হেমফোঁড়

নিবেদিতা আইচ


ববিনে সুতো ভরার ফাঁকে 'সারারা'র ডিজাইনটা দেখে সে। পেঁয়াজ রঙের সাটিন কাপড়ের ওপর সুন্দর জরিসুতার জারদৌসী কাজ করা, কামিজটা সোনালী রঙের। এই রঙটা রোকসানাকে খুব মানাবে। ঠিক পাশেই প্যাস্টেল আর পিচ রঙের কম্বিনেশনে আরেকটা স্যাম্পল। দু'আঙুলের মাঝে নিলেই কী আরাম আরাম অনুভূতি, যেন ঘিয়ের মধ্যে হাত দিয়েছে!
আফিয়ার অবশ্য মনে পড়ে না শেষ কবে ঘি চোখে দেখেছে। গত বছর রোজার ঈদে রোকসানার আবদারে গোশতো পোলাও রান্না করেছিল। ছোটবেলার ঈদে আম্মা ঘি দিয়ে পোলাও রান্না করতো। সেই দিন আর নাই। আফিয়া আফসোস করছিল। এই গল্প শুনে রোকসানা হাসতে হাসতে বলেছে- দরকার নাই, কুত্তার প্যাটে ঘি হজম হইবো নাকি!
বছর ঘুরে আবার ঈদ চলে এলো। রোজা শুরু হবে কয়েকদিনের মাঝে। এবছর দু'বেলা ভাত জুটলেই বর্তে যাবে ওরা,পোলাও তো দূর অস্ত। ভাতের কথা মনে হলে পেট চুইচুই করে উঠলো ওর। তা করবেই, সকালে আজকে না খেয়ে বেরিয়ে এসেছে আফিয়া।
লাঞ্চ আওয়ার। চারপাশ ফাঁকা হয়ে আসছে। সেও উঠবে।তবু এই ফাঁকে একটু কায়দা করে ডিজাইন আর কাটিংটা দেখে নিচ্ছে। কারো চোখে পড়লে আবার টিটকিরি শুনতে হবে। বলা যায় না সুপারভাইজারের কানেও কথা লাগাতে পারে কেউ।
রোকসানার এখনো রাগ পড়েনি বোধ হয়।অন্যদিন আগেভাগেই টিফিন ক্যারিয়ার নিয়ে চলে আসে। আজকে এখনও সাড়াশব্দ নেই।সকালে আসবার সময় টুঁ শব্দটা করেনি। কাল রাতে বিশ্রী রকমের ঝগড়া হয়ে গেছে দু'বোনের মধ্যে৷
রোকসানা বলছিল - এবার আমি তিন হাজারের বেশি দিমু না কইয়া দিলাম আগেই।
আফিয়া ওকে বুঝিয়ে বলেছে বারবার। তবু মেয়েটা ঘাড় বাঁকা করে বলেছে- পাইতে পাইতে অগো জিহ্বা বেশি লম্বা হইয়া গ্যাছে। তুমি দাও গা, আমি এবার একটা টাকাও বেশি দিমু না।
সৎমায়ের সংসারে ছোট ভাইয়ের চিকিৎসা আর অন্যান্য খরচ বাবদ প্রতি মাসে ছয় হাজার করে টাকা পাঠায় ওরা দুজন। ঈদের বোনাস পেলে সে মাসে কিছু বেশি পাঠায়। কিন্তু এ বছরটা শুরুই হয়েছে কুফা দিয়ে। কী এক রোগ এসে গরীবদের পেটে নতুন করে লাথি মেরে দিল। বোনাস দূরে থাক এ মাসে বেতন জুটবে কিনা তার ঠিক নেই। ওদের বাপ আগে শহরে ভ্যান চালাতো। আজকাল নাকি বাড়িতে বেকার বসে থাকছে। রোকসানা অবশ্য পুরোপুরি বিশ্বাস করতে চায় না। বলে- মিছা কথা, নতুন কিছু ঠিকই করতেছে। কিন্তু ট্যাকার মেশিন বন্ করতে চায় না, মেশিন পাইছে না আমগোরে!
আফিয়ার মুখে এমন তিতা কথা আসে না, মাথায়ও এত কিছু ধরে না। সে শুধু চায় কোনো কারণে রোগা ভাইটার চিকিৎসা বন্ধ হয়ে না যাক, খেয়ে পরে বেঁচে থাকুক সে। পরিবারকে আরেকটু ভালো রাখবার চিন্তায় দিনরাত ভারাক্রান্ত থাকে আফিয়া। এই যে রোকসানা, যাকে বাইরে থেকে দেখে এত পাষাণ বলে মনে হয় সেও প্রায়ই বাড়তি রোজগারের আশায় কিছু না কিছু বুদ্ধি বের করতে থাকে। শুধু আফিয়া সাহস পায় না বলে সেসব আর হয়ে ওঠে না।
গতকাল রাতে ঝগড়া শুরু হলো এসব কথা থেকেই। রোকসানা বলছিল ওদের বস্তির পাশে যে টেইলার্সের দোকান আছে সেখান থেকে কাজের অর্ডার নেবে। বোতাম লাগানো, চুমকি আর লেইস বসানো, শাড়ির পাড় লাগানো, আঁচল পিকো করা। গার্মেন্টস থেকে ফিরে রাতের বেলা এসব কাজ করা যাবে। অন্তত এক দুই মাস করে দেখতে ক্ষতি কী, কিছু বাড়তি টাকা তো হাতে আসবে৷
আফিয়া মাথা নেড়ে বলছিল ঘরে ফিরতেই রাত আটটা নটা বেজে যায়, পরদিন বের হতে হয় একদম ভোরবেলায়। এসব বাড়তি কাজ করতে গেলে রান্না, খাওয়া দাওয়া, ঘুম কখন হবে। হঠাৎ করে এত পরিশ্রম সইবে না। বাড়িতে একজন রোগী, তাকে টানতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে, নতুন কিছু যোগ হলে সবাই মিলে না খেয়ে থাকতে হবে তখন।
উত্তরে রোকসানা মুখ ঝামটে বলেছে সবার চিন্তা সে করতে পারবে না। নিজে বাঁচলে পরে বাপের নাম৷ আজীবন গার্মেন্টস শ্রমিক হয়ে থাকবার স্বপ্নও নেই ওর।
ব্যস, তারপর থেকে কথা বন্ধ ওদের। আফিয়া লক্ষ্য করেছে প্রায়ই এই মেয়েটা কীসব স্বপ্নের কথা বলে৷ জিজ্ঞেস করলে ভেঙ্গে বলতে চায় না৷ অন্য সময় যখন মন ভাল থাকে তখন ওর মুখ খুলতে ইচ্ছা করেই ওকে খ্যাপায় আফিয়া৷
জানি তো, বিয়া কইরা সংসারী হইবি! বাচ্চার মা হইবি। তখন কী আর এমন কষ্ট থাকবো! আব্বারে কই জলদি পাত্র দেখুক। বিয়া দিয়া দিই তোরে!
আফিয়া হাসতে হাসতে কৌতূহল নিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে থাকে। বিয়ের কথা শুনে রোকসানা মুখ বাঁকায়,রাগে ফোঁসফোঁস করে ওঠে, নাকের পাটা ফুলে যায়। তারপর হড়বড় করে বলে- শুনো আপা, তোমারে আমি আজকে একখান কথা কইয়া দিই। আমি এইসব বিয়াশাদীর মইধ্যে নাই৷

