ইতিহাস লেখা বাকি

শতাব্দী দাশ

'আমরা তো এসেছিলাম নারী-পুরুষে, ধর্মে ধর্মে জাতিতে জাতিতে কোনও বিভেদ থাকবে না এটা জেনেই। যা কিছু সামন্ততান্ত্রিক, তাকে দূর করবে আমাদের এই রাজনীতি। কিন্তু যখন বুহিয়ে দেওয়া হল, আমরা নারী, এখানে একটা লক্ষণরেখা টানা আছে আমাদের জন্য, তখন মনে হল তাহলে কি বাড়ি-ঘর ছেড়ে ভুল করলাম?'


-কৃষ্ণা বন্দ্যোপাধ্যায় (নক্সাল আন্দোলনে মেয়েরা)



ট্রে থেকে দু কাপ কফি নামিয়ে বেয়ারা চলে গেল। যাদবপুরের এক ঠেক। তৃতীয় পরিসরের বাম আন্দোলনের এক মহিলাকর্মী কথা বলতে এসেছেন এক গৃহহিংসা-কর্মীর সঙ্গে।


-আমি গৃহহিংসা বিষয়ে কিছু আলোচনা বা সেমিনারের আয়োজন করতে চাই আমাদের মেয়েদের জন্য।


-আপনাদের মেয়েদের বলতে?


-বাংলার তৃতীয় পরিসরের বামকর্মী যারা। মানে সংসদীয় বাম নয় যারা। বিভিন্ন দলে-উপদলে বিভক্ত হলেও তাদের মধ্যে কিছু যোগাযোগ তো আছেই। তাদের নিয়ে যদি গৃহহিংসা বিষয়ক একটি আলোচনা শুরু করা যায়…


-ভালো প্রস্তাব।


-ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলি। আসলে আমাদের এখানে, গৃহহিংসা ঠিক শারীরিক হিংসা হিসেবে উপস্থিত নেই। কিন্তু আপনার বই-এ মানসিক হিংসা যেভাবে বর্ণিত হয়েছে, সেভাবে তো অবশ্যই আছে।


-যেমন?


-যেমন ধরুন, মেয়েটির কেরিয়ার শেষ হওয়ে যাওয়া। কেরিয়ার অর্থে এখানে রাজনৈতিক জীবনের কথা বলছি। সেটা তো শেষ হয়ে যায়, প্রায় যে কোনো মধ্যবিত্ত বাড়ির গেরস্ত বউটির কায়দায়৷ অথচ তা হয় বিপ্লবের নামে। এটার মধ্যে নির্মমতা নেই? এই মেয়েরা তো এককালে বিপ্লবের স্বপ্ন নিয়েই রাজনীতি করতে এসেছিল পুরুষ কমরেডদের মতো। রাজনীতি করতে এসেই তার সঙ্গে হয়ত প্রণয় হল কোনো কমরেডের। তারা বিয়ে করল৷


তারপর ছেলেটি হোলটাইমার হল। সে সরকার-বিরোধী নানা আন্দোলনের মুখ হয়ে উঠল। আর মেয়েটি? বিয়ের পরেও সে প্রথম প্রথম মিটিং-এ আসত। তারপর তার হয়ত মিটিং-এ পৌঁছতে দেরি হতে লাগল নানা গৃহকাজে। তারপর সে অনিয়মিত হয়ে পড়ল। তারপর একদিন হারিয়ে গেল। তার কষ্ট হয় না? মানসিক নির্যাতন নয় এটা? আমার তো মনে হয়, গেরস্ত বধূটির চেয়েও বেশি মনোকষ্টে সে ভোগে। কারণ সে তো শুনেছিল, শিখেছিল মুক্তি, বিপ্লব সংক্রান্ত অনেক তত্ত্ব। কেমন লাগে তার?


আমাদের আগের প্রজন্মে এই ঘটনা, জানেন, বিরল কিছু নয়। এটাই...এটাই প্যাটার্ন। আর আমাদের আগের প্রজন্মের মহিলারা মেনেও নিয়েছে এই বাধ্যতামূলক পশ্চাদপসরণ।


-কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার হল, তারা তা মেনে নিয়েছেন 'ইন দ্য নেম অফ পেট্রিয়ার্কি' নয়, বরং 'ইন দ্য নেম অফ রেভোলিউশন'। নয় কি?


-হ্যাঁ৷ পার্টিও এই ব্যবস্থায় কোনো অসুবিধে খুঁজে পায়নি। পরিবার পিছু একজন হোলটাইমার তো পাওয়া যাচ্ছে, মন্দ কী?


