ভালো থাকো গাছ

সৌমনা দাশগুপ্ত

মেঘে ঢাকা তারা ছবির ওই দৃশ্যটা মনে পড়ে? স্যানেটোরিয়ামের সামনে দাঁড়িয়ে একটি মেয়ে চিৎকার করে উঠছে ‘দাদা, আমি কিন্তু বাঁচতে চেয়েছিলাম’, সুরের মূর্ছনায় ভেসে যাচ্ছে চরাচর, আর দর্শকের বুকের ভেতরটা মুচরে মুচরে উঠছে ব্যথায়, যন্ত্রণায়। মেয়েটি বাঁচতে চেয়েছিল। হ্যাঁ, পরিবারকে বাঁচাতে চাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মেয়েটি কিন্তু বাঁচতে চেয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, স্বাধীনতা, দেশভাগ সমস্তকিছুর অভিঘাতে তখন ভারতবর্ষের অর্থনীতি চুরমার হয়ে পড়েছে। ঘরে ঘরে বেকারত্ব, অনাহার, অর্ধাহার, শুধু নীতা নয়, আরও অনেক নারী সেসময়ে পরিবারের সকলের পেট ভরানোর জন্য ছেঁড়া হাওয়াই চপ্পলে সেফটিপিন লাগিয়ে হেঁটে গেছে মাইলের পর মাইল, নিজের শরীরের দিকে তিলমাত্র ভ্রূক্ষেপ না করে সারাদিনের হাড়ভাঙা খটুনির বিনিময়ে বাঁচিয়ে রেখেছে, সিধে রেখেছে পরিবারের মেরুদণ্ডটিকে।

কিন্তু ইতিহাস তো শুধু রাষ্ট্রনায়কদের কথা বলে, বলে নেতাদের কথা। সাধারণ শ্রমজীবি মানুষের ঠাঁই নেই তার মহার্ঘ্য পৃষ্ঠায়। তাই আজকের দিনে বসে বলতে পারি, যে ইতিহাস আমাদের পাঠ্যতালিকাভুক্ত, যে ইতিহাস আমাদের গিলিয়ে দেওয়া হয়, তা আসলে ইতিহাস নয়। সত্যিকারের ইতিহাস লেখা আছে দেশের মাটিতে, যেখানে ঘাম রক্ত এক করে সোনার ফসল ফলায় একজন কৃষক, সত্যিকারের ইতিহাস লেখা আছে সুবিশাল ইমারতের চুন-সুরকির ভাঁজে ভাঁজে, যেখানে লেগে থাকে শ্রমিকের শরীরের লবণের দাগ, সত্যিকারের ইতিহাস খুঁজে পাই বন্ধ কারখানার জংধরা মেশিনের গায়ে, যেখানে লেগে আছে শ্রমিক-পরিবারের অনশনের, অরন্ধনের দিনগুলির ছাপ।

আজ মনে পড়ে যাচ্ছে বাবার মুখে শোনা আটষট্টির বন্যার গল্প। নিজের প্রাণ তুচ্ছ করে বানভাসী মানুষকে বাঁচানোর গল্প। মনে পড়ে যাচ্ছে, আমার দুই জ্যাঠতুতো ভাইয়ের গল্প। ছোটভাই সকলের অগোচরে বাড়ির পেছনের পুকুরে হাঁসেদের খাবার খাওয়াতে গিয়ে পা পিছলে জলে পড়ে যায়, তখন তার বয়স মাত্র তিন। আর ওকে বাঁচাতে আমার পাঁচ বছরের মেজভাই সঙ্গে সঙ্গে পুকুরে ঝাঁপ দেয়, শেষ অব্দি আমরা খুঁজে পাই দুই-ভাইয়ের জড়াজড়ি করে ভেসে থাকা মৃতদেহ। কিম্বা সেই মানুষটির কথা, যিনি মানুষের প্রাণ বাঁচাতে নিজের জীবনের সমস্ত সময় খরচ করে দিচ্ছেন। এদিকে তাঁর নিজের আর্থিক অবস্থা মোটেও স্বচ্ছল নয়, তাঁর চলার পথটিও মসৃণ নয়। আমাদের তরাই-ডুয়ার্স অঞ্চলে সব জায়গায় ঠিকঠাক ডাক্তার পাওয়া এক দুষ্কর ব্যাপার। এমনই এলাকার মালবাজারের রাজাডাঙা অঞ্চলের বাসিন্দা করিমুল হক তাঁর বাইক-অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে পৌঁছে যান দুঃস্থ মানুষের ঘরে ঘরে। তাঁদের পরিবারের আছে একটি পানের দোকান আর একটি মোবাইল ফোন সারাইয়ের দোকান। সেই রোজগারের বেশিটাই চলে যায় মানুষের সেবায়। টাকা-পয়সার কোনও তোয়াক্কা না করেই তিনি অসুস্থ মানুষটিকে নিয়ে যান নিকটবর্তী স্বাস্থকেন্দ্রে। আরেকটু বিস্তারে বলি বরং। সেটা ১৯৯৫ সাল, হার্ট অ্যাটাকে অসুস্থ মাকে নিয়ে হাসপাতালে যাওয়ার জন্য তিনি গ্রামের প্রতিবেশীদের দরজায় দরজায় ঘুরেছেন, সাহায্য চেয়েছেন, কিন্তু কেউই এতটুকু সহানুভূতির হাত বাড়িয়ে দেননি। শেষ অব্দি তাঁর মা বাড়িতে বিনা চিকিৎসায় মারা যান। তারপরেই করিমুল হকের মনে হয়, কাউকে এরকমভাবে মরতে দেওয়া যাবে না। ১৯৯৮ সাল থেকে তিনি শুরু করেন এই বাইক-অ্যাম্বুলেন্স পরিষেবা। তরাই-ডুয়ার্সের ধলাবাড়ি অঞ্চলে, যেখানে ঠিকঠাক রাস্তাঘাট নেই, নেই বিদ্যুৎ সংযোগও, এমন এলাকায় ৪৫ কিলোমিটার দূরের হাসপাতালে তিনি নিয়ে যান দরিদ্র রোগীদের। এভাবেই বেঁচে গেছে কত কত প্রাণ। ২০১৯ সাল অব্দি তিনি পাঁচ থেকে সাড়ে পাঁচ হাজার মানুষকে এই পরিষেবা দিয়েছেন বিনামূল্যে। শুধু তাই নয়, এই অ্যাম্বুলেন্স পরিষেবার মাধ্যমে তিনি প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দেন প্রাথমিক চিকিৎসা-ব্যবস্থা। আয়োজন করেন হেলথ-ক্যাম্পেরও। আসলে, এ-ও এক নেশা, মানুষের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করার নেশা।

এঁদের নাম কিন্তু আপনি ইতিহাসের পাতায় পাবেন না। শুধু মানুষের মনের ঘরে থেকে যাবে এই নামগুলি। এঁরা কোনও রাষ্ট্রনেতা নন, কোনও পার্টির ধ্বজাধারী কেউ নন, কিন্তু এই মানুষগুলো আছে বলেই এখনও জীবনের গায়ে লেগে আছে ক্লোরোফিলের গন্ধ, এখনও আলো আসে, বেঁচে থাকে শিশুগাছ।