নাম- “AFGAN GIRL”

অমিত সরকার



নাসিরবাগ রিফিউজি ক্যাম্প- ১৯৮৪
আমার কোন নিজস্ব নাম নেই। আমাদের অনেকেরই নেই। নেই মানে বাইরের মানুষের কাছে নেই। একটা শব্দ দিয়ে আমাকে ডাকা হয় নিশ্চয়, ঘরের ভেড়াটাকে বারবার ডাকতে হলেও তো একটা চেনা শব্দ লাগে। কিন্তু এখানে সেটা বাইরের লোকের কাছে বলা যাবে না। আমাদের আফগানিস্থানে অন্তত এটাই দস্তুর । সদ্য একটা ঘটনা বলি, আপনারা অনেকেই পড়ে থাকবেন হয়তো। ‘রাবিয়া’ বলে একটি মেয়ে করোনায় আক্রান্ত হয়েছিল কাবুলে। রাবিয়ার প্রচণ্ড জ্বর, সারা শরীরে ব্যথা, কাশিতে বুক ছিঁড়ে যাচ্ছে। অনেক ভাগ্য তার, তাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। ডাক্তার তাকে কোভিড-১৯ শনাক্ত করেন। প্রেসক্রিপশনের একদম ওপরে তার নাম লেখা ছিল । রাবিয়া বাসায় ফিরে তার খসম বা স্বামীর হাতে প্রেসক্রিপশনটা দিয়েছিল, যাতে সে তার জন্য ওষুধগুলো কিনে আনতে পারে । কিন্তু স্বামীর চোখে প্রথমেই পড়ল প্রেসক্রিপশনের ওপরে বড় করে রাবিয়ার নাম লেখা। রাগে উন্মাদ হয়ে গেল তার স্বামী। বাইরের ‘একজন অপরিচিত পুরুষের কাছে’ তার নাম প্রকাশ করার জন্য তাকে পেটাতে লাগল, শেষে গুলি করে দিল। খবরটা অবশ্য ‘আফগান টাইমসে’ বেরিয়েছিল। কিন্তু তাতে আর মৃত রাবিয়ার কী এলো গেল ?
আফগান সমাজে এখনো এটাই নিয়ম। 'বাইরের অপরিচিত' মানুষের কাছে মেয়েরা তাদের নাম গোপন রাখতে বাধ্য হয় পরিবারের চাপে। এমনকি ডাক্তারের কাছেও নাম বলা যাবে না। বলতে হবে ‘অমুক চাষীর মেয়ে’ অথবা ‘অমুকের বউ’। ঠিক সেইজন্যেই সারা পৃথিবী আমাকে ‘আফগান গার্ল’ বলেই চেনে। আমার আর কোন পরিচিতি নেই। আপনিও তো আমার ছবিটা অনেকবার দেখেছেন, ফটোগ্রাফারের নাম থেকে শুরু করে তার সবকটা ছবির ইতিহাস, এমনকি তার ডিভোর্সের তারিখটা অবধি হয়তো বলতে পারবেন, কিন্তু আমি জানি, আপনিও আমার নাম জানেন না।
খিদে আর মার ছাড়া ছোটবেলার কথা কিছুই আমার মনে পড়ে না। শুধু এটুকুই জানতাম আমরা জাতে পাখতুন। পাখতুনদের মধ্যে এখনো মেয়ে আর পোষা কুকুরের মধ্যে বেছে নিতে বললে অনেকেই পোষা কুকুরকে বেছে নেবে। আমার বাবার আবার অনেকগুলো মেয়ে। আফগান সমাজে ছেলে শিশুর মর্যাদা মেয়ে সন্তানের থেকে অনেক অনেক উঁচুতে৷ আজও এদেশে ছেলে সন্তানের জন্মকে অপরিহার্য ও সম্মানের বলে বিবেচনা করা হয়৷ আফগান দৃষ্টিতে ছেলে সন্তান হলো বংশের ও পরিবারের সম্মানের ধারক-বাহক৷ তাই যার ছেলে নেই, সবাই তাকে দেখে করুণার চোখে ৷ আর আমার আব্বু তো একে গরীব চাষী, তায় অশিক্ষিত। জেনেছি মোটামুটি ১৯৭৪ সাল নাগাদ আমার জন্ম। “খোঁকি, তুমি