গোল বেধেছে এখন, এই সময়ে। সেইসব লিঙ্গ-নির্ধারিত ভূমিকা এই মেয়েরা আর মানছে না, যা তাদের মা-মাসিরা মেনে নিয়েছিল একরকম। তারা হয়ত পূর্বনারীদের থেকে আরও বেশি জেনেছে লিঙ্গসাম্য সম্পর্কে। তারা অদৃশ্য হয়ে যেতে অস্বীকার করছে। তারা বিপ্লবীর নীরব সহকারী হয়ে থাকতে চায় না। তাই তাদের মনে ঝড়ও বেশি উঠছে। অথচ তারা যে একরকম নির্যাতনের শিকার, মানে তারাও যে নির্যাতনের শিকার হতে পারে, অনিচ্ছাকৃতভাবে হলেও, সেটাও তারা পুরোপুরি মেনে নিতেও পারছে না।




*****



অদৃশ্যমানতা আর নীরবতা খুব চেনা চেনা ঠেকে। নকশাল আন্দোলনেরও আগে থেকে তা পরিচিত। এই যেমন, চন্দপিঁড়ির অহল্যাকে কেউ চেনে না। লালগঞ্জ, চন্দনপিঁড়ি – দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার কাকদ্বীপের আশেপাশের এই অঞ্চলগুলিতে তেভাগা আন্দোলন জমে উঠেছিল। চন্দনপিঁড়িতে পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছিলেন গর্ভবতী অহল্যা। সেইসঙ্গে উত্তমী, বাতাসী, সরোজিনীরাও। ইতিহাসে তাঁরা অদৃশ্য আজ৷ ইলা মিত্র বা মণিকুন্তলা সেনকে যদি বা কোনোমতে মনে রাখা গেছে, কৃষক-মেয়েরা হারিয়ে গেছেন। যে মেয়েরা কাস্তে আর লাঠি হাতে নির্দ্বিধায় চল্লিশের দশকে মিছিল হেঁটেছিলেন।রানী দাশগুপ্ত লিখছেন,“কমরেড বিমলা মাজীর নেতৃত্বে জঙ্গী কৃষক নারী বাহিনী দা, বঁটি ও ঝাঁটাসহ কোঁচড়ে ধুলোর সঙ্গে লঙ্কা নুন নিয়ে প্রতিরোধে এগিয়ে যায়।' অথচ সেই বাহিনীর একজনকেও আমি চিনিনা।। নায়কের তকমা কে পাবেন, আর কে পাবেন না, তা গূঢ় ও জটিল রাজনৈতিক বিষয়। লিঙ্গ আর বর্ণ, এমনকি বাম আন্দোলনেরও মূলধারার ইতিহাস রচনাতেও, নির্ণায়ক ভূমিকা নেয়। অথচ তেভাগার কালে নাকি দিনাজপুর, যশোর এবং চব্বিশ পরগনায় নারীরা বেপরোয়া হয়েছিলেন। যশোরের নড়াইল মহকুমায় খাদ্য-বস্ত্রের দাবি নিয়ে নাকি মিছিলে হেঁটেছিলেন পাঁচশ মহিলা।


আমরা জানিনা কিশোরী বধূ মনোরমার নাম, ১৯৪৯ সালের ৯-ই সেপ্টেম্বর সাঁকরাইলের হাটাল গ্রামে ভরদুপুরে পুলিশী প্রহরায় জমিদারের বাহিনী ধান কেটে নিয়ে গেলে যে শাঁখ বাজিয়ে গ্রামের লোকজনদের জানয়েছিল। তারপর সে পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছিল। সে তখন সদ্য চোদ্দ। আবার হুগলি জেলার ডুবির ভেরীতে যে সাতজন মহিলা একইভাবে মারা গেছিলেন পুলিশের গুলিতে, তাঁদের তো নামও জানা গেল না। শহীদদের নাম লেখা থাকল কারও মা, কারও বউ হিসেবে। (সূত্র:'তেভাগা আন্দোলনের ইতিহাস', কুনাল চট্টোপাধ্যায়)