আস্তাগফিরুল্লাহ! এইসব কী কছ!
হ! বিয়া করলে তুমি করো গা৷

তারপর রোকসানা জানায় গত কয়েকমাস ধরে সে টাকা জমাতে শুরু করেছে। ভবিষ্যতে রেডিমেড ড্রেসের একটা দোকান দেবার ইচ্ছা ওর, তাতে যতদিন যত বছর সময় লাগে লাগুক।

কথাটা শুনে আফিয়ার যেমন হাসি পায় তেমনি মায়াও লাগে। এই মেয়েটা বরাবরই এমন বোকা বোকা আকাশকুসুম সপ্ন দেখে। তবু উত্তরে যথাসম্ভব নিরীহ গলায় কথা বলার চেষ্টা করে আফিয়া।
ভালো তো, আমারে লগে নিছ তাইলে তোর দোকানে!
বোনের দিকে আড়চোখে তাকায় রোকসানা। ওর প্রতিক্রিয়া বুঝবার চেষ্টা করে। তারপর মাথা দুলিয়ে বলে- মশকরা না, দোকান একটা আমি দিমুই!
নিজের ব্যবসায় পার্টনার হিসেবে সে বোনকেই নেবে। কিন্তু তার বোন তো আছে শুধু বিয়ের চিন্তায়।
রোকসানার কথা শুনে এবার আফিয়া ক্ষেপে ওঠে। বলে- অ্যাহ্ খালি বড় বড় কথা! য্যান তোর মনে বিয়ার খায়েশ নাই!
কচু আছে!

বুড়ো আঙুল দেখায় রোকসানা। তারপর শব্দ করে হাসতে থাকে। ওর এই ঘাড় বাঁকানো উদ্ধত ভঙ্গি মাঝেমাঝে আফিয়াকে বিভ্রান্ত করে দেয়। মনে মনে ওকে সমীহ করে। সেও ভাবতে শুরু করে হয়তো কখনো ওদের ভাগ্যও এমন সুপ্রসন্ন হবে, জীবনে সুখ স্বাচ্ছন্দ্য আসবে।