শ্বশুর বাড়ি জাবিস”, ওই যে আপনাদের রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন ১৮৯২ সালে, তার থেকে বিরাশি বছর পরেও কিন্তু ব্যাপারটা আদৌ ওরকম ছিল না, এমনকি আজও নয়। উনি সম্ভবত আফগান মেয়েদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অবস্থান সম্বন্ধে কিছুই জানতেন না। গ্রামীন আফগান মেয়েদের চেয়ে তাদের বাড়ির পালতু কুত্তাটাও অনেক বেশী আদর পায়। তারপর আমার ওই সবুজ চোখ। আশেপাশের মেয়েরা বলতো আমার ভেতরে নাকি শয়তান আছে। আমার দৃষ্টিতে নাকি রক্ত শুকিয়ে যায়। আমাকে ওই চোখের রঙের জন্যেই যে মেরে ফেলা হয়নি তার প্রথম কারণ আমার ভাগ্য আর দ্বিতীয় কারণ আমার নানির চোখ নাকি ছিল ঠিক আমারই মতন। আর আমার আব্বা ছিল তার খুব পেয়ারা। আমার চোখ দেখলে তার নাকি তার আম্মার কথা মনে পড়তো। যাই হোক খিদে, দারিদ্র আর অত্যাচারের মধ্যে বড় হতে হতেও, সত্যি বলছি আমার কিন্তু কোন অভিযোগ ছিল না। শিখিই নি, কেন বা কীভাবে অভিযোগ করতে হয়। এইরকমই তো সবাইয়ের জীবন।
তারপর মনে পড়ে, খুব ছোটবেলাতেই একদিন দেখলাম আমাদের গ্রামে শেলিং শুরু হলো। ওঃ, সে কী আওয়াজ আর ধোঁয়া। বাড়িগুলো জ্বরের রুগীর মত কেঁপে কেঁপে উঠত। চাষের ক্ষেতগুলো সব পুড়ে খাক হয়ে গেল। আমাদের একটা বোন একদিন উঠোনে খেলতে খেলতে বুকে শার্পনেল ঢুকে মরেই গেল। সবজি নেই, আটা নেই, জলও অমিল। একদিকে রাশিয়ান শেলিং, অন্যদিকে আল্লার বান্দা তালিবানদের ট্যাক্স, যা নাকি সবাইকে দিতেই হবে। সব মিলিয়ে মিশিয়ে আমার আব্বু আরও অনেকের সঙ্গে গ্রাম ছাড়ল। আমার দেশ তখন সত্যিকারের মৃত্যুউপত্যকা। ভাসতে ভাসতে আমাদের ঠাঁই হলো নাসিরবাগ রিফিউজি ক্যাম্পে। ওখানেই একটা কাগজে প্রথম আমার নাম লেখা হলো, ‘শরবতে গুল’ । টাইপ করা কাগজটা ক্যাম্পের লোকেরা আব্বুকে দিয়েছিল। নামটা লিখতে আব্বু বাধ্য হয়েছিল, কারণ না হলে ওরা আমার ভাগের রেশনটা দেবে না। ওখানেই আমি প্রথম ইস্কুলে ভর্তি হলাম। তাঁবুর স্কুল। আমার তখন দশ বছর বয়েস। সালটা ১৯৮৪ । স্কুলে আমাদের প্রাথমিক স্তরের পুস্তু আর আরবি শেখানো হত, দেওয়া হত ধর্মশিক্ষা। আমাদের ধর্মে কোন পরপুরুষের চোখের দিকে মেয়েদের সোজাসুজি তাকানো বারণ। এমনকি তাদের সারাক্ষণ মুখ পর্যন্ত ঢেকে রাখার শিক্ষা দেওয়া হত।