কারও মা, কারও বউ...এই যেমন লীলা মজুমদার। যাদুকরী লেখিকাটি নন। কমরেড চারু মজুমদারের স্ত্রী। চারু মজুমদারেরও এক স্ত্রী ছিলেন। তাঁর সন্তানাদি আছেন যখন, স্ত্রী তো অবশ্যসম্ভাবী। কিন্তু সেই স্ত্রীর মৃত্যুর আগে পর্যন্ত তাঁকে নিয়ে বিশেষ চর্চা হয়নি। মৃত্যুর পরেও যে খুব হয়েছে, তা বলা যায় না। মৌসুমি ভৌমিক একটা বই সম্পাদনা করেছিলেন, 'লীলাদি, এক অন্য রাজনৈতিক যাপন'। সেখানেও আমরা 'লীলাদি'-র স্বর পাইনি তেমন৷ যাদবপুরের ঠেকে আজকের কর্মী মেয়েটি যে 'নীরবতা'-র কথা বলেছিলেন, পরবর্তী জীবনে সেই নীরবতাই তিনি অবলম্বন করেছিলেন নক্সাল আন্দোলন সম্পর্কে, এবং নক্সাল আন্দোলনের ইতিহাস তাঁর সম্পর্কে৷


অথচ তেভাগা আন্দোলন থেকে শুরু করে তৎপরবর্তী কমিউনিস্ট আন্দোলনের লীলা মজুমদার ছিলেন সক্রিয় কর্মী। ছিলেন পার্টির সদস্যও ছয়ের দশকের শেষ পর্যন্ত। মৌসুমি ভৌমিক বলেন, 'নৈঃশব্দ্যও তো রাজনৈতিক হয়ে যায়।' নিশ্চয়। কিন্তু কীরকম ভাবে তা রাজনৈতিক? বা কীরকম রাজনীতির কারণে তিনি সাধের রাজনীতি-ক্ষেত্র থেকে দূরত্ব বজায় রেখে বেছে নিলেন নৈঃশব্দ্য? তা অজানা থাকলেও আন্দাজ করা যায়।


ইলিনা সেন বা বাসন্তী রামণ যদিও বা তাঁকে বাম কর্মী ও নেত্রী হিসেবে মনে রাখেন, কি অবলীলায় প্রিয় কমরেড নিমাই ঘোষ লীলা মজুমদারকে স্মরণ করেন, শ্রদ্ধা জানান, 'চারু মজুমদারের সহধর্মিনী, অনুপ্রেরণদাত্রী' হিসেবে৷ লেখেন, 'লীলাদির মতো মানুষের কথা ইতিহাসে বহুল প্রচারিত হয় না। জীবনসঙ্গীর পাশে প্রেরণাময়ী হয়ে থাকেন তাঁর...লীলাদি যদি পার্টির সক্রিয় কর্মী হতেন তাহলে অনেক উচ্চপদে আসীন হতে পারতেন। কিন্তু নকশালবাড়ির রূপকার কম: চারু মজুমদার অসুস্থ অবস্থায় ওই সংগ্রামে সারা দেশকে যেভাবে উত্তাল করে নতুন স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন, তাঁর পাশে লীলাদির মতো মানুষ ছিলেন বলেই সম্ভব হয়েছে।' ( 'এক আত্মগোপনকারীর চোখে লীলাদি')


শ্রদ্ধার ঘাটতি নেই এই দৃষ্টিভঙ্গিতে, কিন্তু সে শ্রদ্ধা সেই সনাতনী মাতৃরূপী, ধাত্রীরূপী নারীর প্রতিই। এইমাত্র প্রাপ্য? ইতিহাস যদি বা তাঁকে মনে রাখে, এভাবে মনে রাখবে? তাই কি কাঙ্ক্ষিত ছিল?


********



'চারু মজুমদারের স্ত্রী' যেমন বিমা কোম্পানির হয়ে কাজ করতেন সংসার ভরণপোষণের জন্য, ঠিক সেভাবেই আশির দশকে বা নব্বই-এর দশকে স্কুলে পড়াতেন, সেলাইকল চালাতেন, নার্সিং করতেন নকশাল বাড়ির মেয়েরা, বউরা। তা বহিরঙ্গে হয়ত নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতার দ্যোতক। এমনকি উপার্জমক্ষম নারী ও অর্থনৈতিক ভাবে নির্ভরশীল পুরুষের সমীকরণটি দেখলে তাকে জেন্ডার বেন্ডারের উলটপুরাণও মনে হতে পারে। কিন্তু বিষয়টি আরেকটু জটিল। উপার্জন তাঁরা করতেন বটে, কিন্তু সেটা গার্হস্থ্য- প্রতিপালনেরই আরেক প্রবর্ধিত রূপ। সংসার, শিশু, বৃদ্ধদের দেখাশোনা ও সেইসঙ্গে সংসারের জন্য প্রয়োজনীয় উপার্জনটুকু করা -এই পুরো দায়িত্বটিকেই বিকল্প বাম রাজনীতি 'মেয়েলি' কাজ হিসেবে নির্ধারণ করেছিল নিজস্ব পরিসরে। আর পুরুষের কাজ ছিল প্রত্যক্ষ ভাবে রাজনৈতিক। লাল টুকটুকে ভোর আনবে সঙ্গীটি, এই বিশ্বাসে সেই মহিলারা 'নীরবে' সংসার চালিয়ে যেতেন। এইভাবে ছাত্র রাজনীতির ডাকসাইটে নেত্রী স্কুলে পড়াতে গিয়ে স্কুলের এঁদো রাজনীতিতে নিজেকে সঙ্কুচিত করেছেন। জীবনবীমা কর্মী জীবনবীমা অফিসের কর্মীদেরই সংগঠিত করতে চেয়েছেন৷ তাঁদের রাজনৈতিক শিক্ষা তাঁদের পিছু ছাড়েনি। অথবা তাঁরা এভাবেই সঙ্কীর্ণ পরিসরে মুক্তি খুঁজেছেন। তারপর আস্তে আস্তে নীরব হয়েছেন, অদৃশ্য হয়েছেন।


