গভীর তমসার ভেতর এক আলোকবর্তিকা

সুদীপ চট্টোপাধ্যায়

এই পৃথিবীতে এমন অনেক মানুষ আছেন, একটা গোটা সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে যাঁদের একক অসম লড়াই কোনওদিনও তথাকথিত প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাসের বইয়ে স্থান পায় না। সামান্য কিছু মানুষের কাছে তাঁরা দৃষ্টান্ত হয়ে থেকে যান। অথচ তাঁদের এই জীবনপণ সংগ্রাম এই পৃথিবীর যে-কোনও শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষকে উৎসাহিত করতে পারে, খাদের কিনার থেকে টেনে আলোর সামনে দাঁড় করাতে পারে। তেমনই একজন আলোকময়ী, মহীয়সী নারীর নাম ধানি টুডু। একজন তথাকথিত অশিক্ষিত, পিছিয়ে পড়া গোষ্ঠীভুক্ত মানুষ হয়েও, আপন অন্তরের আলোকে আলোকপ্রাপ্ত এক আপোসহীন, অসমসাহসী নারী।

আজ থেকে প্রায় চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ বছর আগেকার ঘটনা। পুরুলিয়া জেলার মানবাজার এক নম্বর ব্লকের অধীনে একটি গ্রামে বাস করতেন তৎকালীন সদ্যবিধবা ধানি টুডু। মানবাজার থেকে কুমারী নদী পেরিয়ে প্রায় কুড়ি কিলোমিটার ভেতরে সেই আদিবাসী গ্রাম। শিক্ষার আলো থেকে অনেক দূরে যে গ্রামের অবস্থান। সেই গ্রামে, স্বামী হারিয়ে, আদিবাসী রমণী ধানি টুডু একা, সম্বলহীন। তখন চল্লিশের কাছাকাছি বয়স। তৎকালীন গ্রামের ক্ষমতাবানেরা সুযোগ নিতে চাইল এই অসহায়তার। আর পুরুলিয়ার আদিবাসী অধ্যুষিত গ্রামে কারওকে বিপাকে ফেলার, কারও প্রতি আক্রোশ মেটানোর কিংবা কারও সম্পত্তি হড়প করার সব থেকে সহজ পন্থা ছিল তাকে ডাইনি ঘোষণা করা, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে। তো সেইসব মেকি সমাজরক্ষকদের লোভাতুর চোখ গিয়ে পড়ল ধানি টুডুর সম্পত্তির উপর, তা যৎসামান্যই হোক না কেন। একজন স্বামীহারা 'অবলা' নারীর থেকে তা নিয়ে নেওয়া অতি সহজ। কিন্তু তাদের অঙ্ক এত সহজে মিলল না। তারা ধানি টুডুকে যতটা অসহায় ভেবেছিলেন, বাস্তবে দেখা গেল, মানসিক দিক দিয়ে তিনি ততটা অসহায় তো ননই বরং অনেকের থেকে অনেক বেশি শক্তিশালী। উপায়ন্তর না দেখে গ্রামের মাথারা তাঁকে ডাইনি সাব্যস্ত করলেন, তাঁরা কুসংস্কারকে কাজে লাগিয়ে গ্রামের আর পাঁচটা অন্ধবিশ্বাসী মানুষের কাছে প্রমাণ করলেন ধানি টুডুর স্বামীর মৃত্যু তথা গ্রামের বিভিন্ন অকল্যাণের মূলে এই মহিলা। এই মহিলার কুদৃষ্টির কারণে ঘটে চলেছে বিভিন্ন অশুভ ঘটনা। এই মহিলা ডাইনিবিদ্যায় পারদর্শী। স্বভাবতই ধানি টুডুর জীবনে নেমে এল সামাজিক বয়কট। তাঁকে একঘরে করা হল। তিনি প্রকৃতই সমাজ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লেন। কিন্তু তিনি দমলেন না। নিকটবর্তী থানায় গিয়ে অভিযোগ করলেন সেইসব ক্ষমতাধারীর বিরুদ্ধে। কিন্তু আমাদের শাসনব্যবস্থার কথা সবার জানা। ধানি টুডুর অনেক অনুরোধ উপরোধ সত্ত্বেও তার অভিযোগ গ্রহণ করা হল না। গ্রামের মাতব্বররা ভাবলেন এইবার বুঝি জব্দ হবে ধানি। অদম্য প্রাণশক্তির ধানি টুডুকে তখনও তারা চিনতে পারেননি। এই হার-না-মানা নারী একটুও না দমে প্রস্তুতি নিলেন জেলা কোর্টে দরবার করার এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে। জেলা কোর্ট, অর্থাৎ পুরুলিয়া জেলা কোর্ট। তাঁর গ্রাম থেকে যার দূরত্ব প্রায় আশি কিলোমিটার। তিনি যাবেন কীভাবে? কোন উকিলকেই বা ধরবেন কেস লড়ার জন্য? তেমন টাকাপয়সাও তাঁর নেই! গ্রামের কোনও মানুষই তাঁকে সাহায্য করবে না। পুরুলিয়া শহর সম্পর্কে তেমন কোনও ধারণাও নেই তাঁর। কাছের শহর মানবাজার তাও প্রায় কুড়ি কিলোমিটার, সেই পথ যাওয়ারও কোনও যোগাযোগ ব্যবস্থা নেই তাঁর গ্রাম থেকে। যা হবার হবে, এই লড়াই জিততেই হবে, প্রয়োজনে নিজের প্রাণের বিনিময়ে, এই মরণপণ সংকল্প করে তিনি ঠিক করলেন পুরুলিয়া যাবেন। প্রথমে পায়ে হেঁটে মানবাজার, তারপর সেখান থেকে বাকি ষাট কিলোমিটার বাসে। এভাবেই শুরু হল তাঁর সংগ্রাম। সমাজের দেওয়া ডাইনি অপবাদ থেকে নিজেকে মুক্ত করার সংগ্রাম। তাঁর বিরুদ্ধে ঘটা অত্যাচার নিরসনের সংগ্রাম। প্রথম কয়েকদিন তিনি পুরুলিয়া গিয়ে উকিল খুঁজলেন, কেউ যদি দয়াপরবশ তাঁর পক্ষে সওয়াল করেন। সেখানে বিভিন্ন মানুষকে জানিয়েছেন প্রকৃত ঘটনা। এভাবে খুঁজতে খুঁজতে অবশেষে পেলেন এক সহৃদয় মানুষকে, যিনি বিনা পারিশ্রমিকে তাঁর হয়ে কেস লড়বেন। এই কেস চলল প্রায় পনেরো বছর। একজন নির্দোষ মানুষকে তাঁর জীবনের পনেরোটা বছর ব্যয় করতে হল নিজেকে প্রমাণ করতে যে তিনি নির্দোষ, তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা সমস্ত অভিযোগ মিথ্যে। এই পনেরো বছর ধরে যেদিনই মামলার তারিখ পড়েছে, দেখা গেছে ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে, পুঁটলিতে চিঁড়েমুড়ি বেঁধে, হাতে একটা লাঠি নিয়ে ধানি টুডু পায়ে হেঁটে কুড়ি কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে মানবাজার পৌঁচচ্ছেন, সেখান থেকে বাসে করে পুরুলিয়া শহর। আবার রাত্রে ফিরে আসছেন একইভাবে। কোনও কোনও দিন মানবাজার থেকে পুরুলিয়া যাবার বাসও পাননি। বিগত শতকের সত্তর দশকের শেষ দিকে বা আশির দশকের প্রথমে মানবাজার থেকে পুরুলিয়া যাবার বাস তেমন সুলভ ছিল না। ফলে সেইসব দিনে, ধানি টুডু তাঁর গ্রাম থেকে পুরুলিয়া শহর, এই প্রায় আশি কিলোমিটার, সম্পূর্ণ পথটাই পাড়ি দিতেন পায়ে হেঁটে। ফিরতেনও একই ভাবে। তবুও একদিনের জন্যও মামলার তারিখে অনুপস্থিত হননি। এমন তাঁর জেদ, এমনই তাঁর আত্মসম্মান বোধ!

