‘আনন্দী, শপিঙে যাবি?’
তবে মা আমাকে বন্ধের দিন পিন্নিপনাও শেখায়। শুক্র-শনিবারতো ঘরে কাজের শেষ নেই। মায়ের সঙ্গে ঘর গোছাতে আমাকেও হাত লাগাতে হয়। আমার ঘরের জঞ্জাল সরাতে আমি ক্লান্ত হয়ে যাই তবু মা ছাড়ে না। মাঝে মাঝে কোনো শুক্র-শনিবার মায়ের মিটিং থাকলে আমি আমি হাঁপ ছেড়ে বাঁচি।
মায়ের বেশি মনোযোগে মাঝেমাঝে আমার অস্থির লাগতো, আজো লাগে। কী অদ্ভুত মায়ের অমনোযোগেও আমার অস্থির লাগতো, আজো লাগে। সেই যে ঝুঁটি বাঁধার দিনে রোজ রোজ কেন মা ফাঁকি দিতে এক ঝুঁটি করতো! শুক্রবার ছাড়া কেন ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, চিকেন ফ্রাই হবে না! মা কেন স্কুল থেকে আনতে যাবে না!
এই মা-ই আমাদের সব। মা আমাদের অভিযোগের ডাকবাকশো। আবার কথায় কথায় মায়ের দিকেই আমরা অভিযোগের আঙুল তুলি। মা ভাঙে না, মচকায় না। মা এক অবিশ্বাস্য শক্তি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে অবিচল। মা আবার সময়মতো রুখেও দাঁড়াতে জানে। বাবা বলে, তোর মা একজন দস্যি মেয়ে। কথাটা একেবারে সত্যি, মা আমার সময়ে সময়ে দস্যিই হয়।
খেয়াল করে দেখেছি কারো কারো কিছু কথা শুনলে মা রাগে চিড়বিড় করতে থাকে। অথচ বুঝতে দেয় না। মুখে একটা আজব হাসি ঝুলিয়ে সেসব কথাবার্তায় সম্মতি দিয়ে যায়, তারপর হুট করে গালে চড় বসানোর মতোন এমন এক কথা বলে যা শুনে বেচারা পালানোর পথ পায় না।
সেদিন তাহের আংকেলের সঙ্গে মা কি কাণ্ডটাই না করলো! তাহের আংকেল কানাডা থেকে ফিরেছে। তিনি আমার বাবার বন্ধু। রাতের ডিনার শেষে সবাই যখন ড্রয়িংরুমে বসে গল্প করছিল তখন আমি সঙ্গেই ছিলাম। আমি ঠিক বুঝি কখন বড়দের গল্পে থাকা যায়, কখন যায় না। ছোটবেলা মা কায়দা করে আমাকে সরিয়ে দিতো, এখন আমি নিজেই সরে যাই।
তাহের আংকেল মায়ের দিকে তাকিয়ে বক্তৃতা দেবার ভঙ্গিতে বলছিল, বাংলাদেশের অবস্থা খুব খারাপ। দেশ দুর্নীতিতে ডুবে গেছে। অধর্মের সীমা নেই। ধর্মহীনতা আর বেহায়াপনা বেড়েছে বলেই হিজাবী কালচার বেড়েছে। সমান অধিকারের নামে মেয়েরা চাকরিবাকরি করতে রাস্তায়, মাঠে ময়দানে নামার পর থেকেই দেশের এই অনিষ্ট শুরু। বাচ্চাকাচ্চা লালনপালন বাদ দিয়ে ডিজিটাল মায়েরা বেআব্রু হয়ে অধর্ম করে বেড়াচ্ছে। কোমলমতি শিশু যুবকদের মাথা ঘোরাচ্ছে। আর অন্যদিকে প্রকৃত ধার্মিকরাই নাজেহাল হচ্ছে রাষ্ট্রযন্ত্রের হাতে।