অর্থাৎ কিনা, প্রথমে বলা হল, পরিবারই নারীর যাঁতাকল। সেখানে 'রিপ্রোডাক্টিভ লেবার'-র পেষণের ফলে নারীর পক্ষে আর 'প্রোডাক্টিভ

লেবার'-এ অংশগ্রহণ সম্ভব হয়ে উঠছে না। তারপর নারীকে ঠেলে দেওয়া হল সেই রাঁধাবাড়া, যত্নআত্তি আর নিত্যনৈমিত্তিক পারিবারিক শ্রমের দিকেই। একটা মধ্যবিত্ত কমিউনিস্ট গার্হস্থ্য আবার আর পাঁচটা গার্হস্থ্যের থেকে কিছুটা আলাদা৷ সেখানে বৃহত্তর পরিবারের অংশ পার্টির সদস্য, কর্মী, সমর্থক কমরেডরাও। ক্ষুদ্রের মধ্যেও সেখানে বৃহতের নিয়ত পদধ্বনি। কিন্তু নারীটির ভূমিকা কী? সেই বৃহত্তর পরিবারের জন্য চা-জলখাবার এগিয়ে দিতে গিয়ে মিটিং-এর অনেকখানি তার শোনা হয় না৷ তাকে ঠেলে দেওয়া হয় এমন কাজে, যা মার্ক্সবাদীদের নিজেদের ভাষাতেই নাকি 'প্রোডাক্টিভ' নয়, যা ইতিহাসে 'নায়কোচিত' বলে মান্য নয়। সে ধীরে ধীরে

উধাও হয় মহৎ বিপ্লবের মূলমঞ্চ থেকে। যে রাজনৈতিক মতাদর্শ তাত্ত্বিকভাবে দাঁড়িয়ে আছে শ্রমের মূল্যের ওপর, সেইখানেই গার্হস্থ্য শ্রমকে 'শ্রম' না বলে কখনও বলা হয় 'আত্মত্যাগ', কখনও 'সহিষ্ণুতা'। তা বলে কি মণিকুন্তলা বা ইলা বা ইলিনারা ছিলেন না? ছিলেন। কিন্তু থাকার কথা ছিল আরও অনেকের।


এইমতো চলছিল বেশ। কিন্তু যত দিন যাচ্ছে, ততই নতুন কালের মেয়েরা আর বিপ্লবে নিভৃতচারিণী অণুপ্রেরণাদাত্রীর টোপটি গিলছেন না, শোনা যায়। তা নিয়ে গোল বাধছে বিস্তর। তাঁরা প্রশ্ন করছেন, এ কি নির্যাতন নয়? প্রতারণা নয়? তাঁরা ইয়াব্বড় লাল পতাকার গায়ে প্রথমবার আঁকছেন প্রীতিলতার মুখ। প্রীতিলতা উড়ছেন মিছিলের মাথা হয়ে। কল্পনা দত্ত বা কনকলতাদের তাঁরা বের করছেন কবর খুঁড়ে। সেই যে কবি বলেছিলেন, 'তুমি আলো/ আমি আঁধারের আল বেয়ে/ আনতে চলেছি লাল টুকটুকে দিন', তা শুনেও তাঁরা বেঁকে বসেছেন। সমান্তরাল আল বেয়ে তাঁরাও ছুটে আসছেন। অপার্থিব আলো হতে তাঁরা নারাজ। তাঁরা হতে চান প্রমিথিউস স্বয়ং। লাল টুকটুকে আগামি ভাবছে, লালতর, লালতম হতে হবে তাকে, এদের সঙ্গে পাল্লা দিতে গেলে। ধর্মতলার মোড়ে প্রীতিলতা হাসছেন।