স্বাধীন, আমার কেউ না ...

সৌমিতা চট্টরাজ

এই স্বাধীন টা কে নিয়ে হয়েছে যত জ্বালা। স্বাধীন মানে স্বাধীন বাউরী, কেয়ার অফ জল-হাওয়া-মাটি-আকাশ। বয়স আনুমানিক তেরো। ক্লাস রোলনম্বর ঠিকানা কিছুই জানা নেই। স্পেশাল মার্ক অফ আইডেন্টিফিকেশন:- থুতনি থেকে ডান গাল পর্যন্ত শুকনো সেলাইয়ের দাগ। স্বাধীন এখনো যুক্তাক্ষর পারে না। এও জানে না যে অশোকচক্রের পেট ফুটে এফোড় ওফোড় হয়ে গেছে চব্বিশটা স্পোক । সাইকেল রিপেয়ারিং দোকানের ফেলে দেওয়া টায়ার চালাতে চালাতে বছরের তিনশো পঁয়ষট্টি টা দিন উদ্ভ্রান্তের মতো দৌড়াতে থাকে সে। বলিহারি সেই মরণপণ দৌড় দৌড় দৌড়... জিলিপি রেসের সুতোয় ঝুলতে থাকা আচ্ছে দিন মুখের মধ্যে আসে আবার সরে সরে যায়। ধপাস করে মুখথুবড়ে পড়ে স্বাধীন, ধুলো ঝেড়ে পরক্ষণেই রেডি। দৌড় আভি ভি বাকি হ্যা জনাব...নতুন সুতো, নতুন জিলিপি, নতুন রেস, পুরোনো টায়ার। কোচিংএর সিঁড়ির তলায় এসে বেশ কয়েক দিন থামতে দেখেছি ওকে। টায়ার বিরোধীতা করে নাকি শ্বাস! বুঝে উঠতে পারিনা। ভ্যালভ্যালে চোখে খানিক চেয়ে থাকার পর দুড়দাড় পায়ে উঠে আসে ওপরে। জল গেলে ঢকঢক করে। এখানে যারা পড়তে আসে আমার কাছে প্রত্যেকেই স্বাধীনের বয়সী, স্বাধীনের মতো। যুক্তাক্ষর বিহীন বানান গুলো ওদের আগের থেকেই রপ্ত। এই যেমন খিদে, ভাত, ছাদ, কাজ আরো কত কি! তেরো জনের মধ্যে কেউ কেউ বিস্কুট বানান টা লিখতে শিখেছে অনেকদিনের চেষ্টায়। স্বাধীন মাঝেমধ্যে ওদের পাশে এসে বসে। শেষ অবধি থাকে, পড়ানো শেষ হলে আমার সাথেই পথ ধরে কোথাও একটা ফিরে যাবে বলে। রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে ওকে ওর নামের বানান জিজ্ঞেস করি, মানে শুধাই। সেলাইয়ের দাগ টা চুলকাতে চুলকাতে খিলখিল হাসে ভ্যালভ্যাল তাকায়। ওকে খুব কাছ থেকে ছুঁয়ে দেখেছি আমি। পরিষ্কার মানুষের চামড়া। সোঁদা সোঁদা গন্ধ। পরিযায়ী পাখির পালক কোত্থাও তো লেগে নেই! দুটো ডানা আছে অবশ্য যেটার ওপর আমারও চিরকালীন লোভ। জানি না ওর কান্না শোনার সৌভাগ্য আদৌও কোনো প্রসূতি সদনের হয়েছিল কিনা, এও জানা নেই যে সবুজ পর্দা ফাঁক করে হাসিহাসি মুখে নার্স দিদির কোলে চেপে ছেলেটা ছুঁতে পেরেছিল কিনা মায়ের হলদেটে কলস্ট্রাম। হয়তো ভারী ভারী ঝমাঝমের নীচে একদা একদিন দাফন হয়ে গেছে ওর পিতৃ পরিচয়! ভীষণ ইচ্ছে করছিল লেখাটার শুরুতেই লিখি চরিত্র গুলো কাল্পনিক এবং ঘটনাটিও কাকতালীয়। কিন্তু গতকাল রাতে বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথ আর নজরুল মিলে তুমুল জুতোপেটা করল আমায়। যখন স্বাধীন আমার কেউ না, রবি দুখু বিলে এরাও তো কেউ নয়।