তাহের আংকেলের আসন্ন দুর্ভোগের কথা ভেবে আমি মিটিমিটি হাসছিলাম আর সকলের কথোপকথন শুনছিলাম। বাবা বিব্রত মুখে বসে ছিল। আমাদের বাসায় এভাবে কেউ কথা বলে না কখনো। আর মায়ের সামনে তো নাই’ই। সেদিন তাই আমি মনোযোগ দিয়ে সব শুনছিলাম।
আমি আমার ডায়েরির পাতায় সব লিখে রেখেছি।
‘একদিকে ঠিকই বলেছেন ভাই, ঘরে বসে আমি আর ভাবী যদি পর্দাপুশিদা করতাম তাহলে ভালই হতো। এখনতো এইকাল সেকাল দুটাই হারাচ্ছি। তবে ভাবী যেভাবে হিজাবটা মেনটেইন করে আমার কিন্তু বেশ লাগে। ফেসবুকে ছবি দেখিতো। নতুন নতুন হিজাবে প্রায় প্রতিদিনই প্রোফাইল পিকচার বদলান।’
মায়ের মুখে তখন দুষ্ট দুষ্ট হাসি।
‘আপনার ভাবী আবার বিদেশে গিয়েও দেশী কালচার ভোলেনি। আর আমিও বলেছি পর্দা করে চলবে, অধর্ম করে বেড়ানো মেয়েমানুষ আমার পছন্দ না।
‘হুম, ভাবীকে স্যালুট। এত পড়াশুনা করে উন্নত একটা দেশে থেকেও বাসায় বসে রায়না মামণিকে সময় দিচ্ছে।’
‘তা ঠিক। আমি সেজন্যই তো ওকে চাকরি করতে দিলাম না। বিদেশে অবশ্য এসব নেই। কিন্তু হাজার হোক, আমরা বাঙালি তো। বাঙালি মা মানেই ঘরদোর সামলানো। আপনার ভাবী খুব ঘরোয়া মেয়ে।’
‘হুম। তাইতো দেখি, কানাডা বসেও পাটিসাপটা, ভাপা পিঠা বানায়। তা ভাই চাকরিজীবী মায়েরা কি ঘরোয়া না?’
‘তা তো আর সম্ভব না। বাচ্চাদের জ্বর হলেই আজকালকার মায়েরা মাথার পাশে বসে জলপট্টি দেবার টাইম পায় না।’
‘আনন্দীর জ্বর এলে মা-দাদীদের মতো আমি আর আনন্দীর বাবা পালা করে আনন্দীর কপালে জলপট্টি দিই। আপনার জন্য এর পরেরবার ভিডিও ফুটেজ রেখে দিবো। যাহোক রায়না মা কেমন আছে?’
‘আছে আলহামদুলিল্লাহ। হলি আর্টিজনের ঘটনার পর তো আর দেশেই ফিরছে না মানুষ। ভেবেছি রায়নাকে কানাডাতেই সেটেল করাবো। ডাক্তারি পড়াবো মেয়েকে।’

‘কষ্ট করে ডাক্তারি পড়াবেন কেন মেয়েকে? নেপোলিয়নের শিক্ষিত মা পেতে তো ডাক্তার মা লাগে না। ভাবীর মতো গ্রাজুয়েট হলেই হয়। আর দেশে আসার দরকার নেই, এত দামী জানটা হাতে করে বিদেশেই পড়ে থাকেন ভাই। বিদেশে মানুষ অমর!’
এরপর তাহের আংকেলের চেহারাটা যা হয়েছিল না! মনে করে মা আর আমি এখনও হাসি।
মা কপালে এলিয়ে পড়া চুলের গোছা আলতো করে কানের পাশে সরিয়ে নিতে নিতে মিষ্টি হেসে যখন তাহের আংকেলদের মতো মানুষদের জব্দ করে আমি তখন মুগ্ধ হয়ে মায়ের দিকে তাকিয়ে থাকি। মায়ের এই হাসিতে যেন অনেক কথা বলা হয়ে যায়। আর এই হাসিতেই আমার ইচ্ছেকুসুম পাপড়ি মেলে।
আমি মনে মনে ভবিষ্যত পরিকল্পনা করে ফেলি-আমি আমার মায়ের মতো দস্যিই হবো।