স্বপ্ন

সঞ্চারী গোস্বামী


আগের কথা
দাবার বোর্ডের মত সাদা-কালো ছক কাটা মেঝে। ফাঁকা রাজার চেয়ার, মন্ত্রীর চেয়ার, ময়ূরপঙ্খী, হাতির হাওদা এসমস্ত যা যা থাকার কথা সবই পড়ে আছে যে যার জায়গায়। আসলে, এসব নয় অবশ্য। ওই বড় চেয়ার, ছোট চেয়ার, মুর্শিদাবাদের শোলার কারুকাজ করা নৌকো, গুজরাটি কাজ করা ওয়াল-হ্যাঙ্গিং এইসব আরকি! যাই থাক না কেন, ভেবে নিতে ক্ষতি কী? এমনটাই ভাবতে ভালো লাগে আকাশনীলের। চোখ বন্ধ করলেই সে দেখতে পায় ওই মেঝের ওপর দিয়ে কোনাকুনি চলেছে হাতি, নীল জল কেটে সোজা এগিয়ে চলেছে নৌকোটি এমন কত কিছু! কল্পনার জগতে থাকতে পারলে সে আর কিচ্ছুটি চায় না। কোনোটা স্বপ্ন আর কোনোটা বাস্তব, এই দুইয়ের মাঝখানের সীমারেখা টেনে দেওয়াটা তার এক্কেবারে না-পসন্দ!
এই তো কিছুদিন আগে তার দিদি সপরিবারে এসেছিল একদিন থাকবে বলে। এদিকে আকাশনীল তো মনে মনে ভেবেই রেখেছে যে সে কিছুতেই একদিনে সন্তুষ্ট হবে না। দিদির আবার একদিনের বেশি থাকার উপায় নেই। তাতে কী! সেই দিদি চলে যাওয়ার সময় রাগারাগি, কান্নাকাটি। মাঝখান থেকে অবুঝ অপবাদ শুনতে হল। আসলে ও কাউকে বোঝাতেই পারেনা যে ও অবুঝ নয়, ও স্বপ্ন দেখতে আসলে একটু বেশিরকমই ভালোবাসে। তাই বুঝি এত সহজে অভিমান হয়। সৃষ্টিকর্তা ওকে গড়েছেনই এভাবে। অন্যদের মত বাস্তবের সঙ্গে আপোস করে চলা ওর আর এ জন্মে হবেনা।
তা, সত্যি বলতে গেলে সে এমন কিছু কচি খোকাটিও তো নয়। এই নয় নয় করেই মোটামুটি চল্লিশের দোরগোড়ায় পৌঁছে গেছে ও। তাতে অবশ্য তার কুছ পরোয়া নেই। কারণ চল্লিশের পরে যে বয়স আবার কমিয়ে দেবার একটা পথ সুকুমার রায় বাতলে দিয়েছেন, সে সেই পথেরই পন্থী। বুড়ো হলেই অবধারিত ভাবে চামড়ায় ভাঁজ পড়বে, চুলে পাক ধরবে, ইস্‌, লাঠি নিয়ে হাঁটতে হবে! এখানেও সেই একই অবুঝপনা, মানে অন্যরা যেটাকে অবুঝপনা বলে দাগিয়ে দেয়, তাই আর কি! প্রতি বছর যে বয়স আসলে একবছর করে বাড়ে, তাতেই আকাশনীলের ঘোর আপত্তি। স্বপ্ন আর বাস্তব যে বিন্দুতে মিলে যায়, ওর পুরো জগতটাই যে সেই বিন্দু দিয়ে তৈরি।
সাধারণের হিসাবে দেখতে গেলে বয়স ওর নেহাত কম হল না, বিয়ের বয়স তো হয়েই গেছে। ছেলেমানুষিটা ছিলই, কিন্তু এক শ্রাবণে আকাশের অঝোরধারা যেদিন ওকে সত্যি সত্যি স্বস্তি দিল নিজেকে লুকিয়ে রাখতে, সেইদিন থেকেই একটা ধাক্কায় আকাশনীল যেন আরো বেশি করে ছেলেমানুষ হয়ে উঠল। ছেলেমানুষরা তো বেশ সবার সামনেই কাঁদতে পারে, আকাশনীলকেও তো সবাই ছেলেমানুষই মনে করে, অথচ সেদিন ও সবার সামনে নিজের যন্ত্রণাটুকু ছড়িয়ে দিতে পারল না। ও তো তখন সত্যি সত্যি চেষ্টা করছিল বড় হয়ে যাওয়ার। সেও ব্যর্থতাটাই বোধহয় ওকে আর বড় হবার সাহস দিল না।
বৃষ্টিস্নাতা! সেই অঝোর শ্রাবণে দূরেও যাওয়া যায় বুঝি! কাছাকাছি, পাশাপাশি থাকতে থাকতে কখনো বোঝা যায় নি সে ওর কতখানি জুড়ে ছিল। ধীরে ধীরে, অনেকদিন ধরে কেউ যদি চুবড়ি হয়ে ভিজতে থাকে ক্রমাগত, সে অসুখ আর সারে না। বৃষ্টিস্নাতা! সে তো ভেজাবে বলেই এসেছিল। এমন অমোঘ নিয়তি, তাকে পাশ কাটানো কি আর আকাশনীলের সাধ্যে কুলোয়!