অবশেষে দীর্ঘ লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে তিনি জয়ী হলেন। সমস্ত অভিযোগ থেকে মুক্ত হলেন। ততদিনে কাছের কুমারী নদী দিয়ে বয়ে গেছে অনেক জল। তিনিও প্রায় বৃদ্ধ। সবাই তাঁকে ধানি বুড়ি বলে। দূর থেকে অনেকেই সম্ভ্রমের চোখে দেখে। তথাপি তাঁর কাছে আসে না কোনও গ্রামবাসী। সরকার যতই বলুক ডাইনিপ্রথা একটা কুসংস্কার মাত্র, বাস্তবে এর কোনও ভিত্তি নেই। আদালত যতই বলুক ধানি বুড়ি নিরপরাধ, আদিবাসী গ্রামে মাতব্বদের নিদানই শেষ কথা। তাদের রক্তচক্ষু এড়িয়ে কারও সাহস নেই ধানি বুড়ির সঙ্গে যোগাযোগ রাখে। অতএব দীর্ঘ লড়াইয়ে জিতেও ধানি টুডু থাকলেন গ্রামবাসী পরিত্যক্তা। এই বৃদ্ধ বয়সেও তাঁর জীবনধারণের জন্য সমস্ত কাজ তাঁকে একাই করতে হত। কিন্তু তিনি ধানি টুডু। প্রতিবাদের আর এক নাম। এত কিছুর পরেও দমলেন না। তিনি ভাল করে জানতেন, তাঁর মৃত্যুর পর তাঁদের ধর্ম মেনে সঠিক পন্থায় কেউ তাঁর দেহ সৎকার করবে না, মৃত্যু পরবর্তী ধর্মীয় কার্যাদিও পালন করবে না। তাই জীবিত অবস্থায়, মৃত্যুর কয়েক বছর আগে, তিনি নিজেই তাঁর ধর্মানুসারে নিজের শ্রাদ্ধ করলেন। এখানেই থামলেন না, নিজের স্বামীর ভিটায় তৈরি করলেন একটি ছোট্ট মন্দির, আর তার ভেতর প্রতিষ্ঠা করলেন নিজের বিগ্রহ। হ্যাঁ, আত্মবিগ্রহ। নাম দিলেন ধানি টুডুর মন্দির। এমন লড়াকু, আত্মসম্মানবোধ সম্পন্ন মানুষ বিরল। শুধু কোনও পিছিয়ে থাকা জাতিগোষ্ঠীর জন্যই নয়, ধানি টুডু সমগ্র মানবজাতির জন্য একটি উদাহরণ, এক অদম্য আলোর নাম। যাকে আমাদের তথাকথিত উচ্চবর্গের ইতিহাস মনে না রাখলেও, ধানি টুডুর মতো মহীয়সীর কিছু যায় আসে না।

কৃতজ্ঞতা: বিপ্লব দাস