ক্যাম্পে মাঝে মাঝেই অনেক বিদেশী মানুষজন আসত। তাদের দেখে আমরা খুব খুশি হতাম। কারণ তাদের আসা মানেই রূপোলী রাংতায় মোড়া সুস্বাদু চকলেট, হয়তো একটা স্কার্ফ, কিম্বা কিছু আশ্চর্য ডিজাইনের পুরনো পোশাক, যা ওখানকার দিদিমনিরা পরে আমাদের মেয়েদের মধ্যে ভাগ করে দিতেন। সেভাবেই একদিন সাদা চুল লোকটার সঙ্গে আমার দেখা হয়। লোকটা সারাদিন বাক্সের মত কী একটা যন্ত্র গলায় ঝুলিয়ে ক্যাম্পের চারপাশে মধ্যে ঘুরে বেড়াত। যা দেখত, সব কিছু ওই যন্ত্রের মধ্যে দিয়ে দেখত। পরে জেনেছিলাম ওটাকে ক্যামেরা বলে। ওটা দিয়ে নাকি ছবি তোলা হয়। লোকটার নাম ছিল স্টিভ ম্যাকারি। স্টিভ আমাদের ইস্কুলের, ক্লাসের, এমনকি পড়ানোরও অনেক ছবি তুলেছিল। কিন্তু কোনো একজন মেয়েরও সিংগল ছবি তুলতে পারেনি, যাকে পোর্ট্রেট বলে। কারণ মেয়েরা সবাই দলবদ্ধ ভাবে থাকত, আর ওর বিদেশী মুখের দিকে কেউ সরাসরি তাকাত না। তো একদিন আমি তাঁবুর ইস্কুল থেকে ফিরছি, দেখি লোকটা এক হাতে ক্যামেরাটা ধরে অন্য হাতে টিউবয়েলে জল পাম্প করার চেষ্টা করছে, কিন্তু ভারী ক্যামেরাটার জন্যে ঠিক করে পারছে না। এদিকে ক্যামেরাটাও ও মাটিতে রাখবে না। দেখে আমি ওকে কলটা পাম্প করে দিলাম। স্টিভ জল খেয়ে ভিজে হাতটা ঘাড়ে গলায় মুছে নিল, তারপর হঠাৎ করে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে ‘থ্যাঙ্ক ইউ’ বলতে গিয়ে বলে উঠল, ‘what an amazing eye’. আমি ততক্ষণে দৌড় মেরেছি। পরের দিনই স্কুলে সাদা চুল লোকটা এলো। মিসের সঙ্গে অনেকক্ষণ কথা বলল। আমি কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। কিন্তু কোন বিষয় নিয়ে দুজনের তর্ক হচ্ছে এটা আমরা সবাই বুঝতে পারছিলাম। তারপর মিস আমাকে ডেকে পাঠাল। একটা বন্ধ ঘরে আমাকে মিস নিয়ে গেল। এখন বুঝতে পারি, আমেরিকান ডলারের সঙ্গে লড়াই করার তাগত আমাদের তাঁবু ইস্কুলের মিসের ছিল না। তবে সারাক্ষণ মিস আমাকে আগলে রাখছিল। তারপর ওই সাদাচুল লোকটা আমাকে অনেকরকম ভাবে দাঁড় করিয়ে করিয়ে ওই কালো বাক্সটার মধ্যে দিয়ে কি যেন করলো। মাঝে মাঝে লোকটার মাথার কাছ থেকে কেমন যেন একটা আলো চমকে উঠছিল। যেন বজ্রবিদ্যুতের দেবতা আকাশ থেকে যুদ্ধ করছেন। আমি ভয়ে চমকে চমকে উঠছিলাম। শেষে যখন চলে আসছি, আমি দেখলাম মিসের হাতে সাদা চুল লোকটা অনেকগুলো সবুজ টাকা যাকে ডলার বলে দিচ্ছে। তারপর আমি আর লোকটাকে কোনোদিন দেখি নি।

ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক- জুন ১৯৮৫
এই মাসের কভার ফটো হিসেবে এখানে একটা ধারালো সবুজ চোখ মেয়ের ছবি ছাপা হয়। ছবিটি স্টিভ ম্যাকারি নামে একজন ফটোগ্রাফারের তোলা। মেরুন ওড়না পরা মেয়েটা সরাসরি লেন্সের দিকে তাকিয়ে আছে। ফটোগ্রাফির ব্যকরন মেনে টেকনিক্যালি দেখলে যে ছবিটার মধ্যে একদম যে ত্রুটি নেই তা নয়, কিন্তু যেটা খুব আশ্চর্যের, সেটা হচ্ছে মেয়েটির দৃষ্টি। এমনিতে