সত্যি বলতে আজকাল এই ভাবনাটা ওর মাঝে ঢুকে গেছে। নিজেদের দোকান না হোক, অন্তত ছোটখাটো কোনো উদ্যোগ ওরা নিতে পারে। অল্প কিছু ড্রেসের অর্ডার নেয়া যায়।সেরকম নিখুঁত কাজ হলে বিক্রিও মন্দ হবার কথা নয়। সাহস করে একবার শুরু করতে পারলেই হলো।
কাজের ফাঁকে ফাঁকে ড্রেসের ডিজাইনগুলো আফিয়া ভালো করে লক্ষ্য করতে শুরু করেছে। রোকসানা টেইলরের দোকানে কথা বলে এসেছে। ফলস লাগানো, পিকোর কাজ করে যদি কিছু বাড়তি টাকা আসে তাতে লাভই, প্রয়োজনে পালা করে কাজ করবে ওরা। বোনের বুদ্ধিটা সত্যিই এখন ভালো বলে মনে হচ্ছে ওর। একা একা এতকিছু করা ওর পক্ষে কিছুতেই সম্ভব হতো না। ভাগ্যিস, বোনটা সাথে আছে । তাই হয়তো এখনো ছেঁড়া কাঁথার মতো জীবনটাকে চারপাশ থেকে হেমফোঁড় দিয়ে বাঁচিয়ে রাখতে পারছে৷

মাঝেমাঝে ছুটির দিনে ওরা দু'জন মিলে বিভিন্ন শোরুম, শপিং মলগুলো ঘুরে বেড়ায়। শুধুমাত্র রেডিমেড কাপড়ের নিত্য নতুন ডিজাইনগুলো দেখবার জন্য। যেদিন ওসব জায়গায় যায় সেদিন একটু ভালো কাপড়চোপড় পরে ফিটফাট হয়ে বের হতে হয়৷ নইলে শো রুমের গার্ড গেইট থেকেই বিদায় করে দেয়। রোকসানা চোখমুখ লাল করে বলে- আমাগের জিনিস বেইচা খায় আর আমাগেরেই কুত্তার মতো খ্যাদায়।

বোনের ছেলেমানুষি দেখে আফিয়ার হাসি পায়। ও পাল্টা যুক্তি দেয়। তাহলে তো রাজমিস্ত্রীরা যেসব উঁচু দালান বানায় তাতে তাদেরকে থাকতে দিতে হয়। কিংবা যারা গ্যারেজে কাজ করে তাদের প্রত্যেকের নিজস্ব গাড়ি থাকবে। বাস্তবে এমন শিশুসুলভ আবদার শুনলে লোকে মারতে আসবেই। কাজেই এমন রেগে যাওয়াটা বোকামী।

মাথাডা ঠান্ডা কর্ রুকসানা, অমন খ্যাপলে চলে? চল্ আইসক্রিম খাই।

রাগে কিংবা প্রচণ্ড গরমে সত্যিই বুকের ভেতরটা শুকিয়ে আসছিল রোকসানার। বোনের কথা শুনে ওর পিছু পিছু যায় সে।

আরো কিছুক্ষণ এদিক ওদিক ঘোরাঘুরির পর ঘরে ফিরবে বলে বাসে উঠে বসে ওরা। লোকাল বাসে করোনার মাঝেও ভিড় কমে না। আফিয়া বসে, রোকসানা দাঁড়িয়ে থাকে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চারপাশ দেখে সে। সামনের সিটে দু'জন মেয়ে বসে আছে। আফিয়া দেখে ওদের গায়ে বুটিকসের সালোয়ার কামিজ। আরেকপাশের সিটে বসে এক ভদ্রলোক সশব্দে খবরের কাগজের শিরোনাম পড়ছে। তার পাশের জন এই নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিচ্ছে।

মেয়ে দু'টো মোবাইল ফোনে কিছু দেখতে দেখতে হঠাৎ বলে উঠলো- ছবিটা দেখছিস? এত খ্যাত ড্রেস আপ! গার্মেন্টসের মেয়েদের মতো লাগছে না?

আফিয়া ঝট করে বোনের দিকে তাকায়। মাস্ক পরা অবস্থায় রোকসানার মুখটা ভাল করে বোঝা যায় না। শুধু ওর কুঁচকানো ভ্রু জোড়া দেখা যাচ্ছে।

'কোভিডের টিকা আসছে খুব শিগগিরই'
সেই লোকটা জোরে জোরে শব্দ করে শিরোনাম পড়ছে।
'করোনা সঙ্কটের মাঝেও পোশাক শিল্পে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান অপরিবর্তিত।'

রোকসানা ঝটপট বলে ওঠে- আঙ্কেল, এই খবরটার ভিতরে কী লিখছে একটু শব্দ কইরা পড়বেন? শুনতে মন চায়।

হঠাৎ করে কয়েক সেকেন্ডের জন্য নিরবতা নেমে আসে। সবার নজর ওর দিকে। রোকসানা দমে যায় না। সে দ্বিগুণ উৎসাহ নিয়ে বলে- না মানে আমি গার্মেন্টসের মেয়ে তো তাই…