শ্বশুরবাড়িটি আকাশনীলের বাড়ি থেকে বাসে দুটো স্টপ। দূরে গেলে তবু যদিও বা ভোলার চেষ্টা করবার আশা থাকে, এখানে তার উপায়টুকুও ছিল না। কী করেই বা ভোলে! সেও তো ভুলতে পারেনি। বিয়েটা করতে হয়েছে অনিচ্ছায়। সুখের হয়নি। এমন প্রেম, এমন বিয়ে, এমনভাবে অনিচ্ছার বিয়েতে টিকে থাকা কয়েক দশক আগে হলেও মানাতো, আজকাল মানায় না। সমস্ত বিষয়গুলোই তো এখন অনেক সহজ, তবু কেন যে কঠিন হয়ে এল ওদের জীবনে! বৃষ্টিস্নাতা যোগাযোগ রেখেছে, মাঝেমাঝে দেখাও করে, কিন্তু তাতেই যেন আরো বেশি খচখচ করে মনের ভেতর। অথচ এমন দশা, যে সে ডাকলে আজও আকাশনীলের সাধ্য নেই যে, সে ডাক উপেক্ষা করে।
ভাঙতে ভাঙতে ক্ষয়ে যেতে যেতে বুঝি আরো বেশি করে শৈশবের কাছে ফেরার জন্য আনচানানি বেড়ে গেল আকাশনীলের। আজকাল লোকজন প্রায়ই ঘুরিয়েফিরিয়ে বলে একজন সাইকিয়াট্রিস্টের পরামর্শ নিতে। হয়ত ঠিকই বলে, কিন্তু ইচ্ছে হয় না ওর। সে তো ভালোই আছে। বরং সেই সীমারেখাকেই ওর ভয়। এখন তো দু:খ পেলে সহজে সবার সামনে কাঁদতেও পারছে ও।
অবশ্য ডাক্তার দেখানোটা ক্রমশ জরুরি হয়ে পড়ছে যেন। সাইকিয়াট্রিস্ট নয়, অন্য কোনো ডাক্তার। কোন ডাক্তার সেটাই বুঝে ওঠা যাচ্ছে না। অনেক জেনারেল ফিজিশিয়ান দেখানো হয়েছে আগেই, কিন্তু রোগ নির্ধারণ হয়নি। এ রোগটাকে নিয়েই ওর আসল সমস্যা। কয়েক বছর আগে হঠাৎ একদিন ট্রেনে সারাদিনে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে যাতায়াত করার পর সন্ধের দিকে পায়ের ডিম-টা ফুলে যায় ওর। প্রাথমিকভাবে মনে হয়েছিল দাঁড়ানোর জন্য, কিন্তু পরে বোঝা গেল, তা একেবারেই নয়। ফোলা অংশে হাত দিয়ে টিপে দিলে কেমন গর্ত হয়ে যায়, খানিক পরে আবার ফুলে সমান হয়ে যায় বাকি অংশের সঙ্গে। অনেক ডাক্তার দেখানো হয়েছে, কেউই এর নিরাময় করতে পারেননি। একজনই বলেছেন এ রোগের নাম ডিপ ভেন থ্রম্বোসিস। সঙ্গে সমস্যা হল শিরার মধ্যে রক্তের জমে যাওয়ার প্রবণতা। সে ডাক্তার বলেছেন কোনো ভাবে এই জমে যাওয়া টুকরো মগজ বা হৃদয়ে ঢুকলেই সর্বনাশ। ভাবতে ভাবতে হেসে ফেলে ও। হৃদয় আর মগজের সর্বনাশ তো আগেই যা হবার হয়ে গেছে। আর রক্তপ্রবাহ জমে যাওয়ার প্রবণতারই বা দোষ কী! বৃষ্টিও তো প্রবাহ! প্রবাহ থেমে যাওয়াটাও বোধহয় ওর জীবনের নিয়তি।