পাখতুন মেয়েরা বেশিরভাগ পর্দানশিনই থাকে। কিন্তু রিফিউজি ক্যাম্পের এই মেয়েটির সবুজ দুচোখ যেন সরাসরি ভল্লের মত হৃদয়ে বিঁধে যাচ্ছে, যুদ্ধকে অভিসম্পাত করছে। যে পৃথিবীখ্যাত ছবিগুলি ইতিহাস পাল্টে দিতে পেরেছিল বলে মনে করা হয়, সেই হল অফ ফেমে খুব দ্রুত জায়গা করে নেয় ছবিটি। ম্যাকারি রাতারাতি পৃথিবী বিখ্যাত হয়ে যায়। এই ছবিটির প্রিন্ট ২০”X২৪” সাইজের প্রিন্ট ১৮০০০ ডলার প্রিন্ট প্রতি বিক্রি হয়। বড় সাইজের প্রিন্টের দাম নিলামে ১,৭৮০০০ ডলার পর্যন্ত উঠেছিল। এর পূর্ণ স্বত্বাধিকারী ছিল ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক এবং স্টিভ ম্যাকারির এজেন্ট। লোকে ছবিটাকে এমনকি ‘আফগানিস্থানের মোনালিসা’ বলে ডাকতে শুরু করে।

২০০২ পাকিস্থান
আমি শরবত গুলা, একজন তন্দুরওলার ( যে রুটি তৈরি করে) বউ। আমার তিনটে মেয়ে। এখন আমি পাকিস্থানে থাকি। আমি নিজেই জানতাম না, আমি এত বিখ্যাত। না ভুল বললাম, আমার ছবি এত বিখ্যাত। ভাগ্যে আমার স্বামী একজন অশিক্ষিত রুটিওলা। না হলে নিশ্চিত আমাকে এতদিনে কবরে শুয়ে থাকতে হত। একমাত্র কারণ, আমার ছবি এতগুলো পরপুরুষে দেখেছে। যাই হোক একটু বিস্তারে বলি, ২০০২ সালে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক টেলিভিশন এবং ফিল্ম কোম্পানি নর্থরূপ নামে একজনের নেতৃত্বে এই সবুজ দৃষ্টির মালিকের খোঁজে একটি অভিযান চালায়। ২০০২- এপ্রিলে “A life revealed” নামে আমাকে ফের খুঁজে পাওয়ার ছবি এই কাগজের কভার স্টোরি হয়। আমি আবার বিখ্যাত হয়ে উঠলাম, কয়েকলক্ষ সবুজ চোখের মেয়ের ইন্টারভিউ নিয়ে ও ফেস ম্যাপিং টেকনলজি ব্যবহার করে ওরা আমাকে আবার খুঁজে বার করলো। আমার নামটার ব্যাপারে ম্যাকারির কোন কৌতূহল ছিল না। প্রকৃতপক্ষে ও জিজ্ঞেস করার কৌতূহলটুকুও কখনো দেখায়নি। নর্থরূপ আমাকে যখন জিজ্ঞেস করেছিল, ‘ওই ছবিটা তোলার সময় আমার কী অনুভূতি হয়েছিল ?’ আমি বলেছিলাম ,’রাগ, তীব্র রাগ। মিস বাধ্য না করলে আমি কখনো একজন পরপুরুষের কাছে ছবি তুলতে যেতাম না। ম্যাকারি আদন্ত্য মিথ্যে বলেছে। যুদ্ধের প্রতি ভয় বা ঘৃণা নয়, আমার দুচোখে ছিল ওই অন্য সংস্কৃতির মানুষটির প্রতি রাগ, যে আমার নামটাও কোনোদিন জানতে চায় নি।’

* লালেহা ওসমানী নামে একজন আফগান মেয়ের নেতৃত্বে এই মুহূর্তে আফগানিস্থানে গড়ে ওঠা একটি জনপ্রিয় আন্দোলন হল # where is may name . এভাবেই হয়তো যুগ যুগ ধরে মেয়েদের দাবিয়ে রাখার ইতিহাস ক্রমাগত স্বীকার করে নিচ্ছে নিজস্ব ভুল। বদলে যাচ্ছে পরিচিত ভাবনাবিশ্ব। আপনি কি এই বদলের সঙ্গে আছেন ?