আজ দুপুরে ডাক এসেছে। রঙিন খামে যত্নে লেখা নাম। না না, এতকিছু নয় অবশ্য, তবে ওই যে স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসে ও। ছোটদের মত ছুঁতে চায় অসম্ভবের দুনিয়া। চিঠি নয়, ফোন এসেছে, তাও ফিসফিসিয়ে ল্যান্ডলাইনে কথা বলার জন্য যে ধুকপুকুনি, তাও সহ্য করতে হয়নি। মোবাইলে ফোন এসেছে, দেখা করার ডাক এসেছে। উপেক্ষা করার উপায় নেই। কিন্তু ভয় আছে। বৃষ্টিস্নাতা বাড়িতে আছে, একা আছে। সেইসঙ্গে আজ আকাশনীলের জন্মদিন। মোমবাতিতে ফুঁ দিলেই যে একবছর বয়স বেড়ে যাবে, তা যেন কিছুতেই মানতে ইচ্ছে করে না ওর।

পরের কথা
বৃষ্টিস্নাতা ছুটে এসেছিল। বৃষ্টি হচ্ছে খুব। ঠিক সেদিনের মত, যেদিন ও ক্রমশ সরে যেতে শুরু করেছিল আকাশনীলের কাছ থেকে। সে ঘরে তখন আর কেউ ছিলনা। ওরা দুজন শুধু। আলো জ্বলে উঠছে ওর সারা মুখে। কিন্তু বৃষ্টির মুখ অন্ধকার কেন? চোখের কোণে কালি কেন? পথশ্রমে! ছুটে আসার কষ্টে! কথা বলে উঠতে গেছিল ও, কিন্তু পারেনি। মুখের ওপর অক্সিজেন। হাত বাড়াতে গেছিল, পারেনি। হাত স্যালাইন নলে বাঁধা পড়েছিল। ওর ইচ্ছে করছিল সব ছিঁড়ে-খুঁড়ে, সরিয়ে দিয়ে উঠে পড়ে, ছুটে বেরিয়ে পড়ে বৃষ্টির হাত ধরে। চিৎকার করে উঠতে ইচ্ছে করেছিল, কিন্তু কে যেন গাঢ় ঘুমের কথা শোনাল,
‘ঘুমের মাসি, ঘুমের পিসি, মোদের বাড়ি এসো/খাট নেই, পালঙ নেই, চোখ পেতে বোসো।‘
এই তো আরামের ঘুম, ঘুমপাড়ানি গান গেয়ে গেয়ে কারা যেন ঘুম পাড়িয়ে দিল ওকে। ঘুমিয়ে পড়তে পড়তে দারুণ মজা লাগছিল ওর, পরের বছর থেকে ওর বয়স আর বাড়বে না। ঊনচল্লিশ নট আউট। শুধু আক্ষেপ বৃষ্টিস্নাতার জন্য। তবু হয়ত ভালোই হল। যদি এবারে সুখী হতে পারে ও।
সেদিনের থেকে পাঁচ বছর পেরিয়েও বৃষ্টির পার্সে লুকোনো ছবিতে বয়স আটকে রয়েছে আকাশনীলের। মুখে কৌতুকের হাসি। বয়সকে হারিয়ে দেওয়ার হাসি বোধহয়। দেখে দেখে আশ মেটেনা বৃষ্টিস্নাতার। কিন্তু বসে থাকার উপায় নেই। স্বপ্ন সারা বাড়ি দৌড়ে বেড়ায়। ছেলে হবার পর থেকে কিছুদিন হল সামান্য শান্তি এসেছে সংসারে। কতদিনের জন্য! জানেনা ও।
খ্র্যাৎ! এই রে স্বপ্ন নিশ্চয়ই দরজার লক লাগিয়ে ফেলেছে। পিসিমণি এসে চলে যাওয়ার পর থেকে এমন কান্নাকাটি জুড়েছিল যে কীভাবে থামাবে ভেবে পাচ্ছিল না। যা হোক, আপনি থেমেছে। কিন্তু আরেক রোগ, যত সব অসম্ভবের দুনিয়ায় বিচরণের খেলা। তার জন্যেও তো চোখে চোখে না রাখলে বিপদ। কখন যে রাজার দেশে থাকবে, কাকে যে রাক্ষস ভাববে, নিজেকে বন্দী রাজকুমার ভেবে বন্দী করবে কোথায়, আর কখন থাকবে সত্যিকারের দুনিয়ায় এসব বোঝার চেষ্টাতেই দিন যায় ওর।
চার বছরের স্বপ্ন। সবাই বলে বড্ড অন্যমনস্ক। ওইটুকু ছেলে মাঝেমাঝেই কী যে আকাশপাতাল ভাবে! হাতের ছবির দিকে তাকিয়ে খানিক যন্ত্রণা আর খানিক রোমাঞ্চে ভেতর ভেতর কুঁকড়ে যায় বৃষ্টি। তবু তো শান্তি এনে দিয়েছে স্বপ্ন। কতদিনের জন্য!
বৃষ্টিস্নাতা জানেনা।